নেতৃত্ব সংকট, আইনি নিষেধাজ্ঞায় হতাশ আ’লীগের তৃণমূল


১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫১

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
দেশে ফ্যাসিজম কায়েম করে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ অস্তিত্ব সঙ্কটে। অথচ ২০০৯ সালে সাজানো নির্বাচনের মধ্য দিয়ে ক্ষমতা দখলের পর আওয়ামী লীগ সাড়ে ১৫ বছর দুঃশাসন চালিয়ে এমন মিথ দাঁড় করিয়েছিলো যে, ‘কোনোদিন তাদের পতন হবে না।’ আওয়ামী লীগের এমন অলীক বিশ্বাসের কারণ, ক্ষমতার অবৈধ ব্যবহার করে তারা দেশের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠা ধ্বংস করে দিয়েছিলো। প্রতিবেশী ভারত হাসিনাকে তাদের মনোনীত মুখ্যমন্ত্রীর মর্যাদা দিয়ে সর্বদা পাশে থেকে সকল মানবতাবিরোধী অপকর্মে সহযোগিতা করেছে। কিন্তু তাদের সব নীলনকশা পণ্ড করে দিয়েছে দেশের গণতন্ত্রকামী, দেশপ্রেমিক ছাত্র-জনতা।
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার বিপ্লবের লক্ষ্যে চূড়ান্ত আন্দোলনে সংঘটিত ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানে হাসিনা সরকারের পতন এবং দলবল নিয়ে পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে আওয়ামীফ্যাসিস্ট রাজত্ব।
আওয়ামী লীগের অতীতের দুঃশাসন, পতন ঠেকাতে গণহত্যা এবং দুঃশাসনের কারণে দেশ-বিদেশের রাজনীতি বিশ্লেষকরা আওয়ামী লীগকে আর রাজনৈতিক দল মনে করে না। তারা এবং দেশের সাধারণ জনগণও বিশ্বাস করে, আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল নয়, মাফিয়া গ্যাং।
আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক দল নয়, মাফিয়া গ্যাং
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, দল হিসেবে আওয়ামী লীগ তার গণতান্ত্রিক চরিত্র হারিয়েছে। প্রতিবারই শাসনক্ষমতায় গিয়ে দলটি ‘টোটালিটারিয়ান টাইরান্ট’ (সর্বগ্রাসী স্বৈরাচার) বা ফ্যাসিবাদী চরিত্র ধারণ করেছে এবং ক্ষমতা বদলের সর্বজনস্বীকৃত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে রুদ্ধ করে দিয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান গত ৮ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেছেন, আওয়ামী লীগ কোনো রাজনৈতিক দল নয়, একটা ‘মাফিয়া গ্যাং’। তিনি বলেন, ‘আমি আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিক দল মনে করি না। ইটস আ মাফিয়া গ্যাং। এই যে মাফিয়া গ্যাং বলছি, এটার একটা প্রমাণ হচ্ছে আজমিরী হক বাঁধনের ওপরে হামলা। হামলাকারীদের মধ্যে যারা ভিডিও প্রকাশ করেছেন, তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে জাহেদ উর রহমান বলেন, ‘আওয়ামী লীগ কী বস্তু, আওয়ামী লীগ কারা করেন, আওয়ামী লীগ কী, তারা আমাদের সামনে আবার হাজির করছেন। আমি প্রায়ই বলতাম, শেখ হাসিনা যখনই কথা বলেন, তিনি আসলে দেখান তারা কত নোংরা।’
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমীর ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. সৈয়দ আব্দুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের স্পষ্ট জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে ফেরার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ, ফ্যাসিবাদী ও স্বৈরাচারীদের ব্যাপারে কোনো প্রকার নরম মনোভাব দেখানো বা আপস করার সুযোগ জামায়াতে ইসলামীর নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়— পরাজিত ও রাজনীতি থেকে বিতাড়িত এই অপশক্তির নিকট ভবিষ্যতে বা বাস্তবে আর ক্ষমতার রাজনীতিতে ফিরে আসার কোনো সম্ভাবনা কিংবা আশঙ্কা নেই।
