আমলাদের গ্রাসে বাজেট

বেতন-ভাতা গিলে খাচ্ছে উন্নয়ন ব্যয়


১৬ জুলাই ২০২৬ ১০:৩২

॥ উসমান ফারুক ॥
একটি দেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মূল চালিকাশক্তি হলো তার উন্নয়ন ব্যয় বা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। কিন্তু বাংলাদেশের বাজেট ব্যয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকার উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে প্রশাসনের রুটিন বা পরিচালন ব্যয় মেটাতেই বেশি ব্যস্ত। মোট ব্যয়ের সিংহভাগই চলে যাচ্ছে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের; বিশেষ করে আমলাতন্ত্রের বিশাল বহরের বেতন, ভাতা এবং পেনশন বাবদ। বেতন-ভাতা বাবদ সরকারি ব্যয় যেভাবে জ্যামিতিক হারে বাড়ছে, তা সামগ্রিক বাজেট ব্যবস্থাপনাকে এক ধরনের কাঠামোগত ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে। এক বছরেই শতভাগের চেয়ে বেতন বৃদ্ধি ইতিহাসে বিরল। মূল্যস্ফীতির চেয়ে বেশি হারে প্রতি বছরেই বাড়ছে বেতন-ভাতা। অথচ সেবার মান বাড়ছে না।
সরকারি সেবা পেতে ঘুষ ও দুর্নীতি লাগামহীনভাবে বাড়ছে। সর্বশেষ বেতন-ভাতা শতভাগের চেয়ে বেশি বাড়ানোর পথে চলেছে সরকার। এর ফলে প্রতি বছরই কমে যাচ্চে উন্নয়ন ব্যয়। তাতে বাড়ছে বেকরাত্ব ও দারিদ্র্য। হচ্ছে না শিল্পায়ন। একসময়ে দেখা যাবে, আমলাদের বেতন দিতে হবে ঋণ করে। এজন্য কর্মচারীর বহর কমিয়ে লিন এন্ড মিন অর্থাৎ আকারে ছোট কিন্তু দক্ষ প্রশাসন গড়ে তোলা আবশ্যক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
৫ বছরের বাজেটে বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দের জোয়ার
একটি আদর্শ অর্থনীতিতে উন্নয়ন ব্যয়ের পাল্লা ভারী হওয়া উচিত। কারণ এর মাধ্যমে রাস্তাঘাট, সেতু, বিদ্যুৎ কেন্দ্র ও মানবসম্পদ উন্নয়ন হয়, ভবিষ্যতে এর ফলাফল আসে সামষ্টিক অর্থনীতিতে। কিন্তু বাংলাদেশে ঘটছে উল্টো। উৎপাদনশীল, কর্মসংস্থান ও জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ায় বিগত কয়েক বছরে দেখা গেছে, যখনই সরকারের রাজস্ব আয় কমে যায় বা অর্থনৈতিক সংকট তৈরি হয়, সরকার সবার আগে কোপ বসায় উন্নয়ন বাজেটে। কিন্তু আমলাদের বেতন-ভাতা ও পরিচালন ব্যয় এক টাকাও কমানো হয় না। ফলে জনগণের করের টাকায় উন্নয়ন কম হচ্ছে, কিন্তু সরকারি আমলাদের সুযোগ-সুবিধা রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি হচ্ছে না।
গত পাঁচ অর্থবছরের বাজেট বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা খাতে বরাদ্দের পরিমাণ প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছিল প্রায় ৭৩ হাজার ১৭৩ কোটি টাকা, যা ছিল মোট বাজেটের প্রায় ১০.৭ শতাংশ। পরের অর্থবছর ২০২৩-২৪তে মূল্যস্ফীতি ও ৫ শতাংশ বিশেষ প্রণোদনার কারণে এই ব্যয় লাফিয়ে বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৮১ হাজার ৫৮৫ কোটি টাকায়। এটি মোট বাজেটের ১০.৬ শতাংশ।
২০২৪-২৫ অর্থবছর নাগাদ বেতন-ভাতার আকার আরও বৃদ্ধি পেয়ে ৮৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যায়। অর্থবছর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা আরো বেড়ে যায়। সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং তাদের পেনশন ও আনুতোষিক মিলে সামগ্রিক ব্যয় এখন বছরে প্রায় ৯৫ হাজার কোটি থেকে ১ এক লাখ কোটি টাকার ঘরে স্পর্শ করেছে, যা মোট জাতীয় বাজেটের প্রায় ১১.৫ শতাংশ থেকে ১২ শতাংশ হয়।
