ক্যাম্পাসগুলোয় শিবিরের ওপর সন্ত্রাসী হামলা
৬ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৫৪
স্টাফ রিপোর্টার : চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় আমূল পরিবর্তন এসেছিল। গেস্টরুম, গণরুম কালচারের বিলোপ হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার্থীরা স্বস্তিতে তাদের ক্লাস, পরীক্ষাসহ দৈনন্দিন একাডেমিক কার্যক্রম চালিয়ে যেতে পেরেছিল। নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের একক কর্তৃত্ব বিলোপের পর ছাত্রদল, ছাত্রশিবিরসহ অন্যান্য ক্রিয়াশীল সংগঠনগুলো ক্যাম্পাসে কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। ২০২৪ সালের এক বছর পর দেশের অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। যেখানে অনেক ক্যাম্পাসে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায় বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির।
অন্যদিকে ছাত্রদলসহ অন্যান্য সংগঠনগুলোও কিছু কিছু পদে জয় পায়। কিন্তু হঠাৎ কেন মারমুখী হয়ে উঠল ছাত্রদলÑ এমন প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের নির্বাচিত ভিপি, জিএস, এজিএস, কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এবং বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের নেতাদের ওপর সশস্ত্র হামলার ঘটনা ঘটেছে গত ৩৫ জুলাই (৪ আগস্ট মঙ্গলবার)। হামলাটি চালিয়েছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদলের আহ্বায়ক হিমেলের নেতৃত্বে ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা, যা ছিল পরিকল্পিত। এ হামলায় জকসু ভিপি ও শিবিরের কেন্দ্রীয় নেতা রিয়াজুল ইসলাম, জিএস ও ছাত্রশিবিরের বিশ্ববিদ্যালয় শাখা সভাপতি মো. আব্দুল আলিম আরিফ, এজিএস মাসুদ রানাসহ অন্তত ২০-২৫ জন আহত হয়েছেন। হেলমেট পরিহিত ছাত্রদলের কর্মীরা এতটাই আগ্রাসী ছিল যে, ন্যাশনাল মেডিকেল কলেজ হাপাতালের ভেতরে চিকিৎসা নিতে যাওয়া শিবির কর্মীদের ওপর দফায় দফায় হামলা চালিয়েছে। এমন হামলার পর শিবির দাবি করছে, বিতাড়িত ফ্যাসিবাদের রূপ ছাত্রদলে ফিরে এসেছে।
শুধু জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় নয়, ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা ঢাকার সরকারি আলিয়া মাদরাসায় হামলা চালিয়েছে। সেখানে শিবির কর্মীদের আহত করে হল থেকে বের করে দিয়েছে, লুটপাট করেছে ল্যাপটপ, মোবাইলসহ গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। এই পরিকল্পনায় যুক্ত রয়েছে সরকারি দলের অঙ্গ সংগঠন যুবদলও। যুবদলের নেতৃত্বে রাজধানীর বকশীবাজারে হেলমেট পরা সশস্ত্র কর্মীরা শিবির কর্মীদের ওপর হামলা চালায় ও মারধর করে। এমনকি আলিয়া মাদরাসার অধ্যক্ষকে পিটিয়ে আহত করে যুবদলের কর্মীরা।
এদিন দিবাগত রাত পৌনে ১টার দিকে রাজধানীর মোহাম্মদপুরে সরকারি গ্রাফিক আর্টস ইনস্টিটিউটের হল থেকে ছাত্রশিবিরকে পিটিয়ে বের করে দিয়েছে ছাত্রদল। এই ঘটনায় মেহেদী নামে এক শিবির কর্মী আহত হয়েছেন। এর আগে দিনের বেলা ঢাকা কলেজেও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছে ছাত্রদলের কর্মীরা।
এসব হামলার ঘটনার শুরু হয় ৩ আগস্ট সোমবার রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে ইসলামী ছাত্রশিবিরের একটি জুলাই প্রদর্শনীকে কেন্দ্র করে। সেখানে হামলা চালায় ছাত্রদলের কর্মীরা। পরে ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রতিরোধের মুখে ক্যাম্পাসছাড়া হয় ছাত্রদল ও বহিরাগত সন্ত্রাসীরা। পরদিন ৪ আগস্ট মঙ্গলবার আবারও বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয় গেটে হাঁসুয়া, রামদা, লাঠিসোঁটা ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে অবস্থান নেয় ছাত্রদলের কর্মীরা। তবে কী জুলাইয়ের বেনিফিশিয়ারি ছাত্রদল জুলাই অভ্যুত্থানের মাসে ক্যাম্পাসগুলোয় অস্থিতিশীলতা তৈরি করে নিজেদের অবস্থান করে নেয়ার চেষ্টা করছে? নাকি নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে এবং অতীত রাজনৈতিক কালচার ফেরাতে এমন হামলার পথ বেছে নিয়েছে সংগঠনটি- সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।
চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর দীর্ঘ কয়েক মাসে ক্যাম্পাসগুলোয় ছাত্রশিবির এবং সংগঠনটির নেতা ও নির্বাচিত ছাত্র সংসদ, হল সংসদের সদস্যরা শিক্ষার্থীদের কল্যাণে নানামুখী কাজ করে যাচ্ছেন। সাধারণ শিক্ষার্থীরা তাদের সাদরে গ্রহণও করছেন। অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের কাছাকাছি যাওয়ার মতো কোনো কর্মসূচি ছাত্রদলের পক্ষ থেকে দৃশ্যমান হয়নি।
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে হামলার ঘটনার জন্য ছাত্রশিবির ছাত্রদলের বিরুদ্ধে টেন্ডারবাজির অভিযোগ তুলেছে। তাদের দাবি অনুযায়ী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের দ্বিতীয় ক্যাম্পাস নির্মাণের জন্য সরকার শতকোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েছে, কিন্তু প্রকল্পটি এখনো আলোর মুখ দেখেনি। যে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সেনাবাহিনীর মাধ্যমে চায় ছাত্রশিবির। অন্যদিকে ছাত্রদল চায় প্রকল্পটি সেনাবাহিনীকে না দিয়ে টেন্ডারের মাধ্যমে অন্য কাউকে দিয়ে বাস্তবায়িত হোক। শিবিরের অভিযোগ, ছাত্রদল এর মাধ্যমে টেন্ডারবাজি ও লুটপাটের পথ খুঁজছে।
ক্যাম্পাসগুলোয় হামলার পর ৪ আগস্ট রাতে ইসলামী ছাত্রশিবিরের সভাপতি নূরুল ইসলাম সংগঠনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, গত ১৬ বছর ধরে শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন ও টেন্ডারবাজি চালিয়ে যে পতিত স্বৈরাচার আজ ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, তাদের করুণ পরিণতি থেকে শিক্ষা নিন। ছাত্র-জনতার রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত এই নতুন বাংলাদেশে কোনো ধরনের দখলদারিত্ব, লেজুড়বৃত্তি ও মাস্তানির রাজনীতি দেশের ছাত্রসমাজ আর এক চুলও সহ্য করবে না।
তিনি বলেন, ক্যাম্পাসের শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজ সেনাবাহিনীর মাধ্যমে সম্পন্ন হলে শতভাগ স্বচ্ছতা থাকবে এবং কেউ চাঁদাবাজি করতে পারবে না। কিন্তু ওপেন টেন্ডারের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার চাঁদা ও অবৈধ কমিশনের ভাগ পাওয়ার লোভী মানসিকতা থেকেই ছাত্রদল সেনাবাহিনীর হাতে কাজ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী, সাংবাদিক ও জকসু প্রতিনিধিদের ওপর এই বর্বরোচিত হামলা চালিয়েছে। প্রতিটি ক্যাম্পাসে চাঁদাবাজি করতে না পেরে এই সন্ত্রাসীরা আজ উন্মাদ হয়ে গেছে।
ছাত্রদলের এমন হামলার পর শিবির সভাপতি বেশকিছু দাবি তুলে ধরেছেন। এর মধ্যে রয়েছেÑ ১. সিসিটিভি ফুটেজ ও ছবির সাহায্যে জকসু জিএস আব্দুল আলিম আরিফের চোয়াল ভেঙে দেওয়া জবি ছাত্রদলের মোস্তাফিজুর রহমান রুমি ও জাফর, ঢাকা কলেজ ও আলিয়া মাদরাসার ঘটনায় জড়িত যুবদল নেতা নয়ন এবং বেরোবিতে হামলাকারী বহিরাগত সকল সন্ত্রাসীকে অনতিবিলম্বে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। ২. সাধারণ শিক্ষার্থীদের ন্যায্য দাবির পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা এবং অডিটোরিয়ামে প্রবেশে বাধা দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রক্টর অফিসের যেসকল কর্মকর্তা পক্ষপাতমূলক ভূমিকা পালন করেছেন, তাদের দ্রুত জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। ৩. জকসু নেতাদের, সাধারণ শিক্ষার্থী এবং কর্তব্যরত আহত সাংবাদিকদের সুচিকিৎসার সম্পূর্ণ ব্যয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও সরকারকে বহন করতে হবে। ৪. ঢাকা আলিয়া মাদরাসার হলের নিয়ন্ত্রণ সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে ফিরিয়ে দিয়ে তাদের আবাসিক নিরাপত্তা ও নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ৫. শিক্ষার্থীদের মূল দাবি অনুযায়ী জবি দ্বিতীয় ক্যাম্পাসের শতকোটি টাকার উন্নয়নকাজ অবিলম্বে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের দৃশ্যমান প্রশাসনিক পদক্ষেপ নিতে হবে।
