ব্যাটারিচালিত অটোরিকশায় বিড়ম্বনা-ঝুঁকি
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪১
শৃঙ্খলায় ফেরানোর উদ্যোগ দরকার
স্টাফ রিপোর্টার : ঢাকার কোনো একটি মহল্লা বা গলি থেকে প্রধান সড়কে উঠতেই দৃশ্যটা প্রায় প্রতিদিনের— একসঙ্গে ব্যাটারিচালিত অনেক অটোরিকশা, হঠাৎ থেমে যাত্রী ওঠানো-নামানো, সামনের গাড়িকে পাশ কাটাতে গিয়ে লেন বদল, কখনো উল্টো পথে ছুটে চলছে এসব যানবাহন। সড়কে দ্রুতগতির বাস কিংবা ট্রাক কোনো কিছুরই তোয়াক্কা করে না অটোরিকশা চালকরা। যেভাবে খুশি সড়ক-মহাসড়কে রাজত্ব করে যাাচ্ছে। সাধারণ মানুষ এই ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা নিয়ে বেশ বিড়ম্বনায় রয়েছেন। সিএনজিচালিত অটোরিকশার চেয়ে খরচ কম হওয়ায় অনেকে ঝুঁকি নিয়ে এই অটোরিকশায় ওঠেন। প্রায় দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটে। নিবন্ধনহীন যান, অপ্রশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ নকশা, দুর্বল ব্রেক ও লাইট, অতিরিক্ত গতি এবং মহাসড়ক বা প্রধান সড়কে ধীরগতির যান নিয়ে মানুষ বিরক্ত। একপর্যায়ে এসে জনদাবির প্রেক্ষিতে সরকার এই অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণে এবং শৃঙ্খলায় নীতিমালা করছে। ফলে বিড়ম্বনা কিছুটা হলে কমার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে।
শুধু ঢাকা নয়, দেশের অন্যসব শহর, উপজেলা; এমনকি গ্রামীণ জনপদেও গত এক দশকে দ্রুত বেড়েছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও ইজিবাইকের সংখ্যা। কম ভাড়া, সহজলভ্যতা এবং স্বল্প দূরত্বে যাতায়াতের সুবিধার কারণে সাধারণ মানুষের কাছে এসব যান জনপ্রিয় হয়েছে। একইসঙ্গে লাখ লাখ মানুষের জীবিকার সঙ্গেও জড়িয়ে গেছে এই পরিবহন। কিন্তু যে বাহন সাধারণ মানুষের যাতায়াত সহজ করেছে, সেটিই এখন ‘সড়কশৃঙ্খলা, নিরাপত্তা, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা ও পরিবেশের জন্য নতুন চাপ’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের সাম্প্রতিক হিসাব বলছে, দেশে ব্যাটারিচালিত রিকশা, ইজিবাইকসহ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলারের সংখ্যা ৫০ থেকে ৮০ লাখ। এসব যান দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। নিবন্ধন, কিউআর কোড, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, চালকের লাইসেন্স ও প্রশিক্ষণ, নির্দিষ্ট রুট এবং পরিবেশবান্ধব ব্যাটারির মাধ্যমে সরকার অটোরিকশা শৃঙ্খলায় আনতে চায়।
রাস্তায় বিড়ম্বনা, বাড়ছে ঝুঁকি
ঢাকার অনেক রাস্তা দ্রুতগতির যান চলাচলের জন্য নির্ধারিত হলেও সেখানে একইসঙ্গে চলছে ধীরগতির অটোরিকশা। কোথাও প্রধান সড়কে প্রবেশ নিষিদ্ধ, তবু সেগুলো ঢুকে পড়ছে। কোথাও আবার রাস্তার মাঝখানে দাঁড়িয়ে যাত্রী তোলা হচ্ছে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে সম্প্রতি বলা হয়েছে, অটোরিকশাগুলোকে এলাকাভিত্তিক জোনে চালানোর পরিকল্পনা করা হচ্ছে। একটি এলাকার রিকশা অন্য এলাকায় অবাধে যেতে পারবে না; প্রয়োজন অনুযায়ী নির্দিষ্ট দিন বা নির্দিষ্ট সড়কেও বিধিনিষেধ থাকতে পারে। অলিগলির যান যখন প্রধান সড়কে উঠে পড়ে, তখন সেটি শুধু যানজট নয়, গতির পার্থক্যের কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বাড়ায়। অনেক গাড়িতে নেই কার্যকর নম্বর প্লেট। চালকদের একটি অংশের নেই প্রশিক্ষণ ও বৈধ লাইসেন্স। অনেক গাড়ির ব্রেক, আলো ও কাঠামোগত নিরাপত্তাও নেই।
