সরকারের ৬ মাস

প্রতিশ্রুতির সঙ্গে প্রাপ্তির বিস্তর ফারাক


২০ আগস্ট ২০২৬ ১০:০৬

॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকার যাত্রা শুরু করে। প্রায় দুই দশক পর বিএনপির ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তনের এই সরকার দায়িত্ব নেয় একদিকে বিপুল রাজনৈতিক প্রত্যাশা; অন্যদিকে দুর্বল অর্থনীতি, উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের সংকট, প্রশাসনিক অনিশ্চয়তা ও আইনশৃঙ্খলার চাপ নিয়ে। ছয় মাস পূর্ণ হওয়ায় সরকারের কার্যক্রমকে নানাভাবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে। এই ছয় মাসে সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন- বাজারে স্বস্তি ফিরল কি, আয় বাড়ল কি, নিরাপত্তা নিশ্চিত হলো কি এবং রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো সত্যিই বদলাচ্ছে? মানুষের এসব প্রশ্নের সঠিক উত্তর ‘হ্যাঁ’ বলা যাচ্ছে না। অন্যদিকে সরকারের দাবি, দ্রুত কিছু জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে। প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস, বিনিয়োগবান্ধব উদ্যোগ এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ঘোষণাও রয়েছে সরকারের পক্ষ থেকে। বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী গুরুত্বপূর্ণ আট খাতে সরকারকে ব্যর্থ বলে দাবি করেছে।
রাজনৈতিক দলগুলোর চোখে ছয় মাসের সরকার
সরকারের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চাপ আসছে সংস্কার বাস্তবায়নের গতি, জুলাই সনদ এবং রাজনৈতিক অন্তর্ভুক্তি নিয়ে। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেন, সংসদে বিরোধীদলের সুযোগ সীমিত হওয়ায় রাজপথে আন্দোলনের প্রয়োজন হচ্ছে। তিনি জুলাই সনদের বাস্তবায়ন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন এবং সংশ্লিষ্ট বিচার প্রক্রিয়ার গতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেছেন। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতা নাসীরুদ্দীন পাটোয়ারী সরাসরি বলেছেন, ছয় মাসে তারেক রহমান সরকার পরিচালনায় ব্যর্থ হয়েছেন। অর্থাৎ বিরোধীদের প্রধান অভিযোগ হচ্ছেÑ সরকার নির্বাচনী ম্যান্ডেট পেয়েছে, কিন্তু জুলাই-পরবর্তী রাষ্ট্র সংস্কারের ম্যান্ডেট বাস্তবায়ন করছে না।
সরকারের রাজনৈতিক আচরণ
সরকার একদিকে বিরোধীদের সঙ্গে সংসদে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, সংবিধান সংশোধনসহ জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সরকার ও বিরোধী দল একসঙ্গে কাজ করতে পারে। অন্যদিকে সরকারি দলের ক্যাডারা বিরোধীদলের নেতাকর্মীও ওপর হামলা করছে, চোখ তুলে নিচ্ছে, এমটি সংসদ সদস্যের ওপরও হামলা করছে। এখানেই সরকারের রাজনৈতিক আচরণের দ্বৈত চিত্র দেখা যায়। একদিকে সংসদীয় সহযোগিতার আহ্বান; অন্যদিকে রাজনৈতিক শক্তিকে ঘিরে কঠোর অবস্থান।
বিশ্লেষকদের মূল্যায়ন
সুশাসন নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠন সুজনের মূল্যায়ন হচ্ছে, সরকারের প্রথম কয়েক মাসের বড় সাফল্য হলো নির্বাচনী অঙ্গীকার দ্রুত বাস্তবায়নের উদ্যোগ; কিন্তু জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক ও দার্শনিক আকাক্সক্ষা বোঝার ক্ষেত্রে সরকারের ঘাটতি রয়েছে। স্বাধীন নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, সংসদীয় জবাবদিহি, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, প্রশাসনের নিরপেক্ষতা ও বিরোধীদলের কার্যকর অধিকার সরকার নিশ্চিত করেন।
প্রশাসনে গতি কি ফিরেছে?
