বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের অন্তরায় হাসিনা
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১৩
॥ ফারাহ মাসুম ॥
বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনার কি সত্যিই অধ্যায় শেষ, নাকি দিল্লিতে তার অবস্থানই এখনো দেশের রাজনীতির অন্যতম বড় ‘পাওয়ার সেন্টার’? প্রশ্নটি এখন আর রাজনৈতিক বক্তৃতার বিষয়মাত্র নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দুই বছর পরও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্র থেকে সরে যাননি। বরং তার প্রত্যর্পণ, ভারতে তাঁর রাজনৈতিক বক্তব্য, আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ, বিএনপি সরকারের অবস্থান এবং ঢাকা-দিল্লি সম্পর্ক— সবকিছু যেন একই সুতায় বাঁধা পড়েছে।
সর্বশেষ পরিস্থিতি আরও তাৎপর্যপূর্ণ। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সঙ্গে বৈঠকে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান জানিয়েছেন, ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের কাছে প্রয়োজনীয় নথিপত্র দেওয়া হয়েছে এবং হাসিনাকে দ্রুত ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
কিন্তু দিল্লির উত্তর— এখনো বিষয়টি ‘আইনি পর্যালোচনায়’। ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, বাংলাদেশ থেকে পাওয়া প্রত্যর্পণ অনুরোধ পরীক্ষা করা হচ্ছে এবং ভারতের প্রযোজ্য আইন ও বিচারিক প্রক্রিয়া অনুসারেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
এই ‘আইনি পর্যালোচনা’ কত দিনের? তার কোনো সময়সীমা নেই। আর এখানেই তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক অস্বস্তি।
ঢাকার দাবি— বিচার নিশ্চিত করতে হাসিনাকে ফেরত দিন। দিল্লির অবস্থান— আইন ও প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে। আর দিল্লিতে অবস্থানরত হাসিনার বক্তব্য— তিনি প্রত্যর্পণের মাধ্যমে নয়, নিজের ইচ্ছায় ডিসেম্বরের মধ্যে বাংলাদেশে ফিরতে চান।
তাহলে আসল ক্ষমতা কার হাতে?
একটি প্রত্যর্পণ, নাকি রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের পরীক্ষা? শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি আপাতদৃষ্টিতে একটি আইনি বিষয়। কিন্তু বাস্তবে এটি এখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশের একটি আদালত বা ট্রাইব্যুনালে তাঁর বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগের বিচার হয়েছে এবং অনুপস্থিতিতে মৃত্যুদণ্ডের রায়ও হয়েছে। অন্যদিকে হাসিনা অভিযোগ অস্বীকার করে আসছেন।
ফলে প্রত্যর্পণ হলে তাকে বাংলাদেশের বিচারিক কাঠামোর মুখোমুখি হতে হবে। কিন্তু ভারত তাকে ফেরত না দিলে বাংলাদেশের সামনে প্রশ্ন দাঁড়াবে— দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান প্রত্যর্পণ কাঠামো বাস্তবে কতটা কার্যকর? এখানেই কূটনীতির কঠিন বাস্তবতা।
আন্তর্জাতিক সম্পর্কে চুক্তি থাকে, কিন্তু চুক্তির পাশাপাশি থাকে রাজনৈতিক স্বার্থ।
ভারতের কাছে বাংলাদেশ শুধু একটি প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়। এটি উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা, বঙ্গোপসাগর, সীমান্ত, বাণিজ্য, ট্রানজিট ও আঞ্চলিক ভূরাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
অন্যদিকে বাংলাদেশের কাছে ভারত শুধু বৃহৎ প্রতিবেশী নয়— পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি, নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের ক্ষেত্রে অপরিহার্য অংশীদার। এই দুই বাস্তবতার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছেন শেখ হাসিনা।
দিল্লিতে হাসিনা : আশ্রয় নাকি রাজনৈতিক প্রভাবের ঘাঁটি?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পর ধারণা করা হয়েছিল, তিনি হয়তো দীর্ঘ সময় প্রকাশ্য রাজনীতির বাইরে থাকবেন। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন হয়েছে। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট দিল্লি থেকে তার ভার্চুয়াল গণমাধ্যমে বক্তব্য বাংলাদেশে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অবস্থান এবং বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে তার বক্তব্য ঢাকার অস্বস্তি বাড়িয়েছে।
ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী কীভাবে রাজনৈতিক বক্তব্য দিচ্ছেন— এই প্রশ্নই এখন দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের একটি বড় বিরোধের জায়গা।
হাসিনা অবশ্য বলেছেন, তিনি ক্ষমতায় ফেরার জন্য নয়, দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতে বাংলাদেশে ফিরতে চান। ভারতীয় সংবাদমাধ্যমকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরের মধ্যে নিজে দেশে ফেরার ইচ্ছার কথাও বলেছেন। কিন্তু তার এই বক্তব্য নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তিনি যদি সত্যিই দেশে ফিরতে চান, তাহলে ভারতের কাছে প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়া নিয়ে এত আলোচনা কেন? আর তিনি যদি নিজেই ফিরতে পারেন, তাহলে কোন নিরাপত্তা ও আইনি নিশ্চয়তায়?
বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে এ বিষয়ে কি কোনো যোগাযোগ আছে? নাকি এটি মূলত দিল্লির ওপর রাজনৈতিক চাপ তৈরির কৌশল?
হাসিনার সর্বশেষ বার্তা : আওয়ামী লীগ কি তার হাতেই?
সেপ্টেম্বরের শুরুতে হাসিনার আরেকটি বক্তব্য বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্ককে আরও জটিল করেছে। তিনি বলেছেন, তার অনুপস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সভাপতির দায়িত্ব শেখ ফজলুল করিম সেলিম পালন করবেন।
এই বক্তব্যকে হালকাভাবে দেখার সুযোগ নেই। কারণ আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ। নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও দলটিকে ‘ঝঁংঢ়বহফবফ’ হিসেবে দেখানো হচ্ছে।
অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় দলটির কার্যক্রম স্থগিত বা নিষিদ্ধ অবস্থায় থাকলেও দলটির সর্বোচ্চ নেতৃত্ব নিয়ে হাসিনার বক্তব্য স্পষ্টতই দেখিয়ে দেয়— তিনি এখনো দলটির রাজনৈতিক কর্তৃত্বের কেন্দ্র হিসেবে নিজেকে দেখছেন।
এখানে সরকারের সামনে একটি কঠিন প্রশ্ন— একটি নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম স্থগিত রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব যদি বিদেশের মাটি থেকে নির্ধারিত হয়, তাহলে সেটি কি বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বিদেশি ভূখণ্ডের রাজনৈতিক ব্যবহার নয় কি?
অন্যদিকে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে কোনো রাজনৈতিক দলকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ রাখার প্রশ্ন নিয়েও কথা আছে। এই দ্বৈত সংকটই আগামী দিনের বাংলাদেশের রাজনীতির অন্যতম বড় পরীক্ষা।
আওয়ামী লীগ কি সত্যিই শেষ?
সরকারের একাংশের বক্তব্য আরও কঠোর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, আওয়ামী লীগ আর বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরতে পারবে না এবং দলটিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিচারের মুখোমুখি করার প্রক্রিয়া চলছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমানও সম্প্রতি আওয়ামী লীগকে ‘মাফিয়া গ্যাং’ বলে মন্তব্য করেছেন।
কিন্তু রাজনীতির ইতিহাস বলে, কোনো বড় রাজনৈতিক দলকে প্রশাসনিক আদেশ দিয়ে চিরতরে মুছে ফেলা স্বাভাবিক নয়। তবে দলের নেতাদের ভুলের কারণে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে স্থায়ীভাবে প্রভাব হারাতে দেখা যায় অনেক দলকে।
১৭ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনের পর প্রশ্ন হচ্ছে— আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কাঠামো কতটা ভেঙেছে, অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক কতটা অক্ষত, স্থানীয় পর্যায়ের নেতৃত্ব কতটা সক্রিয় এবং বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের যোগাযোগ কতটা কার্যকর?
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহেও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের মিছিল, মশাল মিছিলসহ বিভিন্ন তৎপরতার খবর এসেছে। এগুলো উল্লেখযোগ্য শক্তির প্রমাণ নয়। অথবা এগুলো আওয়ামী লীগের পুনরুত্থানেরও প্রমাণ নয়। কিন্তু এটুকু প্রমাণ করে— দলটির সাংগঠনিক অবশেষ পুরোপুরি বিলীন হয়নি। আর এখানেই সরকারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
তারেক রহমানের সামনে ‘হাসিনা ফ্যাক্টর’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার ক্ষমতায় এসেছে এমন একটি সময়ে, যখন জনগণের প্রত্যাশা অত্যন্ত উচ্চ। দ্রব্যমূল্য, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট, কর্মসংস্থান, ব্যাংকিং খাত, বিনিয়োগ, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক সংস্কার— সবকিছু একসঙ্গে সামলাতে হচ্ছে সরকারকে।
সেপ্টেম্বরের শুরুতে তারেক রহমান নিজেই স্বীকার করেছেন, দেশের বিভিন্ন খাতে সমস্যা রয়েছে এবং ক্ষমতার উত্তরাধিকার হিসেবে সরকার সেসব সমস্যা পেয়েছে। একইসঙ্গে তিনি অভিযোগ করেছেন, কিছু রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তি বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটকে ব্যবহার করে দেশে অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে। এখানে একটি রাজনৈতিক বাস্তবতা স্পষ্ট। সরকার যদি প্রতিটি ব্যর্থতার ব্যাখ্যায় আগের সরকারকে সামনে আনে, তাহলে একসময় জনগণ প্রশ্ন করবে— তাহলে পরিবর্তন কোথায়?
