২৫ বছরেও টুইন টাওয়ারে হামলাকারীদের শনাক্ত করতে পারেনি যুক্তরাষ্ট্র
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৭:৪৭
॥ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ আবু হানিফ খান ॥
কথিত ওয়ার অন টেরর পলিসিকে বিশ্বব্যাপী মোড়লিপনা ও মুসলিম নিধনের এক মোক্ষম হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছে যুক্তরাষ্ট্রের সরকারগুলো। ইরাক যুদ্ধের পর ইস্যু তৈরি করতে সৃষ্টি করা হয় নাইন-ইলেভেন নামক নতুন ঘটনা। সৃষ্ট এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে যুক্তরাষ্ট্র সরকার আফগান মুসলমানদের ওপর সামরিক আগ্রাসন চালায়। যুক্তরাষ্ট্র সরকার নিজের প্রতিপক্ষ হিসেবে ইসলাম ও মুসলমানদের দমন করতে ইসলামোফোবিয়া ও গোয়েবলস নীতির ওপর ভর করে হীন মিথ্যাচার করে আসছে; যা বিশ্ববাসীর কাছে দিবালোকের মতোই সুস্পষ্ট এবং সত্যের আলোয় মিথ্যাচার বুদবুদের মতোই বিলিন হয়ে যাচ্ছে। অপরদিকে বিশ্বব্যাপী ইসলাম ও মুসলমানদের ক্রমাগত উত্থান পশ্চিমা দুনিয়াকে চিন্তিত করছে।
শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে অশান্তি : যুক্তরাষ্ট্র সরকার শান্তি প্রতিষ্ঠার নামে মূলত পৃথিবীতে ধ্বংস ও অশান্তি ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে। গণতন্ত্র প্রসারের পরোপকারী আদর্শের বাইরে ট্রাম্প এখন অর্থনৈতিক আধিপত্যের পাশাপাশি ভূরাজনৈতিক আধিপত্যেরও বিস্তার করতে চাইছেন। তিনি ইউক্রেন ও গাজা যুদ্ধ থেকে অর্থ উপার্জনের চেষ্টা করেছেন। হরমুজ প্রণালীর ওপর তার মনোযোগ দেখিয়েছেন। ব্রাউন ইউনিভার্সিটির কস্টস অব ওয়ার প্রকল্পের তথ্যমতে, ২০০১ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে ইরাক, আফগানিস্তান, সিরিয়া, ইয়েমেন ও পাকিস্তানে নাইন-ইলেভেন-পরবর্তী সহিংসতায় অন্তত ৯ লাখ ৪০ হাজার মানুষ নিহত হয়েছেন। নাইন-ইলেভেন-পরবর্তী যুদ্ধক্ষেত্রগুলোয় এই যুদ্ধের পরোক্ষ প্রভাবে মারা গেছেন প্রায় ৩৮ লাখ মানুষ।
নাইন-ইলেভেন যেভাবে : ২৫ বছর আগের ঘটনা। দিনটি ছিল মঙ্গলবার। ১১ সেপ্টেম্বর ২০০১। ছিনতাই হয় অমেরিকান ৪টি বিমান। চার দফা হামলা করা হয়। প্রথম দফায় সকাল ৮টা ৪৫ মিনিটে ২০ হাজার গ্যালন জেট ফুয়েল ভর্তি আমেরিকান এয়ারলাইনসের বোয়িং-৭৬৭ উড়োজাহাজটি আছড়ে পড়ে ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের উত্তর দিকের টাওয়ারে। ছিনতাই হওয়া উড়োজাহাজটি ১১০ তলা ভবনটির ৮০তম তলায় ঢুকে পড়ে। হামলার সঙ্গে সঙ্গেই নিহত হন শত শত মানুষ, ভবনের ভেতরে আটকে পড়েন আরও বহু মানুষ। দ্বিতীয় দফায় ১৮ মিনিট পরে সকাল ৯টা ৩ মিনিটে দ্বিতীয় বিমানটি হামলা চালায়। ইউনাইটেড এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ১৭৫-এর আরেকটি বোয়িং-৭৬৭ উড়োজাহাজ ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারের দক্ষিণ দিকের টাওয়ারের ৬০তম তলায় আঘাত হানে। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে টুইন টাওয়ারের উত্তর দিকের ভবনটি ভেঙে পড়ে। ভবনটি ধসে পড়ার সময় ভেতরে যারা ছিলেন, তাদের মধ্যে মাত্র ছয়জনকে জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা গিয়েছিল। প্রায় ১০ হাজার মানুষকে গুরুতর আহত অবস্থায় বিভিন্ন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলার প্রায় পৌনে এক ঘণ্টা পর আরেকটি হামলা হয় যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সদর দপ্তর পেন্টাগনে। সকাল ৯টা ৪৫ মিনিটে পেন্টাগনের পশ্চিম দিকে আঘাত করে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৭৭-এর বোয়িং-৭৫৭ উড়োজাহাজটি। পেন্টাগনে হামলায় ১২৫ জন সামরিক কর্মকর্তা ও বেসামরিক নাগরিক নিহত হন। আবরুদ্ধ বিমানটির ভেতরে থাকা ৬৪ জন আরোহীও নিহত হন।
