মুসলিম রাজ্য হায়দরাবাদ : গণহত্যা চালিয়ে জবরদখল করে ভারত
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫০
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
ভয়াল ১৩-১৮ সেপ্টেম্বর সমাগত। ১৯৪৮ সালের এই সময়ে ভারতের বর্বরতা ও দখলদারিত্বের কারণে আজ স্বাধীন মুসলিম রাজ্য হায়দরাবাদ শুধু পরাধীনই হয়নি হারিয়ে গেছে। ডেকান বা দাক্ষিণাত্যের যে হায়দরাবাদের ইতিহাস অনেক সুপ্রাচীন। প্রাচীনকালে এখানে দ্রাবিড় সভ্যতা ছিল। বর্তমানে তেলেগু ভাষাভাষীরা এই দ্রাবিড়দেরই পরবর্তী প্রজন্ম। পরে বহিরাগত আর্যরা মালভূমিটি দখল করে। এরপর ১২৯৪ সালে আলাউদ্দিন খিলজী দেবগিরি বিজয়ের মধ্য দিয়ে দাক্ষিণাত্যে প্রথম মুসলিম অধিকার প্রতিষ্ঠিত করেন। আর ১৩২৫ সালে মুহাম্মাদ বিন তুঘলক দিল্লির সিংহাসনে বসে সমগ্র দাক্ষিণাত্যে মুসলিম শাসন কায়েম করেন। তিনি দেবগিরি অঞ্চলের নাম পরিবর্তন করে দৌলতাবাদ রাখেন এবং দিল্লি থেকে রাজধানী এখানে স্থানান্তরিত করেন। এরপর ১৩৪৭ সালে ইরানি বংশোদ্ভূত জেনারেল আলাউদ্দিন হাসানশাহ্ গাঙ্গু বাহমনী নাম ধারণ করে দাক্ষিণাত্যে বাহমনী সাম্রাজ্যের পত্তন করেন। সেটি কিছু বছর স্থায়ী ছিল। তারপর ১৫১২ সাল পর্যন্ত কাতুবুল মুলক সুলতান কুলী এর বংশ কুতুবশাহী এখানে রাজত্ব করেছিলেন। ১৬৫৫ সালে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের শাসনামলে সমগ্র দাক্ষিণাত্য দিল্লির অধীনে চলে আসলে প্রতিষ্ঠিত হয় মুসলিম হায়দরাবাদ।
মুসলিম রাজ্য হায়দরাবাদ প্রতিষ্ঠা : সম্রাট আওরঙ্গজেব ১৭১৩ সালে দিল্লির মুঘল দরবারের তুরানি গোষ্ঠীর নেতা মীর করমউদ্দিন চিন কিলিচ খাঁকে নিজামুল মুলক উপাধী দেন। পরে তাকে দাক্ষিণাত্যের সুবাদার নিযুক্ত করেন। সেই থেকে বংশ পরম্পরায় তারা নিজাম নামে পরিচিত হয়ে আসছেন। কিলিচ খাঁ ভাগ্যনগর অঞ্চলটিতে হায়দরাবাদ রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তার স্ত্রী হায়দারীর নাম অনুসারে অঞ্চলটির নামকরণ হয় হায়দরাবাদ। সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর মুঘল সাম্রাজ্য অনেকটা দুর্বল হয়ে পড়ে। এ সময়ে ইরানের নাদির শাহ দিল্লি আক্রমণ করেন। বলা হয়ে থাকে, নাদির শাহ দিল্লিতে গণহত্যার হুকুম দিলে মুঘল দরবারের সবচেয়ে সম্মানিত ব্যক্তি নিজামুল মুলক নাদির শাহের কাছে দিল্লিবাসীর প্রাণভিক্ষা চান। নাদির শাহও গণহত্যা বন্ধের নির্দেশ দেন। অতঃপর নানা উত্থান ও পতনের পর ১৭২৪ সালে হায়দরাবাদ নিজামুল মুলক নেতৃত্বে আবারও স্বাধীনতা অর্জন করে। ঐ বছরই মুঘল সম্রাট মুহম্মদ শাহ প্রদত্ত উপাধি ‘আসিফ জাহি’ গ্রহণের মাধ্যমে তিনি শাসনকার্য শুরু করেন। তিনিই আসিফ জাহি রাজবংশের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁরই উপাধি নিজাম উল-মুলক, বা ‘হায়দরাবাদের নিজাম’। হায়দরাবাদ ১৭২৪ থেকে ১৮৫৭ সাল পর্যন্ত নিজামদের শাসনাধীনে ছিল। হায়দরাবাদের রাষ্ট্রভাষা উর্দু। হায়দরাবাদের নিজস্ব পতাকার উপরাংশে আল আজমাতুলিল্লাহ অর্থাৎ ‘সব মহিমা আল্লাহর জন্য’, নিম্নাংশে ইয়া উসমান অর্থাৎ ‘হে উসমান’, মাঝখানে লেখা ‘নিজাম-উল-মুলক আসিফ জাহি’। হায়দরাবাদের বাসিন্দারা ‘মুলকি’ (দেশবাসী) নামে পরিচিত।
ইংরেজদের দখলে হায়দরাবাদ : বিশাল মুঘল সাম্রাজ্য বাদশাহ আলমগীরের পর আবারও দুর্বল হতে লাগলো। একটা সময় ব্রিটিশরা প্রথমে ব্যবসা এবং পরে রাজনীতিতে প্রবেশ করে ভারতে বিভাজন সৃষ্টি শুরু করলো। পরে ফরাসি ও ইংরেজরা হায়দরাবাদের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে। কর্নাটকের যুদ্ধে ক্লাইভ বিজয়ী হলে ইংরেজরা পুরোপুরি হায়দরাবাদের ক্ষমতা পেয়ে যায়। তবে জনগণ যাতে বিদ্রোহ না করে, সেজন্য ইংরেজরা আসিফ জাহির পুত্রদেরকেই পুতুল হিসেবে ক্ষমতায় রাখে। প্রথমে আসিফ জাহির তৃতীয় পুত্র সালাবত জঙ্গকে (১৭৫১-১৭৬২ খ্রিস্টাব্দ) ক্ষমতায় রাখে। এরপর তাকে সিংহাসনচ্যুত করে আসিফ জাহির চতুর্থ পুত্র মীর নিজাম আলী খানকে (১৭৬২-১৮০৩ খ্রিস্টাব্দ) ক্ষমতায় বসায়। এই মীর নিজাম আলী খান পরবর্তীতে ইংরেজদের পক্ষালম্বন করে মহিশূরের সিংহ বাহাদুর টিপু সুলতান রহ.কে পরাজিত করে। টিপু সুলতানকে হত্যার ফলে ভারতের স্বাধীনতাকামী মানুষ মীর নিজামের ওপর ক্ষুব্ধ ছিল। ফলে ১৯৪৮ সালে হায়দরাবাদের শেষ নিজামের পতনের সময়ও তাদের প্রতি সহানুভূতি দেখায়নি। যদিও ১৯১১ থেকে ১৯৪৮ সাল পর্যন্ত রাজ্য শাসনে ছিলেন হায়দরাবাদের শেষ নিজাম মীর উসমান আলী খান।
মীর উসমান আলী খানের স্বাধীন মুসলিম রাজ্য হায়দরাবাদ : ১৯৪৭ সালের ১৬ জুলাই ইংল্যান্ডের ভারতীয় বিষয়ক সচিব লর্ড লিস্টোয়েল লর্ড সভায় বলেছিলেন, ‘এখন থেকে ভারতের দেশীয় রাজ্যগুলো হতে ব্রিটিশ রাজ প্রতিনিধি প্রত্যাহার এবং তাদের দাপ্তরিক কার্যক্রমের সমাপ্তি ঘোষণা করা হল’। তিনি আরও বলেছিলেন, ‘দেশীয় রাজ্যগুলো ভারত অথবা পাকিস্তান ডোমিনিয়নের কোনটিতে যোগ দেবে, অথবা স্বাধীন থাকবে সেটি সম্পূর্ণ তাদের ইচ্ছাধীন। ব্রিটিশ সরকার সে বিষয়ে কোনোরকম প্রভাব বিস্তার করবে না’। ১৯৪৭ সালের ১০ জুলাই ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ক্লিমেন্ট এটলীও ‘হাউস অব কমন্সে’ লিস্টোয়েলের অনুরূপ বক্তব্যই প্রদান করেছিলেন। (হায়দরাবাদের