সরকার বদল হয়েছে

প্রশাসনে ফ্যাসিস্ট স্টাইলের পরিবর্তন হয়নি


১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৩৪

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
ছাত্র-জনতার সর্বাত্মক আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট হাসিনা সরকারের পতন হয় ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট। হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের দুঃশাসন, খুন-গুম, সীমাহীন দুর্নীতি ও অর্থ পাচারে অতিষ্ঠ নাগরিকরা বৈষম্যহীন এক নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে রাজপথে সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েন। পুলিশ ও হাসিনার গুণ্ডা বাহিনীর গুলির মুখে বুক পেতে দিয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেন শহীদ আবু সাঈদরা। শহীদ মীর মুগ্ধ, ওয়াসিমদের স্বপ্ন ছিল দুর্নীতি ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ। কিন্তু গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে সেটি কি হয়েছে? হাসিনার পতন হয়েছে, দেড় বছরের বেশি সময় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এবং ছয় মাসের বেশি সময় নতুন নির্বাচিত সরকার দেশ পরিচালনা করছে। কিন্তু দেশের প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। প্রশাসনে পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতিও বদলায়নি। ঘুষ, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ, আত্মীয়করণ সবই বিদ্যমান রয়েছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার শাসনামলে সুবিধাভোগী ও দুর্নীতিবাজ সরকারি কর্মকর্তারা ভোলপাল্টে নতুন সরকারের কোলে-পিঠে ও ঘাড়ে উঠে পড়েছে। অর্থাৎ প্রশাসনে হাসিনার ফ্যাসিস্ট স্টাইলের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সরকার বদলেছে, ক্ষমতার কেন্দ্রেও এসেছে নতুন নতুন মুখ। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম বড় প্রত্যাশা ছিল- রাষ্ট্রযন্ত্র হবে বৈষম্যমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও নাগরিকবান্ধব। কিন্তু অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের দেশ বছর আর বিএনপি সরকারের ছয় মাস মিলিয়ে দুই বছরের বেশি সময়ের পর প্রশাসনের দিকে তাকালে দেখা যাচ্ছে, কাঠামোগতভাবে সেই পুরোনো সংস্কৃতির বড় অংশই টিকে আছে। রাজনৈতিক আনুগত্য আগের মতোই আছে, দলীয় প্রভাব ঠিকই আছে পাল্টেছে দল, একটি ফ্যাসিস্ট দলের জায়গায় এসেছে আরেকটি। ক্ষমতাসীনদের পছন্দের পদায়ন, বদলি-পদোন্নতিতে তদবির এবং দুর্নীতিও আগের মতো আছে। যুদ্ধ-সংগ্রাম করে, রক্ত দিয়েও প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত মৌলিক পরিবর্তন দৃশ্যমান করা যায়নি।
কমিশনের সুপারিশ উপেক্ষিত
বাংলাদেশের জনপ্রশাসন ব্যবস্থাকে আরও জনবান্ধব, স্বচ্ছ ও গতিশীল করতে ২০২৪ সালের ৩ অক্টোবর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন গঠন করে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের সাবেক চেয়ারম্যান ও সাবেক সচিব আব্দুল মুয়ীদ চৌধুরী এই কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। এই কমিশনের অনেক সুপারিশের মধ্যে প্রধান সুপারিশ ছিল— প্রশাসনিক স্বচ্ছতা আনতে মন্ত্রণালয় ও বিভাগের সংখ্যা ৪০ থেকে কমিয়ে ২৫টিতে নামিয়ে আনা, পদোন্নতির ক্ষেত্রে রাজনৈতিক পরিচিতি যাচাই বা রাজনৈতিক পটভূমি খোঁজার প্রথা বাতিল এবং সিভিল সার্জন বা সরকারি কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে অংশগ্রহণ নিষিদ্ধ করা, প্রশাসনিক কার্যক্রমে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি দূর করতে কঠোর পদক্ষেপ এবং সরকারি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের স্পষ্ট সীমারেখা নির্ধারণ, সরকারি নিয়োগের ক্ষেত্রে পুলিশ প্রাক-যাচাই শুধু ফৌজদারি অপরাধের সঙ্গে জড়িত থাকার বিষয়টি যাচাইয়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকা। কিন্তু এই প্রধান প্রধান সুপারিশগুলো উপেক্ষিত।
জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন নিজেই বলেছিল, প্রশাসনের সর্বস্তরে দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে এবং রাজনৈতিক প্রভাবের কারণে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতিতে যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য ও তোষামোদ গুরুত্ব পেয়েছে। কমিশনের জনমত জরিপেও ৮০ শতাংশ মানুষ প্রশাসনকে সাধারণ মানুষের জন্য বন্ধুত্বপূর্ণ নয় বলে মনে করেছেন; ৪২ শতাংশ বলেছেন ঘুষ ছাড়া সেবা পাওয়া অসম্ভব এবং ৪৬ শতাংশ হয়রানির অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন। ২০২৬ সালের টিআইবির মূল্যায়নেও উঠে এসেছে আরও উদ্বেগজনক চিত্র। সংস্থাটি বলছে, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের দেড় বছর পরও প্রশাসনে দলীয় প্রভাব, নিয়োগ-পদোন্নতিতে অনিয়ম এবং পুরোনো ক্ষমতার সংস্কৃতির পরিবর্তে নতুন রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের প্রবণতা রয়ে গেছে।
বদলায়নি দলীয়করণের পুরোনো সংস্কৃতি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার দাবি ছিল সবচেয়ে জোরালো। কিন্তু বাস্তবে পুরোনো রাজনৈতিক প্রভাব পুরোপুরি দূর হওয়ার বদলে ক্ষমতার সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্কের ধরনই যেন নতুন করে সাজানো হয়েছে। টিআইবির ২০২৫ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, প্রশাসনকে একটি রাজনৈতিক পক্ষের প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগের জায়গায় অন্য রাজনৈতিক পরিচয়ের প্রভাব প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দেখা গেছে। ২০২৬ সালের মূল্যায়নেও প্রায় একই ইঙ্গিত করেছে টিআইবি। ২০২৬ সালের জুলাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ১১টি সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সংস্থায় বিএনপি নেতা-কর্মীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ নিয়ে প্রশ্ন তোলে নাগরিক সমাজ। এসব নিয়োগকে প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা এবং সরকারের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনের প্রতিশ্রুতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক হিসেবে দেখেছেন নাগরিকরা।
গত জুলাইয়ের শেষ দিকে এসে আলাদা প্রজ্ঞাপনে ১১টি সরকারি সংস্থা, বোর্ড ও করপোরেশনের শীর্ষ পদে বিএনপির নেতাদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেয় জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়। গ্রেড-২ পদমর্যাদায় এক বছরের জন্য নিয়োগ পেয়েছেন তারা। বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক, রাজশাহীর সাবেক মেয়র মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) চেয়ারম্যান পদে দলের সহ-ধর্মবিষয়ক সম্পাদক আবদুল বারী এবং বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের (বিসিসিটি) ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে দলের সহ-বন ও পরিবেশবিষয়ক সম্পাদক কাজী রওনাকুল ইসলাম নিয়োগ পেয়েছেন। বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান পদে যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি জাকির হোসেন ও বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মামুন হাসানকে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক করা হয়েছে সালাহ্উদ্দিন সরকারকে। তিনি জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের কেন্দ্রীয় কমিটির কার্যকরী সভাপতি। বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অ্যান্ড সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে বিএনপির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক মোহাম্মদ রাশেদুল হককে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব পদে নিয়োগ পেয়েছেন যুবদলের সাবেক কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মো. কামরুজ্জামান। বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে বিএনপির রংপুর বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক আবদুল খালেক এবং বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান পদে দলের জাতীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য শামসুজ্জামানকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) চেয়ারম্যান পদে নিয়োগ পেয়েছেন বেনজীর আহমেদ। তিনি বিএনপির