বেতন বাড়ছে সরকারি চাকরিজীবীদের

কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী ও শ্রমিকদের নিয়ে পরিকল্পনা কী


২০ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৫

স্টাফ রিপোর্টার : দেশের সরকারি চাকরিজীবীদের নবম জাতীয় পে-স্কেল চূড়ান্ত। কখন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, তার ঘোষণা যেকোনো সময়। নতুন এ পে-স্কেল ১ম থেকে ২০তম গ্রেডের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে এবং তা ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ৮৯ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা এবং পেনশন ও গ্র্যাচুইটিসহ মোট ১ লাখ ৪১ হাজার ৪৩৪ কোটি টাকা বরাদ্দও রাখা হয়েছে। কিন্তু এই সরকারি কর্মচারী ছাড়া বাকি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের প্রশ্নÑ রাষ্ট্র যদি আমার কাছ থেকেও কর নেয়, আমার শ্রমও যদি দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখে, তাহলে আমার সুরক্ষায় রাষ্ট্র কোথায়? রাষ্ট্র কী কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নাকি রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিকের জন্য? আর একটি ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের আসল বা প্রকৃত দায়িত্ব হচ্ছে, যে মানুষটি সবচেয়ে কম সুরক্ষিত, তার জন্য তার পাশে দাঁড়াবে রাষ্ট্র।’ কিন্তু সেই চিন্তা রাষ্ট্র পরিচালনাকারীদের আছে বলে মনে করেন না। দেশের এখন যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, সেখানে চাকরির কোনো নিশ্চিয়তা নেই। ঝুঁকি নিয়ে কর্মরত লাখকোটি সাধারণ মানুষ। যাদের ঘাম ঝরানো ট্যাক্সের টাকায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন হচ্ছে, সরকার তাদের নিয়ে ভাবে না, ভাবে সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে।
সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো একেবারে অযৌক্তিক নয়। দীর্ঘসময় ধরে মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির কারণে তাদের বেতন পুনর্নির্ধারণের প্রয়োজনীয়তা তৈরি হয়েছে। কিন্তু একইসঙ্গে দেশের কোটি কোটি বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র প্রতিষ্ঠানের কর্মী ও অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের জন্য রাষ্ট্রের পরিকল্পনা থাকতে হবে, কিন্তু দৃশ্যমান এখন কিছুই নেই।
মূল্যস্ফীতি কি শুধু সরকারি কর্মচারীর জন্য কমবে?
বাংলাদেশে মূল্যস্ফীতি এখনো মানুষের জীবনযাত্রার অন্যতম বড় সংকট। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, জুলাই ২০২৬-এ পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৩২ শতাংশ; জুনে যা ছিল ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমে যায়নি, বরং আগের উচ্চমূল্যের ওপরই নতুন দাম যুক্ত হচ্ছে। আর জুলাইতে দেখানো ৮ দশমিক ৩২ মূল্যস্ফীতি নিয়ে নানা সমালোচনা রয়েছে। অনেকেই বলছেন, এই তথ্য বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়। সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে তার আয় বাড়বে। কিন্তু একই বাজারে যে বেসরকারি চাকরিজীবীর বেতন বাড়ছে না, তার জন্য চাল, ডাল, মাছ, গোশত, বাসাভাড়া, চিকিৎসা, শিক্ষা, পরিবহন, কোনোটির দাম কমবে না। বরং সরকারি বেতন বৃদ্ধি যদি অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাহিদা তৈরি করে এবং উৎপাদন ও সরবরাহ সেই হারে না বাড়ে, তাহলে মূল্যস্ফীতির ওপর নতুন চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকতে পারে। শুধু সরকারি বেতন বাড়লেই মূল্যস্ফীতি কত শতাংশে পৌঁছাবে- এমন নির্দিষ্ট তথ্য সরকারের কাছেও নেই। মূল্যস্ফীতি নির্ভর করে মুদ্রা সরবরাহ, সরকারি ব্যয়, উৎপাদন, আমদানি ব্যয়, জ্বালানি ও খাদ্যের দাম, বিনিময় হার, সুদের হার এবং বাজার ব্যবস্থাপনাসহ বহু বিষয়ের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকও সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে দেখিয়েছে যে মূল্যস্ফীতির চাপ অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে বিস্তৃত এবং প্রকৃত মজুরি মূল্যস্ফীতির তুলনায় পিছিয়ে থাকায় মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। অর্থাৎ কেবল সরকারি কর্মচারীর বেতন কম কি না তা নয়, সমস্যা হলো দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের আয় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে কি না?
সরকার কি শুধু সরকারি কর্মচারীদের জন্য?
রাষ্ট্রের দায়িত্ব শুধু সরকারি কর্মচারীদের ভালো রাখা নয়। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা রাষ্ট্রের অংশ বাকিরা কি মূল্যহীন? রাষ্ট্র সরকারি কর্মচারীদের জন্য যে নীতি তৈরি করবে, সেই নীতির প্রভাব যখন গোটা অর্থনীতিতে পড়ে, তখন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীকেও বিবেচনায় নিতে হয়। পে-স্কেল ঘোষণার আগে সরকারের কাছে সাধারণ মানুষের বেশকিছু প্রশ্ন রয়েছে তা হচ্ছে- শ্রমজীবী মানুষের প্রকৃত আয় কি বাড়ল? বেসরকারি কর্মীদের ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হচ্ছে কি না? ন্যূনতম মজুরি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না? মূল্যস্ফীতির সঙ্গে বেতন সমন্বয়ের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা আছে কি না? কেউ চাকরি হারালে ওই কর্মীর সামাজিক সুরক্ষা সরকার নিচ্ছে কি না? ক্ষুদ্র ও মাঝারি ধরনের প্রতিষ্ঠানের কর্মীদের জন্য কি কোনো ধরনের সামাজিক নিরাপত্তা রয়েছে? এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হলে সমাজে আয়বৈষম্য আরও তীব্র হবে।