চুরি-ডাকাতির কিসসা
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪০
॥ তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী ॥
(গত পর্বের পর)
২.
গতকাল মাগরিবের পর থেকে এখন পর্যন্ত আর বৃষ্টি-বাবাজি হানা দেয়নি। সুতরাং আসরের পর বিকালের ম্লান রোদে শহরের মেঠোপথ বেয়ে আমরা চললাম ওমরের মেসের উদ্দেশে। গতকাল যে গল্পটা বলতে চেয়েছিলাম, সেই ইচ্ছে আজ চরিতার্থ করবো, ইনশাআল্লাহ। আমরা তিনজনে এসে বসলাম ওমরের খাটে। ওমর আজ সালাতে যাওয়ার আগে চা বসিয়ে গিয়েছিল। তাই সালাত থেকে ফিরেই দ্রুত চা নিয়ে এলো। আমাদের চা দিয়ে ওমর একগাল হেসে আমাকে বলল, ‘কীরে! শুরু কর তোর গল্প। দেখি কত কেজি জোস হয়!’
আমি কৃত্রিম-বিরক্ত কণ্ঠে বললাম, ‘এই ফাজলামি করিস না তো! শুনতে চাইলে চুপচাপ বসে শোন।’
আব্দুর রহমান সম্মতি জানিয়ে বলল, ‘হ্যাঁ, শুরু কর তবে।’
আমি আরম্ভ করলাম, ‘সেদিন ছিল কুয়াশাঘন এক শীতের রাত। কুয়াশার জালে আকাশের তারারা যেন অদৃশ্য হয়ে গেছে। রাত তখন তিনটে কী চারটে। গরম কম্বলের তলে ঘুমাচ্ছিলেন আমার আব্বা। হঠাৎ কার যেন কনুইয়ের গুঁতা খেলেন। চোখ মেলে দেখেন— আম্মা বিস্ফারিত চোখে ভ্রু নাচিয়ে জানালার দিকে দেখাচ্ছেন। তিনি পায়ের কাছে দৃষ্টি ফিরিয়েই পুরো হতভম্ব! না, ভূত-জাতীয় কিছু না! সরকারি লাইটের আবছা আলোয় দেখা গেল— একটা চিকন লাঠি জানালার গরাদ ভেদ করে এগিয়ে আসছে। তার লক্ষ্য সম্ভবত মশারির প্রান্ত। আব্বা যথাসম্ভব না নড়ে হাত দিয়ে মশারিটার প্রান্ত ফাঁক করে ধরলেন। যে-ই না লাঠিটা হাতের নাগালে এলো, অমনি লাঠিটা ধরে ফেললেন। লাঠিটার আগায় কিছু একটা লাগানো ছিল। কিন্তু কী, তা তিনি বুঝতে পারলেন না। হাত একটু এগিয়ে নিয়ে দিলেন টান। তখনই জানালার গরাদে একটা কিছু ধাক্কা খেল। কালো কাপড়ে বাঁধা মুখে রক্ত-লাল চোখ জ্বলজ্বল করছে। মুহূর্তেই আবার উধাও হয়ে ওপাশ থেকেও টান পড়ল। এভাবে কিছুক্ষণ টানাটানি-ঠেলাঠেলি খেলা চলল। একপর্যায়ে আব্বা দেখলেন তার তর্জনী আর মধ্যমা আঙুলের ফাঁক দিয়ে আঠালো লাল তরল গড়িয়ে পড়ছে। হালকা জ্বালাও অনুভব করলেন। এবার তার মেজাজ সপ্তমে উঠল। তিনি প্রাণপণে দিলেন এক ঠেলা, আর সাঁই করে লাঠিটা জানালা পেরিয়ে বেরিয়ে গেল।
আব্বা দ্রুত বালিশের পাশ থেকে মোবাইলটা নিয়ে কল দিলেন পাড়ার মুখের খোন্দকার আঙ্কেলকে। আর চেঁচাতে লাগলেন, ‘চোর চোর চোর!’