হাসিনা সরকারের দুঃশাসন এর উত্তরাধিকার অবশ্যই বিশাল। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর দায়ের একটি অংশ বর্তমান সরকারেরও। সুতরাং শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ যতই গুরুত্বপূর্ণ হোক, এটি যেন অর্থনীতি ও শাসনব্যবস্থার ব্যর্থতার ঢাল না হয়ে ওঠে— এটিও সরকারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
দিল্লির সঙ্গে সম্পর্ক : দরজা খুলছে, নাকি আবার বন্ধ হচ্ছে?
ভারতের নতুন হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ঢাকা মিশনকে ঘিরে কূটনৈতিক প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল। ১০ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে তার বৈঠকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কোন্নয়নের বিষয় উঠে আসে। কিন্তু সেই বৈঠকেই হাসিনার প্রত্যর্পণের প্রশ্ন সামনে আসে। অর্থাৎ সম্পর্ক স্বাভাবিক করার দরজা খুললেও দরজার সামনে প্রথম বাধা শেখ হাসিনা।
এরপর সম্ভাব্য তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছিল, ঢাকার পক্ষ থেকে ভারতের প্রতিক্রিয়ার অপেক্ষার বিষয়টি গুরুত্ব পেয়েছে এবং হাসিনা ও অন্য পলাতকদের প্রত্যর্পণ প্রশ্নটি দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের আলোচনায় রয়েছে।
অর্থাৎ ঢাকা সম্পর্ক চায়, কিন্তু শর্তহীন সম্পর্ক নয়। এটি ২০২৪-পরবর্তী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
ভারতের জন্যও হাসিনা এখন বোঝা?
দিল্লির কৌশলগত হিসাবও সহজ নয়। শেখ হাসিনা ভারতের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক অংশীদার ছিলেন। তার সরকারের সময় ভারত নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক যোগাযোগে উল্লেখযোগ্য সহযোগিতা পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই সমীকরণ বদলে গেছে। ভারত যদি হাসিনাকে দীর্ঘদিন রাখে, তাহলে বাংলাদেশে ভারতবিরোধী রাজনৈতিক বক্তব্য আরও শক্তিশালী হতে পারে।
আর যদি প্রত্যর্পণ করে, তাহলে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের একটি বড় বাধা দূর হতে পারে। সুতরাং হাসিনাকে রাখা কিংবা ফেরত দেওয়া— দুই পথেই দিল্লির মূল্য আছে। এই কারণেই ‘আইনি পর্যালোচনা’ দীর্ঘায়িত হওয়ার সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সবচেয়ে বিপজ্জনক প্রশ্ন— হাসিনাকে ঘিরে কি নতুন ভারতবিরোধিতা তৈরি হচ্ছে?
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ভারতবিরোধিতা নতুন নয়। কিন্তু ২০২৪-পরবর্তী প্রজন্মের রাজনৈতিক ভাষায় এর নতুন রূপ দেখা যাচ্ছে।
যদি মানুষের মধ্যে এমন ধারণা তৈরি হয় যে, ভারত বাংলাদেশের জনগণের রায় বা নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার পরিবর্তে সাবেক সরকারের সঙ্গে সম্পর্ককে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে, তাহলে তা শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়; সামাজিক মনস্তত্ত্বেও প্রভাব ফেলতে পারে। এটি ভারতের জন্যও ঝুঁকিপূর্ণ। কারণ সীমান্তের দুই পাশে সম্পর্কের স্থিতিশীলতা নির্ভর করে শুধু সরকারের ওপর নয়; জনগণের মনোভাবের ওপরও।
আরেকটি অস্বস্তিকর সত্য : আওয়ামী লীগের অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক
সরকারের জন্য সবচেয়ে কঠিন কাজ সম্ভবত রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা নয়— অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক ভাঙা। সরকারি পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে আওয়ামী লীগের বিপুল অবৈধ অর্থ থাকার অভিযোগ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—কত অর্থ? কোথায়? কার নামে? কোন ব্যাংকে? কোন ব্যবসায়? কোন বিদেশি প্রতিষ্ঠানে? কোন বেনামি মালিকানায়? কোন রিয়েল এস্টেট সম্পদে?
এই প্রশ্নগুলোর পূর্ণাঙ্গ উত্তর ছাড়া শুধু রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে পুরোনো ক্ষমতার নেটওয়ার্ক ভাঙা সম্ভব নয়। একটি শক্তিশালী অনুসন্ধানী কমিশন, সম্পদ অনুসন্ধান, অর্থ পাচার তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ছাড়া আওয়ামী লীগের কথিত ‘অর্থনৈতিক নেটওয়ার্ক’ নিয়ে প্রকৃত সত্য বের হবে না।
হাসিনা ফিরলে কী হবে?
