হজরত আয়েশা (রা.) বিনতে হজরত আবু বকর (রা.)


৮ জুলাই ২০২৬ ১৮:৩৫

॥ মনসুর আহমদ ॥
হজরত আয়েশা (রা.) ছিলেন মুহাম্মদ (সা.)-এর ঘনিষ্ঠ বন্ধু হজরত আবু বকর (রা.) এবং উম্মে রুম্মানের কন্যা। তিনি মক্কায় ৬১৪ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
প্রথমে বিশিষ্ট সাহাবি  জুবায়ের ইবনে মুতিমের  হজরত জুবায়ের ইবনে মুত’ইম (রা.)-এর সাথে উম্মুল মুমিনীন হজরত আয়শা (রা.)-এর বিয়ের বাগদান বা বাগনিশ্চয়তা (Engagement) হয়েছিল । জুবায়ের ইবনে মুতিম একজন মুসলমান, কিন্তু তাঁর পিতা পৌত্তলিক হলেও তিনি মুসলমানদের প্রতি বন্ধুত্বপূর্ণ ছিলেন। হজরত থাওলা বিনতে হাকিম যখন রাসূল (সা.)-এর প্রথম স্ত্রী হজরত খাদিজার ইন্তেকালের পর রাসূল (সা.)-কে হজরত আয়েশাকে বিবাহের পরামর্শ দিয়েছিলেন, তখন ইবনে মুতিমের সঙ্গে হজরত আয়েশার পূর্ববর্তী সাধারণ সম্মতিক্রমে বাদ দেওয়া হয়েছিল। অন্য একটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে,‘ বাগদান হয়েছিলো হজরত আবু বকর ইসলাম গ্রহণের আগে।   পরবর্তীতে হজরত আবু বকর (রা.) ইসলাম গ্রহণ করলে মুত’ইম ইবনে আদির পরিবার চিন্তিত হয়ে পড়ে। জুবায়েরের মা আশঙ্কা প্রকাশ করেন যে, আয়শা তাঁর ঘরে আসলে তাঁর ছেলে জুবায়েরও নিজের ধর্ম ত্যাগ করে মুসলমান হয়ে যেতে পারে। এই আশঙ্কায় জুবায়েরের পরিবার স্বেচ্ছায় এই বিয়ের সম্পর্কটি ভেঙে দেয় এবং বাগদান বাতিল করে।

রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-তাঁর চার বন্ধু সাহবীকে যারা খোলাফায়ে রাশেদা হিসেবে পরিচতি ছিলেন তাঁদের বিবাহ সম্পর্ক স্থাপনের মাধ্যমে গভীর সম্পর্কে আবদ্ধ করেছিলেন। তিনি হজরত আবু বকর ও হজরত ওমরের কন্যা হজরত আয়েশা ও হজরত হাফসা (রা.)-কে বিবাহ করেন এবং তিনি তাঁর কন্যা হজরত উসমান ও হজরত আলীর সাথে বিবাহ দেন। এখানে উল্লেখ্য যে, তাঁর স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র হজরত আয়েশা (রা.) কুমারী ছিলেন।
রাসূলের স্ত্রীগণের মধ্যে একমাত্র হজরত আয়েশা (রা.)-এর বয়স নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। বেশিরভাগ ঐতহ্যবাহী সূত্রে বলা হয়েছে, হজরত আয়েশা পাঁচ বছর বয়সে জুবায়ের ইবনে মুতিমের সাথে তাঁর ব্যর্থ বাগদানের পর ছয় বা সাত বছর বয়সে মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে আবদ্ধ হন এবং ৯ বছর বয়স পর্যন্ত, আবার ইবনে হিশামের মতে দশ বছর বয়স পর্যন্ত পিতা-মাতার বাড়িতে অবস্থান করেন।
যখন রাসূল (সা.)-এর সাথে মদিনায় তাঁর বিবাহ সম্পন্ন হয়, তখন রাসূল (সা.)-এর বয়স ৫৩ বছর। বিবাহকালে হজরত আয়েশার বয়স একটি বিতর্কের উৎস ছিল। অনেক অমুসলিম ঐতিহাসিক, ইসলামী স্কলার এবং মুসলিম লেখক তাঁর জীবনের পূর্বে গৃহীত সময় রেখাকে চ্যালেঞ্জ করে এই দাবি করেছেন, আসলে হজরত আয়েশার (রা.) যখন রাসূলুল্লাহর (সা.) সাথে বিবাহ সম্পন্ন হয়, তখন হজরত আয়েশার (রা.) বয়স ছিল ১৮-১৯ বছর।
