কী চলছে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের নেপথ্যে
১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৫২
স্টাফ রিপোর্টার : বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের বরফ এখনো গলেনি। কয়েক দফা উদ্যোগও নিয়েছে দিল্লি। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীকে কয়েক দফায় ভারত সফরের আমন্ত্রণও জানানো হয়েছে ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির পক্ষ থেকে। কিন্তু সম্পর্ক স্বাভাবিক করার এই প্রচেষ্টার মধ্যেই ঢাকায় ভারতের বহিঃগোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান পরাগ জৈনের আকস্মিক সফর এবং একই সময়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর একের পর এক উচ্চপর্যায়ের বৈঠক নতুন একটি প্রশ্ন সামনে এনেছে- দিল্লি কি শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক মেরামত করতে চাইছে, নাকি বাংলাদেশকে ঘিরে নিরাপত্তা ও কৌশলগত হিসাবও নতুন করে সাজাচ্ছে?
গত ৯ আগস্ট রোববার চার সদস্যের উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় আসেন ‘র’ প্রধান পরাগ জৈন। তার সঙ্গে ছিলেন অশ্বীন মুকুন্দ কোটনিস, রাহুল নেগি ও শৈবাল রায় চৌধুরী। সফরটির বিস্তারিত কর্মসূচি দুই দেশই প্রকাশ করেনি। পরাগ জৈন ঢাকায় আসার পরদিন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠক করেছেন বলে জানা গেছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম অবশ্য সফরটিকে দুই দেশের সম্পর্কের টানাপড়েনের মধ্যকার একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা যোগাযোগ হিসেবে দেখছে।
আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষকরা বলছেন, ‘একজন গোয়েন্দা সংস্থার প্রধান সাধারণ কূটনৈতিক সৌজন্য সাক্ষাতের জন্য চার সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে বিদেশ সফরে আসেন না, তেমনি সফরটিকে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে ভারতের কোনো গোপন তৎপরতার অংশ কিনা, তাও ভাবতে হবে। প্রকাশ্য তথ্য এখন পর্যন্ত এমন কোনো দাবিকে নিশ্চিত করে না। ‘র’ প্রধানের সফরটি নিরাপত্তা সহযোগিতা, আঞ্চলিক পরিস্থিতি, সীমান্ত, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ এবং দুই দেশের গোয়েন্দা যোগাযোগ পুনর্গঠন- এসবই সম্ভাব্য আলোচনার ক্ষেত্র হিসেবেও বিবেচনা করছে কেউ কেউ।
পরাগ জৈন ঢাকায় আসার আগে চীন সফর করেছেন। বিশ্লেষকরা বলছেন, পরাগ জৈনের ঢাকা সফরের আগে চীন সফরের তথ্যটি কৌশলগত দৃষ্টিতে আলাদা গুরুত্ব বহন করে। বাংলাদেশ এখন শুধু ভারতনির্ভর কোনো ভূরাজনৈতিক বলয়ের অংশ নয়; চীন, যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে ঢাকার যোগাযোগ বাড়ছে। ফলে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দিল্লির নিরাপত্তা হিসাব এখন শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক নয়; এর সঙ্গে বঙ্গোপসাগর, ভারত মহাসাগর, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের নিরাপত্তা সবই যুক্ত।
ত্রিবেদীর ‘দুই দরজায়’ কূটনীতি
‘র’ প্রধানের নিরাপত্তা তৎপরতার সঙ্গে প্রায় একই সময়ে ভারতীয় হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর ধারাবাহিক রাজনৈতিক যোগাযোগ ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে। গত ১০ আগস্ট সোমবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে প্রথমবার সাক্ষাৎ করেন ত্রিবেদী। বৈঠকের পর তিনি দুই দেশের সম্পর্ক নিয়ে আশাবাদী বক্তব্য দেন। তার ভাষায়, বাংলাদেশ ও ভারত শুধু সীমান্ত ভাগ করে না, দুই দেশের মানুষের মধ্যে অভিন্ন স্বপ্নও রয়েছে। এর আগে তিনি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের সঙ্গে বৈঠক করেন। সেখানে তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে বিভিন্ন ইস্যু থাকবে এবং সেগুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা সম্ভব। অর্থাৎ দিল্লির বার্তাটি এখন অনেক বেশি ‘সম্পর্ক মেরামত’ ও ‘আলোচনার মাধ্যমে সমাধান’-কেন্দ্রিক।