গত ৫ বছরে দেখা গেছে, প্রতি বছর গড়ে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয় ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার কোটি টাকা করে বাড়ছে। এই খাতে ব্যয় বৃদ্ধির হার প্রায় ২৫ শতাংশ থেকে ৩০ শতাংশ। পেনশনের হিসাব যোগ করলে এটি আরো বেড়ে যাবে। এভাবে সরকারের মোট পরিচালন ব্যয়ের প্রায় ২৮ থেকে ৩০ শতাংশ সরাসরি চলে যায় সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন ও ভাতায়। এর সাথে অবসরপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পেনশন ও আনুতোষিক, যা মূলত সামাজিক নিরাপত্তা খাতের নামে চালানো হয়, কিন্তু আসলে আমলাতান্ত্রিক ব্যয়েরই অংশ যোগ করা হয়, তবে এই হার ৪০ শতাংশ ছাড়িয়ে যায়।
জিডিপির অনুপাতে বেতন-ভাতার চিত্র সামষ্টিক অর্থনীতির অন্যতম সূচক হলো মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অনুপাতে সরকারি ব্যয়ের হার। সাধারণত বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশে জিডিপির অনুপাতে রাজস্ব আয় এখনো ১০ শতাংশের নিচে। প্রতি বছর জিডিপির আকার বাড়ার সাথে সাথে এই ব্যয়ের আপেক্ষিক অনুপাত কিছুটা স্থিতিশীল দেখালেও, টাকার অঙ্কে এর প্রবৃদ্ধি এতটাই বেশি যে এটি সরকারের কর রাজস্বের একটি বিশাল অংশ একাই গিলে খাচ্ছে। কর-জিডিপি অনুপাত যেখানে স্থবির, সেখানে বেতন-ভাতা বাবদ ব্যয়ের এই প্রবৃদ্ধি বাজেটের ঘাটতিকে আরও বাড়িয়ে তুলছে।
বেতন বৃদ্ধির মূল কারণ
সরকারি কর্মচারীদের নিজেদের পক্ষে আনতে নিয়মিত বিরতিতে মূল বেতনের সাথে ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে বিশেষ প্রণোদনা বা মহার্ঘ ভাতা যোগ করছে, যা স্থায়ীভাবে পরিচালন ব্যয় বাড়িয়ে দিচ্ছে। সরকারি চাকরিজীবীদের অবসরে যাওয়ার বয়স এবং গড় আয়ু বাড়ার কারণে পেনশনের আওতাভুক্ত মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। বিশাল অঙ্কের পেনশন ও গ্র্যাচুইটি দিতে গিয়ে পরিচালন বাজেট প্রতি বছর চাপে পড়ছে। পরিচালন ব্যয়ের আরেকটি বড় কারণ হলো অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের সুদ পরিশোধ। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও অদক্ষতার কারণে অনেক প্রকল্প সময়মতো শেষ হয় না। ফলে ঋণের সুদ বেড়ে যায়, যা পরিচালন ব্যয়কে আরও উসকে দেয়।
টেকসই সংস্কারের সময় এখনই আমলাদের বেতন-ভাতা বাড়ানো দেশের সার্বিক অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। কারণ এর বিপরীতে সরকারি সেবার মান বাড়েনি। সাধারণ মানুষকে এখনো সরকারি অফিসে গিয়ে ঘুষ বা হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে। যদি পরিচালন ব্যয়ের এই লাগামহীন ঘোড়াকে এখনই টেনে ধরা না যায়, তবে আগামী কয়েক বছরে বাংলাদেশ গভীর বাজেট সংকটে পড়বে। একপর্যায়ে উন্নয়ন বাজেট শূন্যের কোটায় নেমে আসবে এবং সরকারকে শুধু সরকারি কর্মচারীদের বেতন দেওয়ার জন্যই দেশি-বিদেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নিতে হবে।
