চব্বিশের জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চেয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ১১ দলীয় ঐক্যের স্মারকলিপি
২৩ জুলাই ২০২৬ ১২:০৫
জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করার দাবিতে বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ
চব্বিশের জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিষয়ে তদন্ত ও দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আবেদন করেছে শহীদ পরিবার ও ১১ দলীয় ঐক্য।
বৃহস্পতিবার ২৩ জুন বেলা সাড়ে ১১টায় চিফ প্রসিকিউট বরাবর জুলাই শহীদ পরিবারের পক্ষে আবেদন করেন শিশু শহীদ জাবির ইবরাহিমের মা রোকেয়া বেগম এমপি এবং ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষে আবেদন করেন ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
এর আগে সকাল সাড়ে ১০টায় জুলাই গণহত্যার সুষ্ঠু তদন্ত ও দ্রুত বিচার নিষ্পত্তি করার দাবিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের সামনে করে ১১ দলীয় ঐক্যের নেতাকর্মীরা।
আবেদনে ২০২৪ সালের জুলাইয়ে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ অনুযায়ী তদন্তপূর্বক দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুততম সময়ে বিচার কার্যক্রম সম্পন্নের দাবি জানানো হয়।
এতে আরও বলা হয়, বিগত ২০০৯ সাল থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার শাসনামলে গুম, খুন, ভোটাধিকারহরণ, অপশাসনের জন্য মানুষের মনে তীব্র হতাশা এবং গভীর ক্ষোভের জন্ম হয়। এভাবে বছরের পর বছর নাগরিক স্বাধীনতাহরণ, ক্ষমতার চরম অপব্যবহার, নির্যাতন ও নিপীড়ন ও দীর্ঘদিনের সেই চাপা ক্ষোভ অবশেষে আগ্নেয়গিরির মতো বিস্ফোরিত হয় ২০২৪ সালের জুলাই মাসে, বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম এদেশের সর্বসাধারণকে নিয়ে ফ্যাসিস্ট হাসিনার বিরুদ্ধে এক তীব্র গনআন্দোলন গড়ে তোলে।
আবেদনে বলা হয়, তরুণ প্রজন্ম ও জনসাধারণের এই আন্দোলন শুধুমাত্র ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ছিল না; ছিল গুম খুনের ন্যায়বিচার, অধিকার, সাম্য সামাজিক মর্যাদা ও গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের এক অদম্য জন-আকাঙ্ক্ষার দূরন্ত প্রকাশ। পরিশেষে উত্তাল ছাত্র জনতার তীব্র আন্দোলনের স্রোতে ভেসে যায় আধিপত্যবাদী শক্তির দাস ফ্যাসিস্ট হাসিনার ১৬ বছর ধরে গড়ে ওঠা একনায়কতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা। অগণিত ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগ, পঙ্গুত্ববরণ, নির্যাতনের দুঃসহ, বেদনাতুর গল্প আর শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ফাইয়াজসহ ১৪০০ শহীদের রক্তের সিঁড়ি বেয়ে আমরা ফিরে পাই এক নতুন বাংলাদেশ এবং নতুনভাবে পথচলার প্রেরণা।
জুলাই ২০২৪ এ সংঘঠিত ব্যাপক হত্যাকাণ্ড, নির্বিচারে প্রাণহানি, গুরুতর শারীরিক নির্যাতন, বল প্রয়োগ এবং নাগরিকদের মৌলিক অধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাবলির প্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক ক্রাইম ট্রাইব্যুনাল অ্যাক্ট ১৯৭৩ এর আওতাভূক্ত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ, স্বাধীন কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বিচার নিশ্চত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক ও আইনগত দায়িত্ব।
আবেদনে ন্যায় বিচারের দাবি জানিয়ে বলা হয়, অপরাধের প্রকৃত সত্য উদঘাটন, সকল দায়ী ব্যক্তিকে আইনের আওতায় আনা ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার স্বার্থে তদন্ত ও বিচার কার্যক্রর হওয়া অপরিহার্য। আমরা ১১ দলীয় ঐক্য এর পক্ষ থেকে বাংলাদেশের সংবিধানে প্রতিষ্ঠিত আইনের শাসন ন্যায়বিচার ও জবাবদিহিতার নীতির প্রতি শ্রদ্ধা রেখে এই স্মারকলিপি পেশ করছি।
