প্রেরণার বাতিঘর শহীদ প্রেসিডেন্ট ড. মুহাম্মদ মুরসি
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:৪৫
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
॥ সাত ॥
এক মায়ের আর্তনাদ : লুৎফির শেষ বিদায়
লুৎফি ইব্রাহিম ইসমাইল খলিলের শাহাদাতের পর তার বাবা-মায়ের প্রতিক্রিয়া পৃথিবীর অগণিত মানুষকে স্তব্ধ, বিস্মিত ও ব্যথিত করেছিল। সন্তানের মৃত্যুর সংবাদে একজন মায়ের হৃদয় যে কীভাবে ভেঙে চুরমার হয়ে যায়, আর একজন বাবা কীভাবে বুকের ভেতর সেই শূন্যতা বহন করেন— লুৎফির বাবা-মায়ের বেদনা যেন তারই এক মর্মস্পর্শী প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল।
একজন মা তার সন্তানকে শুধু জন্ম দেন না; তিনি তাকে নিজের শরীরের অংশ করে পৃথিবীতে আনেন। দশ মাস গর্ভে ধারণ করেন, বুকের দুধে লালন করেন, অসংখ্য নির্ঘুম রাত পার করে তাকে বড় করে তোলেন। সন্তানের ছোট্ট হাত ধরে তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেন। একদিন সেই সন্তান বড় হবে, জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে, মায়ের মুখে হাসি ফোটাবে— এই স্বপ্নেই একজন মা তার জীবনের কত আনন্দ, কত আশা, কত প্রার্থনা সঞ্চয় করে রাখেন।
কিন্তু সেই সন্তান যখন মায়ের কোল ছেড়ে দীর্ঘদিনের জন্য কারাগারের অন্ধকারে হারিয়ে যায়, তখন মায়ের জীবনে নেমে আসে এক অন্তহীন প্রতীক্ষা। দিন যায়, মাস যায়, বছর যায়— কিন্তু সন্তানের কোনো দেখা নেই। কারাগারের ভেতর সে কীভাবে আছে, কী খাচ্ছে, কীভাবে রাত কাটাচ্ছে, নির্যাতনের শিকার হচ্ছে কি না— এই অজানা আশঙ্কা প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের হৃদয়কে বিদীর্ণ করতে থাকে। তারপর একদিন সেই মায়ের কাছে আসে সবচেয়ে ভয়ংকর সংবাদ— তার সন্তানকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একজন মায়ের কাছে এর চেয়ে নির্মম সংবাদ আর কী হতে পারে? যে সন্তানকে তিনি মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করে পৃথিবীতে এনেছিলেন, রাষ্ট্রের মৃত্যুদণ্ডের আদেশে সেই সন্তানকেই শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া হলো। যে মুখে তিনি শৈশবে চুমু এঁকেছিলেন, যে কপালে হাত রেখে অসংখ্যবার দোয়া করেছিলেন, সেই মুখই একদিন কারাগারের অন্ধকার থেকে নিথর হয়ে ফিরে এলো। আর তারপর এলো সেই শেষ মুহূর্ত।
লুৎফির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর তার লাশ যখন পরিবারের কাছে পৌঁছায়, তখন তার মায়ের হৃদয়বিদারক আর্তনাদ যেন সমস্ত মানবিক বেদনার ভাষাকে অতিক্রম করে গিয়েছিল। তিনি আকুল কণ্ঠে প্রশ্ন করেছিলেন— ‘আমি কি আমার সন্তানকে জীবিত অবস্থায় শেষবারের মতো দেখার সুযোগটুকুও পাব না?’
কী নির্মম এক প্রশ্ন! একজন মা তার সন্তানের কাছে শেষবারের মতো যেতে চেয়েছিলেন। মৃত্যুর আগে একবার তাকে দেখতে চেয়েছিলেন। একবার তার মুখ স্পর্শ করতে চেয়েছিলেন। একবার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে বলতে চেয়েছিলেন— ‘বাবা, তুমি কেমন আছ?’