পরিচালন ব্যয় ক্রমাগত বাড়ার পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হলো বিলাসবহুল আমলাতন্ত্র ও অযৌক্তিক সুযোগ-সুবিধা। গ্রেড-১ থেকে শুরু করে সিনিয়র সচিবদের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি কেনা, সেই গাড়ির রক্ষণাবেক্ষণ ও জ্বালানি বাবদ প্রতি মাসে বিশাল অঙ্কের অর্থ নগদ আকারে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া আবাসন সুবিধা, বিদেশ ভ্রমণ এবং নানা ধরনের উৎসব ও বিশেষ ভাতার ছড়াছড়ি পরিচালন ব্যয় বাড়াচ্ছে। অপ্রয়োজনীয় পদ সৃষ্টিও আরেকটি প্রধান কারণ। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে প্রয়োজন না থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক বা বিশেষ বিবেচনায় পদোন্নতি দিয়ে ইনসুটি (পদ না থাকলেও একই পদে বহাল রাখা) করে রাখা হচ্ছে। পদ বাড়ার সাথে সাথে গাড়ি, অফিস ও প্রটোকল খরচ বাড়ছে।
একটি স্বাধীন পাবলিক এক্সপেন্ডিচার রিভিউ কমিশন গঠন করে আমলাদের অতিরিক্ত সুযোগ-সুবিধা ছাঁটাই করতে হবে। অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনা করে জনসংখ্যার তুলনায় আমলাদের পদ সংখ্যা ও বেতন-ভাতার গ্রহণযোগ্য হার ঠিক করা প্রয়োজন। প্রশাসনের শূন্য পদ এবং অপ্রয়োজনীয় পদ বিলুপ্ত করে লিন এন্ড মিন অর্থাৎ আকারে ছোট ও দক্ষ প্রশাসন গড়ে তুলতে হবে।
অর্থনীতির জন্য এক অশনিসংকেত
গত কয়েক বছর ধরে প্রশাসনিক ব্যয় যে হারে বাড়ছে, তাতে দেখা যাচ্ছে পরিচালন ব্যয়ের একটি বড় অংশই এই আমলাতন্ত্রের পেছনে চলে যায়। যেখানে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান নিয়ে টানাটানি, সেখানে সরকারি চাকুরেদের বেতন ১০০ শতাংশের বেশি বাড়ানো বৈষম্যমূলক। এটি বৈষম্যর বড় উদাহরণ। এবারের বাজেটে সেই কাজটি করেছে বিএনপি সরকার। আমলাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে ঘুষ হিসেবে বেতন বাড়ানোর দিকে গিয়েছে সরকার। সাধারণত পে-স্কেলগুলোয় বেতন ১০-২০ শতাংশ হারে বাড়ে, কিন্তু এক লাফে মূল বেতন দ্বিগুণেরও বেশি হওয়া বাংলাদেশের ইতিহাসে বিরল। যেখানে জিডিপির প্রবৃদ্ধি গড়ে ৬-৭ শতাংশের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে, সেখানে বেতন-ভাতা এক বছরেই ১০০ শতাংশের বেশি বাড়ছে। এটি জাতীয় আয়ের সাথে ব্যয়ের ভারসাম্যে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি করছে।
অর্থনীতিবিদ, গবেষক ও বিশ্লেষকরা বলছেন, যখন পরিচালন ব্যয় প্রয়োজনীয় উন্নয়ন ব্যয়কে ছাড়িয়ে যেতে শুরু করে, তখন সেই দেশের দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়। আমলাদের বেতন-ভাতা বাড়িয়ে তাদের তুষ্ট করা গেলেও, এর ফলে যদি উন্নয়ন বাজেট সংকুচিত হয় এবং মুদ্রাস্ফীতি বাড়ে। তবে সাধারণ জনগণের মধ্যে ক্ষোভ দানা বাঁধে। যেকোনো সময়ে সেই ক্ষোভ রাজপথে নেমে আসবে। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকারকে কেবল বেতন বাড়ানো নয়, বরং প্রশাসনিক স্বচ্ছতা এবং উন্নয়ন প্রকল্পের গুণগতমান নিশ্চিত করার দিকেও নজর দিতে হবে। এটিই আগে প্রয়োজন।
করোনা মহামারি ও আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটে অর্থনীতি এখনো ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে সোজা দাঁড়াতে পারেনি। অর্থনীতির সেই চাপের মুখে সারা বাংলাদেশের সব শ্রেণির মানুষ কষ্টে আছে। আমলাদেরও সেই কষ্টের ভাগিদার হতে হবে। এখন সবার আগে প্রয়োজন টেকসই সংস্কার। তারপর সুযোগ-সুবিধা বাড়ানোর দিকে মনোযোগ দেওয়া যেতে পারে। কারণ এই বিশাল পরিচালন ব্যয়ের বোঝা সাধারণ করদাতার কাঁধেই এসে পড়ে। তাই জনগণের করের টাকার সঠিক ব্যবহার করতে হবে সরকারকে।