শিক্ষণীয় ইতিহাস, আয়ার দানিশ, দৈনিক সংগ্রাম ২৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯)। যখন ভারত ভাগের প্রস্তাব ওঠে, তখন চৌধুরী রহমত আলী পাকিস্তানের পাশাপাশি বাঙ্গালিস্তান এবং উসমানিস্তান নামে পৃথক তিনটি মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন। মুসলিম জাতীয়াতাবাদী নেতা চৌধুরী আলী ভারতের পশ্চিমাঞ্চলে পাকিস্তান, বাংলা অঞ্চলে বাঙ্গালিস্তান ও হায়দরাবাদকে উসমানিস্তান নামে রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। ঘটনার পরিক্রমায় স্বাধীন বাঙ্গালিলিস্তান ও উসমানিস্তানের প্রস্তাব থেকে তিনি সরে আসেন। তবে হায়দরাবাদের শাসক উসমান নিজের অবস্থান থেকে সরে আসেননি। তিনি ব্রিটিশদের কাছে অনুরোধ করেন হায়দরাবাদকে একটি স্বাধীন মুসলিম কমনওয়েলথ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণার জন্য। কিন্তু ব্রিটিশ ভারতের গভর্নর জেনারেল লুইস ফ্রান্সিস অ্যালবার্ট ভিক্টর নিকোলাস মাউন্টব্যাটেন অনুরোধটি নাকচ করেন। তিনি উসমানকে যেকোন একটি দেশের সাথে যোগ দেয়ার পরামর্শ দেন। ব্রিটিশরা হায়দরাবাদকে স্বাধীন রাষ্ট্র ঘোষণা না করলেও নিজাম উসমান স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে নিজের কার্যকলাপ চালিয়ে যান। হায়দরাবাদের এই উসমান নিজাম সরকার নয়াদিল্লিতে দূতাবাসও স্থাপন করেছিলেন।
হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ-ভারত ষড়যন্ত্র : হায়দরাবাদের প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলী জানিয়েছেন, হায়দরাবাদের নিজাম মাউন্ট ব্যাটেনের কাছে চিঠি লিখেও জানিয়েছিলেন, হায়দরাবাদ স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবেই থাকবে। ভারত বা পাকিস্তান কোনো রাষ্ট্রেই যোগ দেবে না। মাউন্ট ব্যাটেন উত্তরে নিজামকে জানান যে, তিনি তার পত্র যথাযথভাবে ব্রিটিশ সরকারের কাছে প্রেরণ করেছেন। তিনি খুব শিগগির তার উত্তর আশা করছেন। মীর লায়েক লিখেছেন-উত্তরপত্রটি আর কখনোই আসেনি। কেননা মাউন্ট ব্যাটেন পরবর্তীকালে স্বীকার করেছেন, তিনি পত্রটি ব্রিটিশ সরকারের নিকট আসলে প্রেরণ করেননি। মাউন্ট ব্যাটেনের এই স্বীকার উক্তির মাঝেই রয়েছে হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেস হিন্দু নেতৃবৃন্দের গভীর ষড়যন্ত্রের গন্ধ। অখণ্ড ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা নেহরুও এটা মেনে নিতে পারেননি-ভারতের হৃৎপিণ্ডের মধ্যে পাকিস্তানের মতো আরেকটা স্বাধীন রাষ্ট্র মাথা উঁচু করে দাঁড়াক। পাকিস্তান বিষয়ে শ্রী বিমলানন্দ শাসমল লিখেছেন, ‘পাকিস্তান