নেতৃত্ব দেবে মেধাবীরাই
১২ আগস্ট ২০২৬ ২০:০৮
॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের শক্তিশালী স্লোগান, যা দেশের সীমানা ছাড়িয়েছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে জাতীয় রাজনীতিতে ধ্বনিত হওয়া স্লোগান এটি। বিষেশত শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় এটি ধ্বনিত হয়। সকল রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনও এটি আওড়িয়ে নিজের রাজনৈতিক ও আদর্শিক অবস্থানের জানান দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছে টানার চেষ্টা করেছে। ফ্যাসিস্ট আমলের ২০১৮ সালের ২৯ জুলাই থেকে ৮ আগস্ট পর্যন্ত নজিরবিহীন আন্দোলনের স্লোগানটির আবেদন ফুরিয়ে যায়নি রাজনীতিতে- ধ্বনিত হচ্ছে, ছাত্রশিবির, ছাত্রদলসহ মূল রাজনৈতিক দলের নেতাদের কণ্ঠে।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানেও স্লোগানটি জোরালো হলো ক্যাম্পাসে ক্যাম্পাসে, এখনো হচ্ছে। তবে তা একপক্ষীয় হয়েছে, যা কেবল ছাত্রশিবিরের কণ্ঠে। নির্যাতন ও জুলুমের নতুন রূপ থেকে শিক্ষার্থীদের বাঁচাতে, গণরুম, গেস্টরুম কালচার না ফেরাতে, প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ রক্ষায় ও হল দখলের মতো সংস্কৃতি যাতে না ফিরে আসে, সেজন্য এই স্লোগান তুলছে ছাত্রশিবির।
ক্যাম্পাসগুলোয় নতুন করে সহিংসতাকে ফ্যাসিবাদের নতুন পদধ্বনি হিসেবে মনে করছেন অনেকে। গত ৩ আগস্ট যার সূচনা হয় রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে জুলাইয়ের চিত্র প্রদর্শনীতে হামলার মাধ্যমে। বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় শাখা এই প্রদর্শনীর আয়োজন করেছিল, যেখানে ফ্যাসিবাদী আমলের বিচারিক হত্যাকাণ্ড, চব্বিশের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের নানা স্থিরচিত্র ও আলোকচিত্র স্থান পেয়েছিল। ওই ঘটনার পর জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়া, ঢাকা কলেজসহ সারা দেশের অনেক ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের ওপর হামলা চালায় ছাত্রদলের ‘আদুভাই’ নেতারা।
এসব হামলার নেপথ্যে যেসব কারণ উঠে আসছে, তা খুবই ভয়াবহ। বাহ্যিক দৃষ্টিতে হামলাটি ছাত্রশিবিরের ওপর হলেও আদতে তা বৈষম্যহীন রাষ্ট্র ও ক্যাম্পাস গড়ার আকাক্সক্ষার ওপর চালানো হয়েছে। কারণ এসব হামলার মাধ্যমে দখলবাজি, টেন্ডারবাজি ও চাঁদাবাজির ক্ষেত্র প্রস্তুত করার উদ্দেশ্য রয়েছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। ক্যাম্পাসভিত্তিক ঘটনাগুলোর পোস্টমর্টেম করলে তা উঠে আসে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদলের আহ্বায়ক মেহেদি হাসান হিমেল ২০০৮-০৯ সেশনের শিক্ষার্থী। হিসাব মতে কিংবা ব্যতিক্রম হলেও ২০১৫-২০১৭ সালের মধ্যে তাদের ছাত্রজীবন শেষ হয়ে যাওয়ার কথা। ১৯ বছর আগে ভর্তি হওয়া শিক্ষার্থী কোন যোগ্যতায় এখনো ছাত্রদলের রাজনীতি করেন বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন প্রশ্নও উঠছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের টেন্ডারে ভাগ বসাতে তিনি কি রাজনীতি করছেন? গত ৪ আগস্ট জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের ভিপি শিবির নেতা রিয়াজুল ইসলাম এবং জিএস ও ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি আব্দুল আলিম আরিফের ওপর হামলার পর তারা দাবি করেছেন, তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রকল্প সেনাবাহিনীর মাধ্যমে বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছে। অন্যদিকে ছাত্রদল তা চায় না। ছাত্রদল চায় বিশ্ববিদ্যালয় শতকোটি টাকার প্রকল্প অন্য ঠিকাদারের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হোক; যাতে তারা লুটপাট করতে পারে- এমন অভিযোগ শিবিরের।
