ভুলে ভরা অর্থনীতির আকাশে মন্দার মেঘ : উদাসীন সরকার


১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৩

॥ উসমান ফারুক ॥

শুধু আড়াই শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া ছাড়া প্রবাস আয়ে সরকারের আর কোনো অবদান নেই। আওয়ামী লীগ সরকার দেশ থেকে উৎখাত হওয়ার পর থেকে অর্থ পাচার তুলনামূলক কমে যাওয়ায় প্রবাসীদের রেমিট্যান্স এখন স্বাভাবিকভাবেই বাড়ছে। এ কারণে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভও স্বস্তিতে আছে। এ দুটি ছাড়া অর্থনীতিতে আর কোনো ভালো খবর নেই। দেশের অর্থনীতিতে প্রাণচাঞ্চল্য আনতে অন্তত মৌলিক দেড় ডজন সূচক ভালো থাকতে হয়। সেখানে প্রবৃদ্ধি হলে তার প্রভাব সার্বিকভাবে অর্থনীতিতে পড়ে। কিন্তু সেই সূচকগুলো এখন নড়বড়ে। শুধু দেড় মাস ধরে চলা জ্বালানি সংকট সার্বিক শিল্পোৎপাদন ব্যবস্থাকে হুমকির মুখে ফেলে দিয়েছে। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির বদলে বিদ্যমান চাকরিকেই হুমকিতে ফেলেছে। এজন্য গত আগস্টে ২২ মাস পরে সেবা খাত সংকুচিত হয়েছে ও উৎপাদন খাত এমনভাবে সংকুচিত হয়েছে যে, উৎপাদন আগের মাস জুলাইয়ের চেয়ে অর্ধেকে নেমেছে বলে এমসিসিআই তথ্য দিয়েছে। জুলাইয়ে আমদানি বাড়লেও এর বিপরীতে রপ্তানি কমেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, অর্থনীতি এখন টেনেটুনে কোনোমতে চলছে। অধিকাংশ সূচক নড়বড়ে। বিতাড়িত সরকার যেমন প্রবৃদ্ধির উল্লাস মেতেছিল, বর্তমান সরকারও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে নিতে একই ভুল করছে। নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত নিতে সময়ক্ষেপণ করছে।
এমন সময়ে প্রাকৃতিক বা অন্য কোনো দুর্যোগ সৃষ্টি হলে দেশে অর্থনীতিতে মন্দা দেখা দেবে। সেই মন্দার প্রভাব মোকাবিলার সক্ষমতা দেশের অর্থনীতির নেই। অর্থনীতিতে নিয়ে সরকারের ভুল নীতির কারণে এখন সাধারণ মানুষ জিম্মি হয়ে পড়েছে। তারা বলছেন, সরকারের একের পর এক ভুল নীতির মধ্যে রয়েছে খেলাপিদের আরো ছাড় দেয়া, ব্যবসায়ীদের ঋণ বাড়িয়ে দেয়া, টাকা ছাপিয়ে ৬০ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ঘোষণা, ভ্রমণ কোটায় ৬ হাজার ডলার বাড়িয়ে বার্ষিক ১৮ হাজার করায় অর্থ পাচারের নতুন রুট তৈরি হওয়ার শঙ্কা, দ্রুত জ্বালানির সমস্যার সমাধান না করে সময়ের জন্য অপেক্ষা করা, সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেড়শ’ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেয়ার মতো সিদ্ধান্তগুলো যথাযথ বিশ্লেষণ ছাড়াই করা হয়েছে।
অথচ আয় বাড়াতে সরকারের যেমন অগ্রগতি নেই, তেমনি কোনো পরিকল্পনাও নেই। খরচ বাড়ালেও আয় বাড়ানোর পথে হাঁটছে না সরকার। এসব কারণে গত এক মাসের বেশি সময় ধরে অর্থনীতির আয়না হিসেবে বিবেচিত পুঁজিবাজার টালমাটাল অবস্থায় চলছে। লেনদেন ৫০০ কোটি টাকার নিচে নেমেছে। এরূপ ভুলের দীর্ঘমেয়াদি মাশুলের পরোয়া করছে না সরকার। নীতিনির্ধারকদের এসব ভুলের খেসারত দিতে গিয়ে ফের উচ্চ মূল্যস্ফীতির ধকলের মধ্যে চিড়েচ্যাপ্টা হওয়ার পথে দেশের সাধারণ মানুষ।
অর্থনীতিতে অদ্ভুত বৈপরীত্য আচরণ