দুর্ঘটনার পরিসংখ্যানও উদ্বেগজনক
২০২৫ সালে দেশে ৬ হাজার ৭২৯টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৯ হাজার ১১১ জন নিহত এবং ১৪ হাজার ৮১২ জন আহত হয়েছেন— বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির পর্যালোচনায় এমন তথ্য উঠে এসেছে। দুর্ঘটনায় সংশ্লিষ্ট যানবাহনের মধ্যে ব্যাটারিচালিত রিকশা ও ইজিবাইকের অংশ ছিল ১৩ দশমিক ৫৪ শতাংশ।
বিদ্যুতের হিসাবও বড় হচ্ছে
সড়কের সমস্যার বাইরে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার আরেকটি বড় প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ খাতে। সরকারের হিসাবে, দেশে প্রায় ৫০ থেকে ৮০ লাখ বৈদ্যুতিক থ্রি-হুইলার রয়েছে। এসব যান মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রায় ৫ শতাংশ ব্যবহার করে। এটি নিছক বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব নয়। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে চার্জিং অবকাঠামোর প্রশ্ন। দেশে বৈধ চার্জিং পয়েন্ট মাত্র প্রায় ৩ হাজার ৩০০টি। বিপরীতে শুধু ঢাকাতেই ৪৮ হাজারের বেশি অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ চার্জিং পয়েন্ট রয়েছে বলে সংসদে জানিয়েছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া হিসাবে, এ কারণে সরকারের বার্ষিক রাজস্ব ক্ষতি প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা।
চার্জিং পয়েন্টও আসতে হবে নিয়ন্ত্রণের মধ্যে
অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করে চার্জিং ব্যবস্থা অনিয়ন্ত্রিত রেখে দিলে নীতিমালার বড় একটি অংশ অপূর্ণ থাকবে। সরকারের সাম্প্রতিক নীতিগত আলোচনায় চার্জিং স্টেশন ও গ্যারেজ ব্যবস্থাপনাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্থানীয় সরকার বিভাগের আলোচনায় রেজিস্ট্রেশন, ফিটনেস, গ্যারেজ ও চার্জিং স্টেশন ব্যবস্থাপনা এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহারের বিষয় উঠে এসেছে।
ভবিষ্যতে ‘নিবন্ধিত অটোরিকশা, নিবন্ধিত চার্জিং পয়েন্ট, বৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ ও মিটারভিত্তিক ব্যবহার করতে হবে। এতে একদিকে বিদ্যুৎ চুরি কমানো সম্ভব হবে; অন্যদিকে চার্জিংয়ের নিরাপত্তাও বাড়বে।
এবার নিষেধাজ্ঞা নয়, নিয়ন্ত্রণ
ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা বন্ধের আলোচনা বহুদিনের। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কম আয়ের মানুষের যাতায়াত এবং বিপুলসংখ্যক চালকের জীবিকার সঙ্গে এই বাহন জড়িয়ে গেছে। এ কারণেই এবার সরকারের অবস্থান কিছুটা ভিন্ন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গত ৭ সেপ্টেম্বর সোমবার সংসদে জানিয়েছেন, অটোরিকশা পুরোপুরি বন্ধ না করে ‘নিবন্ধন, কিউআর কোড, ডিজিটাল ট্র্যাকিং, চালকের নিবন্ধন ও প্রশিক্ষণ এবং নির্দিষ্ট রুটের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রণ’ করা হবে।