তীব্র জ্বালানি সংকটে বিপর্যস্ত অর্থনীতি


২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৯

ফ্যাসিস্ট সরকারের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাটের ঘানি টানছে মানুষ
দুই দশকেও হয়নি কোনো গ্যাস অনুসন্ধান
বর্তমানেও নেই দূরদর্শী কোনো পরিকল্পনা

॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
দেশজুড়ে তীব্র জ্বালানি সংকটে শিল্প কলকরখানাসহ সমগ্র অর্থনীতি সংকটে। দফায় দফায় লোডশেডিং আর গ্যাসের জন্য হাহাকারের প্রভাব পড়ছে শিল্প উৎপাদন, পরিবহন, কৃষিসহ ব্যবসা-বাণিজ্যে। পরিস্থিতির দ্রুত উত্তরণ না হলে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি তিন দশমিক পাঁচ শতাংশে নেমে আসতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ফ্যাসিস্ট হাসিনার ভ্রান্ত নীতিতে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট আর বর্তমান দূরদর্শী পরিকল্পনাহীনতার খেসারত দেয়া শুরু করেছে সাধারণ মানুষ।
তীব্র জ্বালানি ঘাটতি : জ্বালানি বিভাগ ও পেট্রোবাংলা সূত্র জানিয়েছে, বর্তমানে দেশে গ্যাসের চাহিদা দিনে ৩৮০ কোটি ঘনফুটের কিছু বেশি। দেশীয় উৎপাদন ও আমদানি মিলিয়ে ২৬৫ কোটি ঘনফুটের বেশি সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে প্রতিদিন ১১৫ কোটি ঘনফুট ঘাটতি থাকছে। এত কম সরবরাহ গত ১৬ বছরের মধ্যে নজিরবিহীন বলেও জানানো হয়েছে। বাসাবাড়ি, শিল্প ও কলকারখানা এবং পরিবহনে গ্যাস-সংকট লেগেই আছে। একইভাবে দেশের মোট ইনস্টলড বা স্থাপিত বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় ৩২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি। যার বিপরতীতে গরম ও বিভিন্ন সময়ে পিক আওয়ারে বিদ্যুতের চাহিদা রয়েছে ১৬ হাজার থেকে ১৮ হাজার মেগাওয়াট। এর মাঝে জ্বালানি স্বল্পতার কারণে বাস্তব সরবরাহ সাধারণত ১২ হাজার ৯০০ থেকে সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াটের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ না থাকায় দৈনিক ঘাটতি কোথাও কোথাও ২ হাজার থেকে ৩ হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
২০ বছরেও কোনো গ্যাসক্ষেত্রের অনুসন্ধান হয়নি : ফ্যাসিস্ট আমলের বিগত দুই দশকে দেশে নতুন গ্যাসক্ষেত্র নিয়ে সমীক্ষা বা অনুসন্ধান কোনোটাই হয়নি। পরিকল্পনা আর নথি তৈরিতেই চলে গেছে দীর্ঘ এ সময়। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) শক্তি ও সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগও নেয়া হয়নি ওই সময়ের মধ্যে। আওয়ামী লীগ সরকারের পক্ষ থেকে সারা দেশে ১০০ কূপ খননের পরিকল্পনার কথা বলা হলেও বাস্তবে তা করা হয়নি। বিপুল চাহিদা থাকা সত্ত্বেও গ্যাসের উৎপাদন বৃদ্ধি না পাওয়ায় ধীরে ধীরে আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ছে জ্বালানি খাত। উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করেও ২০১৯ সাল থেকে আবাসিক, সিএনজি ও বাণিজ্যিক স্থাপনায় নতুন গ্যাস সংযোগ বন্ধ রাখা হয়েছে। ফলে দেশে নতুন করে তেমন আর কোনো শিল্পকারখানা গড়ে ওঠেনি। একই কারণে বিদেশি বিনিয়োগেও স্থবিরতা দেখা দেয়। নতুন কর্মসংস্থান তৈরির পথও বন্ধ হয়ে গেছে।
শিল্পকলকারখানা আর কৃষি ব্যবসা-বাণিজ্যে চরম স্থবিরতা