হজরত আয়েশা (রা.) একজন আলেম হিসেবে সর্বমহলে পরিচিত ছিলেন। রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর দীন প্রচারে তাঁর অবদান ব্যাপক ছিল এবং তিনি রাসূলের ইন্তেকালের পর মুসলিম সম্প্রদায়ের খেদমত করেছিলেন। তিনি ২২১০টি হাদিস বর্ণনা করার জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। তাঁর বর্ণিত হাদিসসমূহ শুধু রাসূল মুহাম্মদ (সা.)-এর ব্যক্তিগত জীবনের সাথে সম্পর্কিত বিষয়গুলোতেই নয়, অন্য বিষয়গুলোর মধ্যে বিবাহ, ইসলামিক উত্তরাধিকার, হজ এবং ইসলামী শিক্ষাতত্ত্বের বিষয়সমূহও অন্তর্ভুক্ত ছিল।
কবিতা ও চিকিৎসাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর প্রজ্ঞা এবং জ্ঞানের জন্য তিনি অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন, যা এতিহ্যবাদী আল- জুহরী এবং তাঁর ছাত্র উরওয়া ইবনে আল-জুবায়ের কর্তৃক প্রচুর প্রশংসিত হয়েছিল।
হজরত আয়েশা (রা.) একজন সেনাপতির ভূমিকা পালন করেছিলেন, যিনি প্রথম ফেতনার সময় হাজার হাজার মুসলমানকে যুদ্ধে নেতৃত্ব প্রদান করেছিলেন।
হজরত আয়েশা বিনতে আবু বকর (রা.) একজন মুহাদ্দিস, রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাসূল (সা.)-এর সর্বকনিষ্ঠ স্ত্রী। হজরত আয়েশা (রা.), রাসূল (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং ইন্তেকালের পরও ইসলামী ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। সুন্নি ঐতিহ্যে তাঁকে বুদ্ধিমান, অনুসন্ধিৎসু এবং বিজ্ঞ স্কলার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তাঁকে হজরত খাদিজা বিনতে খুয়াইলিদের পরে রাসূল (সা.)-এর সবচেয়ে প্রিয়তমা স্ত্রী হিসেবে বর্ণনা করা হয়।
হজরত আয়েশা (রা.) তাঁর পাণ্ডিত্যপূর্ণ অবদানের পাশাপাশি প্রাথমিক মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক এবং রাজনৈতিক বিষয়ে জড়িত ছিলেন। যে সময় মহিলাদের সীমিত জনসাধারণের ভূমিকার কারণে মহিলাদের জন্য খেলাফতের বিষয়সহ বভিন্ন রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া সম্ভব ছিল না, তখন হজর আয়েশা (রা.) খেলাফত সংক্রান্ত বিষয়, ধর্মীয় জ্ঞান প্রচারের পাশাপাশি জংগে জামালসহ প্রধান প্রধান অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছিলেন। এছাড়া তিনি বেশ কয়েকজন সাহাবী এবং তাবেঈনদের শিক্ষক হিসেবে সম্মানের উচ্চ স্থান অধিকার করেছিলেন।
রাসূল (সা.) বলেছেন, তিনি তাঁর স্বপ্নে দুবার হজরত আয়েশাকে দেখেছিলেন, একজন ফেরেশতা তাঁকে রেশমের কাপড়ে বহন করেছিলেন এবং বলেছিলেন যে তিনি তাঁর স্ত্রী হবেন। রাসূল (সা.) বিশ্বাস করতেন যে যদি স্বপ্নগুলো আল্লাহর কাছ থেকে এসে থাকে তবে সেগুলো সত্য হবে।
রাসূলের (সা.) প্রথম স্ত্রী খাদিজার (রা.) ইন্তেকারের পর, তাঁর খালা খাওলা বিনতে হাকিম রাসূলকে (সা.) হজরত আয়েশাকে (রা.) বিবাহ করার পরামর্শ প্রদান করেন। কিন্তু হজরত আবু বকর (রা.) প্রথমে তাঁর কন্যাকে রাসূল (সা.)-এর সাথে বিবাহ প্রদানের ব্যাপারে দ্বিধাগ্রস্ত ছিলেন, তিনি ভেবেছিলেন তাঁরা ভাই। এ অবস্থায় রাসূল (সা.) স্পষ্ট করে দিলেন যে তাঁরা কেবল ধর্মীয়ভাবে ভাই, সে কারণে আয়েশাকে বিবাহ করা তাঁর জন্য বৈধ।
