ভারতে মুসলিম গণহত্যা
১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:৩৭
প্রতিরোধে এগিয়ে আসতে হবে বিশ্ববাসীকে
॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
২০০২ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি গুজরাটের SABARMATI EXPRESS নামে একটি ট্রেনে হামলার ঘটনায় কোনো প্রমাণ ছাড়াই মুসলমানদের দোষী সাব্যস্ত করা হয়। ‘নতুন নানাভাতি’ তদন্ত রিপোর্টমতে, মুসলমানদের ওপর হামলা চালানোর পূর্ব-ষড়যন্ত্র হিসেবেই উগ্র হিন্দু সন্ত্রাসীরা এটি করেছিল। তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী বর্তমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী দাঙ্গাবাজ স্বয়ং নরেন্দ্র মোদির নির্দেশেই শুরু হয় দাঙ্গা। গুজরাটে মুসলিম হত্যাকাণ্ডের অন্যতম বাবুভাই প্যাটেল, উপনাম বাবু বজরঙ্গি নরপশুর সাক্ষাৎকার ২০০৭ সালে গোপন ক্যামেরার মাধ্যমে ধারণ করেন তেহেলকার ম্যাগাজিনের এক সাংবাদিক। ২০০২ সালে গুজরাট দাঙ্গার সময় ‘নারোদা পাতিয়া গণহত্যা’ (আহমেদাবাদ এলাকায়) চালাতে কীভাবে হিন্দুদের সংঘবদ্ধ করে, বহু মুসলমানকে আগুনে পুড়িয়ে ও তলোয়ারে কেটে হত্যা করে। গুজরাট দাঙ্গাকারীদের না ঠেকাতেও তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি পুলিশকে নির্দেশ দিয়েছিলেন। নরেন্দ্র মোদি ২০০২ সালের মুসলিমবিরোধী দাঙ্গার জন্য অনুতপ্ত নন বলেও ঘোষণা করেছেন। একইসঙ্গে তিনি বলেছেন, তার গাড়ি কোনো কুকুরছানাকে চাপা দিলে সে জন্য দুঃখ অনুভব করবেন, কিন্তু মুসলিম হত্যার জন্য নয়। (রয়টার্স)।
নারোদা পাতিয়া মুসলিম গণহত্যা : বাবু বজরঙ্গি নরপশুর সাক্ষৎকারের কিছু অংশ- ‘কেটে টুকরা করা, পুড়িয়ে দেয়া, আগুন ধরানো অনেক কিছুই করা হলো। আমরা মুসলমানদের আগুনে পোড়াতেই বেশি পছন্দ করি, কারণ এই জারজরা মৃত্যুর পর চিতায় পোড়াতে চায় না।’ আমার একটি শেষ ইচ্ছা… আমাকে ফাঁসিতে ঝোলানো হোক… তবে আমাকে মাত্র দুইদিন সময় দেয়া হোক, আমি জুহাপুরা (মুসলিম এলাকা) চলে যাব। সেখানে ৭-৮ লাখ লোক বাস করে। আমি তাদের শেষ করব… কম করে হলেও আমার ২৫-৫০ হাজার মুসলমানকে হত্যা করা উচিত। ‘গণহত্যার পর থানায় মামলার নথিতে লেখা হয়, এক গর্ভবতী মুসলিম মহিলার পেট চিরে আমি ৯ মাসের ফিটাস বা ভ্রƒণ (ভূমিষ্ঠ হওয়ার আগপর্যন্ত শিশুরা ফিটাস বা ভ্রƒণে অবস্থান করে) বের করে নিক্ষেপ করেছি আগুনে। আসলে আমি তাদেরকে দেখিয়েছি, দেখ! আমাদের বিরোধিতার শাস্তি কি। তোদের ভূমিষ্ঠ হতেও দেয়া যাবে না। আমি বলেছি, যদি মহিলাও হয়… যদি শিশু হয় তবু তাদের কেটে ফেল… চিড়ে ফেল… টুকরো করে ফেল… আগুনে পোড়াও সকল মুসলমানদের। আমি আমার সঙ্গীদের বলেছি তাদের কাউকে বাঁচতে দিও না, এরপর তাদের ধনসম্পদ সবই তো আমাদের। আমরা দল বেধে প্রত্যেকেই মুসলমান মারছিলাম অতি উন্মাদনার সাথে।… আমরা এসআরপি (স্টেট রিজার্ভ পুলিশ ফোর্স) ক্যাম্পের পাশেই এই গণহত্যা চালাই।… আসলে একসাথে ‘মুসলমান মারতে এত্ত মজা লাগে না… সাহেব, তাদের মারার পর আমার নিজেকে রানা প্রতাপ বা মহেন্দ্র প্রতাপের মত (মুসলিম নিধনকারী রাজা) মনে হয়েছে। এতদিন শুধু তাদের নাম শুনেছি, কিন্তু সেই দিন আমি তাই করলাম…।’
