নেপথ্য নায়কদের গ্রেফতার না করলে চাঁদাবাজি বন্ধ হবে না
১২ আগস্ট ২০২৬ ১৯:৪৯
স্টাফ রিপোর্টার : মানুষের দীর্ঘদিনের দাবি ছিল রাজধানীর সব ফুটপাত দখলমুক্ত হবে। মানুষ নিরাপদে হেঁটে গন্তব্যে পৌঁছাবেন। কিন্তু ঢাকার গুলিস্তান, মতিঝিল, মৌচাক, শান্তিনগর, নিউমার্কেট, মিরপুর-১, মিরপুর-১০সহ প্রায় সব সড়কের ফুটপাতে হাঁটার কোনো সুযোগই নেই। সব ছোট-বড় দোকান গড়ে উঠেছে। কোনো কোনো স্থানে ফুটপাত নয়, মূল সড়কেও দোকান বসিয়ে ব্যবসা করছে শতসহস্র মানুষ। অবৈধভাবে ফুটপাত ও সড়কে কীভাবে ব্যবসা করার সুযোগ হয়Ñ এমন প্রশ্ন সামনে আনা হলে উত্তর একেবারেই সোজা। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীদের দৈনিক, সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে চাঁদা দিয়েই তারা এমন সুযোগ পায়। নানা সময় এসব চাঁদাবাজের বিরুদ্ধে অভিযান হয়, মামলা হচ্ছে, অভিযুক্তরা গ্রেপ্তারও হচ্ছেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলও অভিযুক্ত নেতাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিচ্ছে। কিন্তু এসবের মধ্যেও স্বাভাবিকভাবেই চলছে চাঁদাবাজি। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে থাকা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, নির্মাণকাজ, পরিবহন; এমনকি ব্যক্তিগত বাসাবাড়িকেও লক্ষ করে চাঁদাবাজি হচ্ছে। কোনো কোনো সময় ক্ষমতাসীন দলের দুর্বল কর্মীকেও চাঁদা দিতে হচ্ছে প্রভাবশালীদের।
গত ২৭ জুলাই চট্টগ্রামে এক ব্যবসায়ীর নির্মাণাধীন ভবনে ২০ লাখ টাকা চাঁদা না দেওয়ায় হামলা, ভাঙচুর ও ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে মামলা করায় আরও ৫০ লাখ টাকা চাওয়া হয়। একই সময়ে চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় চাঁদাবাজির প্রস্তুতিকালে বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গ্রেপ্তার দুজন আলোচিত সন্ত্রাসী ডেভিড ইমনের সহযোগী। অর্থাৎ চাঁদাবাজির অভিযোগ শুধু অর্থ দাবি পর্যন্ত সীমাবদ্ধ নেই; কোনো কোনো ঘটনায় অস্ত্র ও সহিংসতার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে।
গত ২৭ জুলাই চাঁদাবাজি ও মারামারির পৃথক মামলায় সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব আজাদ হোসেনসহ ছয়জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এর পরদিন গ্রেপ্তার হওয়া আজাদ হোসেন ও উল্লাপাড়া পৌর বিএনপির সাবেক ভারপ্রাপ্ত আহ্বায়ক আব্দুর রাজ্জাককে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয় জেলা বিএনপি। দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে তাদের শোকজ করা হয়। জানা গেছে, গ্রেপ্তার হওয়া ওই ছয়জনই আদালত থেকে জামিন পেয়েছিলেন।
জুলাইয়ের শেষ থেকে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে চট্টগ্রামের ডেভিড ইমনকে ঘিরে চাঁদাবাজির একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। ৩১ জুলাই একটি পত্রিকা তার চাঁদা সংগ্রহের পদ্ধতি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। একই দিনে আদালত তাকে বায়েজিদ বোস্তামী থানার একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখান। মামলাটিতে সহিংসতা, চাঁদাবাজি, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
চাঁদা না দেওয়ায় প্রবাসী দুই ভাইয়ের ওপর হামলার ঘটনায় লক্ষ্মীপুরের কমলগঞ্জে মো. সোহেল (৩১) নামে এক যুবদল কর্মীকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গত ৮ আগস্ট সকালে তাঁকে উপজেলার তোরাবগঞ্জ বাজার থেকে গ্রেপ্তার করা হয়। এর আগে উত্তর চরলরেন্স এলাকায় হামলার শিকার হন দুই ভাই। তার মা এ ঘটনায় গত ৬ আগস্ট লক্ষ্মীপুর সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলার আবেদন করেন। আদালতের নির্দেশে কমলনগর থানা পুলিশ গত ৭ আগস্ট শুক্রবার মামলাটি নথিভুক্ত করে। গ্রেপ্তার সোহেল চরলরেন্স ইউনিয়ন যুবদলের সক্রিয় কর্মী। তিনি ইউনিয়নের এক নম্বর ওয়ার্ড কমিটির সভাপতি পদপ্রত্যাশী। এজাহারে বলা হয়, উত্তর চরলরেন্স এলাকার মৃত হাফিজ উল্যার ছেলে আনোয়ার হোসেন সৌদি আরব ও কামাল হোসেন সংযুক্ত আরব আমিরাতের আবুধাবিতে থাকেন। তিন মাস আগে ছুটি নিয়ে দুজন দেশে ফেরেন। এরপর থেকে এক নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি প্রার্থী সোহেল ও দুই নম্বর ওয়ার্ড যুবদলের সভাপতি প্রার্থী ইয়ামিন তাদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা চাঁদা দাবি করে আসছিলেন। চাঁদা না পেয়ে তারা দুই ভাইয়ের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে হামলা চালায়।
কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলায় এক পুলিশ কনস্টেবলের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর, লুটপাট ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। চাঁদার দাবিকৃত টাকা না দেওয়া পুলিশের জমিতে অস্থায়ী ঘর তুলে মাদকদ্রব্য বিক্রির প্রতিবাদ করায় এ হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করেছে ভুক্তভোগী পরিবার। গত ২৭ জুলাই দুপুর সাড়ে ১২টায় সদর উপজেলার গাইটাল নয়াপাড়া এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। ঘটনার পর পুলিশ কনস্টেবল মো. ইব্রাহিমের ছেলে জুলফিকার আহমদ নাঈম বাদী হয়ে কিশোরগঞ্জ সদর মডেল থানায় ১৩ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাত আরও ১০-১২ জনকে আসামি করে মামলা করেন।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চাঁদাবাজি বন্ধ করতে শুধু একজন বা কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করলেই সমাধান হবে না। চাঁদার টাকা কার কাছে যায়? কারা সংগ্রহ করে, কারা ভাগ পায় এবং স্থানীয়ভাবে কার প্রভাব কাজে লাগানো হয়- এসবও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।