কিন্তু সেই সুযোগও তাঁকে দেওয়া হয়নি।
রাষ্ট্রের নিষ্ঠুরতার কাছে একজন মায়ের এই সামান্য অধিকারটুকুও যেন অগ্রাহ্য হয়ে গেল। শেষ পর্যন্ত যখন তার সন্তানের নিথর দেহ তার সামনে এসে পৌঁছাল, তখন আর কোনো কথা ছিল না। ছিল শুধু অশ্রু। ছিল বুকফাটা আর্তনাদ। ছিল সেই অসহনীয় শূন্যতা, যে শূন্যতা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
মা শেষবারের মতো তার সন্তানের লাশের ওপর ঝুঁকে পড়লেন। সন্তানের মুখে চুমু দিলেন। অশ্রুসিক্ত চোখে তাকিয়ে রইলেন সেই মুখের দিকে— যে মুখ একদিন তার কাছে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে প্রিয় মুখ। তারপর ঝরে পড়ল তার অশ্রু।
সেই অশ্রু শুধু একজন মায়ের চোখের পানি ছিল না। সেটি ছিল একজন মায়ের হারিয়ে যাওয়া স্বপ্নের অশ্রু; একটি পরিবারের ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়ার অশ্রু; একজন তরুণের অসমাপ্ত জীবনের অশ্রু; আর ছিল এমন এক বিচারের বিরুদ্ধে নীরব অভিযোগ, যার রায়ে একটি জীবন থেমে গেলেও একটি মায়ের মাতৃত্ব থেমে যায়নি।
পৃথিবীর শত শত কামানের গোলার শব্দ হয়তো একসময় স্তব্ধ হয়ে যায়। যুদ্ধের ময়দানে বিস্ফোরণের প্রতিধ্বনিও একদিন মিলিয়ে যায়। কিন্তু একজন মায়ের বুকফাটা কান্নার যে শব্দ— তার কোনো শেষ নেই।
সন্তান হারানো মায়ের চোখের একটি অশ্রুবিন্দু কখনো কখনো হাজার বক্তৃতার চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সেই অশ্রু প্রশ্ন করে— একজন মায়ের অপরাধ কী ছিল? একজন তরুণের অপরাধ কী ছিল? আর একটি জীবন কেড়ে নেওয়ার পরও কি সত্যিই কোনো রাষ্ট্র মানুষের বিবেককে মৃত্যুদণ্ড দিতে পারে?
লুৎফির মা হয়তো তার সন্তানকে ফিরে পাননি। তার স্বপ্নও আর পূর্ণ হয়নি। কিন্তু তার অশ্রু ইতিহাসের কাছে একটি সাক্ষ্য হয়ে রইল।
একজন মা তার সন্তানকে হারিয়েছেন। কিন্তু পৃথিবী পেয়েছে এক মর্মস্পর্শী প্রশ্ন— ক্ষমতার রায়ে কি একজন মানুষের জীবন শেষ হয়ে যায়, নাকি তার আত্মত্যাগের মধ্য দিয়েই শুরু হয় আরেকটি দীর্ঘ ইতিহাস?
এক সন্তানহারা বাবার আর্তনাদ
লুৎফি ইব্রাহিম ইসমাইল খলিলের বাবা এক সন্তানহারা পিতা। তার হৃদয়বিদারক আর্তনাদ ও অব্যক্ত বেদনার ভাষা বিশ্ব গণমাধ্যমে আলোড়ন তুলেছিল। তার বক্তব্যের প্রতিটি শব্দ যেন ছিল একেকটি অশ্রুবিন্দু; প্রতিটি বাক্য যেন ছিল একজন পিতার বুকচেরা আর্তনাদ। সেই আর্তনাদ শুনে পৃথিবীর অগণিত মানুষের চোখে নেমে এসেছিল অশ্রুর প্লাবন।
অত্যন্ত আবেগাপ্লুত কণ্ঠে তিনি বলেছিলেন— তার প্রিয় সন্তানকে ফাঁসি দেওয়া হবে, সেই সংবাদও তাঁকে আগে জানানো হয়নি।
যে সন্তান ছিল তার কলিজার টুকরা, যাকে তিনি জীবনের সর্বস্ব দিয়ে গড়ে তুলেছিলেন; যার শৈশবের প্রতিটি দিন, কৈশোরের প্রতিটি স্বপ্ন এবং ভবিষ্যতের প্রতিটি প্রত্যাশার সঙ্গে একজন পিতার জীবন জড়িয়ে ছিল— হঠাৎ একদিন সেই সন্তানকে ফাঁসির দড়িতে ঝুলিয়ে দেওয়া হলো।
