নিজেদের মধ্যে বিরোধ ও নেতৃত্ব সংকট

জ্বলছে মুসলিম ভূখণ্ড ইয়েমেন


১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:২৮

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
আরব সাগর, সৌদি আরব ও ওমান দ্বারা পরিবেষ্টিত ভূখণ্ড ইয়েমেন। দেশটির আয়তন প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটার, সীমানা প্রায় ২ হাজার ২০০ কিলোমিটার। ২০২১ সালের হিসেব মতে জনসংখ্যা প্রায় ২ কোটি ২৬ লাখ, রাজধানী শহর সানা। রাষ্ট্রীয় সঙ্গীত বা ‘al-Nashid al-Watani al-Yamani’। ইয়েমেন মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে দারিদ্র্যপূর্ণ আরব দেশ। দেশটির জনসংখ্যার প্রায় ৮০% দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব, পশ্চিমা বিভাজন ষড়যন্ত্র এবং নিজেদের মধ্যে বোকামির শিয়া-সুন্নি বিরোধ ও নেতৃত্ব সংকটে দীর্ঘদিন ধরে সংঘাতে জ্বলছে ইয়েমেন। যেটি বর্তমান বিশ্বের গুরুতর মানবিক সংকটগুলোর মধ্যে একটি।
ইয়েমেন সংঘাতের ইতিহাস : বিশ্বে প্রথম হুতিদের পরিচয় সামনে আসে ১৯৯০-এর দশকে যারা আনসারুল্লাহ নামেও পরিচিত। তাদের নেতা হুসেইন আল-হুতি শিয়া ইসলামের জাইদি ধারার অনুসারী। জাইদিরা কয়েক শতাব্দী ধরে ইয়েমেন শাসন করেও ১৯৬২ সালের গৃহযুদ্ধ পরবর্তীতে সুন্নিরা ক্ষমতায় আসলে কোণঠাসা হয়ে পড়ে। পরে সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতার ওয়াহাবি মতবাদ মোকাবিলায় আল-হুতি পুনর্জাগরণমূলক ‘বিলিভিং ইয়ুথ’ গড়ে তোলেন। এদিকে ১৯৯০ সালে উত্তর ও দক্ষিণ ইয়েমেন একত্রিত হয়ে ইয়েমেন প্রজাতন্ত্র গঠিত হয়। তখন দেশটির প্রেসিডেন্ট হন আলী আবদুল্লাহ সালেহ। প্রেসিডেন্ট সালেহ প্রথমদিকে ‘বিলিভিং ইয়ুথ’ আন্দোলনটি সমর্থন করেন। তবে আন্দোলনটি জনপ্রিয় হয় এবং শাসনব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে। যেটি তার মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পরবর্তীতে ১৯৯৪ সালে একটি সংক্ষিপ্ত গৃহযুদ্ধ কেন্দ্রীয় সরকারের কর্তৃত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করলেও, অসন্তোষ দীর্ঘস্থায়ী হয়। অন্যদিকে ২০০৩ সালে ইরাকে ইঙ্গ-মার্কিন আগ্রাসনকে ইয়েমেনি জনমতকে উপেক্ষা করে সমর্থন দেন সালেহ। এ সময় হুসেইন আল-হুতি জনগণের পুঞ্জীভূত ক্ষোভকে কাজে লাগিয়ে আন্দোলনের ডাক দেন। ফলে ইয়েমেনি সেনারা ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাইদি নেতা আল-হুতিকে হত্যা করে, তবে আন্দোলনটির মৃত্যু হয়নি। জানুয়ারি ২০১১ সালে আরব বসন্তের প্রভাবে প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংস্কার এবং দুর্নীতি বিলুপ্তির দাবিতে আবারও আন্দোলন হয়। এ সময় হুতিরা দেশটির উত্তরাঞ্চলীয় প্রদেশ সাআদা দখলে নিয়ে সালেহ শাসন অবসানের দাবি করে। ঐ বছরই নভেম্বরে জিসিসি-সমঝোতায় ২২ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা প্রেসিডেন্ট সালেহ পদত্যাগ করেন। এ সময় দেশটির অন্তর্বর্তীকালীন শাসনভার নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট মনসুর আল-হাদি। এক বছর পর বিনাপ্রতিদ্বন্দ্বিতায় প্রেসিডেন্ট হয়ে তিনি বিরোধীদের নিয়ে জাতীয় সরকার গঠন করেন। এরপর হাদিবিরোধী বা সালেহপন্থিরা আবার ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন। অন্যদিকে ২০১৪ সালে শিয়া নেতা সায়্যেদ আব্দুল মালিক বিন বদর আল-দিন আল-হুতির নেতৃত্বে ইয়েমেনে শুরু হয় সরকার, সন্ত্রাস ও মার্কিনবিরোধী ‘হুতি আন্দোলন’। আর সেপ্টেম্বর ২০১৪ হুতিরা রাজধানী সানা’র নিয়ন্ত্রণ নেয়। জানুয়ারি ২০১৫ প্রেসিডেন্ট মনসুর আল-হাদি সৌদি আরবে পালিয়ে গেলে মার্চে হাদির সরকার পুনঃস্থাপন করতে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোট সামরিক হস্তক্ষেপ করে। শুরু হয় পূর্ণাঙ্গ গৃহযুদ্ধ। স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্বও এই গৃহযুদ্ধের জন্য পরোক্ষভাবে দায়ী।
‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব : বিশেষজ্ঞ মতে বর্তমান বিশ্বের সকল ঘটনা পশ্চিমা বিশ্ব কর্তৃক পরিচালিত। আর পশ্চিমা বিশ্বের সকল পলিসি স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিসিস দ্বারা প্রভাবিত। সুতরাং মুসলিম ভূখণ্ড ইয়েমেনে চলমান গৃহযুদ্ধও স্যামুয়েল হান্টিংটনের ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিসিস দ্বারা প্রভাবিত। স্যামুয়েল হান্টিংটন তার ‘সভ্যতার সংঘাত’ থিসিসে দেখিয়েছেন মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে ২০৭০ সাল নাগাদ ইসলামী সভ্যতাই বিশ্ব শাসন করবে। আর সেই ইসলামোফোবিয়া আশঙ্কা থেকেই বিশ্বে চলে পরিবার পরিকল্পনা ও গণতন্ত্রের মতো পারস্পরিক সাংঘর্ষিক নীতি বা সংঘাতের মাধ্যমে মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাস করা পশ্চিমাদের পলিসি প্রতিযোগিতা। ফলে ভিন্ন ভিন্ন শিরোনামে মুসলিম জনঅধ্যুষিত এলাকায় বেশি সংঘাত হয়। যেমন কাশ্মীর নিয়ে ভারত-পাকিস্তান দ্বন্দ্ব, রাজনৈতিক স্বাধীনতা নিয়ে তুর্কিয়ে-কুর্দিস্তান, নেতৃত্বের লড়াই নিয়ে সৌদি-ইরান, আদর্শ নিয়ে তালিবান-নর্দান অ্যালায়েন্স, গণতন্ত্রের নামে বিভিন্ন দেশে আন্ত রাজনৈতিক দলগুলোর কোন্দল, স্বর্ণের খনি দখল নিয়ে সুদানে গৃহযুদ্ধ, ধর্ম বিশ্বাসের নামে ইয়েমেনে সাম্প্রতিক শিয়া-সুন্নি দ্বন্দ্বও এর বাইরে নয়। তবে উত্তর-ঔপনিবেশিক তত্ত্বের জনক এডওয়ার্ড সাঈদ হান্টিংটনের জবাব দিয়েছেন তার ‘ক্ল্যাশ অব ইগনোরেন্স’ বইয়ে। তিনি হান্টিংটনের এই তত্ত্বকে বর্ণবাদী বলে অ্যাখ্যা দিয়েছেন। হিটলার যেমনভাবে ইহুদিদের প্রতিপক্ষ হিসেবে দাঁড় করিয়েছিলেন, হান্টিংটনও তেমনিভাবে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে প্রতিপক্ষ হিসেবে একটি শ্রেণিকে দাঁড় করাতে চাচ্ছেন বলে মতামত দিয়েছেন। সমাজতত্ত্ববিদ নোয়াম চমস্কি এই তত্ত্ব নিয়ে বলেছেন, এটি মূলত স্নায়ুযুদ্ধের পর সোভিয়েত ইউনিয়নের ফাঁকা স্থানকেই পূরণ করার উদ্দেশ্য নিয়ে তৈরি করা হয়েছে, যাতে তাদের নাম দিয়ে যেকোনো ধরনের নৃশংসতা চালানো যায়।
ইয়েমেনের সাম্প্রতিক সংঘর্ষ : সম্প্রতি ইয়েমেনে নিজেদের মধ্যে সংঘর্ষ ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ইতোমধ্যে ইয়েমেনে নিজেদের মধ্যে সংঘাতে ৪ লাখের বেশি মানুষ প্রাণ হারিয়েছে এবং প্রায় ৪.৫ মিলিয়ন মানুষ স্থানচ্যুত হয়েছে। আল-জাজিরা বলছে, ইয়েমেন সরকারের এবারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য সানা পুনর্দখল। এর আগে তারা সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের (এসটিসি) কাছ থেকে দক্ষিণ ইয়েমেনের কিছু এলাকা পুনর্দখল করে। এদিকে আরব আমিরাত সমর্থনপুষ্ট ‘জায়ান্ট ব্রিগেড’ নামের সরকারপন্থী দল হুতিদের শাবওয়াহ প্রদেশ থেকেও পরাস্ত করেছে। তবে দীর্ঘদিন ধরে ইরান সমর্থিত হুতিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে ইয়েমেনের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের বড় অংশ এবং রাজধানী সানা। অন্যদিকে আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সরকার এবং মিত্র গোষ্ঠীগুলো দক্ষিণ ও পূর্বাঞ্চলের