মুসলিম মহিলারা পুলিশের কাছে তাদের ইজ্জত রক্ষার আবেদন জানালে পুলিশ বলেছিল, ‘তোমাদের মেরেই ফেলবে। তার আগে ইজ্জত থাকলো কী চলে গেল তাতে কী?’ উগ্র হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীরা ঐ দাঙ্গায় মুসলিম মহিলাদের গণধর্ষণ করে, লাঠি, ছুরি ইত্যাদি দিয়ে যৌনাঙ্গে আঘাত করে। তাদের স্তন, জরায়ু কেটে দেয় এবং তাদের যোনিপথে রড প্রবেশ করানো হয়। তাদের অধিকাংশকেই টুকরো টুকরো কেটে আগুনে ফেলা হয়। জরিপ বলেছে, এই ধ্বংসলীলায় ক্ষতির পরিমাণ তিন হাজার আটশ’ কোটি টাকা প্রায়। দাঙ্গা চলাকালে গুজরাটের প্রধান নগরী আহমেদাবাদের একটি আবাসিক এলাকায় ২০০২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি গুলবার্গ হাউজিং সোসাইটি গণহত্যার শিকার হন সাবেক কংগ্রেস সাংসদ এহসান জাফরিসহ ৬৯ জন মুসলিম। তাদের জীবন্ত পুড়িয়ে শহীদ করা হয়। ২০০২ সালের ১ মার্চ ওডি গ্রামে এলাকার বেশ কয়েকটি বাড়ির মুসলিম বাসিন্দা একটি তিনতলা বাড়িতে আশ্রয় নিলে আগুন ধরিয়ে দেয় হিন্দুরা। একটি ট্রাইব্যুনালের হিসেবে, নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বে ওই গণহত্যায় প্রায় ৫০০০ মুসলমানকে শহীদ এবং ঘরছাড়া হতে হয়েছিল আড়াই লাখ মানুষকে। ‘মকতুব’ নামে একটি এনজিওতে দাঙ্গাপীড়িতদের নিয়ে কাজ করছেন রাবিহা আবদুর রহিম। তিনি বলেন ‘আজ এদেশে মুসলিম মেয়েরা ভাবতে বাধ্য হচ্ছে যে কোনো দিন তারা খুন হতে পারে, পরিবারের সদস্য, সংঘবদ্ধ দল বা ক্যামেরার সামনে ধর্ষিতা হতে পারে বা জীবন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হতে পারে – স্রেফ তাদের ধর্মীয় পরিচয়ের জন্য।’
‘ভারতের মুসলমানদের ওপর হিংস্রতা’ : ওয়াশিংটনভিত্তিক জনাই রাইট ‘স্বাধীন ভারতের মুসলমানদের ওপর হিংস্রতা’ শীর্ষক গবেষণাপত্রে উল্লেখ করেছেন, ‘২০২৩ সালের দ্বিতীয়ার্ধে ভারতজুড়ে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাশ্রিত বক্তৃতা ৬২ শতাংশ বেড়েছে।’ মোদি মূলত কট্টর মুসলিমবিদ্বেষী উগ্রপন্থী হিন্দু রাজনীতিক ও তাত্ত্বিক ভিডি সাভারকারের শিষ্য। সাভারকার ১৯২৩ সালে তার রচিত ‘হিন্দুত্ব: হিন্দু কে?’ শীর্ষক বইতে শুধু হিন্দুদেরই ভারতের ভূমিপুত্র আর মুসলমান ও খ্রিষ্টানদের ‘বহিরাগত’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক প্রচারমাধ্যমে গুজরাটে মুসলিম হত্যার করুণ কাহিনি তুলে ধরা হয়। অন্যদিকে নিউইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ‘হিউম্যান রাইটস ওয়াচ’-এর ২০১৯ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, বিজেপির সমর্থকরা ২০১৫ সালের মে থেকে ২০১৮ সনের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৪৪ জন মুসলিম হত্যা করে।