খোন্দকার আঙ্কেল কল ধরতেই আব্বা বললেন তাড়াতাড়ি বেরিয়ে চোরকে ধরতে। কিন্তু চোরকে আর পায় কই? সে তো পুরো জিনের মতোই গায়েব হয়ে গেল। এর মধ্যেই আশপাশের লোকজনও উঠে পড়েছিল। সবাই বেরিয়ে এলেন।
ওমর বলল, ‘এই দাঁড়া এক মিনিট! শীতের সময় তো সবাই জানালা বন্ধ করে শোয়। তাহলে?’
আমি বললাম, ‘এখানেই তো চুরিবিদ্যার মহাসাফল্য। বুঝিস না?’
আব্দুর রহমান বলল, ‘আচ্ছা, চোরটা কি সত্যিই কিছু চুরি করতে এসেছিল নাকি তোর আব্বার কোনো ক্ষতি করতে?’
আমি বললাম, ‘সম্ভবত বালিশের পাশে রাখা ঐ মোবাইলটা চুরি করতে।’
ওমর বলল, ‘হুম। একদিন ইউটিউবে দেখলাম এক ডাক্তার বলছে, শোয়ার সময় মোবাইল বালিশের পাশে রাখলে ব্রেইনের ক্ষতি হয়। এখন তো দেখছি মোবাইলেরও ক্ষতি হয়।’
আমি খেই তুলে নিয়ে বললাম, ‘কিন্তু কি জানিস? চোর যদি তার কাজে সফলও হতো, তবু খুব একটা লাভ হতো না। কারণ মোবাইলটা ছিল বাটন ফোন।’
আব্দুর রহমান তাজ্জব বনে গিয়ে বলল, ‘ওরেব্বাস! তো এরপর কী হলো? চোরকে ধরা গেল? সিসিটিভি ক্যামেরায় কিছু দেখা গেল না?’
আমি বললাম, ‘আরে তখনো সিসিটিভি ক্যামেরা এদিকে তার রাজত্ব শুরু করেনি। তো বলি এরপর’—।
ওমর চঞ্চল হয়ে বলল, ‘হুম। তাড়াতাড়ি বল।’
আমি একটু কেশে নিয়ে বললাম, ‘তোরা তো জানিস আমি ছোট থেকেই এই শহরে থাকি। আর যে বাসায় এখন আছি, সেখানেও থাকতে থাকতে প্রায় দশ বছর হয়ে গেল। আমাদের বাসাটা নিচতলায় হলেও এটা একটু উঁচু। তাই খালি পায়ে দাঁড়িয়ে জানালার নাগাল পাওয়া সহজ না। আবার আব্বার রুমের পাশ দিয়ে গেছে ড্রেন। তো আব্বা সবাইকে নিয়ে সেদিকে যান। সেদিকে গিয়েই তো সবার চক্ষু চড়কগাছ আর কী! ঐ যে, বিল্ডিং রং করার সময় এক ধরনের কাঠের জিনিসের ওপর দাঁড়ায় না?!’
আব্দুর রহমান বলল, ‘ও, কাঠের ঘোড়া বলা যে, ওগুলো না?’
আমি মাথা নাড়িয়ে বললাম, ‘হুম। তো সবাই আলো ফেলে দেখল— সেরকম একটা জিনিস ড্রেনের ওপর কাত হয়ে পড়ে আছে। কাছে গিয়ে তারা দেখতে পেলেন মাটির ওপর বিভিন্ন ছাপ— জুতা, হাত, পা, লাঠি। বোঝাই যাচ্ছে আব্বার ঠেলা খেয়ে চোর মিয়া ঘোড়াসুদ্ধ চিৎপটাং হয়েছিলেন। এই আর কী! গল্প শেষ।’
ওমর ভ্রুযুগল কুঞ্চিত করে বলল, ‘কী বলিস? শেষ? চোরটা সম্পর্কে আর কিছুই জানা যায়নি?’
আমি বললাম, ‘উহু! বুঝলি ‘শেষ হয়েও হইল না শেষ।’ এবার বল কেমন হলো?’