শিক্ষার্থীবান্ধব শিবির, পেশিশক্তিনির্ভর ছাত্রদল
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর ইসলামী ছাত্রশিবির শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মসূচি নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দোরগোড়ায় গেছে। নেতৃত্ব কাঠামোয় নিয়মিত মেধাবী শিক্ষার্থীদের সামনে আনছে ছাত্রশিবির। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন দাবি দাওয়া ও অধিকার প্রতিষ্ঠায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশসান ও সংশ্লিষ্টদের সাথে সমন্বয়ের কাজটি সূচারুরূপে করেছে সংগঠনটি; ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ডাকসু, চবির চকসু, জাবির জাকসু, রাবির রাকসুতে নিরঙ্কুশ জয় পায় ছাত্রশিবির। অন্যদিকে ছাত্রদলের আদুভাই নেতৃত্ব ক্ষমতার চর্চা এবং নিয়মিত শিক্ষার্থীদের নেতৃত্ব না থাকায় শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি পৌঁছাতে পারেনি। ফলে ছাত্র সংসদ নির্বাচনে বিপর্যয় হয়েছে তাদের।
ছাত্রদলের এক ধরনের ‘আদুভাই’র রাজনীতি চর্চায় দেখা যায় গত ৪ আগস্টে ঢাকা সরকারি মাদরাসা-ই-আলিয়ায়। বহিরাগতদের নিয়ে হলে থাকা নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালানোর মাধ্যমে। বের করে দেয়া হয় ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের, যারা এখনো হলে নিজের বৈধ সিটে উঠতে পারেনি। হামলার সময় দেখা যায় যুবদল নেতা নয়ন প্লাস্টিকের এক ধরনের লাঠি হাতে নিয়ে হামলার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, পুলিশকে ধমকাচ্ছেন; এমনকি টেনে ধরছেন। প্রশ্ন হলো- শিক্ষার্থীদের হলে ‘নয়ন বাহিনী’ কেন? আবার একটি টেলিভিশন টকশোতে ছাত্রশিবিরের সাবেক সভাপতি জাহিদুল ইসলামের প্রশ্নের উত্তরে নয়ন বলেন, হাতে থাকা বস্তুটি ছিল খেলনা! আলিয়া মাদরাসা প্রাঙ্গণ তার কি খেলার মাঠ!
গত ৮ আগস্ট ডাকসুর জিএস ও ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক এসএম ফরহাদ আলিয়া মাদরাসার ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন, ছাত্রদল ইতিহাস রচনা করল-ঢাকা আলিয়ায় ১১ জন শিক্ষার্থী তাদের অনার্স ইয়ার ফাইনাল পরীক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত হলো। পূর্বনির্ধারিত (সরকারি) ১ম ও ৩য় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি তারা। পুলিশ, ব্যারিকেড দিয়ে আটকে রেখেছে পুরো সময়, পুলিশকে পরীক্ষার ব্যাপারে জানানোর পরও পুলিশ সম্পূর্ণ অসহযোগিতা করেছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর টানা ১ ঘণ্টা বাইরে অপেক্ষা করেছিলেন শিক্ষকদের সহযোগিতার আশায়। ক’দিন আগেই আলিয়ার অধ্যক্ষের মাথায় চাপাতি দিয়ে কুপিয়েছে ছাত্রদল ও যুবদল; সেই ভয়েই অন্য শিক্ষকরা আজকে ১১ জন শিক্ষার্থীর বাইরে অপেক্ষার বিষয় জানার পরও কোনো সহযোগিতা করেননি বলে অভিযোগ করেন ফরহাদ।
তিনি আরও বলেন, ঢাকা আলিয়ার হলের প্রতিটি রুমে জিনিসপত্র ভাঙচুর, ল্যাপটপসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ জিনিসপত্র চুরি এবং হলকে সন্ত্রাসের অভয়ারণ্য বানানোর পর বিএনপির সকল নেতাদের পক্ষ থেকে তাদের উৎসাহ দেয়া একটি ভয়ংকর অশনিসংকেত।
এসএম ফরহাদ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আজকে শুধুমাত্র ভিন্ন রাজনৈতিক মতের কারণে ১১ জন শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন থেকে ১ বছর কেড়ে নিয়ে ছাত্রদল হুবহু ছাত্রলীগে পরিণত হলো। দেশের কোনো ক্যাম্পাসে আবাসিক হলে কোনো অছাত্র থাকতে পারবে না। হলগুলো হবে শুধুমাত্র নিয়মিত শিক্ষার্থীদের, এই অধিকার নিশ্চিতে আমাদের লড়াই জারি থাকবে।