আরও তাৎপর্যপূর্ণ হলো, তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাতের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই ত্রিবেদী দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ছাড়েন। কূটনৈতিক সূত্রগুলো এটিকে দুই দেশের সম্পর্কের পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে দিল্লিতে আলোচনার অংশ হিসেবে দেখছে। ফলে একই সময়ে ঢাকায় ‘র’-এর প্রধান এবং দিল্লিতে ভারতীয় হাইকমিশনার- দুই পর্যায়ের যোগাযোগকে কেবল কাকতালীয় ঘটনা হিসেবে না দেখে পরিকল্পিত কূটনৈতিক তৎপরতা হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। তারা আরও বলছেন, ভারতের দুটি সমান্তরাল চ্যানেল সক্রিয়- রাজনৈতিক চ্যানেলে ত্রিবেদী, নিরাপত্তা চ্যানেলে পরাগ জৈন।
কেন এত দ্রুত সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা?
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনার পতনের পর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের যে গভীর অবনতি হয়েছিল, তার কেন্দ্রে ছিল দিল্লির সঙ্গে শেখ হাসিনা সরকারের দীর্ঘ ঘনিষ্ঠতা এবং পরবর্তী সময়ে শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান। বাংলাদেশ তার প্রত্যর্পণের দাবি জানিয়েছে; ভারত এখনো সেই দাবিতে সম্মতি দেয়নি। ফলে নতুন সরকারের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করতে গেলেও দিল্লিকে এক সঙ্গে হাসিনা প্রশ্নটি সামলাতে হচ্ছে।
দিল্লির আরেকটি বাস্তবতা হলো- বাংলাদেশে নতুন রাজনৈতিক নেতৃত্ব এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক রাখতে আগ্রহী হলেও আগের ধরনের একমুখী নির্ভরতার সম্পর্ক চায় না। ঢাকা অর্থনৈতিক ও কৌশলগতভাবে চীন, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন অংশীদারের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছে। ফলে ভারতকে নতুন সরকারের কাছে নিজের প্রয়োজনীয়তা প্রমাণ করতে হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটেই দীনেশ ত্রিবেদীর নিয়োগ বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তিনি প্রচলিত ক্যারিয়ার কূটনীতিক নন; সাবেক কেন্দ্রীয় মন্ত্রী এবং ভারতের রাজনীতিতে দীর্ঘ অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ব্যক্তি। তার পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, বাংলা ভাষা ও দুই বাংলার সামাজিক-সাংস্কৃতিক বাস্তবতা সম্পর্কে পরিচিতিÑ সব মিলিয়ে এটি দিল্লির ‘রাজনৈতিক কূটনীতি’র নতুন পদক্ষেপ।
তারেক রহমানকে দিল্লিতে নেওয়াই কি বড় লক্ষ্য?
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তারেক রহমানকে দ্বিপক্ষীয় সফরের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। পাশাপাশি ভারত ইওগঝঞঊঈ-এর চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে ইজওঈঝ আউটরিচ পর্বে অংশ নেওয়ার আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান স্পষ্ট করেছেন, এ বিষয়ে ঢাকা এখনো কোনো নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয়নি এবং ইজওঈঝ-এর আমন্ত্রণটি তারেক রহমানকে ব্যক্তিগতভাবে নয়, ইওগঝঞঊঈ চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে। ঢাকা যদি এখনই তারেক রহমানের দিল্লি সফর নিশ্চিত করে, তাহলে সেটি সম্পর্ক স্বাভাবিকীকরণের শক্তিশালী রাজনৈতিক সংকেত হবে। কিন্তু সফরের আগে শেখ হাসিনা ইস্যু, ভিসা, সীমান্ত, পানি, বাণিজ্য ও অন্যান্য অমীমাংসিত প্রশ্নে দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সেটি ভিন্নভা সমালোচনা হওয়ার ঝুঁকি দেখছে সরকার। তাই ঢাকার অবস্থান সম্ভবত- সম্পর্ক চাই, কিন্তু শর্তহীনভাবে নয়।
‘র’ প্রধানের সফর কি তবে শেখ হাসিনা ইস্যুকেন্দ্রিক?