মুসলিমদের ওপর ‘বুলডোজার সন্ত্রাস’ : আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস ও মুসলিম মিররের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন মতে, গত ৬ মে থেকে ১৮ জুনের মধ্যে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান ও হরিয়ানায় অসংখ্য মুসলিম নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে এবং এর প্রায় সবগুলোই বিজেপি-শাসিত রাজ্যে সংঘটিত হয়েছে। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তালিকার মধ্যে রয়েছে দিল্লির মাঙ্গোলপুরিতে দরগাহ পাঁচ পীরান ও একটি মাদরাসা, হরিয়ানার ফরিদাবাদে একটি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বারান্দায় দুটি মসজিদ, গুজরাটে তিনটি দরগাহ ও একটি কবরস্থান, মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওয়ে একটি দরগাহ, বারানসিতে আজগাইব শহীদ মসজিদ, পুনের বোপোদিতে একটি দরগাহ, উত্তর প্রদেশের সম্ভলে একাধিক দরগাহ-মসজিদ-ঈদগাহ, রাজস্থানের জয়পুরে নুরানী মসজিদ, মহারাষ্ট্রের ভয়ান্দরে নুরি মসজিদ এবং বারানসিতে গঞ্জ শহীদা মসজিদ। শুধু ১৮ জুন রাজস্থানের বারমের জেলার মালানা গ্রাম এলাকায় চারটি মসজিদ ভাঙা হয়। বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙার প্রতিবাদে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন রাজস্থানের অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের রাজ্য সভাপতি সৈয়দ সাদাত আলী ও যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস ফর অল এবং এক তীব্র গণআন্দোলনের ডাক দিয়েছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড (এআইএমপিএলবি)। গত ২২ জুন বোর্ডের কার্যনির্বাহী কমিটির এক বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। একইসঙ্গে বিষয়টির সুষ্ঠু তদারকির জন্য একটি বিশেষ ‘অ্যাকশন কমিটি’ও গঠন করেছে তারা। বোর্ডের মুখপাত্র ড. এস কিউ আর ইলিয়াস জানান, বিজেপিশাসিত রাজ্যগুলোয় মুসলিমদের ঘরবাড়ি, এলাকা, মসজিদ এবং মাদরাসা লক্ষ করে চালানো উচ্ছেদ অভিযান বা ‘বুলডোজার সন্ত্রাস’ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। মুসলিমদের জোর করে ‘বন্দে মাতরম’ চাপিয়ে দেওয়া ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘনের বিষয়েও বোর্ড হুঁশিয়ারি দিয়েছে।
