নিত্যপণ্যের বাজার দাম না কমে উল্টো বাড়ছে


১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪০

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের নিত্যপণ্যের বাজারের বড় সমস্যা হচ্ছে— একবার কোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধির পর সেটি আর কমার খবর থাকে না, মানে কমেই না। এরপর কিছু দিন স্থিতিশীল থাকার পর আবার মূল্য বাড়ে। ফলে দেখা যায়, বছরের শুরুতে ত্রিশ হাজার টাকা বেতনের কর্মচারী তার আয়ে যেভাবে জীবনযাপন শুরু করে শেষ দিকে এসে ব্যাপক টানাটানিতে পড়ে যায়। কারণ বছরের ব্যবধানে অনেক পণ্যের মূল্যই বৃদ্ধি পায়, কিন্তু তার আয় বাড়ে না। ফলে দরিদ্র ও স্বল্পআয়ের মানুষ অনেক কষ্টে জীবন কাটান। দিন দিন যায় আর মূল্য বাড়ে, আর সঙ্গে কষ্টও বাড়ে স্বল্পআয়ের মানুষের।
ঢাকার বাজারে খবর নিয়ে জানা গেছে, বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম সরকার নির্ধারণ করেছে লিটারপ্রতি ২০৪ টাকা। কিন্তু দাম বাড়ানোর পরও বাজারে তেলের সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কোথাও চাহিদামতো তেল মিলছে না, কোথাও পুরোনো স্টক নতুন দামে বিক্রি করছে দোকানীরা। সপ্তাহের ব্যবধানে চিনি কেজিতে ১০ থেকে ১৫ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। সবজির বড় অংশের দাম এক সপ্তাহেই কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। ডিম বিক্রি হচ্ছে ডজন ১৬৫ টাকা পর্যন্ত। মাছেও স্বস্তি নেই। অর্থাৎ সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের বাজার অস্বস্তির বাজারে পরিণত হয়েছে।
তেল : দাম বাড়ল, কিন্তু সংকট কাটল না
নিত্যপণ্যের বাজারে এই মুহূর্তে সবচেয়ে স্পষ্ট সংকট ভোজ্যতেলে। গত ২ সেপ্টেম্বর বুধবার সরকার বোতলজাত সয়াবিন তেলের সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য লিটারপ্রতি ৫ টাকা বাড়িয়ে ২০৪ টাকা নির্ধারণ করে। ব্যবসায়ীরা আরও বেশি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছিলেন; বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনও লিটারপ্রতি ১০ টাকা বৃদ্ধির সুপারিশ করেছিল। শেষ পর্যন্ত সরকার ৫ টাকা সমন্বয় করেছে। খোলা সয়াবিন ও পাম তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, ‘দাম সমন্বয় করেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি।’ ঢাকার বিভিন্ন বাজারের খবর নিয়ে জানা গেছে, প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে অনেক খুচরা বিক্রেতা নিয়মিত সরবরাহ পাচ্ছেন না। নতুন দাম ঘোষণার পরও বিপণনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো পর্যাপ্ত তেল সরবরাহ করছে না বলে বিক্রেতারা জানিয়েছেন। কোথাও অল্প পরিমাণ তেল এলেও তা চাহিদার তুলনায় কম। লাখো ভোক্তার প্রশ্ন, দাম বাড়ানোর যুক্তি যদি হয় আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়, তাহলে দাম সমন্বয়ের পর বাজারে সরবরাহ স্বাভাবিক হওয়ার কথা। কিন্তু এখানে দাম বেড়েছে, অথচ সংকট কাটেনি।
চিনি : সরবরাহ কমলে দ্রুত চাপে পড়ে বাজার
সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে চিনির বাজারেও টান দেখা দিয়েছে। গত ৭ সেপ্টেম্বরের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গত দুই সপ্তাহে চিনির দাম কেজিতে প্রায় ১০ থেকে ১৫ টাকা বেড়েছে। খুচরা বিক্রেতারা এর জন্য সরবরাহ কমে যাওয়া ও পাইকারি বাজারে দাম বাড়াকে দায়ী করছেন। অনেক দোকানেই চাহিদামতো চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। চিনি ও ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রে একই ধরনের একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। অর্থ্যাৎ সরবরাহ কমে গেলে খুচরা বাজারে দাম দ্রুত বাড়ছে।
সবজিতে স্বস্তি নেই, বরং বাড়ছে চাপ