অধিকাংশ এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় অস্ত্রবিরতি কার্যকর হওয়ার পর থেকে ইয়েমেন সংঘাত তুলনামূলকভাবে শান্ত ছিল; যা এই নতুন সংঘর্ষের মাধ্যমে ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। যদিও সেই আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির মেয়াদ ঐ বছরের শেষদিকে ভেস্তে যায়। তবে চুক্তির কারণে গত কয়েক বছর দেশজুড়ে পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ দেখা যায়নি। বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাহাজ চলাচলের রুট বাব-আল-মানদেব প্রণালিতে নেতৃত্বের লড়াইয়ে হুতিরা বড় ধরনের অভিযান চালানোর পরপরই শুরু হয় এই সংঘর্ষ।
বাব-আল-মানদেব : ইয়েমেনের বর্তমান সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ- বাব-আল-মানদেব প্রণালির নিয়ন্ত্রণ। বাব-আল-মানদেব হলো লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের মধ্যকার কৌশলগত সমুদ্রপথ। হুতিরা ২০২৩ সাল থেকে লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালিয়ে আসছে। ‘ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের এক বার্তায় বলা হয়, কয়েকজন অস্ত্রধারী ফসফরিক এসিড বহনকারী বাণিজ্যিক ট্যাংকার ‘সেন্ট্রাল পার্ক’ জব্দ করতে যাওয়ায় সহায়তার জন্য ট্যাংকারের ক্রুরা আবেদন জানালে মার্কিন নৌবাহিনী এগিয়ে আসে। সেসময় প্রণালিটিতে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ লক্ষ করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া হয়। একই দিনে পেন্টাগনের মুখপাত্র ব্রিগেডিয়ার জেনারেল প্যাট রাইডার বলেন, আন্তর্জাতিক নৌপথের নিয়ম হচ্ছে যখন কেউ সহায়তার জন্য আবেদন করেন, তখন কাছাকাছি থাকা জাহাজগুলোকে এগিয়ে আসতে হয়। তিনি উদ্বেগের সাথে জানান যে, সেসময় কাছাকাছি চীনা নৌবাহিনীর তিনটি জাহাজ থাকলেও তারা ‘সহায়তার ডাকে সাড়া দেয়নি’। এ পরিস্থিতিতে যুক্তরাজ্য, বাহরাইন, কানাডা, ফ্রান্স, নরওয়ে ও অন্যদের নিয়ে নতুন এক বহুজাতিক নৌ-টাস্কফোর্স গঠন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। বাব-আল-মানদেব জলপথের গুরুত্ব আরও বেড়েছে হরমুজ প্রণালিতে নৌচলাচল সীমিত হওয়ার কারণে। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের সংঘাতের মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। একই সময়ে বাব-আল-মানদেবেও বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিলে এর প্রভাব মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি বাজারেও পড়া অবশ্যম্ভাবী। এদিকে হুতিদের হামলার আশঙ্কায় বিশ্বের বৃহত্তম পাঁচটি শিপিং ফার্মের মধ্যে চারটি- মায়েরস্ক, হাপাগ-লয়েড, সিএমএ সিজিএম গ্রুপ ও এভারগ্রিন লোহিত সাগরে জাহাজ চলাচল বন্ধ রেখেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ জ্বালানি প্রতিষ্ঠান ব্রিটিশ পেট্রলিয়াম (বিপি)ও একই পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। আর শিল্পোন্নত দেশগুলোর জোট জি-৭ এ ধরনের হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে। তবে হুতিদের এক মুখপাত্র মুহামেদ আল-বুখাইতি আল-জাজিরাকে জানান, তারা লোহিত সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন যেকোনো জোটকে মোকাবিলা করবেন। হুতিরা আরো বলছে, তারা তখনই থামবে, যখন ইসরাইল ইয়েমেনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার ফিলিস্তিনের গাজায় হামলা বন্ধ করবে। তবে চলমান আঞ্চলিক যুদ্ধের কারণে তেহরান হুতিদের সহায়তায় কতটা সক্ষম হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যদিও সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের ২০২১ সালের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সমুদ্র মাইন, ব্যালাস্টিক ও ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র এবং ড্রোনসহ অন্যান্য অস্ত্রশস্ত্র ও কারিগরি সুবিধা দিয়ে হুতিদের সহায়তা করে ইরান। ইরানের কথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেসিস্ট্যান্স’-এর অংশ হুতিরা। এটি মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও জায়নবাদের বিরুদ্ধে ইরানের নেতৃত্বে গঠিত একটি আঞ্চলিক সামরিক জোট। গাজায় হামাস ও লেবাননে হিজবুল্লাহর মতো ইয়েমেনে ইরানের আস্থার জায়গা হুতিরা। তবে হুতিদের বাব-আল-মান্দেবে হামলা এড়াতে চাইলে জাহাজগুলোকে আফ্রিকা হয়ে অধিকতর দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হবে। যদিও সৌদি আরব প্রণালিটির ভরসায় ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন তৈরি করেছে।
ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন : আরব উপদ্বীপজুড়ে ১ হাজার ২০০ কিলোমিটার দীর্ঘ ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইনটি সৌদি আরবকে হরমুজ প্রণালি এড়িয়ে লোহিত সাগর দিয়ে তেল পরিবহনের সুযোগ করে দিয়েছিল। হরমুজে কোনো ধরনের বিঘ্নের কথা মাথায় রেখেই ১৯৮০-এর দশকে পাইপলাইনটি তৈরি করা হয়েছিল। ২০১৯ সালে হুতিদের ড্রোন হামলার সময় এটি সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছিল। এ বছর ফেব্রুয়ারিতে ইরান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এখন বাব-আল-মানদেব প্রণালি হুতিদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া ও ইস্ট-ওয়েস্ট পাইপলাইন বন্ধ ঘোষণার ফলে আরব উপদ্বীপের দুই পাশেই জ্বালানি সরবরাহে প্রচণ্ড চাপ তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থা (আইইএ) উদ্বেগের সাথে জানিয়েছে, সৌদি আরবের অপরিশোধিত তেল সরবরাহ তিন দশকের বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে গেছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়ান ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক আলাম সালেহের ভাষায়, ইরানের হরমুজ প্রণালির পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাব-আল-মানদেব নৌপথের প্রভাব রয়েছে। হুতিদের এই অগ্রযাত্রা চীন ও রাশিয়ার কাছেও একটি বার্তা দিচ্ছে— মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক শক্তির প্রভাব আগের তুলনায় কমছে। আর দোহা ইনস্টিটিউট ফর গ্র্যাজুয়েট স্টাডিজের অধ্যাপক মুহাম্মদ এলমাসরি বলেন, গত কয়েক বছরে ইরান থেকে পাওয়া ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা হুতিদের সামরিক সক্ষমতা আরো বাড়িয়েছে। তবে কিংস কলেজ লন্ডনের সহযোগী অধ্যাপক আন্দ্রেয়াস ক্রিগের মতে, দ্রুত সামরিক সাফল্য পেলেও পশ্চিমা বিভাজন ষড়যন্ত্রে টেকশই শাসন পরিচালনা হুতিদের অধরাই থেকে যাওয়ার আশঙ্কা।