ভারতে বছরে অন্তত ৫০০০ মুসলিম হত্যা : ভারতের ন্যাশনাল ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরোর (এনসিআরবি) ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশটিতে প্রতি বছর প্রায় ২৮ হাজার ৫২২টি খুনের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়, যার একটি বড় অংশ সংখ্যালঘু মুসলিম সম্প্রদায়। যদিও এনসিআরবি ভুক্তভোগীদের ধর্মীয় পরিচয় প্রকাশ করে না, তবে গবেষকরা একটি ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরছেন। ভারতের বর্তমান জনসংখ্যায় মুসলিমদের হার প্রায় ১৫%। অপরাধবিজ্ঞানের সাধারণ সূত্র অনুযায়ী, মোট হত্যাকাণ্ডের অন্তত ১৫% মুসলিম হওয়ার কথা, যা সংখ্যায় প্রায় ৫০০০ জন। হিন্দুত্ববাদী জঙ্গিদের তাণ্ডবে খ্রিস্টানরাও কোণঠাসা হয়ে পড়েছে। এদিকে ‘দক্ষিণ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন’ (এসএজেসি) এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, ২০২৫ সালে ভারতে অন্তত ৫০ জন মুসলিম বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। সংস্থাটির ‘ইন্ডিয়া পার্সিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্যানুযায়ী, গত বছর রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কর্মীদের হাতে শিশুও নিহত হয়েছে।
‘ভোজশালা’কে মসজিদ নয়, মন্দির হিসাবেই মধ্যপ্রদেশ হাইকোর্টের ফয়সালা : ভারতের ধার জেলায় ‘ভোজশালা’ নামক একটি ঐতিহাসিক স্থাপনা, যেটিকে হিন্দুরা দেবী সরস্বতী মন্দির; অন্যদিকে মুসলিমরা কামাল মওলা মসজিদ বলে। ২০০৩ সাল থেকে হিন্দু সম্প্রদায়কে মঙ্গলবার ও বসন্ত পঞ্চমীতে পূজা করার এবং মুসলিম সম্প্রদায়কে শুক্রবার নামাজ আদায়ের অনুমতি দেওয়া হয়। ২০০৩, ২০১৩ এবং ২০১৬ সালে, যখন বসন্ত পঞ্চমী এবং শুক্রবার একই দিনে পড়েছিল তখন দুই পক্ষের মধ্যে সহিংসতা হয়। ২০২২ সালে হিন্দু ফ্রন্ট ফর জাস্টিস হিন্দু সম্প্রদায়কে নিয়মিত পূজা করার অধিকার প্রদান এবং চত্বরটিতে নামাজ নিষিদ্ধ করার জন্য হাইকোর্টে একটি পিটিশন দাখিল করেন। সম্প্রতি আদালত পিটিশনমতেই রায় দেয় এবং বলে ‘লন্ডন মিউজিয়াম থেকে দেবী সরস্বতীর মূর্তি ফিরিয়ে আনা এবং এই চত্বরে তা পুনঃস্থাপনের বিষয়ে ভারত সরকার বিবেচনা করতে পারে।’ মুসলিম পক্ষের আইনজীবী আশহার ওয়ারসি বলেন, ‘আদালত পূর্বে মসজিদ হিসেবে বিবেচিত স্থানটিকে মন্দির হিসেবে ঘোষণা করেছে যদিও সম্পত্তিটি প্রায় ৭০০ বছর ধরে মুসলিম সম্প্রদায়ের মালিকানাধীন। আমাদের বলা হয়েছে যে অন্যত্র জমি দেওয়া হবে। আমরা সিদ্ধান্তটি খতিয়ে দেখব এবং প্রয়োজনে সুপ্রিম কোর্টে যাব।’
UCC বিল পাস-মুসলিমদের উদ্বেগ : উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর হিমন্ত শর্মা সরকার ২৫ মে আসাম বিধানসভায় বিবাহ, তালাক, ওয়ারিশ সংশ্লিষ্ট UCC বিল পাস করেছে। রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের পরেই আইনটি চালু হবে। যদিও মুসলিম বিশ্বাস অনুযায়ী এগুলো শরিয়ার ভিত্তিতে করা বাধ্যতামূলক। মুখ্যমন্ত্রী বিশ্বশর্মা বলেন, ইউসিসি ‘এক দেশ, এক আইন’ নীতির ওপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছে। আসাম কংগ্রেসের কার্যনির্বাহী সভাপতি জাকির হোসেন সিকদার অভিযোগ করেছেন যে এই বিধি বিজেপির একটি রাজনৈতিক এজেন্ডা এএনআই-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন। বিশেষজ্ঞদের মতে, বাধ্যতামূলক ও অভিন্ন আইন ধর্মীয় স্বাধীনতার সাংবিধানিক অধিকারকে চরমভাবে লঙ্ঘন করে।
