গ্রন্থ পরিচিতি


২৩ আগস্ট ২০২৬ ১০:২৭

গ্রন্থ : আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি
লেখক : মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ
প্রচ্ছদ : সাইফ আলী
প্রকাশক : সোমেশ্বরী পাবলিকেশন
প্রকাশকাল : আগস্ট ২০২৬
মূল্য : ২০০ টাকা
‘আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি’ : কিশোর জীবন, সমাজ বাস্তবতা ও নৈতিকবোধের গল্প। সাহিত্যের বড় শক্তি হলো- সাধারণ জীবনের ভেতর থেকে অসাধারণ গল্প আবিষ্কার করা। মানুষের হাসি-কান্না, স্বপ্নভঙ্গ, বন্ধুত্ব, সম্পর্কের টানাপড়েন, কৈশোরের দুরন্তপনা, সামাজিক অসঙ্গতি কিংবা জীবনের কোনো অপ্রত্যাশিত ঘটনার অভিঘাত- এসবই একজন গল্পকারের হাতে হয়ে উঠতে পারে সাহিত্যের উপাদান। মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদের ‘আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি’ সেই গল্প বলার আকাক্সক্ষারই একটি প্রকাশ।
গ্রন্থটি মূলত কিশোরদের উপযোগী ছোটগল্পের সংকলন। তবে এর বিষয়বস্তু কেবল কিশোর জীবনের আনন্দ-বেদনায় সীমাবদ্ধ নয়। পারিবারিক সম্পর্ক, ধর্মীয় অনুশাসন, সামাজিক বৈষম্য, নারী ও শিশুর প্রতি নির্যাতন, প্রযুক্তির নেতিবাচক প্রভাব, মানবিকতা, ভালো আচরণ এবং জীবনবোধের নানা দিক গল্পগুলোর মধ্যে উঠে এসেছে। ফলে বইটি কিশোর পাঠকের পাশাপাশি অভিভাবক ও সাধারণ পাঠকের জন্যও ভাবনার কিছু উপাদান তৈরি করে।
গল্পের ভেতর সমাজের মুখ
একজন গল্পকার শুধু ঘটনা বলেন না; তিনি তার চারপাশের জীবনকেও দেখেন এবং সেই দেখা থেকে গল্প নির্মাণ করেন। রাশেদের গল্পগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য হলোÑ পরিচিত জীবনের নানা ঘটনা ও সমস্যাকে তিনি সহজ ভাষায় কিশোর পাঠকের সামনে তুলে ধরতে চেয়েছেন।
‘বড় মামুর বিয়ে’ গল্পে ধর্মীয় পর্দাপ্রথা ও সামাজিক রীতির একটি চমৎকার বৈপরীত্য তুলে ধরা হয়েছে। আমাদের সমাজে এমন অনেক মানুষ আছেন, যারা ব্যক্তিজীবনে পর্দার ব্যাপারে কঠোর হলেও বিয়ের অনুষ্ঠানের প্রচলিত রীতির সামনে সেই অনুশাসন অনেক সময় শিথিল করে ফেলেন। গল্পের কনে প্রচলিত বিয়ের পোশাকে নয়, বোরকা পরেই বিয়ের পিঁড়িতে বসে এবং শ্বশুরবাড়িতেও বোরকা পরেই যায়। নববধূকে দেখার জন্য পাড়া-প্রতিবেশী ও আত্মীয়-স্বজনের ভিড় হলেও সে কারো সামনে মুখ খোলে না। ঘটনাটির মধ্য দিয়ে লেখক ধর্মীয় বিশ্বাস ও সামাজিক প্রথার একটি বৈপরীত্য পাঠকের সামনে তুলে ধরেছেন।
‘পাখির রাজ্যে জুই’ গল্পটি আবার অনেকটা ফিচারধর্মী। পাখি সম্পর্কে প্রচুর তথ্য গল্পটির মধ্যে স্থান পেয়েছে। তথ্যের দিক থেকে এটি আকর্ষণীয় হলেও গল্পের শিল্পরীতির বিচারে এটি আরও সংহত হতে পারত। গল্প ও তথ্যের মধ্যে ভারসাম্য তৈরি করা গেলে এর সাহিত্যিক আবেদন আরও বাড়ত।
‘সাজিদের ইচ্ছে পূরণ’-এ ভ্রমণবৃত্তান্তের বৈশিষ্ট্য বেশি স্পষ্ট। ফলে এটি ছোটগল্পের চেয়ে ভ্রমণকাহিনির কাছাকাছি চলে গেছে। একইসঙ্গে চরিত্রের নাম বারবার ব্যবহারের পরিবর্তে কিছু জায়গায় সর্বনাম ব্যবহার করলে ভাষা আরও সাবলীল ও স্বাভাবিক হতে পারত।