অন্তর্বর্তী সরকারের আড়াই বছরে যে সংস্কার শুরু হয়েছিল, তা পিছিয়ে যাচ্ছে। সংস্কার কার্যক্রম গতি হারানোর ফলে অর্থনীতি আর সচল হচ্ছে না। এর ফলে ২০২৬ সালের এই সময়ে এসে দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলো যেভাবে একের পর এক দুর্বল হয়ে পড়ছে, তা গত ২০ বছরের যেকোনো সংকটের চেয়েও গভীর এবং কাঠামোগতভাবে ভিন্ন। তাতে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে একটি অদ্ভুত বৈপরীত্য আচরণ দেখা যাচ্ছে।
দেশের পুঁজিবাজার থেকে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা চলে যাচ্ছে। তুলে নিতে শুরু করেছে তাদের বিনিয়োগ। গত জুলাই মাসের বিদেশি বিনিয়োগকারীদের পোর্টফোলিও বিনিয়োগের তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে। ব্যালেন্স অব পেমেন্টের হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের জুলাইয়ে পোর্টফোলিও বিনিয়োগে ১ কোটি ২০ লাখ ডলার ছিল। এ বছরের জুলাই মাসে তা ঋণাত্মক হয়ে ৩ কোটি ৮০ লাখ ডলার হয়েছে। তার মানে এ পরিমাণ বিনিয়োগ তারা পুঁজিবাজার থেকে তুলে নিয়েছে। যার প্রভাবে গত দুই মাস ধরে খরায় চলছে পুঁজিবাজার। এটি পুঁজিবাজারের প্রতি বিদেশি বিনিয়োগকারীদের অনাস্থার সরাসরি প্রমাণ।
একদিকে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্সের রেকর্ড প্রবাহ বেড়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে কিছুটা কৃত্রিম স্বস্তি এনেছে। এখন রিজার্ভ ৩৬ বিলিয়ন ডলার পার করেছে। এটা সাময়িক স্বস্তি দিলেও আমদানি প্রবৃদ্ধি আশানুরূপ হচ্ছে না। অথচ রিজার্ভ বাড়লে আমদানি চাপও বৃদ্ধি পাওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে বিনিময় হার স্থির থাকার কথা। টাকার মান ডলারের বিপরীতে শক্তিশালী হওয়ার কথা। কিন্তু বাস্তবে ডলারের বিপরীতে গত দেড় বছরে টাকার মান হারিয়েছে ২০ পয়সা থেকে এক টাকা।
এ কারণে বাস্তব বা রিয়েল ইকোনমির প্রতিটি সূচকই ভঙ্গুর। মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় কোনো স্বস্তি নেই। বিশেষ করে শহরের চেয়ে গ্রামে খাদ্য মূল্যস্ফীতি এবং জীবনযাত্রার ব্যয় অনেক বেশি। রেকর্ড প্রবাস আয় ও রিজার্ভের তেমন সুফল মিলছে না।
কারণ হচ্ছে, রপ্তানি খাত সংকটের মুখে, তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটে শিল্পের উৎপাদন খাত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে, খেলাপি ঋণের ক্যান্সার ব্যাংকিং খাতকে ধ্বংসের মুখে নিয়ে যাচ্ছে। বেসরকারি খাতে ঋণের প্রবৃদ্ধি ৩৩ বছরের ইতিহাসে সর্বনিম্ন ৪ দশমিক ৪৭ শতাংশে নেমে এসেছে। পুঁজিবাজার হয়ে উঠেছে দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে নিকৃষ্ট পারফর্মার। এই পরিস্থিতিতে নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা এবং সংস্কারে চরম অনীহা আমাদের অর্থনীতিকে এক খাদের কিনারে নিয়ে দাঁড় করিয়েছে।
গত জুলাইয়ে বাণিজ্য ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২০৮ কোটি ৮০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই মাসের চেয়ে ৩৮ দশমিক ৩৭ শতাংশ বেশি। কাঁচামাল আমদানি বাড়লেও গ্যাস সংকটে পণ্য রপ্তানি করতে পারছে না ব্যবসায়ীরা। বাণিজ্য ঘাটতির রেকর্ড বৃদ্ধি, রপ্তানি খাতের পতন এবং আর্থিক হিসাবের ধারাবাহিক রক্তক্ষরণ সামষ্টিক অর্থনীতির মূল ভিত্তিগুলোকে এক গভীর ঝুঁকির মুখে দাঁড় করিয়েছে। বাহ্যিক খাতের এই মরীচিকার পেছনে যে তিনটি প্রধান নীতিগত ও কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, তার নির্মোহ বিশ্লেষণ ছাড়া সামনে আসা অর্থনৈতিক মন্দা ঠেকানো বলা যায় অসম্ভব।