প্রাচ্যবিদ মন্টোগোমারী ওয়াট মত প্রকাশ করেন যে, মুহাম্মদ (সা.) হজরত আবু বকরের সাথে তাঁর সম্পর্ক জোরদার করার আশা করেছিলেন; সে সময় আরব সংস্কৃতিতে সম্পর্ক বন্ধনের দৃঢ়তা বিবাহের ভিত্তি হিসেবে প্রধানত কাজ করত।
ইসলামী শাস্ত্র সূত্রমতে মুহাম্মদ (সা.)-এর সাথে বিবাহের বয়স ছিল ছয় এবং পরিসমাপ্তির বয়স ৯ বছর। সহীহ আল-বুখারীর একটি হাদিসে বলা হয়েছে হজরত আয়েশার ছয় বছর বয়সে বিবাহ সম্পন্ন হয়।
ইবনে সাদের জীবনীতে বিয়ের সময় তাঁর বয়স ছয় থেকে সাতের মধ্যে ধরা হয়েছে এবং তাঁর বিবাহের শেষ সময় ৯ বছর উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসলামী সাহিত্যে তাঁর বিবাহের অল্প বয়সের বিষয়টি কোনো উল্লেখযোগ্য আলোচনার জন্ম দেয়নি; তবুও স্পেলবার্গ এবং আমীর আলী তাঁর বয়সের উল্লেখকে প্রাথমিক মুসলিম জীবনীকারদের কাছে অস্বাভাবিক বলে মনে করেন এবং তাঁর কুমারিত্ব এবং তার চেয়েও বেশি ধর্মীয় পবিত্রতার একটি অর্থ অনুমান করেন।
তাঁর বয়স নিয়ে পরবর্তী মুসলিম পণ্ডিতদেরও কোনো জটিলতায় জড়ায়নি। এমনকি মধ্যযুগীয় এবং প্রাথমিক- আধুনিক খ্রিস্টান বিতর্কবিদদের কাছেও একটি অপ্রত্যাশিত বিষয় ছিল।
প্রাথমিক প্রাচ্যবিদ লেখকেরা; এমনকি রাসূল (সা.) এবং ইসলামের প্রতি তাদের অবজ্ঞাপূর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যেও রাসূলের বহু বিবাহ গ্রহণ এবং রাজনৈতিক কারণে বিবাহের নীতি নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিলেন। হজরত আয়েশার (রা.) বয়স নিয়ে আলোচনাকারী কয়েকজন কোনো নিন্দা ছাড়াই বেছে নিয়ে ছিলেন বয়সের ব্যবধান ব্যাখা করতে- বেছে নিয়েছিলেন প্রাচ্যের সমসাময়িক বোঝাপড়াকে একটি বিতর্কিত বিষয় হিসেবে, যা যৌন বিচ্যুত অনুশীলন প্রচার করেছিল।
ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষের দিকে, প্রাচ্য এবং এর কথিত অনৈতিকতা ক্রমবর্ধমান নিন্দনের বিষয় হয়ে ওঠার সাথে উপনিবেশবাদী শক্তিগুলো সম্মতির বয়স নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা চালিয়ে ছিল, যে প্রচেষ্টার ধারা আজও অব্যাহত রয়েছে।
এখানে একটি বিষয় উল্লেখ করা অনৈতিক হবে না যে, স্থান-কালের পরিবর্তনের সাথে রাজনৈতিক ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চিন্তায়ও পরিবর্তন ঘটে।
এই যে কিছু বছর আগের ঘটনা, রাজা রাম মোহন রায় বিবাহ করেছিলেন ৯ বছর বয়সে তাঁর চেয়ে কম বয়সের রানী দেবীকে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর বিয়ে করে ছিলেন চৌদ্দ বছর বয়সে তাঁর চেয়ে কম বয়সের সারদা দেবীকে। বঙ্কিমচন্দ্র ১১ বছর বয়সে বিবাহ করেন পাঁচ বছর বয়সের একটি কন্যাকে, ঈশ্বচন্দ্র বিবাহ করেন ১৪ বছর বয়সে আট বছর বয়সী এক কন্যাকে এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২২ বছর বয়সে বিবাহ করেছিলেন ৯ বছরের মৃণালিনী দেবীকে। ইতিহাসে এমন আরও দৃষ্টান্ত রয়েছে যাকে কেউ দোষণীয় মনে করেননি বা এ নিয়ে কেউ কছু বলার প্রয়োজন মনে করেননি।