একজন বাবা যখন সন্তানকে কোলে তুলে নেন, তখন তিনি শুধু একটি শিশুকে বুকে ধারণ করেন না; তিনি তার সঙ্গে একটি ভবিষ্যৎকে ধারণ করেন। লুৎফির বাবারও একটি স্বপ্ন ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, একদিন তার সন্তান বড় হবে, তার পাশে দাঁড়াবে, তার বার্ধক্যের অবলম্বন হবে। এমনকি জীবনের শেষ প্রান্তে যখন তার নিজের মৃত্যু আসবে, তখন তার প্রিয় সন্তানই হয়তো তার নিথর দেহ কাঁধে তুলে কবরস্থানে নিয়ে যাবে, পিতাকে কবরে শুইয়ে দেবে এবং তার রেখে যাওয়া পরিবার, বংশ ও উত্তরাধিকারের দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেবে।
একজন পিতা সন্তানের জন্মের দিন থেকে অজান্তেই এই স্বপ্ন বুনতে থাকেন। কিন্তু একটি ফাঁসির দড়ি মুহূর্তের মধ্যে সেই সমস্ত স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দিল।
সন্তানের মৃত্যুর সংবাদ শুনে সেই বাবা ছুটে গেলেন কারাগারের সামনে। সেখানে গিয়ে তিনি দেখলেন— যে সন্তানকে তিনি একদিন নিজের বুকে জড়িয়ে মানুষ করেছিলেন, সেই সন্তান আজ নিথর। প্রাণহীন দেহ পড়ে আছে তার সামনে।
কিছুক্ষণ হয়তো তিনি বিশ্বাসই করতে পারেননি— এ কি সত্যিই তার সন্তান? যে মুখে একদিন তিনি জীবনের প্রথম হাসি দেখেছিলেন, যে কপালে অসংখ্যবার স্নেহের চুম্বন এঁকেছিলেন, যে চোখে তিনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছিলেন— আজ সেই মুখ নিথর, সেই চোখ বন্ধ, সেই বুক আর উঠানামা করছে না।
তিনি সন্তানের দিকে তাকিয়ে ছিলেন। সেই তাকিয়ে থাকার মধ্যে কোনো ভাষা ছিল না; অথচ সেই নীরবতাই যেন পৃথিবীর সবচেয়ে দীর্ঘ বক্তৃতা হয়ে উঠেছিল। সেখানে ছিল একজন পিতার আর্তনাদ। ছিল অসহায়ত্ব। ছিল বিস্ময়। ছিল শোক। ছিল একটি নীরব প্রতিবাদ।
আর ছিল সমগ্র পৃথিবীর সামনে ছুড়ে দেওয়া এক প্রশ্ন— একজন সন্তানকে হারানোর যে বেদনা একজন পিতা বহন করেন, সেই বেদনার মূল্য কে দেবে?
তিনি তার সন্তানের কপালে শেষবারের মতো চুম্বন করলেন। যে কপালে শিশুকালে তিনি আদর করে চুমু এঁকেছিলেন, আজ সেই কপালেই তিনি এঁকে দিলেন বিদায়ের শেষ চিহ্ন।
কত অদ্ভুত নিয়তি! একদিন যে শিশুকে তিনি পৃথিবীর আলো দেখানোর জন্য কোলে তুলে নিয়েছিলেন, আজ সেই শিশুকেই পৃথিবী থেকে বিদায় দিতে হলো তার নিজের হাতে।
তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ছিল সন্তানের মুখের ওপর। সেই অশ্রু যেন শুধু একজন বাবার ব্যক্তিগত শোকের অশ্রু ছিল না; তা হয়ে উঠেছিল এক যুগের বিবেকের অশ্রু।
প্রভাতের সূর্য তখন পূর্বাকাশে আলো ছড়াচ্ছিল। সূর্যের সোনালি রশ্মি এসে পড়েছিল সন্তানের নিথর দেহের ওপর। আর সেই আলোয় বাবার চোখের পানি ঝিলমিল করছিল।
মনে হচ্ছিল— একদিকে সূর্যের আলো পৃথিবীকে আলোকিত করছে; অন্যদিকে একজন পিতার অশ্রু সেই আলোকে প্রশ্ন করছে। কী এমন অপরাধ, যার মূল্য দিতে হয় একটি তরুণ জীবন দিয়ে?
কোন বিচার একজন সন্তানকে তার মায়ের কোল, বাবার বুক, পরিবারের স্বপ্ন এবং পৃথিবীর আলো থেকে চিরদিনের জন্য বিচ্ছিন্ন করে দিতে পারে?
একজন তরুণকে হয়তো একটি ফাঁসির দড়ি দিয়ে পৃথিবী থেকে বিদায় দেওয়া যায়। তার শরীরকে নিথর করে দেওয়া যায়। তার কণ্ঠকে স্তব্ধ করে দেওয়া যায়। কিন্তু তার প্রতি একজন পিতার ভালোবাসাকে কি ফাঁসি দেওয়া যায়?