যা বলছেন বিশ্লেষকরা
বিশ্বব্যাংক ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, বিদেশি মুদ্রার মজুদ এখন মোটামুটি সন্তোষজনক আছে। আমদানি বাড়লেও খুব একটা সমস্যা হবে না। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে এখন বড় সংকট হয়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি সংকট। দিন যত যাচ্ছে, সংকট ততই বাড়ছে। গ্যাস-বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান না হলে কিন্তু সব ভেস্তে যাবে।
অন্যদিকে দেশে তীব্র গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কারণে কারখানাগুলোয় ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ উৎপাদন কমেছে— বলেছেন ব্যবসায়ী নেতা বাংলাদেশ চেম্বারের সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী পারভেজ। তিনি বলেন, এই সংকটের ফলে শিল্প খাত গভীর বিপর্যয়ে পড়েছে। সংকট বড় করে প্রচার হওয়ায় তৈরি পোশাক খাতের বিদেশি অর্ডার হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে।
উচ্চহারে বিল দিয়েও সময়মতো জ্বালানি না পাওয়ায় ব্যবসায়ীরা ব্যাংক ঋণখেলাপি হওয়ার আশঙ্কায় আছেন জানিয়ে তিনি বলেন, নতুন সরকার আসল, আমরা ভেবেছিলাম এখন সবকিছু ভালোভাবে শুরু হবে। অনেকে অনেক পরিকল্পনা করলেন বিনিয়োগ করার। কিন্তু সবকিছু কেমন যেন হয়ে গেল। জ্বালানি সংকটের দ্রুত সমাধান না হলে নতুন শিল্প-কারখানা স্থাপন তো দূরে থাক; যেগুলো আছে, সেগুলো টিকে থাকবে কি না— সেটিই এখন প্রশ্ন হয়ে দেখা দিয়েছে।
চলমান গ্যাসের সংকট ও শিল্প খাতে এর প্রভাব নিয়ে পোশাক খাতের নিটওয়্যার ব্যবসায়ীদের সংগঠন বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গ্যাসের সংকটে শিল্প-কারখানাগুলো মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এক মাসে অন্তত ৪০ শতাংশ রপ্তানি আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সময়মতো পণ্য পাবেন না শঙ্কায় বিদেশি ক্রেতারাও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোর দিকে ঝুঁকছেন।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এখন দ্রুত বিকল্প ব্যবস্থা করতে হবে। সেখানে প্রয়োজনে সরকারকে বেশি অর্থ ব্যয় করতে হলেও উৎপাদন ব্যবস্থা সচল রাখতে হবে। নইলে এর প্রভাব সকল খাতেই পড়বে। পণ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি দেখা দিলে মূল্যস্ফীতির যে চাপ আসবে, তা সামাল দেয়া সম্ভবপর হবে না।
বারবার ছাড় খেলাপিদের
আওয়ামী লীগ সরকারের রেখে যাওয়া ক্ষতগুলোর মধ্যে সবচেয়ে দগদগে হচ্ছে ব্যাংকিং খাত। অর্থের জোগান দেয়া উৎসগুলোর মধ্যে ব্যাংক খাত এখন খেলাপি ঋণের ক্যান্সারে আক্রান্ত। খেলাপিদের শাস্তির বদলে বারবার পুনঃতফসিল করার সুযোগ এই সরকারও দিয়েছে। এমন খেলাপিদেরও সুযোগ দেয়া হয়েছে, যারা এক বছরে আগে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ঋণ পুনঃতফসিল করেছিল। সেই প্রতিষ্ঠানও পুনরায় খেলাপি হয়ে গেছে ব্যাংকের কাছে। তাদের আবার নতুন করে সুযোগ দেয়া হচ্ছে সুদ মওকুফসহ খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করার। গত জুন শেষে দেশের ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকা পার করেছে। খেলাপির হার এখন ৩২ দশমিক ৭৯ শতাংশ।