সৃষ্টি হিন্দুদের মনে অপ্রীতিকর প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করেছিল। যে ভারত মাতাকে হিন্দুরা দেবী বলে পূঁজা করে, মুসলমানরা সেই মাতাকেই দ্বি-খণ্ডিত করলো বলে হিন্দুরা ক্ষুব্ধ ছিল। (হায়দরাবাদ আমাদের পথ চলার দিকনির্দেশনা, আরিফুল হক, দৈনিক ইনকিলাব ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯)।
হিটলার-নেহরু : নেহরু আগ্রাসী হিটলারের মতো প্রকাশ্যে হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে হুঙ্কার দেন। তিনি বলেন, ‘যদি এবং যখন প্রয়োজন মনে করবো হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে সেনা অভিযান শুরু করা হবে’। নেহরুর এই দাম্ভিক উক্তি সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ১৯৪৮ সালের ৩০ জুলাই ব্রিটিশ কনজারভেটিভ পার্টির বিরোধীদলীয় নেতা উইনস্টাইন চার্চিল কমন্স সভায় বলেছিলেন, ‘নেহরুর ভীতি প্রদর্শনের ভাষা অনেকটা হিটলারের ভাষার অনুরূপ যা তিনি অস্ট্রিয়া ধ্বংস করার সময় করেছিলেন’। তিনি ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ও মন্ত্রিসভাকে সতর্ক করে বলেছিলেন, তাদের পবিত্র দায়িত্ব এবং কর্তব্য হচ্ছে, যে সমস্ত রাজ্যকে সার্বভৌম মর্যাদা দান করা হয়েছে, সেগুলোকে অনাহারে রেখে শক্তিহীন করে গ্রাস করার প্রক্রিয়াকে ব্রিটিশ সরকার যেন অনুমোদন না দেয়। তবে মি. চার্চিলের সেই সতর্কবাণীকে আমল দেয়নি ব্রিটিশ সরকার, আমল দেয়নি মাউন্ট ব্যাটেনও। নেহরু, মাউন্ট ব্যাটেন, প্যাটেল চক্র ছলনা, ভয়ভীতি প্রদর্শন করে উপমহাদেশের ৫৬২টি করদ রাজ্যের অধিকাংশই গ্রাস করেছিলেন। একইভাবে হায়দরাবাদ দখলেরও পরিকল্পনা আঁটতে লাগলো চিরাচরিত অভ্যাস এবং ব্লু-প্রিন্ট অনুযায়ী। ভারতের শেষ ভাইসরয় লর্ড মাউন্ট ব্যাটেন ছিলেন নেহরুর ব্যক্তিগত বন্ধু। তিনিও চাননি ভারত বিভক্ত হোক। কেবলমাত্র কায়েদে আযমের প্রবল ব্যক্তিত্ব ও বলিষ্ঠ নেতৃত্বের সামনে ব্রিটিশ সরকার ও কংগ্রেসের হিন্দু নেতৃবৃন্দ পাকিস্তানের দাবিকে অখণ্ডনীয় বাস্তবতা বলে স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছিলেন। তবে নেহরু ও মাউন্ট ব্যাটেন রেডক্লিফ রোয়েদাদের মাধ্যমে পাকিস্তানকে বিকলাঙ্গ করার ব্যবস্থা করেন। এসব গোপন পরামর্শের কথা পরবর্তীকালে ল্যারি কলিন্স ও ডোমিনিক লাফিয়ের গ্রন্থে বিশেষভাবে আলোচিত হয়েছে। ভারত বিভাগের পরেও কংগ্রেস ব্যাটেনকে স্বাধীন ভারতের প্রথম গভর্নর জেনারেল নিয়োগ করেছিল। এ ছিল তার মুসলমানদের সাথে বেঈমানীর পুরস্কার।