ভারতে মুসলমান নারী বিক্রির অ্যাপ : ঝা আর তার এক সহযোগী ‘কেশু’ তারা ইউটিউবের লাইভ অনুষ্ঠানে মুসলিম নারীদের নিলাম করেন। ক্লাবহাউস নামে এরকম একটি অডিও অ্যাপও রয়েছে। দলিত সম্প্রদায়ের এক তরুণ, নিজের পরিচয় দিলেন ‘এইচআর’ এই নামে। ‘তারা বলে দলিতরা হিন্দু নয় এবং হিন্দু ভারত গড়ে তোলার জন্য মুসলিম নারীদের ধর্ষণ করা যথার্থ। এমনকি শিশুহত্যাও’, টুইটার বার্তায় বিবিসিকে জানান এইচআর। ‘অতি উগ্রপন্থীরা মুসলিম ও খ্রিস্টান বিরোধী, তাদের মতে শিক্ষিত নারীরা যথেষ্টভাবে হিন্দু নয়।’ বলছেন লেখিকা সানিয়া সাইদ। মিজ পুনম বলেন, হিন্দুদের মধ্যে উগ্রপন্থার উত্থান ভারতের ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বিশাল একটা হুমকি। ‘সুল্লি’ কেনার এখনই সুযোগ। হাসিবা আমিন, বিরোধীদল কংগ্রেসের সোশ্যাল মিডিয়া সমন্বয়কারী বলেন, বেশ কয়েকটি অনলাইন আ্যাকাউন্ট থেকে নিয়মিত মুসলিম নারীদের টার্গেট করে বিদ্বেষী প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মিজ আমিন বলেন, এভাবে অনলাইনে মুসলিম নারীদের অপদস্থ করার ঘটনা এটাই প্রথম নয়। ঈদুল ফিতরের দিন ইউটিউবের একটি চ্যানেলে ‘ঈদ স্পেশাল’ নামে এক অনুষ্ঠানে ভারত ও পাকিস্তানের মুসলিম নারীদের নিলামে তোলা হয়েছিল। পেশাদার পাইলট, বিমানচালক হানা মোহসিন খানও ছিলেন ইউটিউবে নিলামে তোলা ঐ নারীদের একজন। ‘মানুষজন একেক নারীর জন্য পাঁচ রুপি, ১০ রুপি বিড করছিল। শরীরের বিভিন্ন অঙ্গের রেটিং করছিল, তাদের সাথে কাল্পনিক সংগমের রগরগে বর্ণনা দিচ্ছিল, ধর্ষণ করার হুমকি দিচ্ছিল’, বলেন হানা খান। আরো কয়েকটি টুইটার অ্যাকাউন্ট যার একটি নাম ছিল সুল্লিডিলস১০১। বিশ্বের দুশ’রও বেশি নামকরা অভিনেতা-অভিনেত্রী, সঙ্গীতশিল্পী, সাংবাদিক এবং সরকারি কর্মকর্তা ফেসবুক, গুগল, টিকটক এবং টুইটারের প্রধান নির্বাহীদের কাছে এক খোলা চিঠিতে নারীদের নিরাপত্তাকে ‘অগ্রাধিকার’ দেওয়ার অনুরোধ করেছেন। ‘ইন্টারনেট এখন একবিংশ শতাব্দীর টাউন স্কয়ার’,- তারা লিখেছেন, ‘এখানেই এখন সমাজ তৈরি হচ্ছে কিন্তু যে মাত্রায় অনলাইনে মেয়েদের অপমান-অপদস্থ করা হচ্ছে, তাতে নারীর জন্য এই টাউন স্কয়ার অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।’ ‘সুল্লি ডিলস’ নামে একটি অ্যাপ এবং ওয়েবসাইট ৮০ জনেরও বেশি মুসলমান নারীর প্রোফাইল তৈরি করে। সেখানে বলা হয় ‘ডিলস অব দ্য ডে’। ব্যবসায়িক পরিভাষায় কোনো একটি নির্দিষ্ট দিনে নির্ধারিত দামে সেরা অফারকে ‘ডিলস অব দ্য ডে’ বলে। বুল্লি বাই কিংবা সুল্লি ডিলস কোনো ক্ষেত্রেই, সত্যিকার অর্থে বেচাকেনা ছিল না, কিন্তু এর উদ্দেশ্য ছিল মুসলমান মহিলাদের হেনস্থা করা। সুল্লি শব্দটি একটি মানহানিকর হিন্দি স্ল্যাং, যা ভারতের উগ্রপন্থী হিন্দুরা মুসলমান নারীদের ট্রল করার জন্য ব্যবহার করে। বুল্লি শব্দের অর্থ নিন্দনীয়। এ ধরনের অ্যাপ গিটহাব নামে একটি ওয়েব প্ল্যাটফর্মের, মামলা হওয়ার পর গিটহাব কর্তৃপক্ষ এর কন্টেন্ট সরিয়ে দিয়েছে।