তীব্র জ্বালানি সংকটের সরাসরি প্রভাব পড়ছে দেশের শিল্প উৎপাদনে। বিশেষ করে জ্বালানিনির্ভর শিল্পগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। গ্যাসের ঘাটতির কারণে অনেক পোশাকশিল্প এবং সহযোগী ডায়িং, ওয়াশিং কারখানায় উৎপাদন কার্যক্রম স্বাভাবিকভাবে চালানো যাচ্ছে না। কিছু ক্ষেত্রে উৎপাদন ক্ষমতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে গেছে। এর মাঝে জ্বালানি ব্যয় বাড়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে সিমেন্ট ও ইস্পাতশিল্পেও। সিমেন্টের প্রতি ব্যাগের দাম ইতোমধ্যে ২৫ থেকে ৩০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এছাড়া ফার্মাসিউটিক্যালস খাতেও প্রভাব পড়েছে। উৎপাদনের কাঁচামাল ও প্যাকেজিং খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে প্যাকেজিং উপকরণের দাম ৭০০ ডলার থেকে বেড়ে ১৮০০ ডলার পর্যন্ত হয়েছে। জ্বালানি সংকট শুধু শিল্পেই নয়, কৃষি ও সাধারণ মানুষের জীবনেও বড় প্রভাব ফেলছে। সেচে ব্যবহৃত ডিজেলের দাম বাড়ায় কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
সার আমদানির খরচ বেড়েছে প্রায় ৯০ শতাংশ। ইতোমধ্যে ইউরিয়াসহ বিভিন্ন সারের বস্তা প্রতি দাম বৃদ্ধি পেয়েছে। গ্রামীণ এলাকায় প্রতিদিন ৮ থেকে ১৪ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করা হচ্ছে। আর শহরের নিম্নআয়ের পরিবারগুলো তাদের আয়ের প্রায় ২২ শতাংশ জ্বালানি ব্যয়ে বেশি খরচ করছে।
লোকসানের চাপে বন্ধ ৪০ শতাংশ কারখানা
তীব্র লোডশেডিং এবং গ্যাস সংকটে বড় শিল্পের পাশাপাশি ক্ষুদ্র ও মাঝারিশিল্পের অবস্থা আরো ভয়াবহ। অনেক কারখানা মালিক বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এর মাঝে তাঁতের জন্য বিখ্যাত সিরাজগঞ্জ জেলার পাঁচ লাখ তাঁত কারখানার মধ্যে বিদ্যুৎ সংকটে প্রায় ৪০ শতাংশ বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানায় বাংলাদেশ পাওয়ারলুম অ্যান্ড হ্যান্ডলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন। সংগঠনটি বলছে, সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর, উল্লাপাড়া, কামারখন্দ, বেলকুচি, এনায়েতপুর, রায়গঞ্জ, চৌহালী ও কাজীপুরে কারখানাগুলোয় পাঁচ লাখের বেশি তাঁত রয়েছে। এর সঙ্গে প্রায় পাঁচ লাখ তাঁতি পরিবার সরাসরি জড়িত। এ জেলায় বছরে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার তাঁতপণ্য উৎপাদন হয়। উৎপাদন হয় প্রায় ৭০ কোটি মিটার কাপড়। কিন্তু বর্তমানে লোডশেডিং, রং ও সুতার মূল্যবৃদ্ধির কারণে জেলার তাঁত কারখানাগুলোয় উৎপাদনে ধস নেমেছে। চাহিদামতো বিদ্যুৎ ও শ্রমিক না থাকায় অধিকাংশ তাঁত কারখানা বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বেকার হয়ে পড়ছেন শ্রমিকরা। অনেকে পেশা বদলাচ্ছেন।
তাঁত মালিকরা জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে আগে যেখানে ১০ জন শ্রমিক কাজ করতেন, এখন সেখানে মাত্র দুই তিনজন কাজ করছেন। সব মিলিয়ে উৎপাদন খরচও আগের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অনেকে বাধ্য হয়ে কারখানা বন্ধ রেখেছেন। সিরাজগঞ্জ তাঁত মালিক সমিতির সভাপতি ও বাংলাদেশ হ্যান্ডলুম অ্যান্ড পাওয়ারলুম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী বদিউজ্জামান বলেন, টিকতে না পেরে অনেক তাঁতি তাদের তাঁত বন্ধ করে দিতে বাধ্য হচ্ছেন।
সিরাজগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির পরিচালক হাজী আব্দুস সাত্তার বলেন, জেলার তাঁতশিল্প জাতীয় অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু তারা সেভাবে সুবিধা পাচ্ছেন না। তাই দেশীয় তাঁতশিল্প রক্ষায় সরকারকে তাঁতিদের ঋণ দেয়াসহ রং ও সুতায় ভর্তুকি দিতে হবে।
এ বিষয়ে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, জ্বালানি এমন একটি পণ্য ও সেবা, যা ছাড়া অর্থনীতি অচল হয়ে পড়ে। জ্বালানি ছাড়া শিল্পকারখানা, অফিস-আদালত; এমনকি মানুষের ঘরবাড়িও স্বাভাবিকভাবে চলতে পারে না। আমরা এমন একটি পরিস্থিতিতে পৌঁছেছি, যার পেছনে অনেক কারণ রয়েছে। তবে বাস্তবতা হলো, আমরা এখন এই সংকটের মধ্যেই রয়েছি। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের অভিঘাত বহুমাত্রিক উল্লেখ করে তিনি বলেন, আগে আমরা মধ্যমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি পরিকল্পনার কথা বলতাম। কিন্তু এখন তাৎক্ষণিকভাবে কী করতে হবে, সেটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ফাহমিদা খাতুন বলেন, বর্তমান সরকারের রাজনৈতিক ইশতেহারে অর্থনৈতিক অগ্রগতির জন্য বিভিন্ন পথরেখা তুলে ধরা হয়েছে। এর মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি গড়ে তোলা, বিনিয়োগ বাড়ানো ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্য রয়েছে। কিন্তু জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে এসব লক্ষ্য অর্জন করা একেবারেই অবাস্তব হয়ে পড়বে।
সংকট মোকাবিলায় চাই বিভিন্ন মেয়াদি পরিকল্পনা
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংকট থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের এখনই দ্বিমুখী পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। স্বল্পমেয়াদি বা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা হিসেবে জ্বালানি আমদানির উৎসগুলো বহুমুখী করতে হবে। কেবল একটি বা দুটি উৎসের ওপর নির্ভর না করে সরবরাহ নিশ্চিত করার বিকল্প পথ খুঁজে বের করতে হবে, যাতে সরবরাহ চেইন বিচ্ছিন্ন না হয়।
ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বিশিস্ট অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে. মুজেরী বলেন, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানির দিকে অগ্রসর হওয়া এখন সময়ের দাবি। নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধানে ব্যাপক বিনিয়োগ ও আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। মাঝারি ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনাগুলো বাস্তবায়নের কাজ এখনই শুরু করতে হবে। কারণ এর সুফল পেতে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হতে পারে।
তিনি বলেন, সরকার তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানির মাধ্যমে চলমান জ্বালানি সংকটের সমাধান করতে চাইছে। কিন্তু এলএনজি আমদানির মাধ্যমে এই সংকট স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয় বলে মন্তব্য করেছেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, এলএনজি এনে সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করা হলে ভবিষ্যতে গ্যাসের দাম সরকার আবারও বৃদ্ধি করতে বাধ্য হবে। গ্যাসভিত্তিক ব্যবস্থার ওপর দীর্ঘ মেয়াদে ভরসা না করে বিদ্যুতায়নের দিকে যেতে হবে।