যে স্বপ্ন নিয়ে বাবা তার সন্তানকে বড় করেছিলেন, সেই স্বপ্নকে কি কোনো আদালতের রায় মুছে দিতে পারে? একজন পিতার চোখের অশ্রুকে কি কোনো কারাগারের প্রাচীর আটকে রাখতে পারে? না।
কারণ মানুষের শরীরকে বন্দী করা যায়, কণ্ঠকে স্তব্ধ করা যায়, কিন্তু সত্যের প্রশ্নকে বন্দী করা যায় না।
লুৎফির বাবা শেষ পর্যন্ত তার সন্তানের নিথর দেহ নিয়ে কবরের পথে এগিয়ে গেলেন। যে স্বপ্ন ছিল— একদিন সন্তান তার লাশ কাঁধে তুলে কবরস্থানে নিয়ে যাবে— সেই স্বপ্নই যেন নিয়তির নির্মম পরিহাসে উল্টে গেল। সন্তান নয়, বাবা তার সন্তানকে নিয়ে গেলেন কবরের দিকে।
তিনি তার সন্তানকে মাটির ঘরে শুইয়ে দিয়ে ফিরে এলেন। ফিরে এলেন— কিন্তু আগের সেই মানুষটি হয়ে নয়। ফিরে এলেন শূন্য হাতে।
তার হাত থেকে চলে গেল তার সন্তান; তার বুক থেকে ছিনিয়ে নেওয়া হলো তার স্বপ্ন; তার ভবিষ্যৎ থেকে মুছে গেল তার একটি অধ্যায়।
কিন্তু তিনি যে অশ্রু রেখে গেলেন, তা শুধু কবরের মাটিতে মিশে গেল না। তা ছড়িয়ে পড়ল মানুষের বিবেকের ভেতর। হয়তো একটি তরুণের জীবনকে একটি ফাঁসির দড়ি থামিয়ে দিতে পারে; কিন্তু একজন সন্তানহারা পিতার অশ্রু থামানো যায় না। সেই অশ্রু প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রশ্ন হয়ে ফিরে আসে। সেই অশ্রু ইতিহাসের কাছে সাক্ষ্য হয়ে থাকে। সেই অশ্রু পৃথিবীর বিবেকের দরজায় কড়া নাড়ে।
আর সেই পিতা— যিনি একদিন সন্তানের হাত ধরে তাকে জীবনের পথে এগিয়ে দিয়েছিলেন, আর শেষ দিনে সন্তানের নিথর দেহকে কবরের মাটিতে শুইয়ে দিয়ে শূন্য হাতে ফিরে এসেছিলেন— তিনি হয়তো পৃথিবীকে নীরবে বলে গেছেন, ‘আমি আমার সন্তানকে হারিয়েছি; কিন্তু তোমরা যেন মানবিকতা না হারাও। আমি আমার স্বপ্নকে কবর দিয়েছি; তোমরা যেন ন্যায়বিচারের স্বপ্নকে কবর দিও না।’
একজন সন্তানহারা বাবার এই অশ্রুসিক্ত বিদায় তাই কেবল একটি পরিবারের শোকগাথা নয়— এটি মানবতার কাছে এক অনন্ত প্রশ্ন, ইতিহাসের কাছে এক নীরব সাক্ষ্য এবং বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে এক অবিনাশী আলো।
আহমদ আবদেল হাদি আল-সেহাইমিকে মৃত্যুদণ্ড
২০১৬ সালের ২ মার্চ সামরিক আদালত আহমদ আবদেল হাদি আল-সেহাইমিকে মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত করে। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হলেও তার ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হয়নি। ২০১৭ সালের ১৯ জুন সুপ্রিম মিলিটারি কোর্ট অব আপিল তার মৃত্যুদণ্ড বহাল রাখে। তার পক্ষে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মহলে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছিল— তিনি একজন বেসামরিক নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও তাঁকে সামরিক আদালতে বিচার করা হয়েছে এবং মামলার বিভিন্ন পর্যায়ে নির্যাতনের মাধ্যমে আদায় করা স্বীকারোক্তি ও অনিয়মিত বিচারিক প্রক্রিয়া ব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে।
মানবাধিকার সংগঠনগুলো তার বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। অভিযোগ ছিল, একটি স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার পাওয়ার মৌলিক অধিকার তার ক্ষেত্রে যথাযথভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। কিন্তু এসব অভিযোগ, আপত্তি ও আন্তর্জাতিক উদ্বেগ শেষ পর্যন্ত তার মৃত্যুদণ্ডের পথ রুদ্ধ করতে পারেনি। আইনের নামে যে বিচার চলছিল, তার শেষ প্রান্তে অপেক্ষা করছিল মৃত্যুর অন্ধকার দরজা।