অর্থাৎ বেসরকারি খাতে দেওয়া ব্যাংকের দেওয়া প্রতি ১০০ টাকা ঋণের প্রায় ৩৩ টাকাই এখন ফেরত দিচ্ছে না ব্যবসায়ীরা। এভাবে কৃত্রিমভাবে খেলাপি ঋণ কমিয়ে আনার উদ্যোগ অর্থনীতিকে আরো ভোগাবে। এখানেই প্রশ্ন আসে সরকার কোথায় ভুলটি করছে? ভুলটা শুরু হয়েছে নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে। আওয়ামী লীগ সরকারের তোষণনীতির ধারাবাহিকতা এই সরকারও ভিন্ন মোড়কে ধরে রেখেছে। ঋণখেলাপিদের শাস্তি দেওয়ার পরিবর্তে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে একের পর এক নজিরবিহীন বিশেষ সুবিধা দিয়ে চলেছে। অন্যদিকে দেড় মাসেও জ্বালানি সমস্যার সমাধান করতে পারছে না। হাতে হাত ধরে বসে আছে। যার ফলে এখন রাজধানী ঢাকায়ও লোডশেডিং শুরু হচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, আমাদের জ্বালানি সংকটের মূল কারণ হচ্ছে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধানে চরম অবহেলা করা। এটি আওয়ামী লীগ সরকার করেছে গত দেড় দশকে। এখন সরকারকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে অভ্যন্তরীণ গ্যাস অনুসন্ধান করার। অতিমাত্রায় আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং কয়লার ওপর নির্ভরশীলতায় আজকের বিপদে ফেলেছে অর্থনীতিকে। একটি মাত্র টার্মিনাল দিয়ে এলএনজি সরবরাহ করা হচ্ছে, সেটি বন্ধ হওয়ায় এখন পুরো অর্থনীতি সংকটে পড়েছে। আওয়ামী লীগ সরকার দেশীয় গ্যাস কূপ খনন ও অনুসন্ধানে কোনো বড় বিনিয়োগ করেনি। উল্টো লবিস্ট এবং অলিগার্কদের সুবিধা দিতে গিয়ে এলএনজি আমদানির দিকে ঝুঁকেছে।
মূল্যস্ফীতির ফাঁদে মধ্যবিত্ত ও সাধারণ আয়ের মানুষ
সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম বড় মাথাব্যথা হলো মূল্যস্ফীতি। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্য বলছে, গত আগস্টে দেশের সাধারণ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ২৬ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। তবে এই পরিসংখ্যানটি সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের বাজারের ব্যাগ ও পকেটের শূন্যতার সাথে মেলে না। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি আসলে আরো বেশি। বিশেষ করে খাদ্যসহ অতি প্রয়োজনীয় ডজনখানেক পণ্যের হিসাব কষলে দেখা যায়, মূল্যস্ফীতি ১২ শতাংশের ওপরে রয়েছে।
এমন চাপের মধ্যে সরকার সয়াবিন তেলের দাম বাড়িয়েছে প্রতি লিটারে ৫ টাকা। ভোজ্যতেল কেবল সরাসরি রান্নার উপাদান নয়, এটি খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ শিল্প, বেকারি, রেস্তোরাঁ এবং হোটেল খাতের জন্য একটি প্রধান কাঁচামাল। সয়াবিন তেলের দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যসামগ্রীর দামও বৃদ্ধি পাবে। ফলে খাদ্য মূল্যস্ফীতি গত আগস্ট মাসে যে ৭ শতাংশে নেমেছিল, তা আবারও ঊর্ধ্বমুখী হবে। অন্যদিকে খাদ্যবহির্ভূত মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যেই ৯ দশমিক ৩২ শতাংশের ওপরে আছে। আগামী মাসে পরিবহন ও আনুষঙ্গিক খরচের কারণে আরও উসকে যাবে।
অর্থ পাচার বেড়ে যাওয়ার শঙ্কা