হায়দরাবাদ দখলের ভারতীয় পাঁয়তারা : ভারত হায়দরাবাদের সাথে একটা ‘স্ট্যান্ড স্টিল’ চুক্তি করে। চুক্তির শর্তানুযায়ী হায়দরাবাদ তার প্রতিরক্ষা উন্নয়ন করতে পারেনি। পাকিস্তানের সাথে একীভূতও হতে পারেনি। মূলত চুক্তিটির মাধ্যমে হায়দরাবাদকে আন্তর্জাতিকভাবে প্রথমেই বিচ্ছিন্ন ও দুর্বল করে ষড়যন্ত্রকারি ভারত। চুক্তি পরবর্তী পরিস্থিতির ওপর নজর রাখার জন্য হায়দরাবাদের পক্ষে নিজাম মন্ত্রিসভার সাবেক মন্ত্রী এবং প্রখ্যাত স্থপতি নওয়াব ইয়ার জংকে দিল্লিতে নিযুক্ত করা হয়। অপরপক্ষে ভারতের গুজরাটি রাজনীতিবিদ, লেখক এবং এককালের বোম্বাইয়ের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কে এস মুন্সীকে হায়দরাবাদে ভারতীয় প্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। ঘটনাক্রমে ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগের অব্যবহিত পরে রিজার্ভ ব্যাংকের অংশ হিসেবে পাকিস্তানের প্রাপ্য ৫০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে ভারত অন্যায়ভাবে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে সদ্যোজাত পাকিস্তান অর্থ সংকটে নিপতিত হয়। পাকিস্তানের সেই দুঃসময়ে হায়দরাবাদ সরকার পাকিস্তানকে ২০ কোটি টাকা ঋণ দিয়ে সাহায্য করেন। পাকিস্তানকে ঋণ দেয়ার ঘটনাটিকে ভারত হায়দরাবাদ চুক্তির খেলাপ হিসেবে দেখিয়ে হায়দরাবাদের বিরুদ্ধে দখলের পাঁয়তারা হিসেবে অবরোধ আরোপ করে। অন্যদিকে ভারতের গোয়েন্দা বাহিনী ছদ্মবেশে হায়দরাবাদে হিন্দুদের ওপর রাতের অন্ধকারে হঠাৎ জঘন্য ও বর্বরোচিতভাবে আক্রমণ করে। ভারতীয় মিডিয়া এই আক্রমণের দায় নিজামুল মুলক সরকারের ওপর দিয়ে সংবাদ প্রকাশ করে। তৎকালীন দ্য হিন্দুস্তান টাইমস ঐ কলূসিত ভূমিকা পালন করে। তৎপরবর্তীতে হিন্দুত্ববাদীদের প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরু কংগ্রেসের বোম্বাই অধিবেশনে সদম্ভে মানবতাবিরোধী জঘন্য যুদ্ধের ঘোষণা করে বলেন, ‘হায়দরাবাদের সামনে এখন দুটি পথ খোলা আছে— হয় পথে ফিরে আসা, নয়তো যুদ্ধ’।
হায়দরাবাদে বর্বর ভারতীয় হামলা : কংগ্রেসের সিদ্ধান্ত হয় ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাউদার্ন কমান্ড, হায়দরাবাদে দ্বিমুখী সাঁড়াশি আগ্রাসন পরিচালনা করবে। পরিকল্পিত আগ্রাসন পরিচালনার দায়িত্ব অর্পিত হয় ডিভিশন কমান্ডার হিসেবে জয়ন্তনাথ চৌধুরী এবং আর্মড ব্রিগেড কমান্ডার হিসেবে ব্রিগেডিয়ার এসডি বর্মার ওপর। ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতের তৎকালীন ডেপুটি প্রধানমন্ত্রী বল্লভভাই প্যাটেল স্বাধীন হায়দরাবাদ রাজ্যকে ভারতের সাথে যুক্ত করতে হায়দরাবাদে ভারতীয় বর্বর সেনাবাহিনীকে প্রবেশের অনুমতি দেন। অবশেষে ১৯৪৮ সালের ১৩ সেপ্টেম্বর ভারতীয় বাহিনী হায়দরাবাদে ‘অপারেশন পোলো’ নামে হামলা শুরু করে। শুরু হয় ভারতীয় আগ্রাসী বাহিনীর মুসলিম হায়দরাবাদে নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। লাখ লাখ সাধারণ নাগরিক ও সেনাদের হত্যা করে অসভ্য বর্বর ভারতীয় বাহিনী। হায়দরাবাদের পক্ষে সেনা পরিচালনা করেন সাঈদ আহমেদ আল্-ইদরুস। মরণপণ লড়াই করেও ভারতীয় আগ্রাসী বাহিনীর সামনে টিকতে পারেনি হায়দরাবাদের সরকার। ১৭ সেপ্টেম্বর সন্ধায় প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলি হায়দরাবাদের নিজাম মীর উসমান আলি খানের সাথে আলোচনা করেন। আলোচনায় নিজাম শেষ পর্যন্ত জনগণের জানমালের নিরাপত্তার কথা বিবেচনা করে আত্মসমর্পণের পথ বেছে নেন। এরপর ঐদিনই তিনি এক বেতার ভাষণে দেশবাসীর উদ্দেশে ভাষণ দেন। ভাষণে তিনি বলেন, ক্রমে ভারতীয় আগ্রাসন প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় তার সরকার পদত্যাগ করছে। পাশাপাশি তিনি ভারতীয় প্রতিনিধি কে এম মুন্সির পরামর্শে ভারতের আনুগত্য স্বীকার করে নেন। পরদিন ১৮ সেপ্টেম্বর হায়দরাবাদের সেনাপতি মেজর জেনারেল আল্-ইদরুস ভারতীয় বাহিনীর প্রধান মেজর জেনারেল জে এন চৌধুরীর কাছে অস্ত্র সমর্পণ করেন। ফলে প্রায় ৬০০ বছরের দেশ হায়দরাবাদের স্বাধীনতার অবসান ঘটে। অবসান হয় আসিফ জাহির পূর্বপুরুষদের ২২৪ বছরের শাসন। আর চতুর ভারত অতি দ্রুত সেই উসমানিস্তানকে ভারতের চারটি প্রদেশ— অন্ধ্রপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, তেলেঙ্গানা ও গুজরাটের সঙ্গে খণ্ড-বিখণ্ড করে মিশিয়ে দেয়। ভারত বিশ্ব মানচিত্র থেকে মুছে দিয়েছে হায়দরাবাদের অস্তিত্ব। এখন হায়দরাবাদ বলতে টিকে আছে শুধু একটি শহর।
হায়দরাবাদে ভারতের গণহত্যা : হায়দরাবাদ দখলের সময় ভারতীয় বর্বর বাহিনী নারকীয় গণহত্যায় মেতে উঠে। এ সময় লাখ লাখ মুসলিম গণহত্যার শিকার হয়। নারীদের হত্যা করা হয় পাশবিকভাবে ধর্ষণের পর। গণহত্যার হাত থেকে রেহাই পায়নি অবলা শিশুরাও। আর সমগ্র অঞ্চলজুড়ে ভারতীয় বাহিনী কায়েম করে লুটতরাজ। ১৯৪৮ সালে স্বাধীন হায়দরাবাদ দখলের পর ভারতের নির্দেশে জেনারেল জে এন চৌধুরীকে সামরিক গভর্নর ও আরো পাঁচজনকে সামরিক সদস্য করে মন্ত্রি সভা গঠন করা হয়। মন্ত্রিসভাটি হায়দরাবাদের শাসনভার গ্রহণ করে। নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের পর মুসলিমদের ওপর আবারো চালানো হয় নির্যাতনের স্টিম রোলার। ‘হায়দরাবাদ : একটি মুসলিম