সবজির বাজারের চিত্র আরও অস্বস্তিকর। সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে আগের সপ্তাহের চাইতে প্রায় সব ধরনের সবজির দাম কেজিতে ১০ থেকে ২০ টাকা বেড়েছে। বেগুন, করলা, বরবটি, ঢ্যাঁড়শ, পটোল ও কাঁকরোলসহ বেশিরভাগ সবজি বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ১২০ টাকা কেজিতে। আগাম শীতকালীন শিম বাজারে এলেও এর দাম কেজিতে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা। টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা এবং কাঁচামরিচ ১৬০ টাকা কেজি পর্যন্ত উঠেছে। অন্যদিকে পেঁপে তুলনামূলক কম, কেজি ৪০ টাকা। সবজির বাজারে এই মূল্যবৃদ্ধির ব্যাখ্যাও কিছুটা ভিন্ন। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সরবরাহ কমে যাওয়া এবং পাইকারি দামের চাপ খুচরা বাজারে প্রভাব ফেলছে।
‘গরিবের প্রোটিন খাবার’ ডিমও এখন সস্তা নয়
ডিমের বাজারেও ক্রেতার জন্য স্বস্তি নেই। বাজারে এক ডজন ডিমের দাম ১৬৫ টাকা এবং চারটি ডিম ৫৫ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। অর্থাৎ একটি পরিবারের নিয়মিত প্রোটিনের সহজ উৎস হিসেবে পরিচিত ডিমও এখন দৈনন্দিন খাদ্য ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে। বাজারে ব্রয়লার মুরগি কেজি ১৯০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর গোশতের দাম ছিল কেজি ৮০০ টাকা।
মাছেও স্বস্তি নেই
নিত্যপণ্যের বাজারে মাছ সাধারণত গোশতের বিকল্প হিসেবে বিবেচিত হয়। কিন্তু সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহের বাজারে মাছও খুব একটা স্বস্তি দেয়নি। বাজারে তেলাপিয়া ২৫০-২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০-২৫০ টাকা, রুই-কাতল ৩৮০-৪২০ টাকা, পাবদা ৩৫০-৪০০ টাকা এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হয়েছে। দেশি কৈয়ের দাম ছিল ৭০০-৮০০ টাকা পর্যন্ত।
বাজারের আসল সমস্যা কোথায়?
তেল ও চিনির ক্ষেত্রে সরবরাহ ঘাটতির কথা সরাসরি উঠে এসেছে। তেলের ক্ষেত্রে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে নিয়মিত সরবরাহ না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারিতে বেশি দামে পণ্য কিনতে হচ্ছে। ফলে তারা কম দামে বিক্রি করতে পারছেন না। গত ১ সেপ্টেম্বর এফবিসিসিআইয়ের সঙ্গে ব্যবসায়ীদের মতবিনিময়ে ব্যবসায়ীরা সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্ন, জ্বালানি সংকট, এলসি খোলার সমস্যা এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবকে পণ্যের দামের ওপর চাপ সৃষ্টির কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
ভোজ্যতেলের মতো পণ্যে আন্তর্জাতিক বাজার ও আমদানি ব্যয়ের পরিবর্তন সরাসরি দেশের বাজারে প্রভাব ফেলে। সরকারও সয়াবিন তেলের দাম সমন্বয়ের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মূল্য ও আমদানি ব্যয়কে কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। শুধু পণ্যের উৎপাদন বা আমদানি নয়— বন্দর থেকে পাইকারি বাজার, সেখান থেকে খুচরা বাজার পর্যন্ত প্রতিটি ধাপের খরচ শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ওপর পড়ে।
যা করা উচিত
প্রথমত, সরবরাহ নিশ্চিত করা। বিশেষ করে তেল ও চিনির মতো পণ্য বাজারে নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, পাইকারি ও খুচরা দামের ব্যবধান পর্যবেক্ষণ। অস্বাভাবিক ব্যবধান হলে উৎস পর্যায় পর্যন্ত তদন্ত করতে হবে। তৃতীয়ত, মজুদের তথ্য ডিজিটাল করা। আমদানিকারক, পরিশোধনকারী, বড় পাইকার ও গুদাম পর্যায়ের মজুদ সম্পর্কে নিয়মিত তথ্য থাকা প্রয়োজন। চতুর্থত, পণ্যভিত্তিক বাজার মনিটরিং। সব পণ্যের জন্য একই ধরনের অভিযান নয়; তেল, চিনি, সবজি, ডিম, মাছ— প্রতিটির সরবরাহব্যবস্থা আলাদা।
পঞ্চমত, ভোক্তার জন্য তথ্য উন্মুক্ত করা। সরকারি নির্ধারিত দাম, পাইকারি দর ও খুচরা বাজারদর পাশাপাশি প্রকাশ করা গেলে বাজারে অস্বচ্ছতা কমবে।