এর আগে দেখা যায়, আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করলে পুলিশ তাদের গেটে আটকিয়ে দেয়। শিক্ষার্থীরা বৈধ কাজপত্র দেখানোর পরও পুলিশ তাদের কর্তৃপক্ষের অনুমতি না থাকার অজুহাত দেখায়।
এর আগে গত ৪ আগস্ট দিবাগত রাতে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের হল থেকে ছাত্রশিবিরকে পিটিয়ে বের করে দেয় ছাত্রদল। এদিন গ্রাফিক আর্টস ছাত্রদলের আহ্বায়ক তামিম মাতুব্বর ও ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহ-সভাপতি মোতাহার হোসেনের নেতৃত্বে ছাত্রশিবিরের আরও ১০ থেকে ১৫ জন শিক্ষার্থীকে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্রশিবিরের ওপর হামলার প্রতিবাদে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে গত ৫ আগস্ট গণসমাবেশ করেছে ছাত্রশিবির। সমাবেশে সভাপতির বক্তব্যে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দাম অভিযোগ করেন, ক্যাম্পাসে আবারও হল দখল, গণরুম ও গেস্টরুম সংস্কৃতি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। ক্যাম্পাসগুলোয় যারা হামলা করেছে, তারা প্রকৃত ছাত্র নয়, বরং ছাত্র সন্ত্রাসী ও টোকাই। ছাত্রদল ক্যাম্পাসগুলোয় যাদের দিয়ে কমিটি দিয়েছে, তাদের অনেকের ছাত্রজীবন ১৫ থেকে ২০ বছর আগেই শেষ হয়েছে।
ক্যাম্পাস অস্থির করে সুবিধা নিতে চায় ছাত্রদল
ক্যাম্পাসগুলো অস্থির করে ফায়দা নেয়ার চেষ্টা করেছে ছাত্রদল- এমন অভিযোগ করে আসছে ছাত্রশিবির। গত ৪ আগস্ট ক্যাম্পাসগুলোয় এমন দৃশ্য প্রত্যক্ষ করেছে শিক্ষার্থীরা। প্রশাসনকে চাপে রাখাও এ কৌশলের অন্তর্ভুক্ত বলে মনে করেন কেউ কেউ। উদাহরণ হিসেবে টানছেন হামলার সময় নিজের শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় প্রশাসন নিরব থাকা। এমনকি ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় ১১ শিক্ষার্থীর পরীক্ষা দিতে না পারা। শিক্ষকদের ওপর নগ্ন হামলার মাধ্যমে এ পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে বলে মনে করা হয়। ছাত্রলীগও একই কৌশলে মব কিংবা হামলা করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে কব্জায় নিয়েছিল। সম্প্রতি একটি ঘটনায় সিসি টিভির ফুটেজ প্রকাশ করতে হল সংসদ ও শিক্ষার্থীরা চাপ দিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদুল্লাহ হলের প্রাধ্যক্ষ পদত্যাগ করেন। শিক্ষার্থীদের দাবি, সত্য প্রকাশ হলে ছাত্রদল ফেঁসে যাবে- এমন আশঙ্কা থেকে তাকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে। মূলত শহীদুল্লাহ হলের ঘটনা ছাত্রশিবিরের ইমেজ ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টা।
শহীদুল্লাহ্ হলের ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করায়, হল সংসদের অনুরোধে হল প্রশাসন একটি ফ্যাক্ট-ফাইন্ডিং কমিটি গঠন করে এবং বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তদন্তে দায়িত্বরত শিক্ষকদের মিটিং চলাকালে হল শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক রবিউল ইসলাম নাহিদ ও হাদিউল ইসলাম শিক্ষকদের রুমে প্রবেশ করে মব সৃষ্টি করে।
বিষয়টি জানতে পেরে হল সংসদের নির্বাচিত প্রতিনিধিরা সেখানে যায়, পরে শিক্ষকদের অনুরোধে কক্ষ থেকে বের হয়ে আসে। হল সংসদের প্রতিনিধিরা হলের দোতলায় চলে যায় আর ছাত্রদল নিচে অবস্থান করে। এমন সময়ে ছবি তোলার অভিযোগ এনে গায়ে পড়ে মব সৃষ্টি করে হল সংসদের প্রতিনিধি, ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে ছাত্রদল।
এসএস ফরহাদ ওই ঘটনা প্রসঙ্গে বেশ কয়েকটি প্রশ্ন তোলেন। তার প্রশ্নের মধ্যে রয়েছে-
১. তদন্তের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকদের বৈঠক চলাকালে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা কেন শিক্ষকদের কক্ষে প্রবেশ করেছিলেন এবং তদন্ত কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিলেন?
২. পরবর্তীতে ছাত্রদল কেন হলো সংসদের প্রতিনিধি, ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মী ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালালো? তাহলে কি অপ্রীতিকর ঘটনাটির প্রকৃত সত্য আড়াল বা ধামাচাপা দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য ছিল?
৩. ঘটনাটি ঘটার পাঁচ দিন পর কেন সামনে আনা হলো? ঘটনার সময় এজিএস কক্ষে উপস্থিত না থাকলেও পরে কক্ষে আসেন। তারপরও পাঁচ দিনের মধ্যে তাকে বিষয়টি জানানো হয়নি কেন? একইভাবে হল প্রশাসনকেও তাৎক্ষণিকভাবে অবহিত করা হয়নি কেন? এবং অভিযুক্ত দুজনকে ঘটনার সাথে সাথেই প্রক্টরিয়াল টিমের হাতে তুলে না দিয়ে এক্সিট দেয়া হলো কেন?
৪. এই বিলম্ব কি সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ বা গায়েব করার সুযোগ করে দেওয়ার জন্যই ছিল? পরবর্তী সময়ে যে নাটক মঞ্চস্থ করা হয়েছে, তার সঙ্গে এ ঘটনার কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি?
৫. এজিএস ও ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে যে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে, তার পেছনে কোনো দলীয় বা রাজনৈতিক স্বার্থ রয়েছে কি না। এসব প্রশ্নের নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্তের মাধ্যমেই প্রকৃত উত্তর বেরিয়ে আসতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের কল্যাণ, অধিকার ও উন্নয়নকেন্দ্রিক কার্যক্রমে তাদের তেমন কোনো দৃশ্যমান উদ্যোগ নেই বললেই চলে। অন্যদিকে ছাত্রশিবিরের আদর্শিক, সৃজনশীল ও শিক্ষার্থীবান্ধব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পাল্লা দিতে না পেরে, নিজেদের দোষ ঢাকতে ছাত্রশিবিরকে দায়ী করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিল করতে চায়। অতীতেও আমরা ‘শিবিরকে একটা দায় দিয়ে দাও’- এ ধরনের রাজনৈতিক কৌশল দেখতে পেয়েছি।
সিসিটিভি ফুটেজ পাওয়া গেলে ছাত্রদলের জড়িত থাকার বিষয় বের হবে এবং ঘটনা ধামাচাপা দিয়ে ছাত্রশিবিরকে জড়িয়ে অপপ্রচারের রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি সকলের কাছে উন্মোচন হবে- এই ভয়েই ছাত্রদল তদন্তের দায়িত্বরত শিক্ষকদের রুমে ঢুকে তদন্তের কাজে বাধা সৃষ্টি করে এবং পরবর্তীতে হল সংসদের প্রতিনিধি, ছাত্রশিবিরের নেতা-কর্মী ও শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা করে বলেও অভিযোগ তোলেন ডাকসুর জিএস ফরহাদ।
‘আদুভাই’র রাজনীতি ছাত্রদলে, শিবিরে শিক্ষার্থী
ক্যাম্পাসগুলোয় অস্থিরতা তৈরি করে ছাত্রদলের সুবিধা নেয়ার যে অভিযোগ উঠেছে তার সত্যতাও উঠে আসছে নানাভাবে। চট্টগ্রাম ছাত্রদলের কমিটিতে থাকা নেতাদের বয়স ও শিক্ষা নিয়েও উঠছে নানা প্রশ্ন। তথ্যমতে, চবি ছাত্রদলের কমিটির সভাপতি মাহাম্মদ আলাউদ্দিন মহসিন রাজনীতি বিজ্ঞান বিভাগের ২০০৮-০৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। আর সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ আল নোমান একই বিভাগের ২০০৯-১০ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। এদিকে ছাত্রদলের সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০০৭-০৮ সেশনের শিক্ষার্থী। সে অনুযায়ী তার শিক্ষাজীবন শেষ হওয়ার কথা ২০১৪-১৬ সালের মধ্যে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির ১৮ বছর পরও তিনি ছাত্রদলের সভাপতি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ থেকে ২০০৭-০৮ সেশনে ভর্তি হয়েছিলেন ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির। সে অনুযায়ী তার বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির বয়স ১৮ বছর। স্বাভাবিকভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ৬-৭ বছরের মধ্যে শিক্ষাজীবন শেষ হয় ছোট-খাটো ব্যত্যয় হলেও। কিন্তু ছাত্রদলের তা হয় না কেন? কী মধু আছে ক্যাম্পাস রাজনীতিতে! এমন নানা প্রশ্ন উঠছে এখন। শুধু তাই নয়, ছাত্রদলে পতিত স্বৈরাচারের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ছাত্রদলে পুনর্বাসিত হচ্ছে। এমন অভিযোগ রয়েছে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পক্ষের ছাত্র সংগঠনগুলোর।
তবে সাম্প্রতিক ক্যাম্পাস সহিংসতার জন্য ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে আঙুল তুলছে ছাত্রদল। কিন্তু তাদের বক্তব্যের স্বপক্ষে তেমন শক্ত যুক্তি কিংবা প্রমাণ দেখা যায়নি। অন্যদিকে সহিংসতা সংক্রান্ত যেসব ভিডিও গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে তাতে দেখা যায় ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাই মূলত আগ্রাসী ভূমিকায় এবং আহত ও ক্ষতিগ্রস্ত সাধারণ শিক্ষার্থী ও শিবির কর্মীরা। বহিরাগতদের হাতে দেশীয় অস্ত্র, লাঠিসোঁটা, শাবল, হাঁসুয়া নিয়ে মহড়া দিচ্ছে। এমনকি নারায়ণগঞ্জ আলিয়া মাদরাসা, বরিশালের ব্রজমোহন কলেজ, ঢাকার গ্রাফিক্স আর্ট ইনস্টিটিউটে শিবির কর্মীদের হল থেকে বের করে দেয়ার খবর গণমাধ্যমে উঠে এসেছে। ছাত্রশিবির কোথাও সিট দখল করেছে এমন নজির সামনে আসেনি। এসব ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন নীরব থেকেছে। কারণ সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর দলীয়করণের মাধ্যমে দেশের ৯টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি নিয়োগ দিয়েছে নিয়ম উপেক্ষা করে। নিয়োগ নিয়ে গত ১১ আগস্ট মঙ্গলবার এমন অভিযোগ তুলেছেন জামায়াতের নায়েবে আমীর অধ্যাপক মুজিবুুর রহমান এমপি।
ক্যাম্পাসগুলোয় অস্তিরতার জন্য ছাত্ররাজনীতির এই ‘আদুুভাই’ নেতৃত্ব দায়ী কিনা। যেসব চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও হলে সিট-বাণিজ্যসহ যেসব অভিযোগ উঠছে সেসবের সাথে ‘আদুভাই’ সংস্কৃতি জড়িত থাকার বিষয়টি সামনে আসছে। চব্বিশের জুলাই গণঅভ্যত্থানে শিক্ষার্থীদের অন্যতম মূল দাবিই ছিল নিরাপদ, বৈষম্যমুক্ত ক্যাম্পাস। যেখানে সহিংসতায় কোনো শিক্ষার্থীর প্রাণ হারাবে না, রাজনৈতিক কারণে কোনো শিক্ষার্থীর শিক্ষাজীবন হুমকিতে পড়বে না, ধ্বংস হবে না। কিন্তু ইতোমধ্যে ঢাকা আলিয়া মাদরাসায় হল দখলের নামে শিক্ষার্থীর জীবনে ধস নামালো ছাত্রদল। এমন যদি হয়, তাহলে ‘উই ওয়ান জাস্টিস’ স্লোগান ছাত্রদলের মেকি আচরণ ছিল, নাকি বিএনপির জুলাই সনদ মানার উদাহরণ; যদি ভোট না দেয় সেজন্য মেনে নিয়েছিলাম- সেরকম। তবে জাস্টিস প্রতিষ্ঠায় ছাত্রসমাজ যে ঐক্যবদ্ধ থাকবে, তাতে কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। না হলে ফ্যাসিস্টের দোসররা অনৈক্য সৃষ্টি করবে। আবার ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার অপচেষ্টা করবে।