শেষ দফায় বিমান হামলাটি হয় সকাল ১০টা ১০ মিনিটে। নিউজার্সি থেকে ক্যালিফোর্নিয়ার উদ্দেশে যাত্রা করার ৪০ মিনিট পর ইউনাইটেড ফ্লাইট ৯৩ নামের উড়োজাহাজটি ছিনতাই করা হয়। বিমানে অবস্থানকালেই যাত্রীরা নিউইয়র্ক ও ওয়াশিংটনে হামলার বিষয়ে জেনে যান। পরে পশ্চিম পেনসিলভানিয়ার শ্যাংকসভিলের কাছে একটি ফাঁকা মাঠে উড়োজাহাজটি বিধ্বস্ত হয়। এতে বিমানে ৪৪ জন আরোহীই নিহত হন। হৃদয় বিদারক ও লোমহর্ষক ওই সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা প্রবাহে আজও মানবতা আঁতকে ওঠে। ঘটনায় প্রায় ৩ হাজার মানুষ নিহত এবং ৬ হাজারের বেশি আহত হন। ধ্বংস হয় ১০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সমমানের সম্পদ। কিন্তু এই হামলার নেপথ্যে হাজারো প্রশ্ন আজও রহস্যঘেরা। নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে আল কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করলেও মার্কিন প্রশাসন এ ব্যাপারে কিছু অনুমাননির্ভর ব্যাখ্যা ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি।
আল-কায়দার দায় অস্বীকার : আগে সংঘটিত কয়েকটি দেশের মার্কিন দূতাবাসে সন্ত্রাসী হামলার কথা আল কায়দা স্বীকার করলেও নাইন-ইলেভেনের ঘটনার দায়িত্ব তারা কখনো স্বীকার করেনি। বরং ঘটনার পরপর ওসামা বিন লাদেন তাতে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করেছিলেন। আল-জাজিরা ২০০১ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর এক প্রতিবেদনে ওসামা বিন লাদেনের এক বক্তব্য প্রচার করে। যেখানে তিনি বলেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলছি যে আমি এই কাজ করিনি, মনে হয় কেউ তার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য হাসিল করার লক্ষ্যে এই হামলা চালিয়েছেন।’ তাহলে প্রশ্ন, ওসামার কথা যদি সত্য হয়, তাহলে নাইন-ইলেভেন কাদের কাজ এ রহস্য আজও উদ্ঘাটন হয়নি। বিশ্বজুড়ে কর্তৃত্ব-প্রভুত্ব প্রচেষ্টার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র অনেক শত্রুর জন্ম দেয়। এতে শুধু রাষ্ট্রশক্তিই ছিল না, ছিল ধর্মীয় সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা সংগঠনও। এই অনাচার সৃষ্টির দায় যুক্তরাষ্ট্রের। তাদের ফিলিস্তিনবিরোধী ও ইসরাইলি তোষণনীতিও এর মধ্যে পড়ে। তাছাড়া রয়েছে আঞ্চলিক যুদ্ধের উসকানি, সোভিয়েত বিরোধিতার সূত্রে সৃষ্ট আগ্রাসী নীতি ইত্যাদি।
বিশ্বাসযোগ্যতা পায়নি মার্কিন রিপোর্ট : যুক্তরাষ্ট্রে এই ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার জন্য আল-কায়দাকে দায়ী করে মার্কিন সরকারের অনেক রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। অনেকেই তা বিশ্বাসও করতে পারছেন না। তাদের মতে, আমেরিকার তৎকালীন বুশ সরকার নিজেই এই ঘটনা ঘটিয়েছে। তাদের ভাষ্য হচ্ছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্বব্যাপী তার নতুন ভূরাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়নের অংশ হিসেবেই এই ঘটনা ঘটিয়ে তার দায় আল-কায়দার ওপর চাপিয়েছে। মার্কিন সরকারের ভাষ্যের সঙ্গে যারা ভিন্নমত পোষণ করেন তাদের অন্যতম ফিলিপ মার্শাল।