পশ্চিমা বিভাজন ষড়যন্ত্র : বহু বছর ধরে ইয়েমেনে ভয়াবহ সংঘাত চলছে, যেটি আসলে কোনো বিজয়ীর খোঁজ করছে না। বিষয়টি ১৯৯৯ সালে মার্কিন কৌশলবিদ এডওয়ার্ড লুটওয়াকের ‘গিভ ওয়ার অ্যা চান্স’ শীর্ষক নিবন্ধে তোলা সেই তত্ত্বের কথা মনে করিয়ে দেয়। যা ২০১৩ সালে সিরিয়া সংকটের সময় প্রয়োগ করা হয়েছিল— সব যুদ্ধের সমাপ্তি মানেই শান্তি নয়, আবার সব বিজয়েও কাঙ্ক্ষিত ফল আসে না। সিরিয়া প্রসঙ্গে লুটওয়াক যুক্তি দিয়েছিলেন, সরকারি বাহিনীর জয় মানে ইরানের শক্তিশালী হওয়া, আর তার পতন মানে ‘নিয়ন্ত্রণহীন বিদ্রোহীদের’ উত্থান। মার্কিন ও ইসরাইলি দৃষ্টিকোণ থেকে সেসময় তাই সংঘাতকে অনির্দিষ্টকালের জন্য অচল অবস্থায় রাখাই ছিল সবচেয়ে অনুকূল পথ। এক দশকের বেশি সময় পর ইয়েমেন যেন সেই তত্ত্বেরই এক বাস্তব মহড়া দিচ্ছে। হুতিরা কখনোই পুরো দেশ দখল করতে পারেনি, আবার জোট বাহিনীও তাদের সানা থেকে সরাতে পারেনি। এ বিষয়ে মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের সিনিয়র ফেলো জেমস ফারওয়েলও জানান, ইয়েমেনের সংঘর্ষ এখন একটি অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। কোনো পক্ষই অপরের বিরুদ্ধে সামরিক সংগ্রামে জয়ী হতে পারছে না। ‘পরিস্থিতি এখন আরও খারাপ হচ্ছে, কারণ আক্রমণে আরও ভয়াবহ মারণাস্ত্র ব্যবহার হচ্ছে,’ যোগ করেন তিনি। ওয়াশিংটন জেনেশুনে লুটওয়াকের তত্ত্ব প্রয়োগ করেছে কি না, তা বড় কথা নয়; তবে এই ফ্রেমওয়ার্ক সুদান, লিবিয়া, ইরাক ও লেবাননের ঘটনা বুঝতেও সাহায্য করে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি নীতি সংঘাত সমাধানের চেয়ে সমাজগুলোকে বিভক্ত ও দুর্বল করে রাখার কাজই বেশি করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ড্রাইভিং সিটে না বসে আড়ালে থেকেই যুদ্ধের সীমা ঠিক করে দিতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে, আর অন্যরা বহন করে তার মাশুল। আঞ্চলিক সমীকরণও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তবে উদীয়মান তুরস্ক-সৌদি-পাকিস্তান অক্ষ রিয়াদের হয়ে আঙ্কারা বা ইসলামাবাদ ইয়েমেনি সংকটে আসবে কি না, তা অনিশ্চিত। শাদি ইব্রাহিম ইস্তাম্বুল সাবাহাত্তিন জাইম ইউনিভার্সিটির সেন্টার ফর ইসলাম অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের গবেষণা সহযোগী।
হুতিরা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রধান শিরোনাম হয় মূলত লোহিত সাগরে ব্রিটিশ মালিকানাধীন ও জাপান থেকে পরিচালিত ‘গ্যালাক্সি লিডার’ জব্দ করার মধ্য দিয়ে। সূত্রমতে, সশস্ত্র ব্যক্তিরা হেলিকপ্টারে করে জাহাজটির পিছু নেন। তারা হেলিকপ্টার থেকে জাহাজের ছাদে নামেন। জাহাজে উড়িয়ে দেন ফিলিস্তিন ও ইয়েমেনের পতাকা। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম তেহরান টাইমসের মূল শিরোনাম হয়, ‘ফিলিস্তিন ইস্যু ইয়েমেনের পররাষ্ট্রনীতির অন্যতম অগ্রাধিকার’। হুতি নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর জ্যেষ্ঠ কমান্ডার ও ইয়েমেনি বিমানবাহিনীর সাবেক মুখপাত্র মেজর জেনারেল আব্দুল্লাহ আল-জাফরি বিশেষ সাক্ষাৎকারে সংবাদমাধ্যমটিকে বলেন, ‘আমাদের নেতা সৈয়দ আব্দুল মালিক বিন বদর আল-দিন আল-হুতি নির্দেশ দিয়েছেন যে, ইসরাইলের যেকোনো জাহাজ আটক করতে হবে। ‘আব্দুল্লাহ আল-জাফরি আরও বলেন, ‘ধর্ম, জাতীয়তা, নৈতিকতা, মানবিকতা ও ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে ইয়েমেন জোরালো কণ্ঠে আনুষ্ঠানিকভাবে এই ঘোষণা দিচ্ছে যে, তারা জায়নবাদীদের (ইসরাইলপন্থি) বিরুদ্ধে সরাসরি সংঘাতে জড়াচ্ছে। তবে ‘সভ্যতার সংঘাত’ তত্ত্ব, পশ্চিমা বিভাজন ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে নিজেদের মধ্যে বোকামির শিয়া-সুন্নি বিরোধ ও নেতৃত্ব সংকট নিরসনের মাধ্যমে ইয়েমেন তথা সারা বিশ্বে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
তথ্যসূত্র : ইয়েনি শাফাক, দ্য মিডল ইস্ট আই, দ্য গার্ডিয়ান, BBC, DW, CNN, আল-জাজিরা।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com