ভারতীয় সাংবাদিক ইসমত আরা- যার নাম এবং ছবি দেয়া হয়েছে বুল্লি বাই অ্যাপে, দিল্লি পুলিশের কাছে তিনি অজ্ঞাত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন। দেশটির জাতীয় মহিলা কমিশন টুইট করেছে যে সংস্থাটির চেয়ারপারসন দিল্লি পুলিশ কমিশনারকে এই মামলায় নেওয়া পদক্ষেপ সম্পর্কে ‘শিগগিরই’ সবাইকে জানাতে বলেছেন। ভারতে অনলাইন হয়রানি নিয়ে ২০১৮ সালের অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যেসব নারী যত বেশি সোচ্চার, তারা তত বেশি টার্গেট হচ্ছেন। ‘লাখ লাখ অ্যাকাউন্ট খুঁজে বের করার মত অর্থবল, জনবল বা সময় আমাদের কোনটাই নেই’, বলছেন মুম্বাইয়ের একজন উর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা ব্রজেশ সিং। অন্যদিকে বিবিসিকে মুম্বাই পুলিশের সাইবারসেল বিভাগের প্রধান রাশমি কারানদিকার বলেন আমরা বিষয়টি তদন্ত করছি তবে এখন পর্যন্ত বিষয়টির কোনো বিচার হয়নি। ‘পুলিশ যদি এই অপরাধীদের খুঁজে নাও পায়, আমি আদালতে যাবো’, বলেন হানা খান। ‘আমি এর শেষ দেখে ছাড়বো।’ লেখক এবং ভারতে অ্যামনেস্টির সাবেক মুখপাত্র নাজিয়া এরাম সুল্লি ডিলস ঘটনার পরে বিবিসিকে বলেছিলেন, ‘এই টার্গেটেড এবং পরিকল্পিত হামলার মাধ্যমে আসলে শিক্ষিত মুসলমান মহিলা যারা নিজেদের মতপ্রকাশ করেন এবং ইসলামোফোবিয়ার বিরুদ্ধে কথা বলেন, তাদের কন্ঠস্বর স্তব্ধ করে দেয়ার একটি প্রচেষ্টা।’ যদিও ক্যানাডার ইনস্টিটিউট অব স্ট্র্যাটেজিক ডায়ালগ যারা ভারতে উগ্রবাদীদের আচরণ নিয়ে গবেষণা করেছে নামে একটি সংস্থার জরিপ বলছে উগ্রপন্থায় ঝোঁকার পথ তৈরি করেছে মহামারি কোভিড-১৯। কারণ লাখ লাখ মানুষ অনলাইনে প্রচুর সময় কাটিয়েছে।
‘পার্টিশান হররস্ রিমেমব্রান্স ডে’ : ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী দেশভাগের বিভীষিকাকে মনে করিয়ে দিতে ১৪ অগাস্ট দিনটি ‘পার্টিশান হররস্ রিমেমব্রান্স ডে’ হিসাবে পালন করার কথা বলছেন। ঘটনাচক্রে দেশভাগের ঠিক আগে কলকাতায় যে দাঙ্গা হয়েছিল ১৯৪৬ সালের অগাস্টে, যা গ্রেট ক্যালকাটা কিলিংস নামে ইতিহাসে পরিচিত, সেই ঘটনার কথাও সম্প্রতি সামনে এনেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। যদিও বাঙালি উদ্বাস্তুদের জয়েন্ট অ্যাকশান কমিটির সর্বভারতীয় সভাপতি সুকৃতি রঞ্জন বিশ্বাস বলছিলেন দেশভাগের সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়ে লর্ড মাউন্টব্যাটেন, জওহরলাল নেহরু আর মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ একমত হতে পারেননি, যার ফল দেশভাগ। দেশভাগের আগে ঢাকায় বসবাস করতেন এমন একটি পরিবারের সদস্য অঞ্জলি সরকার বিবিসিকে বলেছিলেন, তার চোখে দেখা একটি ঘটনার কথা। ‘ঢাকা শহরে আমরা যেখানে থাকতাম, সেটা পুরোটাই হিন্দু পাড়া। একটি শুধু মুসলমান বাড়ি ছিল, তারাও খুবই নিম্নমধ্যবিত্ত পরিবার। একদিন দেখলাম আমারই এক মামা তার বন্ধ-ুবান্ধবদের নিয়ে কেরোসিন ঢেলে ওদের বাড়িটা জ্বালিয়ে দিল’। আর দেশভাগ এবং উদ্বাস্তুদের নিয়ে গবেষণামূলক কাজ করেন নাজেস আফরোজ বলেন, ‘আমার গবেষণার কাজে যখন বাংলাদেশে গিয়েছিলাম, সেখানে খালেদ হোসেইন নামে এক আইনজীবীকে পাই, তাদের আদি বাড়ি ছিল বিহারের পাটনায়। ৪৭ সালে তার বাবার বয়স ছিল ১০-১১ বছর।’ ‘তার বাবা আমাদের বলেছিলেন যে তাদের পরিবারের পুরুষদের হত্যা করা হয়েছিল এবং মহিলারা নিজেদের সম্মান রক্ষার্থে কুয়ায় ঝাঁপ দিয়েছিলেন। তারা দুই ভাই এক কাকার সঙ্গে পালিয়ে পূর্ব পাকিস্তানে গিয়ে প্রাণে রক্ষা পান।’
গবেষণা সংস্থা ‘ইন্ডিয়াস্পেন্ড’-এর তথ্যানুযায়ী, সহিংসতায় ভারতে নিহতদের প্রায় ৮৬ শতাংশই মুসলিম। অথচ এই পদ্ধতিগত এবং সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়া হত্যাকাণ্ডগুলোকে ভারতীয় সরকার ও গণমাধ্যমগুলো অনৈতিকভাবে ‘বিচ্ছিন্ন ঘটনা’ হিসেবে উপস্থাপন করে। দেশজুড়ে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর অত্যাচার নিয়ে উদ্বেগজনক তথ্য সামনে এনেছে ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার (আইপিটি)। সংস্থাটির প্রকাশিত রিপোর্টমতে ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল, শুধু এই চার মাসে দেশের আটটি রাজ্যে হিন্দুচরমপন্থীদের হামলায় অন্তত ১৩ জন মুসলিমের মৃত্যু হয়েছে। সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইনের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত এই সংস্থার রিপোর্টে বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ১২টি রাজ্যে মুসলিমদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক হিংসার ঘটনা ঘটেছে। পাশাপাশি ১৮টি রাজ্যে বিদ্বেষমূলক অপরাধ, হুমকি ও ভয় দেখানোর একাধিক অভিযোগ সামনে এসেছে। একই সময়ে খ্রিস্টান সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধেও আক্রমণ ও বৈরিতার ঘটনা বেড়েছে বলে দাবি করা হয়েছে রিপোর্টে। প্রায় হাজার বছরের মুসলিম শাসনের ভারতজুড়ে মুসলিম সংখ্যালঘুদের ওপর হিন্দুত্ববাদীদের যে গণহত্যা চলছে তা বন্ধ করতে বিশ্ববাসীকে এগিয়ে আসতে হবে।
তথ্যসূত্র : কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস ও মুসলিম মিরর, আল-জাজিরা, নিউইয়র্ক টাইমস, গার্ডিয়ান, বিবিসি।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : alhelaljudu@gmail.com