ডিসেম্বরে হাসিনার ফেরার গুঞ্জন ও বাস্তবতা
ক্ষমতা হারানোর পর থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অস্পষ্ট সূত্রে গুঞ্জন ছড়ানো হয়েছিল যে, শেখ হাসিনা আগামী ডিসেম্বরে দেশে ফিরে আসবেন। তবে রাজনৈতিক বাস্তবতার নিরিখে এটিকে একটি সম্পূর্ণ অবাস্তব ও ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
আইনি জটিলতা, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা এবং সর্বস্তরের মানুষের তীব্র ক্ষোভের মুখে তার দেশে ফেরার মতো কোনো ন্যূনতম অনুকূল পরিবেশ নেই। গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশের সর্বস্তরের জনগণ ও বিচারব্যবস্থা যেখানে তার এবং তার শাসনের নির্মমতার বিচার দাবিতে সোচ্চার, সেখানে তার ফেরা কেবল অবাস্তবই নয়, রাজনীতিতে টিকে থাকার শেষ চেষ্টা হিসেবে ছড়ানো স্রেফ প্রোপাগান্ডা। বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে খোদ দলের অনুসারীরাও এখন বুঝতে পারছেন, তথাকথিত ‘ডিসেম্বর মিশন’ কিংবা শেখ হাসিনার ফেরা শুধুই অলীক স্বপ্ন।
হাসিনাতন্ত্রের অবসান ও নেতা-কর্মীদের হতাশা
দীর্ঘ চার দশক ধরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ এককভাবে শেখ পরিবারের ওপর ভর করে পরিচালিত হয়ে আসছে। দলটির সিদ্ধান্ত গ্রহণ থেকে শুরু করে সার্বিক রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণ— সবই নির্ধারিত হতো একটি পরিবারকে কেন্দ্র করে। কিন্তু সাম্প্রতিক সংকটময় মুহূর্তে পরিবারটির কোনো কার্যকর বা গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব সামনে না আসায় দলের সাধারণ নেতা-কর্মীরা চরম হতাশ।
শেখ পরিবারের তরুণ বা নতুন প্রজন্মের কোনো প্রতিনিধি রাজনীতিতে উঠে এসে দলকে নেতৃত্ব দেবেন— এমন আশা সাধারণ নেতা-কর্মীদের মধ্যে আর অবশিষ্ট নেই। পরিবারকেন্দ্রিক এই নেতৃত্বের রাজনৈতিক দেউলিয়াত্ব এবং সংকটকালে মাঠ ছেড়ে আত্মগোপন বা বিদেশে অবস্থান করার প্রবণতা দলের তৃণমূলের আত্মবিশ্বাস সম্পূর্ণ ভেঙে দিয়েছে। কর্মীরা বুঝতে পারছেন, যে পরিবারের ওপর তারা অন্ধ বিশ্বাস রেখেছিলেন, সেই পরিবার তাদের রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত সুরক্ষার কোনো পথ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে। বিশেষ করে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহী একটি গ্রুপ যখন সজীব ওয়াজেদ জয়ের পুরোনো ছবি নতুন বলে উপস্থাপন করে আশা জাগানোর অপচেষ্টা করছিলো, ঠিক তখনই ভারতের একটি পত্রিকার সাথে সাক্ষাৎকারে হাসিনা হাটে হাঁড়ি ভেঙেছেন। শেখ সেলিমকে পরবর্তী নেতা ঘোষণা করে। হাসিনার বক্তব্য প্রচারে আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকায় তা কোড করা হলো না। যদিও সম্প্রতি শেখ হাসিনার বক্তব্যের টেক্সট, অডিও এবং রাজনৈতিক বিবৃতি প্রচার করে দৈনিক মানবজমিন পত্রিকা চরম বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। কারণ আইন বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী পলাতক ও মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত কোনো ব্যক্তির বক্তব্য প্রচার করা সুস্পষ্ট আদালত অবমাননার শামিল।