অবশেষে এসে গেল সেই নির্মম দিন— ২০১৮ সালের ২ জানুয়ারি। মাত্র ২৮ বছর বয়সী এই যুবকের জীবনের শেষ সকালটি উদিত হয়েছিল অন্যসব সকালের মতোই; কিন্তু তার জন্য সেটিই ছিল পৃথিবীতে শেষ সকাল। বুর্জ আল-আরব কারাগারে সেদিন তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। একই দিনে আরও তিনজনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।
একজন মানুষের জীবন— যার সামনে হয়তো ছিল আরও বহু বসন্ত, বহু স্বপ্ন, বহু সম্ভাবনা; রাষ্ট্রীয় মৃত্যুদণ্ডের নির্মমতায় সেদিন হঠাৎ থেমে গেল। কারাগারের সেই নিস্তব্ধ প্রাচীরের ভেতর শেষ হয়ে গেল একটি পরিবারের স্বপ্ন, একজন মায়ের প্রতীক্ষা, একজন বাবার আশ্রয় এবং একটি তরুণ জীবনের সমস্ত সম্ভাবনা।
পৃথিবী তখনো মানবাধিকারের কথা বলছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে মানুষের জীবন, মর্যাদা, স্বাধীনতা ও ন্যায়বিচারের অধিকার নিয়ে উচ্চকণ্ঠ আলোচনা চলছিল। বিশ্বের বহু মানবাধিকার সংস্থা মৃত্যুদণ্ডের বিরোধিতা করছিল, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলো বিচারিক স্বচ্ছতা ও মানবিক মর্যাদার পক্ষে অবস্থান ঘোষণা করছিল। অথচ মিশরের মাটিতে যখন একের পর এক মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হচ্ছিল, তখন সেই উচ্চকণ্ঠ প্রতিবাদ বাস্তব প্রতিরোধে রূপ নিতে পারেনি।
এখানেই ইতিহাসের এক নির্মম বৈপরীত্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। মানবাধিকারের সর্বজনীনতার কথা বলা হলেও, পৃথিবীর কিছু মানুষের জীবন যেন সেই সর্বজনীনতার সীমানার বাইরে পড়ে যায়। কোনো কোনো দেশে মানুষের অধিকার নিয়ে প্রবল উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়, অথচ অন্য কোনো দেশে একই অধিকার পদদলিত হলে আন্তর্জাতিক সমাজের প্রতিক্রিয়া হয়ে পড়ে সীমিত, নীরব কিংবা আনুষ্ঠানিক।
আহমদ আবদেল হাদি আল-সেহাইমির মৃত্যুদণ্ড তাই শুধু একজন তরুণের মৃত্যুর ঘটনা নয়; এটি বিচার, মানবাধিকার, রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক নৈতিকতার সামনে এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন। যদি একজন বেসামরিক মানুষকে সামরিক আদালতে বিচার করা হয়, যদি নির্যাতনের মাধ্যমে স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ ওঠে, যদি বিচার প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন থাকে— তবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগে ন্যায়বিচারের শেষ দরজাটি কি আরও একবার খোলা উচিত ছিল না?
ইতিহাসের আদালতে এসব প্রশ্নের উত্তর একদিন না একদিন দিতে হবে। কারণ ফাঁসির দড়ি একটি জীবনকে থামিয়ে দিতে পারে, কিন্তু একটি প্রশ্নকে হত্যা করতে পারে না। কারাগারের দরজা একটি কণ্ঠকে স্তব্ধ করতে পারে, কিন্তু অন্যায়ের স্মৃতিকে মুছে দিতে পারে না। আর মৃত্যুদণ্ড একটি মানুষের জীবন শেষ করে দিতে পারে— কিন্তু ন্যায়বিচারের দাবিকে শেষ করে দিতে পারে না।
আহমদ আবদেল হাদি আল-সেহাইমির মৃত্যুর কাহিনী তাই আমাদের শুধু শোকাহত করে না; আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে— মানবাধিকার কি সত্যিই সবার জন্য সমান, নাকি তারও কোনো ভূগোল আছে? ন্যায়বিচার কি রাষ্ট্রের ক্ষমতার কাছে নতজানু হতে পারে? আর আন্তর্জাতিক সমাজ যখন অন্যায়ের সাক্ষী হয়, তখন নীরব থাকা কি কেবল নিরপেক্ষতা, নাকি কখনো কখনো সেই নীরবতাও ইতিহাসের বিচারে একটি অবস্থান হয়ে দাঁড়ায়?