আব্দুর রহমান গম্ভীরমুখে বলল, ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনীও বোধ হয় তোর এই অসমাপ্ত গল্পের চেয়ে ভালো। কী গল্পের মাঝখানে এনে মহাকাশ থেকে ফেলে দিলি!’
আমি হাসতে হাসতে বললাম, ‘হুম। এটাই তো মজা!’
আমাদের চায়ের কাপগুলো প্রায় খালি হয়ে আসছে। হঠাৎ কীসের গর্জনে চমকে বাইরে তাকাই। দেখি— সহসা আকাশ কালো হয়ে আসছে। কীরে! সবাই কি আমার ওপর ‘রাগ করলা?’ ঝুম করে শুরু হলো ‘জল পড়ে পাতা নড়ে’।
আব্দুর রহমান আকাশের মতোই মুখখানা কালো করে বলল, ‘এ-ই রে! সেরেছে! এবার?’
আমি বললাম, ‘এবার আর কী! এবার আপনাদের সামনে চুরি-ডাকাতির কিসসা নিয়ে হাজির হবেন সুবর্ণচরের বিখ্যাত সেলিব্রিটি ওমর ফারুক!’
ওমর মাথা নেড়ে বলল, “উহু, সুবর্ণশহর, চর নহে!
আমরা দুজন তো হেসে লুটোপুটি খেতে লাগলাম।
ওমর আবার বলল, ‘তোরা দুইটাই ব্যর্থ চুরি বা ডাকাতির গল্প শুনালি। কিন্তু আমি শোনাবো এক মারাত্মক লেভেলের ট্যালেন্টেড ও সফল চোরের কাহিনী। শুনবি?’
আব্দুর রহমান উৎসাহভরে বলল, ‘আলবাত শুনব! কিন্তু তার আগে ঝাল কিছু একটার ব্যবস্থা কর দেখি মামা। বাইরের বৃষ্টির সাথে টক-ঝাল-মিষ্টি না হলে কি আর হয়?’
ওমর নাক উঁচিয়ে বলল, ‘উহু, শ্বশুরবাড়ি আসছেন নাকি হ্যাঁ? খাদক কোথাকার!’
আমি বললাম, ‘হ্যাঁ রে! দেখনা কিছু আছে কিনা?’
ওমর ডান হাত বুকের কাছে নিয়ে চোখ বন্ধ করে বলল, ‘যথা আজ্ঞা মহারাজ!’
আমি এক ঘা দেওয়ার আগেই সে ছুটে রান্নাঘরে পালাল। কিছুক্ষণ পর দেখি— একটা স্টিলের বাটিতে মুড়ি চানাচুর নিয়ে এলো। বলল, ‘টক আর মিষ্টি হবে না। যা আছে খেলে খা, নইলে আমি একলাই খাই।’
আমরা দুজনে দ্রুত বলে উঠলাম, ‘তাতেই হবে।’
এক মুঠো মুড়ি মুখে পুরে আমি বললাম, ‘হুম। শুরু কর তোর ট্যালেন্টেড চোরের গল্প।’
মুড়ি চিবাতে চিবাতে ওমর শুরু করল, ‘আমাদের গ্রামের রমিজ মিয়ার ছিল বিশাল খামার। বিশ পঁচিশটা গরু। একদিন সকালে ফজরের সালাতের পর তিনি খামারে গিয়ে তো পুরো মাথায় হাত। পনেরোটা গরু উধাও। চিল্লাফাল্লা করতেই লোকজন ছুটে এলো। কে নিল? কে এত বড় চুরি করল? সবার মুখে একই প্রশ্ন।’
এরপর আরেকদিন আমার চাচাজান মধ্যরাতে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়ে দেখেন— পুকুরের ধারে কে যেন জাল গুটাচ্ছে। তিনি সঙ্গে সঙ্গে হইহই করে সেদিকে ছুটে গেলেন। লোকটাও মাছসুদ্ধ জাল নিয়ে দৌড় লাগাল। কিছুদূর গিয়ে একটা ছোট্ট ট্রাকে উঠে তা চালিয়ে দিল সে। আমার চাচাও ছাড়বার পাত্র নন। তিনিও নিজের বাইকটা নিয়ে পিছু ধাওয়া করলেন। ইতোমধ্যে লোকজনও জড়ো হওয়া শুরু করেছে। চাচাজান ফুল স্পিড দিলেও এবড়োখেবড়ো রাস্তার কারণে খুব একটা সুবিধা করতে পারছিলেন না। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার হলো ট্রাকটা অবলীলায় অবিশ্বাস্য গতিতে ছুটে চলছিল। যেন হাইওয়ে রাস্তায় গাড়ি চালাচ্ছে। কিছুক্ষণের মধ্যেই ট্রাকটা চাচাজানকে ব্যঙ্গ করে পালিয়ে গেল। চাচাজান ব্যর্থ মনোরথে ফিরে এলেন। জরিপ করে দেখা গেল— আমাদের পুকুরের প্রায় সব মাছই চোরটা নিয়ে গিয়েছিল।’
আমি বললাম, ‘কী বলিস? এ তো পুরো অবিশ্বাস্য! একাই পুকুরের সব মাছ জাল দিয়ে ধরে নিয়ে গেল?’
