ডেঙ্গু-হামে সমান্তরাল স্বাস্থ্যঝুঁকিতে দেশ
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৩
স্টাফ রিপোর্টার : একটি রোগ ঠেকাতে চলছে টিকাদান, আরেকটি রোগ প্রতিরোধে চলছে মশকনিধন অভিযান। কিন্তু কোনো উদ্যোগেই আপাতত পুরোপুরি থামছে না সংক্রমণ। হাম এখনো প্রাণ নিচ্ছে কোমলমতি শিশুদের, একই সময়ে দ্রুত বাড়ছে ডেঙ্গু রোগী। অর্থাৎ একইসঙ্গে দুই সংক্রামক রোগে প্রাণ হারাচ্ছেন শিশু ও বিভিন্ন বয়সের নাগরিকরা। পাশাপাশি চাপ সামলাতে হচ্ছে দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকেও।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ হিসাব বলছে, গত ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল ৮টার পূর্বের ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরও তিনজনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে ডেঙ্গুতে মারা গেছেন চারজন। অর্থাৎ এক দিনেই দুই রোগে প্রাণ গেছে সাতজনের। এই সময়ে হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন নতুন ১ হাজার ২১৬ জন এবং ডেঙ্গুতে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৩১৪ জন। হামে গত ১৫ মার্চ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মৃত্যু দাঁড়িয়েছে ‘৯৯৭ জনে’। এর মধ্যে ‘৮৯৭ জন’ মারা গেছেন হামের উপসর্গ নিয়ে এবং ১০০ জনের মৃত্যু হয়েছে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হওয়ার পর। অন্যদিকে চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে ১২১ জনের মৃত্যু এবং ৪৩ হাজার ৯০৪ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
হাম পরিস্থিতি উদ্বেগজনক
কয়েক মাস ধরে চলা হাম পরিস্থিতিতে সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো— প্রতিদিনই নতুন রোগী পাওয়া যাচ্ছে। ১৫ মার্চ থেকে ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ পাওয়া গেছে ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩০৪ জনের শরীরে। একই সময়ে নিশ্চিতভাবে হাম শনাক্ত হয়েছে ১৯ হাজার ৭৫৬ জনের। হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৪৫ হাজার ২৭০ জন। এর মধ্যে ১ লাখ ৩৯ হাজার ৮৩১ জন চিকিৎসা শেষে ছাড়পত্র পেয়েছেন। হামের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি শিশুদের ঘিরে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, সাম্প্রতিক প্রাদুর্ভাবে শিশুদের একটি বড় অংশ টিকা না নেওয়া বা অসম্পূর্ণ টিকা পাওয়া ছিল। নিয়মিত টিকাদানের ঘাটতি হওয়ায় রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমেছে এবং সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
টিকা দেওয়া হচ্ছে, তবু নতুন রোগী
হাম নিয়ন্ত্রণে সরকারের বড় পদক্ষেপ ছিল জরুরি টিকাদান কর্মসূচি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে জরুরি হাম-রুবেলা টিকাদান কার্যক্রম শুরু হয় এবং পরে তা দেশব্যাপী সম্প্রসারিত হয়। কিন্তু টিকাদান কর্মসূচি চলার পরও নতুন করে রোগী শনাক্ত হওয়া বন্ধ হয়নি।
হঠাৎ বেড়েছে ডেঙ্গু
হামের দীর্ঘস্থায়ী চাপের মধ্যেই সেপ্টেম্বরের শুরুতে ডেঙ্গু পরিস্থিতি নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। গত ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার সকাল পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় ১ হাজার ৩১৪ ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। মারা গেছেন চারজন। এক দিনে এত রোগী হাসপাতালে ভর্তি হওয়া চলতি বছরের পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করছে। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি ডেঙ্গু রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪৩ হাজার ৯০৪ এবং মৃত্যু ১২১ জনে। তবে এই সংখ্যা শুধু হাসপাতালভিত্তিক সরকারি হিসাব। ডেঙ্গু আক্রান্তদের সবাই হাসপাতালে ভর্তি হন না। ফলে হাসপাতালের ভর্তি সংখ্যা দিয়ে দেশের প্রকৃত মোট সংক্রমণের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।
রাজধানীর বাইরে ছড়াচ্ছে ডেঙ্গু
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক হিসাবে ঢাকা ছাড়াও খুলনা, চট্টগ্রাম, বরিশাল, ময়মনসিংহ, রাজশাহী, রংপুর ও সিলেট বিভাগে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। ফলে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু রাজধানীকেন্দ্রিক মশকনিধন কার্যক্রম যথেষ্ট নয়। স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন শহর ও জনপদে জমে থাকা পানি ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে হবে।
টিকা নিশ্চিত ও মশকনিধন
বাংলাদেশের সামনে এখন তাই দুটি সমান্তরাল স্বাস্থ্যঝুঁকি। একদিকে ১৫ মার্চ থেকে হামের উপসর্গ ও নিশ্চিত হাম মিলিয়ে ৯৯৭ মৃত্যুর ভয়াবহ পরিসংখ্যান; অন্যদিকে চলতি বছরে ডেঙ্গুতে ১২১ মৃত্যু এবং প্রায় ৪৪ হাজার হাসপাতালে ভর্তি। হামের ক্ষেত্রে টিকাদান নিশ্চিত করা জরুরি এবং ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজনন নিয়ন্ত্রণ জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুটি কাজ যত দ্রুত ও ধারাবাহিকভাবে করা যাবে, হাসপাতালের ওপর চাপ তত কমবে।