প্রশাসনকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত, দক্ষ এবং জনগণমুখী করার প্রতিশ্রুতি সরকারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গীকার। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই কর্মকর্তাদের পছন্দের পোস্টিংয়ের জন্য তদবির না করার আহ্বান এবং প্রশাসনিক নিরপেক্ষতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রশাসনের বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে পরিবর্তন হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পরপরই বিভিন্ন পদে বদলি ও পদায়ন ঘিরে তদবিরের অভিযোগ সামনে এসেছে। নতুন ইউএনও, বিভাগীয় কমিশনারসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক পদে নিয়োগ ও বদলি অব্যাহত থাকায় প্রশাসনের ওপর রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত প্রভাবের পুরোনো সংস্কৃতি দৃশ্যমান হয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসনের প্রশ্নটি আরও জটিল হয়েছে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ, ওএসডি এবং বাধ্যতামূলক অবসর নিয়ে বিতর্কের কারণে। একটি পেশাদার প্রশাসনের জন্য শুধু কর্মকর্তাদের কাজের গতি বাড়ানো যথেষ্ট নয়; সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক নিরাপত্তা, পেশাগত স্বাধীনতা এবং নিরপেক্ষতাও নিশ্চিত করতে হয়। কিন্তু প্রশাসনে এখনো তা নিশ্চিত হয়নি।
শিক্ষা খাতে পরিবর্তন কোথায়?
শিক্ষা খাতে সরকারের অন্যতম বড় প্রতিশ্রুতি হলো জাতীয় উন্নয়নের সঙ্গে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত করা এবং শিক্ষা ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। আগামী পাঁচ বছরে শিক্ষা খাতে ব্যয় জিডিপির ৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্য এবং ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা ব্যয় ২ শতাংশে উন্নীত করার ঘোষণা এই অগ্রাধিকারেরই প্রতিফলন। কিন্তু শিক্ষকদের বদলি ব্যবস্থায় আগের মতোই অনিয়ম ও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের ভূমিকা রয়েছে গেছে। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, শিক্ষকরা কতটা প্রশিক্ষিত, বিদ্যালয়ের পরিবেশ কেমন, পরীক্ষাব্যবস্থা কতটা কার্যকর এবং শিক্ষা শেষে শিক্ষার্থীরা বাস্তব জীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত এসব নিয়ে সরকারের নতুন উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। পাঠ্যক্রমে মূল্যবোধ, মানবিকতা ও দক্ষতাভিত্তিক শিক্ষার ওপর জোর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন শিক্ষাবিদরা।
আইনশৃঙ্খলা ও জননিরাপত্তা
আইনশৃঙ্খলা সরকারের প্রথম ছয় মাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার। সরকারের ১৮০ দিনের কর্মপরিকল্পনায় জননিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলাকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি, মাদক, অপরাধ ও উগ্রবাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি পুলিশ বাহিনীকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে পুলিশ সদস্যের সংখ্যা বাড়ালেই জননিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। আইন প্রয়োগের মান, তদন্তের নিরপেক্ষতা, থানায় নাগরিকের অভিজ্ঞতা এবং বিচার প্রক্রিয়ার ওপর মানুষের আস্থা এখনো ফেরেনি। এখনো প্রতিদিনই প্রকাশ্যে খুন হচ্ছে মানুষ। ক্ষমতাসীনরা দুর্বলের ওপর চড়াও হচ্ছে, দলীয় কোন্দলেও অনেকে প্রাণ হারাচ্ছেন।
দুর্নীতি চলছেই
সরকার প্রশাসনকে ‘জনগণের সেবক ও বন্ধু’ হিসেবে গড়ে তোলার বার্তা দিয়েছে। দ্রুত, স্বচ্ছ ও হয়রানিমুক্ত সরকারি সেবা দেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে। কিন্তু নাগরিকের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা, জমি, পাসপোর্ট, পুলিশ, স্থানীয় সরকার, হাসপাতাল, শিক্ষা অফিস, এসব জায়গায় সেবা গ্রহণে নতুন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনো ঘুষ দেওয়া লাগছে। দুর্নীতি এখনো চলছে।