বর্তমান সময়ে কিশোরদের জীবনে মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রভাব গভীর। ‘স্বপ্নের মৃত্যুকে হাসিমুখে আলিঙ্গন’ গল্পে লেখক সেই বাস্তবতাকেই সামনে এনেছেন।
গল্পের কিশোর চরিত্রটি এসএসসি পর্যন্ত মোবাইল ফোন ব্যবহার করেনি। পড়াশোনাতেও সে ভালো। কিন্তু কলেজে ওঠার পর হাতে মোবাইল আসে এবং একটি মেয়ের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে তার জীবন ও পড়াশোনায় নেমে আসে অন্ধকার। গল্পটির মধ্য দিয়ে লেখক কিশোরদের হাতে প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার কথা বলতে চেয়েছেন।
বিষয়টি সমকালীন এবং গুরুত্বপূর্ণ। তবে প্রযুক্তি নিজে যে বিপজ্জনক নয়, বরং তার অপব্যবহারই বিপদের কারণ এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি আরও শিল্পিতভাবে গল্পে ফুটিয়ে তুলতে পারলে এর বক্তব্য আরও গভীর হতো।
গ্রন্থের নামগল্প ‘আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি’ ঢাকার একটি নিম্নবিত্ত মহল্লার খণ্ডচিত্র। এখানেই আশিকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। তার জ্যাঠাতো ভাই কিবরিয়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার জন্য গ্রাম থেকে তাদের বাসায় আসে। কিবরিয়ার অমায়িক ব্যবহার, সুন্দর কথাবার্তা এবং পড়াশোনার প্রতি নিষ্ঠা মহল্লার তরুণদের মধ্যে নতুন স্বপ্ন তৈরি করে। তারা বুঝতে শেখে জীবনে বড় হতে হলে পড়াশোনা করতে হবে এবং নিজেদের পরিবর্তনের চেষ্টা করতে হবে।
আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সুযোগ পাওয়ার পরও কিবরিয়া তার শেকড় ভুলে যায় না। মহল্লার মানুষের খোঁজ নেয়, বিপদে-আপদে পাশে থাকে। ফলে চরিত্রটি শুধু শিক্ষার গুরুত্বের প্রতীক হয়ে ওঠে না; হয়ে ওঠে শেকড়ের প্রতি দায়বদ্ধতারও প্রতীক।
গল্পটির ভাবনা প্রশংসনীয়। তবে কিছু অপ্রয়োজনীয় ঘটনা গল্পের মূল গতিকে দীর্ঘ করেছে, কিন্তু সেই অনুপাতে আকর্ষণ বাড়াতে পারেনি। সম্পাদনার মাধ্যমে এসব অংশ সংক্ষিপ্ত করা গেলে গল্পটি আরও শক্তিশালী হতে পারত।
‘দিশেহারা কিশোরী’ গ্রন্থের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গল্প। গ্রাম থেকে শহরে কাজের জন্য আসা এক কিশোরী তথাকথিত ভদ্রসমাজের হাতে নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। একপর্যায়ে যৌন নির্যাতনের ফলে সে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নেয়।
গল্পটি আমাদের সমাজের একটি নির্মম বাস্তবতার দিকে আঙুল তোলে। গৃহকর্মী কিংবা দরিদ্র পরিবারের শিশু-কিশোরদের প্রতি সমাজের একটি অংশের নিষ্ঠুর আচরণ এখানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। লেখক কিশোর পাঠকের সামনে বিষয়টি তুলে ধরে এক ধরনের সামাজিক সচেতনতা তৈরি করতে চেয়েছেন। গল্পটির সামাজিক অভিঘাত তাই অস্বীকার করার উপায় নেই।
‘টার্মিনালের দিতি’ গল্পটিও পাঠযোগ্য। অন্যদিকে ‘শুভ্রা’ গল্পে সুন্দর ব্যবহার দিয়ে কীভাবে মানুষের হৃদয় জয় করা যায়, সেই মানবিক বার্তা তুলে ধরা হয়েছে। সরল ও ইতিবাচক জীবনবোধের কারণে গল্পটি কিশোর পাঠকের কাছে সহজেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে।
গল্পের শেষে নৈতিক শিক্ষা : কতটা প্রয়োজন?