এদিকে সারা দেশের ক্যাম্পাসগুলোয় শিবিরের ওপর ছাত্রদলের সন্ত্রাসী হামলার নিন্দা জানিয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। গত ৪ আগস্ট মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর নতুন বাংলাদেশে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দেশবাসী প্রত্যাশা করেছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত হবে, সন্তানরা নিরাপদে থাকবে, চাঁদাবাজি ও দখলবাজি বন্ধ হবে। শিক্ষার্থীরা তাদের রাজনৈতিক ও মৌলিক অধিকার ফিরে পাবে। ক্যাম্পাসগুলোয় সন্ত্রাসীদের অস্ত্রের ঝনঝনানি আর শোনা যাবে না, কোনো শিক্ষার্থীকে আর নিপীড়নের শিকার হতে হবে না। কিন্তু বিএনপি সরকার গঠনের পর তাদের ছাত্র সংগঠন ছাত্রদল শিক্ষার্থীদের কল্যাণে কাজ করার পরিবর্তে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের সন্ত্রাসী পথ অনুসরণ করে আধিপত্য বিস্তারের হীন কৌশল অবলম্বন করেছে। যার ফলে আজ পরিকল্পিত হামলা চালিয়েছে শিক্ষার্থীদের ওপর, যা সাধারণ শিক্ষার্থীরা ঘৃণাভরে প্রত্যাখ্যান করে।
তিনি বলেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রশিবির ও সাংবাদিকদের ওপর ছাত্রদল সশস্ত্র হামলা চালিয়ে রক্তাক্ত করেছে, তা অতীতের সমস্ত রেকর্ডকে ছাড়িয়ে গেছে। হামলার সময় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। তারা আহত শিক্ষার্থীদের রক্ষায় কোনো প্রকার পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা প্রশাসনের এহেন ভূমিকার তীব্র নিন্দা জানাই।
গোলাম পরওয়ার বলেন, বিএনপির ওপর ফ্যাসিবাদী শাসনের ছায়া ভর করেছে। তারা বিরোধী মতকে রাজনৈতিক ও আদর্শিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হয়ে ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসের পথে হাঁটছে, যা জাতির জন্য অশনিসংকেত, শিক্ষাঙ্গনের জন্য একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির সৃষ্টি করতে পারে। চব্বিশের বিপ্লবী ছাত্র-জনতা এসব সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিহত করবে, প্রত্যাখ্যান করবে, ইনশাআল্লাহ।
তিনি আরও বলেন, যেসব বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাদরাসা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রদলের সন্ত্রাসীরা এমন হামলা চালিয়েছে, অবিলম্বে তাদের শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনতে সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি। একইসাথে সংঘটিত এসব হামলার সুষ্ঠু তদন্ত করে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে একাডেমিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানাচ্ছি। পাশাপাশি সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষকে শিক্ষার সুষ্ঠু পরিবেশ রক্ষায় এবং ভবিষ্যতে এমন অনাকাক্সিক্ষত ঘটনা এড়াতে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানাচ্ছি।
গোলাম পরওয়ার বলেন, আজ ৩৫ জুলাইয়ে (৪ আগস্ট) জুলাই অভ্যুত্থানের বেনিফিশিয়ারি ছাত্রদলের এমন সন্ত্রাসী হামলা দেখে দেশবাসী হতবাক হয়েছে। আমরা প্রত্যাশা করছি, ছাত্রদলের নেতাকর্মীদের এমন সন্ত্রাসের পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে এবং দেশ ও ক্যাম্পাসসমূহে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে বিএনপি দায়িত্বশীল পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। পাশাপাশি স্বপ্নের নতুন বাংলাদেশ বিনির্মাণে দেশের সকল শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও দেশবাসীকে সকল অন্যায় ও সন্ত্রাসী কার্যক্রম প্রতিরোধে সচেষ্ট থাকার আহ্বান জানাচ্ছি।