স্মারকলিপিতে সাতদফা দাবি তুলে ধরা হয়-
১। জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড সংঘটতি প্রধান প্রধান ঘটনাস্থলরে (ক্রাইম সিন) অধকিাংশরে তদন্ত এখনো সম্পন্ন হয়ন। অতএব, সকল প্রধান ঘটনাস্থলরে র্পূণাঙ্গ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে দায়ী ব্যক্তদিরে বরিুদ্ধে বচিার র্কাযক্রম দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২। জুলাই ২০২৪-এর গণহত্যা ও মানবতাবরিোধী অপরাধরে অভযিোগে জড়িত বলে অভিযুক্ত বহু পুলিশ কর্মকর্তা ও অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এখনও গ্রেফতার হননি এবং অনেকে এখনো সরকারি দায়িত্বে বহাল রয়েছেন- এমন অভিযোগ রয়েছে। তদন্তে যাদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৩। অভিযোগ রয়েছে যে, দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ৬১ জেলায় মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত হয়েছে। কিন্তু ঢাকা, রংপুর ও কুষ্টিয়া জেলার বাইরে সংঘটিত বহু ঘটনার তদন্ত কার্যক্রম এখনো সম্পূর্ণ হয়নি। ফলে সংশ্লিষ্ট অনেক অভিযুক্তকে এখনো আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়নি। অতএব, দেশের সকল জেলায় সংঘটিত অভিযোগসমূহের নিরপেক্ষ তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে প্রাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৪। অভিযোগ রয়েছে যে, জুলাই ২০২৪-এর হত্যাকাণ্ড ও হামলার ঘটনায় অভিযুক্ত আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী/অঙ্গসংগঠনের অনেক চিহ্নিত ব্যক্তিকে এখনো গ্রেপ্তার করা হয়নি। এর ফলে ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ও ভীতি সৃষ্টি হচ্ছে। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমের স্বার্থে তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে।
৫। অভিযোগ রয়েছে যে, গণহত্যা বা মানবতাবিরোধী অপরাধকে সমর্থন, উসকানি, ন্যায্যতা প্রদান অথবা বিচারপ্রক্রিয়া ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে অপপ্রচার, বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার কিংবা এর পক্ষে জনমত সৃষ্টির অভিযোগে যাঁদের সংশ্লিষ্টতা তদন্তে প্রতীয়মান হবে, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৬। গুম, গুম-পরবর্তী হত্যাকাণ্ড এবং নিহত ব্যক্তিদের মরদেহ গোপন বা ধ্বংস করার অভিযোগে জড়িত ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট টিএফআই TFI ও জিআইসি-এর সঙ্গে সম্পৃক্ত সামরিক ও বেসামরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত কার্যক্রম দ্রুত সম্পন্ন করে, পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ প্রাপ্তি সাপেক্ষে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ বিচার কার্যক্রম নিশ্চিত করতে হবে।
৭। গুম-সংক্রান্ত মামলাসমূহের তদন্ত ও বিচার কার্যক্রমে অস্বাভাবিক ধীরগতি পরিলক্ষিত হওয়ায় বিচারপ্রার্থী, ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রাপ্তি নিয়ে উদ্বেগ ও শঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। অতএব, গুম-সংক্রান্ত সকল মামলার তদন্ত দ্রুত সম্পন্ন করে তদন্তে যাঁদের বিরুদ্ধে পর্যাপ্ত সাক্ষ্য-প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাঁদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার, ভুক্তভোগী ও সাক্ষীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আইনের শাসন সুসংহতকরণ, ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিতকরণ এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধের স্বার্থে আপনার সদয় ও জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করা হয় স্মারকলিপিতে।