যদি কারখানায় স্থিতিশীল বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা যায়, তবে বিকল্প প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সামগ্রিক উৎপাদন খরচে প্রায় ৪ শতাংশ পর্যন্ত সাশ্রয় করা সম্ভব বলে জানান খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। এভাবে ১০ থেকে ১৭ শতাংশ পর্যন্ত জ্বালানি সাশ্রয় করা সম্ভব বলেও জানান তিনি।
কুইক রেন্টালের নামে আওয়ামী লীগের শত শত কোটি টাকা লোপাট
ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা বিদ্যুৎ সংকটকে পুঁজি করে ১৫ বছরে বিদ্যুৎ খাতে ব্যয় করেছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এ সময়ে শুধু রেন্টাল-কুইক রেন্টালের আড়ালে অস্বাভাবিক দরে বিদ্যুৎ কেনার নামেই লুটপাট আর পাচার করেছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি পেমেন্টই (কেন্দ্র ভাড়া) দেওয়া হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা। আর সবচেয়ে মজার ব্যাপার হচ্ছে এসব কেন্দ্রের বেশিরভাগই উৎপাদন না করেই এসব টাকার ভাগ-বাঁটোয়ারা পেয়েছে আওয়ামী লীগ নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা। ২০০৮ সালে বিদ্যুৎ খাতে ৯০০ কোটি টাকা ভর্তুকি থাকলেও তা পরে কেন্দ্র ভাড়ার নামে তথা ক্যাপাসিটি চার্জের নামে বেড়ে দাঁড়ায় ৪০ হাজার কোটি টাকা। কারণ ভর্তুকির ৮৫ শতাংশই গেছে কেন্দ্র ভাড়ায়। ভর্তুকি কমাতে দফায় দফায় বাড়ানো হয়েছে বিদ্যুতের দাম। যার ঘানি মানুষ এখনো টানছে প্রিপ্রেইড মিটারসহ নানা যন্ত্রণার মাধ্যমে।
গত ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার সম্পূর্ণ বিনা দরপত্রে ৩২টি কুইক রেন্টাল কেন্দ্র নির্মাণের অনুমতি দেয়। আর দরপত্র এড়াতে ২০১০ সালে জাতীয় সংসদে দুই বছরের জন্য পাস করা জরুরি বিশেষ আইন পাস করে। এই আইনের অধীনেই পর্যায়ক্রমে মোট ৮২টি রেন্টাল ও ইনডিপেনডেন্ট পাওয়ার প্রডিউসার (আইপিপি) কেন্দ্রের অনুমতি দেওয়া হয়। এই আইনে করা কোনো বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্পের বিরুদ্ধে প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবে না, যাওয়া যাবে না দেশের কোনো আদালতে তাদের লুটপাটের বিচার চাইতে। পরে আইনটির মেয়াদ কয়েক দফা বাড়িয়ে সর্বশেষ ২০২৬ সাল পর্যন্ত করা হয়েছিল। এই আইনটির বলেই ভিত্তি করেই আওয়ামী লীগ লুটপাটের এই মহাযজ্ঞ শুরু করে। পিডিবির বার্ষিক প্রতিবেদন সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮-০৯ অর্থবছর থেকে ২০১৭-১৮ অর্থবছর পর্যন্ত ১০ বছরে আইপিপি ও রেন্টাল কেন্দ্রগুলোকে ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় প্রায় সাড়ে ৪৩ হাজার কোটি টাকা। এর পরের পাঁচ বছরে, অর্থাৎ ২০১৮-১৯ থেকে ২০২২-২৩ অর্থবছর পর্যন্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দেওয়া হয় প্রায় ৬৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। আর গত ১৩ বছরে বিনা দরপত্রে বিদ্যুৎকেন্দ্র পাওয়ার শীর্ষে ছিল সামিট গ্রুপ। এই গ্রুপ গোপালগঞ্জ-১ আসনের আওয়ামী লীগের টানা ছয়বারের এমপি ও সাবেক বিমানমন্ত্রী ফারুক খানদের। সামিটের সাতটি বিদ্যুৎকেন্দ্র ভাড়া পেয়েছে ১ হাজার ৯৫৭ কোটি টাকা। দ্বিতীয় স্থানে রয়েছে ইউনাইটেড গ্রুপের পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, এগুলো পেয়েছে ১ হাজার ৬৮২ কোটি টাকা। আর কনফিডেন্স গ্রুপ বিনা দরপত্রে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্র পেয়েছে। কেন্দ্র ভাড়া পাওয়ার দিক থেকে এই গ্রুপটি তৃতীয় স্থানে রয়েছে, তাদের ছয়টি কেন্দ্র ভাড়া পেয়েছে ৯৬২ কোটি টাকা। কেন্দ্র ভাড়া পাওয়ায় পঞ্চম স্থানে রয়েছে বাংলাক্যাটের চার বিদ্যুৎকেন্দ্র, ৮৮৩ কোটি টাকা। আরেক আওয়ামী লীগ নেতা নুরে আলম সিদ্দিকীর ডরিন গ্রুপ ছয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের মাধ্যমে পায় ৬৫১ কোটি টাকা।
সূত্র মতে, প্রয়োজন ছাড়াই বার বার বেড়েছে এসব কেন্দ্রের মেয়াদ। সর্বশেষ ২০২৪ সালেও পাঁচটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ বাড়ানো হয়, যেগুলোর সম্মিলিত ক্ষমতা ৬০০ মেগাওয়াটের কিছু বেশি। এই কেন্দ্রগুলো তিন বছরের মেয়াদে এসেছিল। ওই সময়ের মধ্যে কেন্দ্রগুলোর মালিক লাভসহ বিনিয়োগও তুলে নিয়েছেন। এরপরও লুটপাটের ভাগবাঁটোয়ারার অংশ হিসেবে দফায় দফায় কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ মেয়াদ বাড়ানোর কারণে এসব কেন্দ্রের জন্য বছরে গুনতে হয়েছে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা।
কুইক রেন্টাল এবং ক্যাপাসিটি চার্জ বন্ধ ঘোষণা
বর্তমানে কোনো কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু বা কার্যকর নেই। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী এসব চুক্তির পুরোপুরি অবসান ঘটানো হয়েছে এবং বন্ধ থাকা এসব প্লান্টের বিপরীতে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ বা অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করা হচ্ছে না। এ বছর জুলাই মাসে জাতীয় সংসদে দেওয়া এক প্রশ্নের লিখিত জবাবে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় এই তথ্য নিশ্চিত করেছে। জ্বালানি মন্ত্রী জানান, দেশের সব কুইক রেন্টাল ও ভাড়ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয়েছে বা বাতিল করা হয়েছে। প্লান্টগুলো বন্ধ থাকায় সরকারের পক্ষ থেকে আর কোনো অলস বসিয়ে রাখা খরচের (ক্যাপাসিটি চার্জ) দায় থাকছে না। জ্বালানিমন্ত্রী জানান, শাহজিবাজার পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেডের ৮৬ মেগাওয়াট এবং আশুগঞ্জের প্রিসিশন এনার্জি লিমিটেডের ৫৫ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর ‘নো ইলেকট্রিসিটি, নো পেমেন্ট’ ভিত্তিতে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে এবং কেন্দ্র দুটি বর্তমানে চালু রয়েছে। ক্যাপাসিটি চার্জ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বর্তমানে দেশে কোনো কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু না থাকায় এসব কেন্দ্রের বিপরীতে কোনো ক্যাপাসিটি চার্জ পরিশোধ করা হচ্ছে না। বর্তমানে কোনো কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সরকারের বিদ্যমান কোনো চুক্তিও নেই বলে জানান জ্বালানিমন্ত্রী।
তবে জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা জানান, এ সেক্টরে আওয়ামী লীগের লুটপাটের খেসারত দেশের জনগণকে আরো বহু বছর দিতে হবে এবং হচ্ছে।