বিচারপতি ও আইনি বিশেষজ্ঞদের অভিমত অনুযায়ী, বিচারের মুখোমুখি না হয়ে বিদেশে পলাতক অবস্থায় দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে অস্থির করার উদ্দেশ্যে বক্তব্য দেওয়া আইনত দণ্ডনীয়। মানবজমিন এই বক্তব্য প্রচার করে একদিকে যেমন আদালতের নির্দেশনার লঙ্ঘন করেছে; অন্যদিকে স্বৈরাচারী শাসনের বয়ান পুনর্বাসনের চেষ্টা চালিয়েছে। যদিও ঘটনাপ্রবাহ স্পষ্ট করে যে, আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে দলটির কোনো কার্যক্রম চালনোর অধিকার বা সুযোগ আর অবশিষ্ট নেই।
শেখ সেলিমকে মানতে নারাজ তৃণমূল
শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে বা পরিবারের অন্য সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তায় শেখ ফজলুল করিম সেলিমের মতো জ্যেষ্ঠ নেতাদের মাধ্যমে দল গোছানোর চেষ্টার ঘোষণা দিলেও তৃণমূল পর্যায়ের নেতা-কর্মীরা তাকে নেতা হিসেবে মেনে নিতে পুরোপুরি অস্বীকৃতি জানিয়েছেন। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তৃণমূলের অনাগ্রহের পেছনে একাধিক সুস্পষ্ট কারণ রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য হলো— শেখ সেলিমের বর্তমান বয়স এবং শারীরিক অবস্থা দলকে রাজপথে বা সংকটময় পরিস্থিতিতে নেতৃত্ব দেওয়ার মতো উপযোগী নয়। বিগত সরকারের শাসনামলে ঘটে যাওয়া নানা দুর্নীতি, স্বৈরাচারী আচরণ এবং মানবতাবিরোধী অপরাধে তিনিও জড়িত ছিলেন এমন প্রমাণ আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের কাছে আছে। আদালতে তার বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ ও দণ্ডপ্রাপ্ত হওয়ার কারণে আইনিভাবেও তিনি নেতৃত্ব প্রদানের যোগ্যতা হারিয়েছেন। এছাড়া আরো যেসব জ্যেষ্ঠ নেতার ওপর দল টিকিয়ে রাখার দায়িত্ব অর্পণ করার কথা ভাবা হচ্ছিল, তারা নিজেরাও আইনি ও রাজনৈতিকভাবে চরমভাবে বিতর্কিত এবং একাধিক অপরাধে অভিযুক্ত।
মানবতাবিরোধী অপরাধে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ : ভবিষ্যতের সমীকরণ
বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর রাজনীতিতে একটি রাজনৈতিক দলের বিরুদ্ধে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন এবং সাধারণ জনগণের ওপর গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের এমন ভয়াবহ অভিযোগ আর কখনো দেখা যায়নি। শেখ হাসিনা ও তার প্রশাসনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গণহত্যার বিচার চলছে।
আইনগত ও নৈতিকভাবে দলটি এখন একটি নিষিদ্ধ ও বিতাড়িত অপশক্তি। গণহত্যার বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত এবং স্বৈরাচারী শাসনের সম্পূর্ণ জবাবদিহি নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতিতে দলটির পুনর্বাসনের কোনো সুযোগ নেই। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এবং দেশের জনগণের দৃষ্টিতে এই দল এখন একটি ফ্যাসিবাদের প্রতীকে রূপান্তরিত হয়েছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, নেতৃত্বের দেউলিয়াত্ব, মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখোমুখি অবস্থান, তৃণমূলের চরম হতাশা এবং শেখ পরিবারের রাজনীতি থেকে দৃশ্যত বিদায়ের পর আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক দল হিসেবে ঘুরে দাঁড়ানোর বা ক্ষমতায় ফেরার সমস্ত পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। তথাকথিত ডিসেম্বর মিশন কিংবা আইনি সীমানা টপকে বক্তব্য প্রচারের চেষ্টা চালিয়েও এই অবধারিত রাজনৈতিক পতন আটকানো অসম্ভব।