বাংলাদেশের রিজার্ভ বাড়লে একটি মহল অর্থ পাচারে ঝুঁকে পড়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও ৪৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ ওঠার পর নানা উপায়ে অর্থ পাচার শুরু হয়। এখনো সেই পথে হাঁটতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এখন বৈধ পথে টাকা পাচারের পথ সুগম করেছে। ভ্রমণ কোটায় বছরে আরো ৬ হাজার ডলার নেয়ার সুযোগ দিয়েছে। আগে বছরে একজন নাগরিক ১২ হাজার ডলার খরচ করতে পারতো বিদেশ ভ্রমণে, এখন বছরে তা হবে ১৮ হাজার ডলার। এতে গ্রুপ ভ্রমণের নামে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো আগের চেয়ে বেশি করে বিদেশে টাকা পাচার করতে পারবে।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্তে বৈধ পথে বৈধ ভ্রমণ কোটা বেশি থাকবে, তখন মানুষ কার্ডে বেশি ডলার এন্ডোর্স করবে। কিন্তু অনেক সময় বাস্তবে সেই ডলার হুন্ডির মাধ্যমে বিদেশে ক্যাশ করে নেওয়া হয়। অতএব এটি অর্থ পাচার বন্ধ তো করবেই না, বরং পাচারকারীদের জন্য বৈধ মোড়কে ডলার বাইরে নিয়ে যাওয়ার একটি বড় ফাঁকফোকর তৈরি করে দেবে।
আয় কমলেও সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি করেছে সরকার। একদিকে দেশের রাজস্ব আদায়ের অবস্থা তথৈবচ, উন্নয়ন বাজেট সংকুচিত করতে হচ্ছে, ঠিক তখনই মন্ত্রিসভা সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি নতুন বেতনকাঠামো অনুমোদন করেছে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি যৌক্তিক হতে পারে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে, কিন্তু এই সংকটের সময়ে খরচ বাড়ানো প্রক্রিয়া অত্যন্ত প্রশ্নবিদ্ধ। প্রায় ১৫ লাখ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর হাতে হঠাৎ করে বাড়তি অর্থ আসার ফলে বাজারে মুদ্রা সরবরাহ বাড়বে। কিন্তু উৎপাদন না বাড়ায় এই অতিরিক্ত অর্থ বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর চাহিদার চাপ তৈরি করবে এবং মূল্যস্ফীতিকে আরও উসকে দেবে।
বোদ্ধামহল ও বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের সামষ্টিক অর্থনীতি এখন নীতিনির্ধারকদের ধারাবাহিক ভুল সিদ্ধান্ত ও সংস্কারের অনাগ্রহের কারণে একটি চোরাবালিতে আটকে গেছে। রেমিট্যান্সের ওপর ভর করে সাময়িক স্বস্তি মিললেও, কাঠামোগত সংস্কার ছাড়া এই স্বস্তি দীর্ঘস্থায়ী হবে না। অর্থনীতিকে পুনরায় সচল করতে এবং মন্দা এড়াতে খেলাপি ঋণের বিরুদ্ধে কঠোর হতে হবে সরকারকে। দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানে জোর দিতে হবে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে।
সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তর ঘটাতে হবে। আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা নিশ্চিত করা লাগবে। দ্রুত বিকল্প পথে জ্বালানি সরবরাহ বাড়াতে হবে। সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সুবিধার সাথে সাথে তাদের বার্ষিক সম্পদ বিবরণী প্রকাশ বাধ্যতামূলক করে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। অর্থনীতির রোগগুলো এখন আর সাময়িক ব্যথানাশক ওষুধ দিয়ে সারানো সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন দ্রুত ও সাহসী বড় ধরনের অস্ত্রোপচার। নীতিনির্ধারকদের উদাসীনতা ঝেড়ে ফেলে বাস্তবমুখী সংস্কারের পথ বেছে নেওয়াই এখন সময়ের একমাত্র দাবি। সরকার এদিকে গুরুত্ব না দিলে আওয়ামী লীগ সরকারের মতো জনগণের রোষানলে পড়তে হবে।