ঢাকা বিভাগীয় সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বিএনপির মনোনয়ন বঞ্চিত নেতাদের সুবিধাভোগী করতেই সরকারি প্রতিষ্ঠানে এসব নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ আবদুল আউয়াল মজুমদার বলেন, রাজনীতিবিদরা তাদের প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি কমাতে, কাজের গতি বাড়াতে এবং সরকারি টাকার সাশ্রয় করতে পারেন কি না, সেটাই এখন দেখার বিষয়। জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আবদুল বারী জাতীয় সংসদে বলেছেন, নিয়োগ, বদলি ও পদায়নে মেধা, সততা ও দক্ষতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে এবং রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত প্রভাবের সুযোগ নেই।
বন্ধ হয়নি নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য
প্রশাসনের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গাগুলোর একটি হলো নিয়োগ, বদলি ও পদায়ন। ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মকর্তাদের ব্যাপক রদবদল বাংলাদেশের প্রশাসনে নতুন নয়। সকালে নিয়োগ দিয়ে বিকেলে বাতিল করার ঘটনাও ঘটেছে একাধিকবার। গত ১২ সেপ্টেম্বর শনিবার কারা অধিদপ্তরের নতুন কারা মহাপরিদর্শক হিসেবে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও অতিরিক্ত কারা মহাপরিদর্শক পদে কর্নেল সাইদুল ইসলামকে দেওয়া নিয়োগ বাতিল করা হয়েছে। এ দুই সেনা কর্মকর্তাকে প্রেষণে নিয়োগ দিয়ে ১০ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছিল। তাদের চাকরি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। ১০ সেপ্টেম্বর জারি করা ওই প্রজ্ঞাপনটি ১২ সেপ্টেম্বর বাতিল করা হয়। লোভনীয় পদে পদায়ন নিতে গুরুত্বপূর্ণ জেলায় ডিসি-এসপি পদে পদায়ন নিতে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে ঘুষ নেওয়ার খবরও প্রকাশিত হচ্ছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। সচিবালয়ে নিয়োগ ও বদলি বাণিজ্য থেমে নেই। নানা মাধ্যমে এসব অপকর্ম অব্যাহত রয়েছে।
এখনো ‘ফুয়েল’ ছাড়া ফাইল নড়ে না
প্রশাসনে দুর্নীতির সবচেয়ে বড় শিকার সাধারণ নাগরিক। ঘুষের বিনিময়ে সেবা নেওয়ার সংস্কৃতি যে এখনো ব্যাপক, তার শক্ত প্রমাণ মিলেছে টিআইবির জাতীয় খানা জরিপে। ২০২৫ সালের তথ্যের ওপর পরিচালিত টিআইবির সর্বশেষ জরিপে দেখা যায়, দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবার কোনো না কোনো সেবা নিতে গিয়ে দুর্নীতির অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হয়েছে। ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারকে ঘুষ দিতে হয়েছে। জরিপ অনুযায়ী, ২০২৫ সালে দেশে ঘুষ লেনদেনের আনুমানিক পরিমাণ ছিল ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো— ঘুষ দেওয়ার প্রধান কারণ হিসেবে ৮১ দশমিক ৫ শতাংশ পরিবার জানিয়েছে, ঘুষ না দিলে সেবা পাওয়া যায় না। অর্থাৎ এটি কেবল বিচ্ছিন্ন দুর্নীতি নয়; অনেক ক্ষেত্রে সেবা পাওয়ার প্রক্রিয়ার সঙ্গেই ঘুষের সংস্কৃতি জড়িয়ে পড়েছে। এখানে ‘ফুয়েল’ বা ঘুষকে শুধু কোনো একক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ব্যক্তিগত অনৈতিকতা হিসেবে দেখলে চলবে না। টিআইবিও বলেছে, ডিজিটালাইজেশনের পরও অনেক ক্ষেত্রে সেবা ব্যবস্থার জটিলতা ও মধ্যস্বত্বভোগীর ওপর নির্ভরতা ঘুষের সুযোগ তৈরি করছে।
সেবাগ্রহীতার হয়রানি বন্ধ হয়নি
প্রশাসন সংস্কারের সবচেয়ে দৃশ্যমান ফল হওয়ার কথা ছিল নাগরিক সেবায়। অথচ সংস্কার কমিশনের জরিপেই সাধারণ মানুষের প্রশাসন সম্পর্কে নেতিবাচক অভিজ্ঞতার চিত্র পাওয়া গেছে। এক লাখ পাঁচ হাজার মানুষের ওপর পরিচালিত জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের অনলাইন জরিপে ৩১ শতাংশ উত্তরদাতা সরকারি কর্মচারীদের অসৌজন্যমূলক আচরণের কথা বলেছেন। ৪৬ শতাংশ সেবা নিতে গিয়ে হয়রানির শিকার হওয়ার কথা জানিয়েছেন। আরও ৬৬ শতাংশ মনে করেন, সরকারি কর্মকর্তারা নিজেদের শাসকের মতো আচরণ করেন। অর্থাৎ সরকার বদলালেও প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলায়নি।
তোষামোদ ও দুর্নীতির মাধ্যমে লোভনীয় পদে আসার প্রতিযোগিতা বিদ্যমান