মার্কিন সরকারের অনেক গোপন মিশনের সঙ্গে জড়িত বিমান চালনা বিশেষজ্ঞ ফিলিপ মার্শাল মনে করতেন আল-কায়দা কিছুতেই এ ধরনের হামলা করতে পারে না। তার ধারণা, নাইন-ইলেভেন নিয়ে গভীর ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত হয়েছে। তার এই ভিন্নমত অনেকের মাঝে নতুন চিন্তার খোরাক যোগাচ্ছে। টুইন টাওয়ার ধ্বংসের রহস্য কারো কারো মধ্যে নতুন ধারণার সৃষ্টি করছে। সেই ঘটনার পর ভিন্নমত পোষণকারী ফিলিপ মার্শালের নিজেরও রহস্যজনক মৃত্যু ঘটে। এমনকি বিমানের সাবেক ওই অভিজ্ঞ পাইলট ও নাইন ইলেভেন ষড়যন্ত্রের লেখক ফিলিপ মার্শাল এবং তার দুই সন্তানকে ক্যালিফোর্নিয়ায় মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়।
হাজারো প্রশ্নের বেড়াজালে মার্কিন প্রশাসন : টুইন টাওয়ার হামলার পর থেকে ২৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও ঘটনার দায় অমীমাংসিতই রয়ে গেছে। ঘটনার পেছনের রহস্য তত্ত্বগুলো এখনো মিলিয়ে যায়নি। বিবিসিতে বিশিষ্ট সাংবাদিক মাইক রুডিন একথা বলেছেন। সেই ঘটনার পর অনেক সরকারি রিপোর্ট প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু এখনো বেশকিছু প্রশ্ন রয়েই গেছে, যা মানুষের সন্দেহ জিইয়ে রেখেছে।
প্রথম প্রশ্নটি হচ্ছে, বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রর বিমানবাহিনী ছিনতাইকৃত চারটি বিমানের একটিকেও কেনো বাধা দিতে পারেনি। এক্ষেত্রে রহস্য হচ্ছে, তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট ডিক চেনি সামরিক বাহিনীকে কেবল দাঁড়িয়ে থাকতে এবং বিমানগুলোয় বাধা না দেয়ার নির্দেশ দিয়েছিলেন।
দ্বিতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, কেনো টুইন টাওয়ার এতো দ্রুত ধসে পড়েছিল। কয়েকটি ফ্লোরে আগুন লাগার পর ঘণ্টা দুয়েকের মধ্যে টুইন টাওয়ার পুরোপুরি ধসে পড়ার ঘটনা খুবই অস্বাভাবিক। এক্ষেত্রে রহস্য হচ্ছে, নিয়ন্ত্রিত গুঁড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমে একে ধ্বংস করা হয়েছিল। বিভিন্ন খবরে বলা হয় ধসে পড়ার আগে বেশকিছু বিস্ফোরণের আওয়াজ শোনা যায়। টুইন টাওয়ার ধ্বংস হওয়ায় সেখানে অবস্থানরত প্রায় সবারই করুণ মৃত্যু ঘটে।
তৃতীয় প্রশ্নটি হচ্ছে, একজন এ্যামেচার পাইলট কীভাবে একটি বাণিজ্যিক বিমান নিয়ে বিনা বাধায়ই বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী সামরিক দফতরে গিয়ে আছড়ে পড়লো। প্রথম সম্ভাব্য ছিনতাইয়ের রিপোর্ট পাওয়ার পর মাত্র ৭৮ মিনিটের মধ্যে মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনে এটি বিধ্বস্ত হয়। ছিনতাইয়ের রিপোর্ট পাওয়ার পর কেনো বিমানটিকে ধাওয়া করা বা বাধা দেয়া হয়নি। এটি এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। এক্ষেত্রে রহস্য হচ্ছে, কোনো বাণিজ্যিক বিমান পেন্টাগনে আঘাত হানেনি। বরং ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে বা ছোট বিমান বা পাইলটবিহীন ড্রোন বিমান এই হামলায় ব্যবহার করা হয়েছে। তবে