ট্র্যাজেডি’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে অধ্যাপক উইলফ্রেড ক্যান্টওয়েল স্মিথ বিবেকবান হিন্দু প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘যুদ্ধ থেমে যাওয়ার পরও মুসলমানরা ব্যাপক গণহত্যা ও পাশবিক হামলার শিকার হয়। ধ্বংসযজ্ঞের পর যারা বেঁচে ছিলেন তারাও ভীতসন্ত্রস্ত অবস্থায় কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়েছিল। তাদের লাখ লাখ ব্যক্তিকে হত্যা এবং উচ্ছেদ করা হয়। মুসলিম বাহিনীর সহযোগীদের কথিত সহিংসতার প্রতিশোধ নেয়ার অজুহাত দেখিয়েই এসব নারকীয় হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছিল।’ (১৯৫০ সালে প্রকাশিত ‘দ্য মিডল-ইস্ট জার্নাল’, খণ্ড-৪)।
হায়দরাবাদের অভ্যন্তরীণ শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার জন্য নবাব বাহাদুর ইয়ার জং ইত্তিহাদুল মুসলিমীন নামে একটি সংগঠনকে সামনে আনেন। পূর্বে এটি অল ইন্ডিয়া ইত্তিহাদুল মুসলিমীন নামে পরিচিত ছিল। এটি ১৯২৭ সালে নবাব মুহাম্মাদ নওয়াজ খান প্রতিষ্ঠা করেন। বাহাদুর ইয়ার জং-এর নেতৃত্বে হায়দরাবাদের মুসলমানদের যেন প্রাণ ফিরে এসেছিল। কিন্তু ঠিক এমন মুহূর্তেই তিনি মৃত্যু বরণ করেন। শোকে স্তব্ধ হয়ে যায় হায়দরাবাদের মানুষ। নবাব বাহাদুর ইয়ার জংয়ের মৃত্যুর পর ইত্তিহাদুল মুসলিমীন এর সভাপতি হন কাসেম রিজভী। কিন্তু গাদ্দার কংগ্রেস সমর্থকরা সমগ্র হায়দরাবাদে হামলা ও রাহাজানি শুরু করে। আর চতুর্দিকে ভারতবেষ্টিত আন্তর্জাতিকভাবে প্রায় বিচ্ছিন্ন হায়দরাবাদ ভারতীয় আগ্রাসী বাহিনীর তাণ্ডবে টিকতে না পেরে স্বাধীনতার প্রত্যাশা থেকেও দূরে সরে যেতে বাধ্য হয়। তবে ভারতীয় রাজনীতিবিদরা বিশ্বের দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে রাখার কৌশল হিসেবে নিজামকে কিছুদিনের জন্য হায়দরাবাদের রাজপ্রমুখ মর্যাদায় ভূষিত করে রাখে। নিজাম মীর উসমান আলী খান ছিলেন আসিফ জাহি রাজবংশের ৭ম এবং শেষ প্রদীপ। জন্মভূমির প্রতি প্রগাঢ় ভালোবাসা নিয়ে এই ৭ম ও শেষ নিজাম মীর উসমান আলী খান ১৯৬৭ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি দুপুর ১টা ২২ মিনিটে নশ্বর পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। স্বাধীন হায়দরাবাদের শেষ প্রধানমন্ত্রী মীর লায়েক আলীর ‘The Tragedy of Hyderabad’ গ্রন্থে হায়দরাবাদের স্বাধীনতাপ্রেমী মানুষের বেদনাবিধুর কাহিনীর বর্ণনা পাওয়া যায়।
তথ্যসূত্র : minbarbd, বিবিসি, দ্য হিন্দুস্তান টাইমস, আল্-জাজিরা ইত্যাদি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com