প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলো যদি ক্ষমতা, প্রভাব বা অর্থনৈতিক সুবিধার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়, তাহলে সৎ ও দক্ষ কর্মকর্তা পিছিয়ে পড়বে। ২০২৫ সালের জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে বলা হয়, রাজনৈতিককরণের কারণে মেধা ও দক্ষতার গুরুত্ব কমেছে এবং প্রায় সব ক্ষেত্রে নিয়োগ, পদায়ন ও পদোন্নতি যোগ্যতার বদলে রাজনৈতিক আনুগত্য ও তোষামোদের ওপর নির্ভর করেছে। ২০২৬ সালেও পদায়ন ও পদোন্নতি নিয়ে টিআইবির পর্যবেক্ষণ বলছে, প্রশাসনে পদোন্নতির ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট মানদণ্ড অনুসরণ করছে না, অতীতের দুর্নীতি ও অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের পদোন্নতি এবং রাজনৈতিক আনুগত্যকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
সংস্কার কমিশনের সুপারিশ কোথায়?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র সংস্কারের জন্য যে ছয়টি বড় কমিশন গঠন করা হয়েছিল, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশন ছিল তার অন্যতম। কমিশন নাগরিককেন্দ্রিক, জবাবদিহিমূলক ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনের জন্য বিস্তৃত সুপারিশ দেয়। কিন্তু বাস্তবায়নের জায়গায় এসে বড় ঘাটতি দেখা দিয়েছে। টিআইবির ২০২৬ সালের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, জনপ্রশাসন সংস্কার কমিশনের ২০৮টি সুপারিশের মধ্যে তাৎক্ষণিকভাবে বাস্তবায়নযোগ্য হিসেবে চিহ্নিত ১৮টির মাত্র তিনটি বাস্তবায়ন হয়েছে। এসবের মধ্যে ছিল টয়লেট সংস্কার, যাচাই ছাড়া পাসপোর্ট পাওয়ার ব্যবস্থা এবং জনশুনানি। অর্থাৎ প্রশাসনের মূল কাঠামো— নিয়োগ, পদায়ন, পদোন্নতি, জবাবদিহি ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্তির জায়গায় বড় ধরনের পরিবর্তন এখনো হয়নি।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নেই কোথাও?
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের প্রত্যাশা ছিল— ক্ষমতার পালাবদল শুধু সরকার পরিবর্তনে সীমাবদ্ধ থাকবে না; রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও বদলাবে। প্রশাসন হবে নিরপেক্ষ, নাগরিকবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক। কিন্তু প্রায় দুই বছর পর সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে। টিআইবির ভাষায়, কর্তৃত্ববাদী সরকারের পতনের পরও দুর্নীতিমুক্ত, জবাবদিহিমূলক ও সুশাসনভিত্তিক রাষ্ট্রের ভিত্তি যথেষ্ট শক্ত হয়নি। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ ড. হোসেন জিল্লুর রহমানও প্রশাসনিক সংস্কারে আমলাতন্ত্রের সঙ্গে আপসকে জুলাইয়ের সংস্কার এজেন্ডার অন্যতম বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। তার মতে, পুরোনো আমলাতান্ত্রিক কাঠামো ভাঙার বদলে একই কাঠামোর কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় রাখায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান অধ্যাপক আলী রীয়াজ আগেই সতর্ক করেছিলেন, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হলেও কর্তৃত্ববাদ ফিরে আসার ঝুঁকি থাকবে। তার বক্তব্যের মূল কথা ছিল— শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে এমনভাবে পুনর্গঠন করতে হবে; যাতে কোনো সরকার আবার সেগুলোকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্ষমতার হাতিয়ার বানাতে না পারে।
জুলাই অভ্যুত্থানের অন্যতম রাজপথের যোদ্ধা জান্নাতুল ফেরদৌস মালিহা মনে করেন, মানুষ যে বাংলাদেশের জন্য যুদ্ধ করেছিল সেই বাংলাদেশ পাচ্ছে না। ক্ষমতাসীনরা লোভে পড়ে সংস্কারের কথা ভুলে গেছে। তিনি বলেন, আমরা সর্বস্তরে সংস্কার চাই। যে বাংলাদেশি হিসেবে বিশ্বের দরবারে যেকোনো নাগরিক বুক ফুলিয়ে বলতে পারেন আমি একজন বাংলাদেশি।
গত ১৪ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জুন এই তিন মাসে কোটিপতি ব্যাংক গ্রাহক বেড়েছে পাঁচ হাজারের বেশি। বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন এ অবস্থানকে ‘রাজনৈতিকে প্রশ্রয়’ বলে দায়ী করেন। তিনি মনে করেন, ‘বর্তমানে রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়েও অনেকেই আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যাচ্ছেন। তাদের সম্পদের হিসাবও দিতে হয় না।