শেখ হাসিনা ইস্যু যে দুই দেশের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক সম্পর্কের একটি বড় উপাদান, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। ভারত চাইবে না, এই ইস্যু দুই দেশের গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সহযোগিতাকেও অচল করে দিক। অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইবে, ভারতের মাটিতে বসে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো তৎপরতা না হোক। ফলে ‘র’ প্রধানের সফরের একটি সম্ভাব্য উদ্দেশ্য হতে পারে- দুই দেশের নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে নতুন বাস্তবতার ভিত্তিতে যোগাযোগের ন্যূনতম কাঠামো তৈরি করা। কীভাবে সীমান্ত নিরাপত্তা, আন্তঃসীমান্ত অপরাধ, রাজনৈতিক সহিংসতা ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে তথ্য আদান-প্রদান চলবে তা নিয়ে আলোচনা করা।
কে নির্ধারণ করবে সম্পর্ক ‘রিসেট’-এর শর্ত?
ঢাকায় ‘র’ প্রধানের সফর এবং ভারতীয় হাইকমিশনারের একের পর এক বৈঠককে বৃহত্তর কৌশলের অংশ হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা। ভারত বুঝতে পারছে, বাংলাদেশের নতুন রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হলে শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কূটনীতি যথেষ্ট নয়। রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ যেমন দরকার, তেমনি নিরাপত্তা কাঠামোর সঙ্গেও আস্থার সম্পর্ক পুনর্গঠন দরকার। অন্যদিকে বাংলাদেশও জানে, ভারতের সঙ্গে স্থায়ী বৈরিতা বাস্তবসম্মত নয়। ভৌগোলিক অবস্থান, সীমান্ত, বাণিজ্য, পানি, যোগাযোগ, জ্বালানি ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার কারণে দুই দেশকে শেষ পর্যন্ত একে অপরের সঙ্গে কাজ করতেই হবে। কিন্তু সেই সম্পর্কের ভিত্তি যদি আগের মতো ‘এক সরকার, এক সম্পর্ক’ হয়, তাহলে তা টেকসই হবে না। ফলে ‘র’ প্রধান ও ত্রিবদীর দৌড়ঝাঁপ ভারতের ‘রিসেট’ উদ্যোগ এবং বাংলাদেশের ‘শর্তসাপেক্ষ পুনঃসম্পর্ক’- এই দুই প্রবণতার সমন্বয় হিসেবে দেখছেন কেউ কেউ। ‘র’ প্রধানের নীরব সফর এবং ত্রিবেদীর প্রকাশ্য কূটনীতি একই বার্তা দিচ্ছে- দিল্লি ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন অধ্যায় খুলতে চায়। কিন্তু সেই অধ্যায়ের প্রথম পৃষ্ঠায় শেখ হাসিনা, নিরাপত্তা, পানি, সীমান্ত ও পারস্পরিক আস্থার পুরোনো প্রশ্নগুলো এখনো রয়ে গেছে। শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন হচ্ছে- ঢাকা ও দিল্লি কি এমন একটি নতুন সম্পর্কের কাঠামো তৈরি করতে পারবে, যেখানে নিরাপত্তার পাশাপাশি সার্বভৌমত্ব, পারস্পরিক মর্যাদা এবং জাতীয় স্বার্থও সমান গুরুত্ব পাবে?