আব্দুর রহমান বলল, ‘তার চেয়েও আশ্চর্য হলো এবড়োখেবড়ো রাস্তায় ট্রাক কীভাবে বাইককে ফাঁকি দিতে পারে?’
ওমর বাঁকা রহস্যময় হাসি হেসে বলল, ‘এখানেই তো তার বিশেষত্ব। বলেছিলাম না, এই চোর মারাত্মক লেভেলের ট্যালেন্টেড। যাকে বলে আল্ট্রা প্রো ম্যাক্স!’
এমন সময় আব্দুর রহমান হতাশকণ্ঠে বলল, ‘হুম। তোর আল্ট্রা প্রো ম্যাক্সের গল্প আজ আর শোনা হবে না।’
আমি চোখ তুলে বললাম, ‘কেন?’
ওমর বলল, ‘বুঝেছিস? আব্দুর রহমানের শ্রবণেন্দ্রিয়ের উন্নতি হয়েছে। কিন্তু তোরটার হলো না।’
আমি মাথা চুলকে বললাম, ‘মানে?’
ওমর বলল, ‘আরে বেটা মাগরিবের আযান দিচ্ছে।’
আব্দুর রহমান বলল, ‘বাইরে তো ঝরঝরে বৃষ্টি।’
ওমর বলল, ‘আমার কাছে তো একটাই ছাতা আছে। কী আর করার। রুমেই জামাত করে নিতে হবে।’
আমি মিনতির সুরে বললাম, ‘যখন ঘরে জামাত করবো, তখন গল্পটার আরেকটু শোনা যাক।’
ওমর মাথা নেড়ে বলল, ‘নো নো। জানিস না, আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নির্ধারিত সময়ে সালাত কায়েম করা মুমিনদের জন্য অবশ্য কর্তব্য’। (সূরা নিসা : ১০৩)। সুতরাং আগে সালাত, পরে অন্য কিছু।
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে। তবে যা বুঝলাম, তোর গল্পটা বেশ জমবে। শুধু একটু ‘ইকো’টা বাড়িয়ে দিলেই হবে। বৃষ্টির কারণে ঠিকমতো শোনা যাচ্ছিল না।’
ওমর আর আব্দুর রহমান অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। হায় রে ইকো হুজুর! বাংলাদেশেই বোধ হয় ভাইরাল হওয়া সবচেয়ে সহজ!
খালি স্টিলের বাটিতে বাতাসের ঝাপটায় কয়েক ফোঁটা পানি এসে জমল। বাইরের প্রকৃতি আরও জোরে বাজিয়ে যেতে লাগল তার বর্ষাকালের চিরন্তন সুর। স্নিগ্ধ ভেজা বৃক্ষরাজির দিকে তাকিয়ে শুধু একটা কথাই মনে দোল খেতে লাগল— ‘গাছের পাতা সব-উ-জ’। (চলবে)