রাশেদের গল্পগুলোর একটি বড় বৈশিষ্ট্য তিনি পাঠককে একটি নির্দিষ্ট নৈতিক শিক্ষা দিতে চান। কিশোর সাহিত্যের ক্ষেত্রে এই উদ্দেশ্য অবশ্যই ইতিবাচক। কিন্তু ছোটগল্পের শিল্পরীতির বিচারে এখানেই কিছু প্রশ্ন তৈরি হয়।
সার্থক ছোটগল্প শেষ হওয়ার পরও শেষ হয় না। গল্পের শেষ বাক্যের পর থেকেই তার অনুরণন শুরু হয় পাঠকের মনে। রবীন্দ্রনাথের বহুল উদ্ধৃত সেই পঙক্তি- ‘শেষ হইয়াও হইল না শেষ’ ছোটগল্পের এই শিল্পসত্যকে মনে করিয়ে দেয়।
রাশেদের গল্পে অনেক সময় গল্প শেষ হওয়ার পর একটি ফিচারধর্মী উপসংহার যুক্ত হয়েছে, যেখানে গল্পের শিক্ষা বা নৈতিক বক্তব্যটি সরাসরি পাঠকের সামনে বলা হয়েছে। এতে লেখকের উদ্দেশ্য স্পষ্ট হলেও গল্পের অন্তর্নিহিত ব্যঞ্জনা কিছুটা কমে যায়।
আধুনিক ছোটগল্প অনেক সময় হঠাৎ শুরু হয় এবং এমন একটি জায়গায় গিয়ে থামে, যেখানে গল্প শেষ হলেও পাঠকের ভাবনা শেষ হয় না। লেখক ঘটনা বলেন, কিন্তু তার ব্যাখ্যার পুরো দায়িত্ব পাঠকের ওপর ছেড়ে দেন। পাঠক নিজের অভিজ্ঞতা ও জীবনবোধ দিয়ে গল্পের অর্থ আবিষ্কার করেন। রাশেদুল ইসলাম রাশেদ ভবিষ্যৎ গল্পে এই শিল্পকৌশলের দিকে আরও মনোযোগী হলে তার গল্প আরও পরিণত ও শক্তিশালী হয়ে উঠতে পারে।
বইটির আরেকটি দিক হলো ভাষা ও সম্পাদনা। কোথাও কোথাও বানানগত ত্রুটি, শব্দচয়নের দুর্বলতা এবং বাক্যগঠনের অসংগতি চোখে পড়ে। একটি সাহিত্যকর্মের ভাবনা যতই ভালো হোক, ভাষার শুদ্ধতা ও সম্পাদনার যত্ন তার শিল্পমানকে অনেকখানি প্রভাবিত করে।
বিশেষ করে নতুন লেখকের ক্ষেত্রে পাণ্ডুলিপি প্রকাশের আগে অভিজ্ঞ সম্পাদক বা পেশাদার প্রুফরিডারের সহায়তা নেওয়া জরুরি। অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দেওয়া, পুনরুক্তি কমানো, বাক্যকে মেদহীন করা এবং ভাষাকে আরও সাবলীল করে তোলার ক্ষেত্রে একজন দক্ষ সম্পাদকের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যৎ সংস্করণে এ বিষয়ে আরও যত্নবান হলে বইটি নিঃসন্দেহে আরও পরিশীলিত হবে।
লেখকের নাম নিয়েও একটি বিষয় বলা যায়। ‘মো. রাশেদুল ইসলাম রাশেদ’ নামটি দীর্ঘ এবং কিছুটা পুনরুক্তিমূলক। সাহিত্যিক পরিচয়ের ক্ষেত্রে সংক্ষিপ্ত ও স্বতন্ত্র নাম পাঠকের মনে সহজে স্থায়ী হতে পারে। তবে এটি সম্পূর্ণ লেখকের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের বিষয়।
সব সীমাবদ্ধতার পরও ‘আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি’কে একজন নতুন গল্পকারের সৃজনশীল যাত্রার গুরুত্বপূর্ণ সূচনা হিসেবে দেখা যায়। প্রথম বইতেই একজন লেখক সম্পূর্ণ পরিণত শিল্পরীতি আয়ত্ত করবেন- এমন প্রত্যাশা বাস্তবসম্মত নয়। বরং প্রথম বইয়ে তার সম্ভাবনা, জীবনকে দেখার চোখ এবং ভবিষ্যৎ যাত্রার দিকনির্দেশ খুঁজে পাওয়া যায়।
রাশেদের গল্পে সমাজের প্রতি দায়বদ্ধতা আছে, কিশোরদের প্রতি মমতা আছে এবং ভালো মানুষ হয়ে ওঠার আহ্বান আছে। তিনি তার চারপাশের পরিচিত মানুষ, ঘটনা ও সমস্যাকে গল্পের উপাদান করেছেন। এটাই তার শক্তি। এখন তার সামনে সবচেয়ে বড় কাজ- গল্পকে শুধু ঘটনা থেকে সাহিত্যে উন্নীত করা; নৈতিক বক্তব্যকে গল্পের ভেতর স্বাভাবিকভাবে মিশিয়ে দেওয়া; পাঠককে সরাসরি শিক্ষা না দিয়ে ভাবার সুযোগ করে দেওয়া; অপ্রয়োজনীয় অংশ বাদ দিয়ে গল্পকে সংহত করা এবং ভাষাকে আরও মেদহীন ও শিল্পিত করে তোলা।
ছোটগল্পের ক্যানভাস ছোট, কিন্তু তার জীবন বিশাল। একটি বাড়ি, একটি মহল্লা, একটি পরিবার, একটি সম্পর্ক কিংবা একটি কিশোরের জীবনের সামান্য ঘটনা থেকেও তৈরি হতে পারে বৃহত্তর মানবজীবনের প্রতিচ্ছবি। রাশেদুল ইসলাম রাশেদের ‘আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি’ সেই বৃহত্তর জীবনের দিকে তাকানোর একটি প্রাথমিক প্রয়াস।
সব শেষে বলা যায়, ‘আমতলার একশ পাঁচ নম্বর বাড়ি’ শুধু একটি কিশোর গল্পগ্রন্থ নয়; এটি একজন নতুন গল্পকারের জীবন ও সমাজকে গল্পের ভাষায় দেখার প্রথম দিকের একটি দলিল। বইটির কিছু গল্প পাঠককে ভাবায়, কিছু গল্প সতর্ক করে, কিছু গল্প মানবিক হতে শেখায়। আবার কোথাও কোথাও গল্পের শিল্পরীতি, ভাষা ও সম্পাদনায় আরও পরিণত হওয়ার প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একজন নতুন লেখকের সবচেয়ে বড় সম্পদ তার সম্ভাবনা। রাশেদুল ইসলাম রাশেদের সেই সম্ভাবনা রয়েছে। প্রয়োজন নিরন্তর পাঠ, অনুশীলন, আত্মসমালোচনা এবং গল্পের নিজস্ব শিল্পভাষা খুঁজে নেওয়া।
কারণ সার্থক গল্প শেষ হয়ে যাওয়ার পরও পাঠকের মনে বেঁচে থাকে। শেষ বাক্যের পর শুরু হয় তার আরেক জীবন- পাঠকের কল্পনায়, অনুভবে এবং চিন্তার ভেতর। রাশেদুল ইসলাম রাশেদের আগামী গল্পগুলো সেই অনুরণ আরও গভীরভাবে তৈরি করবে- এই প্রত্যাশাই রইল।
আলোচনায় : সুমন রায়হান।