সরকার ব্যয়সংকোচন করেছে, নতুন গাড়ি, ভবন, বিদেশ ভ্রমণসহ বিভিন্ন সরকারি ব্যয়ে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করেছে। কিন্তু একই সময়ে মূল্যস্ফীতি, বিদ্যুৎ-গ্যাস সংকট এবং উচ্চ সুদের চাপ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়কে এখনো চাপে রেখেছে। আগস্টেও প্রধানমন্ত্রী নিজেই গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। দুঃখ প্রকাশ করেছেন।
ছয় মাস পর মানুষের প্রত্যাশা এখন আর শুধু পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিতে সীমাবদ্ধ নেই। মানুষ এখন পরিবর্তনের ফলাফল দেখতে চায়। সরকারের সামনে তাই প্রত্যাশার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে দৈনন্দিন জীবনের স্বস্তি, নিরাপত্তা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে সংস্কার ও তার কার্যকারিতা। সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা বাজারে স্থায়ী স্বস্তি। মানুষ চায় মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ফল সরাসরি বাজারে দেখতে। শুধু নীতিগত ঘোষণা নয়, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম, পরিবহন ব্যয় এবং পরিবারের সামগ্রিক জীবনযাত্রার ব্যয়ে স্বস্তি ফিরতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আয় ও কর্মসংস্থানের প্রশ্ন। বিশেষ করে তরুণদের জন্য নতুন ও টেকসই কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সরকারের অন্যতম বড় প্রত্যাশা। জননিরাপত্তাও মানুষের অগ্রাধিকারের শীর্ষে। চাঁদাবাজি, ছিনতাই, মাদক ও রাজনৈতিক সহিংসতা থেকে মুক্ত একটি নিরাপদ পরিবেশ মানুষ চায়। সরকারি সেবার ক্ষেত্রেও মানুষ হয়রানিমুক্ত অভিজ্ঞতা চায়। ভূমি অফিস, থানা, হাসপাতাল, পাসপোর্ট অফিস কিংবা স্থানীয় প্রশাসন যে প্রতিষ্ঠানেই নাগরিক সেবা নিতে যাওয়া হোক, সেখানে দ্রুততা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা এখন বড় দাবি। ব্যাংকিং খাতেও মানুষ বড় পরিবর্তন আশা করছে। খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক প্রভাবিত ঋণ এবং আর্থিক অনিয়মের সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ব্যাংকিং ব্যবস্থা গড়ে তোলা। রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অবসান এবং আইনের সমান প্রয়োগও গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যাশা। মানুষ দেখতে চায়, ক্ষমতার সঙ্গে সম্পর্কের ভিত্তিতে নয়, একই আইনি মানদণ্ডে সবার বিচার হবে। জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নও এখন জনআকাক্সক্ষার অংশ। মানুষ সংস্কারের আলোচনা শুধু রাজনৈতিক বক্তব্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তব প্রতিষ্ঠান ও আইনকাঠামোয় এর প্রতিফলন দেখতে চায়।
সরকারের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা
সরকার একাধিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনা, লক্ষ্য ও সংস্কারের উদ্যোগ ঘোষণা করেছে। কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি সূচকে এখনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। এর মধ্যে সবচেয়ে স্পষ্ট সমস্যা দ্রব্যমূল্য। মূল্যস্ফীতি এখনো প্রায় ৯ শতাংশের আশপাশে থাকায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমেনি। তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও শিল্প সম্প্রসারণের লক্ষ্য থাকলেও বড় আকারে নতুন চাকরির সুযোগ এখনো দৃশ্যমান ফলাফলে পরিণত হয়নি। ব্যাংকিং খাত সরকারের সবচেয়ে কঠিন সংস্কার-চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। দীর্ঘদিনের অনিয়ম, খেলাপি ঋণ ও দুর্বল তদারকির সমস্যা স্বীকার করা হলেও সংকটের গভীরে গিয়ে সমাধানের কঠিন পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি।