সরকারের গত ৭ মাস : কমছে গ্যাস সরবরাহ, বাড়ছে বিদ্যুৎ সংকট
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:৩০
প্রতিদিন ক্ষতি ২৩৮৭ কোটি টাকা
॥ জামশেদ মেহদী ॥
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ১২ জানুয়ারি শেখ মুজিব ক্ষমতা গ্রহণ করেন। ক্ষমতা গ্রহণের কিছুদিন পর তিনি একাধিকবার বিভিন্ন জনসভায়, সংবাদ সম্মেলনে এবং সুশীল সমাজের উদ্দেশে বক্তব্য প্রদানের সময় সরাসরি বলেন যে, আগামী ৩ বছর ‘কিছুই দিবার পারবো না’। পাকিস্তানিরা সব ধ্বংস করে দিয়ে গেছে। এগুলো পুনর্গঠনে সময় লাগবে। তিনি কবিতার সুরে বলতেন—
নিঃস্ব আমি রিক্ত আমি
দেবার কিছু নাই
আছে শুধু ভালোবাসা
দিলাম আমি তাই।
শেখ মুজিব জনগণকে কিছু দিতে পারেননি। এমনকি সরকারি এবং স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার কর্মচারীদের বেতন মাসের পর মাস আংশিক কেটে নিয়েছেন। ওয়াদা করেছিলেন যে, সময়মতো সব ফেরত দেওয়া হবে। কিন্তু কাউকেই তিনি কোনো টাকা ফেরত দিয়ে যাননি। আর অর্থনীতির অবস্থা রাতারাতি ভয়াবহ সংকটে পড়ে। আমার মনে আছে, তখন শিশুখাদ্য ল্যাক্টোজেনের এক কৌটার দাম ছিলো ৭ টাকা। মাত্র ১ মাসের মধ্যে তার দাম হয়েছিল ৭০ টাকা। আর ৭৪ সালের দুর্ভিক্ষের কথা নাই বা বললাম। অসংখ্য মানুষ অনাহারে এই ঢাকার গুলিস্তান; এমনকি বঙ্গভবনের অনতিদূরে লাশ হয়ে পড়েছিলেন।
জুলাই বিপ্লবের ৩ দিন পর ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ড. মুহাম্মদ ইউনূসও উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিলেন একটি বিধ্বস্ত অর্থনীতি এবং একটি একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। পেয়েছিলেন এক বিরাট শক্তিশালী বৈরী প্রতিবেশী। অর্থনীতি যে কতখানি লণ্ডভণ্ড হয়েছিল, তার প্রমাণ হলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য রচিত সেই শ্বেতপত্র। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ড. ইউনূসের সময় ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের একটি শ্বেতপত্র কমিটি গঠিত হয়। এই কমিটি ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর ড. ইউনূসের হাতে তাদের রিপোর্ট হস্তান্তর করে। রিপোর্টটির শিরোনাম ছিলো, “White Paper on the State of the Bangladesh Economy: Dissection of a Development Narrative.” বাংলা, বাংলাদেশের অর্থনীতির ওপর শ্বেতপত্র : একটি উন্নয়ন বয়ানের ব্যবচ্ছেদ। ৩৯৯ পৃষ্ঠার এই বিশাল রিপোর্টে দেখানো হয়েছে, কীভাবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের রাজত্বে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে তছনছ করে ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করা হয়েছে। বাংলাদেশি মুদ্রায় ২৩৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমান অর্থ হলো, ২৮ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা।
শুধু এই ২৮ লাখ ৮২ হাজার কোটি টাকা নয়। আওয়ামী লীগের সভাপতি হাসিনা থেকে শুরু করে মফস্বলের নেতারা পর্যন্ত যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছেন, তার একটি তথ্যসমৃদ্ধ ফিরিস্তি দেওয়া শুরু করেছেন লন্ডনপ্রবাসী এক বাংলাদেশি বৃদ্ধা মহিলা তাসনিম খন্দকার। তিনি এ পর্যন্ত ৪৩ জন শীর্ষ আওয়ামী লীগ নেতার সম্পদ লুণ্ঠনের বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন। তিনি আওয়ামী নেতাদের টাকা-পয়সা লুটপাটের ধারাবাহিক বিবরণ দিয়ে যাচ্ছেন।