ধরা যাক, ভারত শেষ পর্যন্ত প্রত্যর্পণে সম্মত হলো। তাহলে বাংলাদেশের সামনে তিনটি বড় পরীক্ষা। প্রথমত, তার নিরাপত্তা। দ্বিতীয়ত, বিচার প্রক্রিয়ার আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা। তৃতীয়ত, তার সমর্থকদের রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া। মৃত্যুদণ্ডের রায় কার্যকর করার প্রশ্নে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহল কী অবস্থান নেয়, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
অন্যদিকে যদি ভারত তাকে ফেরত না দেয়, তাহলে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কে দীর্ঘস্থায়ী চাপ তৈরি হতে পারে। আর যদি হাসিনা নিজেই ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার ঘোষণা বাস্তবায়ন করেন, তাহলে পরিস্থিতি আরও নাটকীয় হয়ে উঠবে। কারণ তখন প্রশ্ন হবে— তিনি কি সরকারের সঙ্গে কোনো সমঝোতার ভিত্তিতে ফিরছেন, নাকি সরাসরি বিচারিক প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হচ্ছেন?
নতুন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় পরীক্ষা
শেখ হাসিনা বাংলাদেশের রাজনীতির একটি দীর্ঘ অধ্যায়ের নাম। তাকে ঘিরে বিচার হবে— এটি রাজনৈতিকভাবে প্রায় অবধারিত। কিন্তু বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে কীভাবে বিচার হয়।
প্রতিশোধের রাজনীতি হলে পুরোনো সংস্কৃতি ফিরে আসবে নতুন নামে প্রমাণভিত্তিক বিচার হলে তৈরি হবে নতুন নজির। একইভাবে আওয়ামী লীগের ক্ষেত্রেও প্রশ্নটি দলটি আবার ক্ষমতায় ফিরবে কি না— এখানে সীমাবদ্ধ নয়।
প্রশ্ন হলো— বাংলাদেশের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কি এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেখানে কোনো দলই রাষ্ট্রকে নিজের সম্পত্তি ভাবতে পারবে না? যেখানে সরকার বদল মানে রাষ্ট্রের মালিক বদল নয়? যেখানে বিরোধীদল মানে রাষ্ট্রের শত্রু নয়? যেখানে বিচার মানে প্রতিশোধ নয়?
শেষ কথা : হাসিনা কি বাংলাদেশের অতীত, নাকি ভবিষ্যতেরও অংশ?
শেখ হাসিনা এখন ভারতে। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি সরকার ক্ষমতায়। ভারত প্রত্যর্পণ অনুরোধ ‘পর্যালোচনা’ করছে। ঢাকা দ্রুত সিদ্ধান্ত চাচ্ছে। হাসিনা নিজে ডিসেম্বরের মধ্যে ফেরার কথা বলছেন। আর বাংলাদেশের রাজনীতি ক্রমেই তাকে ঘিরে নতুন মেরুকরণের দিকে যাচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় ভুল হবে— শেখ হাসিনাকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের রাজনীতির সব ব্যাখ্যা দাঁড় করানো। কারণ একজন পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে ফেরানো গেলেও একটি রাজনৈতিক সংস্কৃতি শুধু গ্রেপ্তার বা বিচারের মাধ্যমে বদলায় না।
বাংলাদেশের সামনে আসল লড়াই এখন তিনটি— ক্ষমতার জবাবদিহি, রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন এবং প্রতিবেশী শক্তির সঙ্গে সমমর্যাদার সম্পর্ক। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ সেই লড়াইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। কিন্তু শেষ অধ্যায় নয়। বরং আসল পরীক্ষা শুরু হবে তাকে ফিরিয়ে আনার পর। তখন দেখা যাবে— বাংলাদেশ কি সত্যিই নতুন রাজনৈতিক যুগে প্রবেশ করেছে, নাকি শুধু ক্ষমতার চেয়ার বদলেছে?
কারণ ইতিহাসের সবচেয়ে কঠিন প্রশ্নটি তখনই সামনে আসবে— যে রাষ্ট্র একসময় একজন নেত্রীর হাতে অতিরিক্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ার অভিযোগে বিস্ফোরিত হয়েছিল, সেই রাষ্ট্র কি এবার এমন প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে পারবে; যেখানে কোনো শেখ হাসিনা, কিংবা অন্য কোনো প্রধানমন্ত্রী কোনো দল বা ব্যক্তিই রাষ্ট্রের ঊর্ধ্বে উঠতে না পারে? বাংলাদেশের আগামী দশকের রাজনীতি আসলে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজবে।