কবি মোশাররফ হোসেন খানের কবিতা : বিন্দুর ভেতর সিন্ধু
২৩ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৯
॥ বিলাল হোসাইন নূরী ॥
কবিতার শরীর কতটা বড়, তার চেয়েও বড় কথা হচ্ছে তার ভাব-সম্পদের শেকড় কতটা গভীরে পৌঁছাতে পেরেছে। বিশ্ব সাহিত্যের ইতিহাসে কবিতা কখনো দীর্ঘ বয়ানের আশ্রয় নিয়েছে, কখনো আবার অল্প কয়েকটি পঙক্তির মধ্যেই প্রকাশ করেছে জীবনবোধের অনিঃশেষ গল্প। দু-চার পঙক্তির একটি কবিতাও বেঁচে থাকতে পারে শতাব্দীর পর শতাব্দী, যখন তা মানুষের আবেগকে আলোড়িত করতে পারে, ঝংকার তুলতে পারে সময়ের বহমান তরঙ্গে। এ কারণে ছোট কবিতা কখনোই ছোট নয়।
কবিতার এই সংক্ষিপ্ত ও শক্তিশালী রূপগুলোর অনন্য উদাহরণ হচ্ছে ফারসি ‘রুবাইয়াত’, ইরানের ওমর খৈয়াম যার বিখ্যাত কবি। গজলের রচনাশৈলীতেও আমরা এমন প্রয়াস দেখতে পাই, যার প্রতি দু’লাইনের একেকটি শে’র গভীর ভাবসম্পদের প্রতিনিধিত্ব করে। হাইকু, লিমেরিক ও কাপলেটের মতো ছোট ছোট বিপুল কাব্যকলা নানান দেশে নানা ভাষায় সাহিত্যের অনিবার্য আসন দখল করে আছে এবং থাকবে।
আমেরিকার কবি এমিলি ডিকিনসন ছোট ছোট কবিতার শরীরে গেঁথে দিয়েছেন বড় বড় পালক। বাংলাভাষায়ও এ ধরনের প্রয়াস চলে আসছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘কণিকা’ কাব্য এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য।
আধুনিক বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি মোশাররফ হোসেন খানের কলমেও উঠে এসেছে ছোট কবিতার ভিন্ন এক স্বাদ। তবে তার বিষয়বৈচিত্র্য ও বর্ণনাভঙ্গি অন্য সবার চেয়ে আলাদা। এখানে তিনি অন্য অনেকের মতো আনন্দবিলাসী নন, বিপ্লব-বিদ্রোহে ফেটে পড়া এক অকুতোভয় যোদ্ধা। ভোগ নয়, ত্যাগই তার জীবনদর্শন। পৃথিবীর মোহে বুঁদ হয়ে না থেকে বরং পৃথিবীকেই ভেঙে নতুন এক সমাজধারা বিনির্মাণের স্বপ্নে তেজোদীপ্ত তিনি। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থেই তিনি বলেছেন-
‘নারীর কাছে চাইনে কিছু, শুধুই বলি : যোদ্ধা দাও
বধির খুনী ঝঞ্ঝা বটে, তবু বলি : ধ্বংস দাও।
গড়তে হলে ভাঙতে হবে বেশ রকমে পাচ্ছি টের
যুদ্ধ করে মরাই ভালো এমন বাঁচার চাইতে ঢের।’
[প্রস্তুতি : হৃদয় দিয়ে আগুন]
কবি আশার বীজ বুনে রেখেছেন এভাবে যে, কেউ না কেউ এ ভাঙা-গড়ার হাল ধরবেই। ‘পাথরে পারদ জ্বলে’ কাব্যগ্রন্থে তাঁর নিটোল উচ্চারণ-
‘পাথরে পারদ জ্বলে, জলে ভাঙে ঢেউ-
ভাঙতে ভাঙতে জানি গড়ে যাবে কেউ!’
পৃথিবীকে ভাঙতেই বা হবে কেন? কেন মোশাররফ হোসেন খানের ছোট কবিতাগুলোয এ ভাঙা-গড়ার অধীর তরঙ্গ? কারণ পৃথিবীকে তিনি পাঠ করেছেন তার নিজের ভাষায়, অবলোকন করেছেন তৃতীয় দৃষ্টিতে। বুঝেছেন, বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক হানাহানি, যুদ্ধবিগ্রহ এবং অন্ধ জাতীয়তাবাদের নেতিবাচক প্রভাবই সকল সংঘাতের কারণ।
তার ভাষায়-
‘পৃথিবীর বুকে আগুনের হাত
মানবতায় বোমার বিস্ফোরণ
জাতীয়তার গোয়ালে বাস করে ভণ্ড
দিকে দিকে তাই দেখা দেয় সংঘাত।’
[সংঘাত : হৃদয় দিয়ে আগুন]
মানুষ যখন ‘জাতীয়তাবাদ’-এর নাম করে নিজের গোষ্ঠী বা রাষ্ট্রকে বড় করে দেখে এবং অন্যকে ঘৃণা করতে শেখে, তখন সে মুখে মুখে মানবতার বুলি আওড়ানো ভণ্ড ছাড়া আর কিছুই নয়। আর এ ভণ্ডদের গোয়ালঘর না ভাঙতে পারলে পৃথিবীর মুক্তি মিলবে কী করে?
কিন্তু কীভাবে এ ভাঙনের খেলা খেলতে চান কবি? হ্যাঁ, এর জন্য প্রয়োজন একটি বিপ্লব!
কবি মোশাররফ হোসেন খান তার ‘শিখর শিলালিপি’তে এ বিপ্লবের কথাই বলেছেন। যে বই তিনি শুধু ছোট কবিতা দিয়েই সাজিয়েছেন। তিনি প্রয়োজন অনুভব করেছেন একটি পালাবদলের। তাই শুরুটাই করেছেন এভাবে-
‘বিপ্লবের মৌসুম এখন
তৈরি আছে খড়ের শীষ
জেগে ওঠার এই তো সময়
আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দিস।’
আসলে কেমন বিপ্লব চান কবি? এখানে তার কোনো রূপরেখা নেই, আছে কেবল উদ্দীপনার স্ফুলিঙ্গ। তিনি কেবল মানুষের শিরায় শিরায় দুর্দমনীয় গতিধারা সঞ্চার করতে চেয়েছেন, যেন তারা ঘুমিয়ে না পড়ে। কার জন্য জেগে থাকবে মানুষ? কেমন পরিবর্তন আনবে তারা এ পৃথিবীতে? কবি সেটা আমাদের বলে দিয়েছেন আরও অনেক আগেই-
‘আমার এ চোখ দেখতে অপারগ মানুষের ধ্বংসাবশেষ
অথচ প্রতিদিনই দেখতে হচ্ছে বীভৎস কঙ্কাল
তবু আমি অপেক্ষায় আছি
আমি তো দেখে যেতে চাই-
উৎসবমুখর পৃথিবী
আর মানুষের সবুজ উত্থান।’
[সবুজ উত্থান : দাহনবেলায়]
এ সবুজ তার বিশ্বাসের রং, তাওহীদের কোমল প্রলেপ! বিধ্বস্ত পৃথিবীর পরতে পরতে তিনি দেখতে চান হক ও ইনসাফের সবুজ গম্বুজ। তাই তিনি তার কাক্সিক্ষত বিপ্লবের নাম দিয়েছেন, ‘সবুজ উত্থান’!
এ উত্থান কি এতই সহজ?
না, এর জন্য প্রয়োজন ঘামের লোনাসমুদ্র, রক্তের নজরানা। ক্ষুধা, মৃত্যু ও অবর্ণনীয় কষ্টের পথ পাড়ি দিয়েই কেবল পৌঁছা যায় একটি নতুন বিজয়ের সবুজ উপত্যকায়। যে পথ ধরে জাহেলিয়াতের অন্ধকারে ডুবে থাকা পৃথিবীকে পুনর্নির্মাণ করেছিলেন মানবতার মহানায়ক নবী মুহাম্মদ সা., কবি তো সে পথেরই পথিক। যেন তার একটাই স্বপ্ন, কখন আসবে সকাল? তাই তার শিরায় শিরায়, মেধা ও মননে শুধুই বিপ্লব! শুধুই বিদ্রোহ! তিনি বলেছেন, মুক্তি তাঁর বোন! সংগ্রাম তার ভাই! বিপ্লব তাঁর রক্ত! তার ভাষায়-
‘ডালে ডালে রক্ত গোলাপ
রক্ত কুঁড়ি রাত
রক্ত গোলাপ নয় তো ওসব-
বিপ্লবীদের হাত!’
বিপ্লবীদের হাত রক্তাক্ত হবেই। তাই তার সহযাত্রীদের তিনি সাহস যুগিয়ে যাচ্ছেন এভাবে-
‘আসবে ঝড় উড়বে খড়
নাওটা হবে ছত্রখান
ভয় কি তাতে সাঁতরে চলো
নীল দরিয়া সাগরবান!’
কিংবা
‘তোমার চোখে পারদ জ্বলে
বারুদ আছে বুকে
তুমুল তুফান অগ্নি-হাওয়া
দাও না তবে রুখে!’
না হয় কবির স্বপ্ন সহসা পূরণ হলো না, তাই বলে কি তিনি থেমে থাকবেন? থেমে থাকবে সকল বিপ্লবী-বিদ্রোহী প্রাণ? না। মানুষের কাজ হচ্ছে লক্ষ্য স্থির করে শুধু এগিয়ে চলা। এ চলা থামবার নয়-
‘আমি তো জানি না পথ, পথের দূরত্ব
জানি না বরফঢাকা নদীর ঘনত্ব-
এতোটুকু জানি শুধু গন্তব্যের বাড়ি
যতই হোক না দূরে দিতে হবে পাড়ি।’
কবি মোশাররফ হোসেন খান ‘শিখর শিলালিপি’তে তার ব্যক্তিগত আবেগ-অনুভূতি, দুঃখ-শোকের বহু বর্ণিল কাসিদাও নির্মাণ করেছেন নিপুণভাবে। স্বভাবতই তিনি নরম মনের মানুষ, মানবতার কবি। খুব সহজেই বুকের ভেতর জায়গা দিতে পারেন মানুষকে। তার কবিতা পাঠে মনে হয়, বারবার তিনি আঘাত পেয়েছেন, ভীষণ আঘাত। তা-ও চেনা-জানা মানুষদের কাছ থেকেই। অথচ তিনি তো ভালোবাসা ছাড়া আর কিছুই চাননি। নিজের প্রাপ্য চাইতে না পারাটাই কি তার অক্ষমতা? প্রকৃত কবিদের ভাগ্য কি এমনই?
কবি মোশাররফ হোসেন খানকে নতুন করে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার কিছু নেই। তবে আগে থেকে ছোট কবিতা লিখলেও শিখর শিলালিপিতে একশ’ পঁয়ত্রিশটি অণুকবিতা নিয়ে তিনি আবির্ভূত হয়েছেন সম্পূর্ণ নতুনরূপেই! সাহস-সংগ্রাম, প্রতিবাদ-প্রতিরোধ, দেশপ্রেম থেকে শুরু করে দৈনন্দিন জীবনযাত্রার নানা সংকট-সম্ভাবনার টুকরো টুকরো অনুভূতি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে বিচিত্র শব্দের ব্যঞ্জনায়। এ যেন বিন্দুর ভেতরে সিন্ধু। কিছু কিছু পঙ্কতি তো মুখে মুখে ভেসে বেড়ানোর মতো। লেখায়, বক্তৃতায় উদ্ধৃতি দেওয়ার মতো।
লেখক : কবি ও গীতিকার।