এই ধরনের একটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত এবং ধ্বংসপ্রাপ্ত অর্থনীতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছিল জুলাই বিপ্লবোত্তর ড. ইউনূসের সরকার। এত বড় ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েও তার সরকারের ১৮ মাসে অর্থনীতির এমন বেহাল দশা হয়নি, যা এই সরকারের ৭ মাসে হয়েছে। অনেকে হয়তো বলতে চাইবেন যে, বর্তমান সরকার তো ড. ইউনূস সরকারের ধারাবাহিকতা। এই সরকারও উত্তরাধিকার সূত্রে এমন খারাপ একটি অর্থনীতি পেয়েছে। কথাটি যুক্তির ধোপে টেকে না।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে নিত্যব্যবহার্য পণ্যের দাম বাড়েনি এমন নয়। কিন্তু এই সরকারের ৭ মাসে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের বাজারে যে আগুন লেগেছে, তেমন ভয়াবহ আগুন ড. ইউনূসের আমলে লাগেনি। ইউনূসের আমলে ১৮ মাসে ২৬৬টি আন্দোলন তথা রাজপথে বিশৃঙ্খলা হয়েছিলো। এই সরকারের ৭ মাসে ৭টি আন্দোলনও হয়নি। তারপরও ইউনূসের আমলে সার, গ্যাস ও বিদ্যুৎ ক্ষেত্রে তেমন সংকট দেখা যায়নি। অথচ সরকারি পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, ড. ইউনূস নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ অব্যাহত রাখার জন্য গৌতম আদানিসহ ভারতের অন্যান্য প্রতিষ্ঠানকে মোট ১ দশমিক ০৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার পরিশোধ করেছেন। এই সরকারকে এই ধরনের কোনো দায় পরিশোধ করতে হয়নি। অর্থনীতি যে এখন কত বড় পাঁকে পড়েছে, সে সম্পর্কে কয়েকটি সূচক উল্লেখ করছি।
এই মুহূর্তে বাংলাদেশে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা। অথচ আমাদের চলতি বাজেটের অংক ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। সুতরাং রাজস্ব ঘাটতি হচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এ কথা একজন অন্ধও বলতে পারেন যে, যদি ঐ খেলাপি ঋণ না থাকতো অথবা ঐ খেলাপি ঋণের অর্ধেকও যদি উদ্ধার করা যেত, তাহলে আমাদের বাজেটে কোনো ঘাটতি থাকতো না।
কেন এত বিশাল অংকের ঋণ খেলাপ? কারা এই ঋণখেলাপি? গত ২ বছর থেকে বিস্তর লেখালেখি হয়েছে যে, আওয়ামী অলিগার্করা এই ঋণখেলাপি কালচারের সূচনা করে গেছেন। এগুলোর মধ্যে ১০টি ব্যাংকে ঋণ খেলাপ হয়েছে সবচেয়ে বেশি। এগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, এক্সিম ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, ন্যাশনাল ব্যাংক, ইউনিয়ন ব্যাংক এবং এবি ব্যাংক। এই ১০টি ব্যাংকের খেলাপি ঋণ মোট খেলাপি ঋণের ৭২ শতাংশ। কীভাবে সরকার এত বিশাল অংকের খেলাপি ঋণ পুনরুদ্ধার করবে? এ সম্পর্কে কোনো শক্ত পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়।
মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর এবং সিইও সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেছেন, এই বিশাল খেলাপি ঋণের বিরাট অংশই আর পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে বলে তিনি মনে করেন না। লঙ্কাবাংলা ফাইন্যান্সের এমডি এবং সিইও হুমায়রা আজম বলেন যে, বড় বড় ঋণখেলাপিদের আমরা আমাদের আশপাশেই ঘুরতে দেখছি। তারা বিশাল আকারে সন্তানদের বা আত্মীয়-স্বজনদের বিয়ের অনুষ্ঠান করছেন এবং সেসব অনুষ্ঠানে লাখ লাখ টাকা খরচ করছেন। তার মতে, অন্য দেশ হলে এসব খেলাপিদের ছবি বিরাট আকারে বিলবোর্ডে এঁকে সেগুলো রাস্তায় টাঙিয়ে দেওয়া হতো।
বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনীতির দুর্বলতাগুলো চিহ্নিত করেছে সিপিডি এভাবে— (১) রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বিশাল হলেও রাজস্ব আদায়ের গতি মন্থর। টার্গেট পূরণের জন্য অলআউট ড্রাইভও নাই। (২) শিল্প উৎপাদন চলছে শম্বুকগতিতে। (৩) দেশি বা বিদেশি বিনিয়োগ মোটেই উৎসাহব্যঞ্জক নয়। (৪) ৯৫টি কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। (৫) ৬১ হাজার ৮৮১ জন শ্রমিক চাকরি হারিয়েছেন। (৬) নড়বড়ে ব্যাংক খাতের উন্নতির কোনো চিহ্ন নাই। (৭) গ্যাস সংকট চলছে। অবশ্য গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার যখন এই রিপোর্ট লিখছি, তখন অনলাইন পোর্টালে দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, আগামীকাল মঙ্গলবারের (১৫ সেপ্টেম্বর) মধ্যে নাকি শিল্পে গ্যাস সরবরাহ দেড় মাস আগের অবস্থায় ফিরে যাবে। তবে প্রধানমন্ত্রী ঘরে ঘরে গ্যাস সরবরাহ এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রয়োজনীয় গ্যাস সরবরাহের ব্যাপারে কিছু বলেননি।
বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সমস্যা উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী। কিন্তু এই উত্তরাধিকারী কারা? অন্তর্বর্তী সরকার? নাকি আওয়ামী লীগের ১৫ বছর? একটু আগেই তো বলেছি, অন্তর্বর্তী সরকার শেখ হাসিনার লুটপাটের লেগাসির উত্তরাধিকারী হয়েছেন। তারপরও তো এমন ভয়াবহ জ্বালানি সংকট দেখা যায়নি।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, দেশে সরকারি হিসাব মতে বেকারের সংখ্যা ২৭ লাখ। তবে একাধিক জাতীয় দৈনিকের রিপোর্ট অনুযায়ী অর্থনীতিবিদদের মতে ২৭ লাখ বেকারের চিত্রটি অসম্পূর্ণ। বাস্তবে এই সংখ্যা অনেক বেশি। সরকারি হিসাব মতেই উচ্চশিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ৯ লাখ। স্বল্প শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা ১৮ লাখ। আর নিরক্ষর বেকারের সংখ্যা উল্লেখ করা হয়নি। অর্থনীতিতে আরেক ধরনের বেকারত্ব রয়েছে। সেটিকে বলা হয় প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব (Disguised unemployment)। প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব কী? ধরা যাক একটি কারখানায় কর্মরত রয়েছেন ১০০ জন শ্রমিক। কিন্তু যোগ্যতা ও দক্ষতার সাথে ঐ কারখানা চালাতে প্রয়োজন হয় ৮৫ জন শ্রমিক। এই অতিরিক্ত ১৫ জন শ্রমিককে হয় মালিকের আত্মীয়-স্বজনকে খুশি করার জন্য অথবা রাজনীতির রাঘব-বোয়ালদের সুপারিশ রক্ষার জন্য চাকরি দেওয়া হয়েছে। আসলে এই ১৫ জন শ্রমিক বেকার। তাই বলা হয় প্রচ্ছন্ন বেকারত্ব।
এই সরকার প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি ছিটাচ্ছে। বলা হচ্ছে যে, ২০৩১ সালের মধ্যে ১ কোটি কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। সেক্ষেত্রে প্রতি মাসে ২০ লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে হবে। গত ৭ মাসে তারা নতুন কতগুলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন এবং ১ বছর পূরণ হলে কতগুলো সৃষ্টি করবেন, সে সম্পর্কে সঠিক পরিসংখ্যানের জন্য মানুষ অপেক্ষা করবেন। তবে ডাক্তার, শিক্ষকসহ বেশ কয়েক হাজার পদ খালি রয়েছে। সেগুলো পূরণ করলে সেটিকে নতুন কর্মসংস্থান বলা যাবে না।
প্রাইম ব্যাংক একটি রিপোর্টে কয়েকটি পরিসংখ্যান দিয়েছে। তাতে বলা হয়েছে যে, চাহিদার তুলনায় গ্যাসের সরবরাহ ৩৬ শতাংশ কম। চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ ৩ হাজার ৭ মেগাওয়াট কম। এসবের ফলে দৈনিক অর্থনৈতিক ক্ষতির পরিমাণ ২ হাজার ৩৮৭ কোটি টাকা। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি মাত্র ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশ। ২ জন অর্থনীতিবিদের মতে মুদ্রাস্ফীতি বা মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশকি ৫ শতাংশ। এই সরকারের ৭ মাসে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা হ্রাস পেয়েছে অন্তত ১০ শতাংশ। অর্থাৎ নিম্ন ও মধ্যবিত্তের আয় এতটুকু বাড়েনি, কিন্তু জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে। সেক্ষেত্রে মানুষ অনেক কষ্টে আছে। এই কষ্টের হার এই সরকারের ৭ মাসে আরো বেড়েছে।
২ বছর আগেও জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিলো ৬ থেকে সাড়ে ৬ শতাংশ। এখন সেই প্রবৃদ্ধির হার আইএমএফের মতে, ৪ থেকে সাড়ে ৪ শতাংশ। অথচ বিএনপি সরকার বলছে যে, তারা ২০৩৪ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানাবে। বর্তমান অথনীতির আকার ৪৫৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ১ হাজার বিলিয়নে হয় ১ ট্রিলিয়ন। এই সরকারের একজন উপদেষ্টা রাশেদ মাহমুদ তিতুমীর। তিনি একজন ধীরস্থিরচিত্তের অর্থনীতিবিদ। তিনি তো জানেন যে, ২০৩৪ সালের মধ্যে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি বানাতে হলে এখন থেকে জিডিপি প্রবৃদ্ধি প্রতি বছর লাগাতার ৮ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে রাখতে হবে।
সরকারের এসব হাই সাউন্ডিং প্রতিশ্রুতি বাস্তবভিত্তিক? নাকি দিবাস্বপ্ন? সেটি আগামী ১ বছরের মধ্যেই পরিষ্কার হয়ে যাবে।
E-mail : jamshedmehdi15@gmail.com