যেহেতু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে যে আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট ৭৭ পেন্টগন ভবনে আঘাত হেনেছিল তাতে পেন্টাগনমুখী বিমান চালিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্পর্কে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কারণ পেন্টাগনের ওপর দিয়ে কোনো বিমান চলাচল করতে পারে না। এক্ষেত্রে যুক্তি হচ্ছে সেই বিমানটি আল-কায়দার নিয়ন্ত্রণে ছিল না, বরং পেন্টাগনেরই নিয়ন্ত্রণে ছিল।
চতুর্থ প্রশ্নটি হচ্ছে, পেনসিলভেনিয়ার শ্যাংকভিলে একটি ছিনতাইকৃত বিমানের বিধ্বস্ত হওয়া। বিধ্বস্তস্থলটি খুবই ছোট এবং সেখানে বিমানের কোনো ধ্বংসাবশেষ কেনো দৃশ্যমান হয়নি। এক্ষেত্রে রহস্য হচ্ছে, ইউনাইটেড এয়ারলাইন্সের ফ্লাইটের বিমানটিকে ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়ে আঘাত করা হলে মাঝ আকাশেই এটি ধ্বংস হয়ে যায় এবং ধ্বংসাবশেষ বিস্তীর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
পঞ্চম প্রশ্নটি হচ্ছ, হামলার ঠিক এক সপ্তাহ আগে, ২০০১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর, হোয়াইট হাউসে তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা কন্ডোলিজা রাইসের কাছে আল-কায়েদার হামলা সংক্রান্ত একটি গোপন চিঠি ও সতর্কবার্তা দেন কর্মকর্তা রিচার্ড ক্লার্ক। এক্ষেত্রে রহস্য হচ্ছে, তৎকালীন বুশ প্রশাসন সেই চরম সতর্কবার্তা কেন গুরুত্ব দেয়নি বা কেন তা এড়িয়ে গিয়েছিল, তা আজও এক মস্ত বড় প্রশ্ন।
এভাবে হাজারো প্রশ্ন এখনো অনেকের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। হাজারো প্রশ্ন আজও রহস্যঘেরাই রয়ে গেছে। হামলার রহস্য কেবল তিমিরেই থেকে গেলো। রহস্য উন্মোচিত হলো না। হলো ইসলামবিদ্বেষ বা ইসলামোফোবিয়াকে ছড়িয়ে পশ্চিমাদের ক্ষুব্ধ করা।
নিহত ৬ বাংলাদেশি : ১১ সেপ্টেম্বরের সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের মধ্যে ৬ জন ছিলেন বাংলাদেশি। নিহতের তালিকায় রয়েছেন মুক্তাগাছার নূরুল হক মিয়া এবং তার স্ত্রী মৌলভীবাজারের শাকিলা ইয়াসমীন, সুনামগঞ্জের সাব্বির আহমেদ, কুমিল্লার মো. শাহজাহান, সিলেটের সালাহউদ্দিন চৌধুরী এবং নোয়াখালীর আবুল কে. চৌধুরী।
গোয়েবলসীয় নীতি অনুসরণ : গোয়েবলসীয় নীতি হলো নাৎসি জার্মানির প্রচারমন্ত্রী জোসেফ গোয়েবলসের প্রণীত রাজনৈতিক প্রচারণা ও মনস্তাত্ত্বিক নিয়ন্ত্রণের কৌশল। এই নীতির মূল কথা হলো— একটি মিথ্যা বারবার প্রচার করলে সাধারণ মানুষ একসময় সেটিকে সত্য বলে বিশ্বাস করতে শুরু করে।
গোয়েবলসীয় নীতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো : প্রথমত, পুনরাবৃত্তি ঘটানো। একই মিথ্যা বা তথ্য বারবার প্রচার করা; যাতে তা মানুষের মনে স্থায়ী হয়। দ্বিতীয়ত, সরলীকরণ করা। জটিল রাজনৈতিক বা সামাজিক বিষয়গুলোকে অতি সরলীকরণ করে মানুষের আবেগ ও অনুভূতিকে কাজে লাগানো। তৃতীয়ত, বিরোধীদের দমন ও সমালোচনা করা। প্রতিপক্ষ বা শত্রুর বিরুদ্ধে ক্রমাগত নেতিবাচক প্রচার চালিয়ে তাদের হেয় করা। চতুর্থত, একপেশে তথ্যপ্রবাহ প্রচার করা। গণমাধ্যমের ওপর একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে শুধু নিজেদের পক্ষে তথ্য প্রচার করা এবং বিকল্প বা সত্য তথ্য ঢেকে রাখা। পঞ্চমত, সুনির্দিষ্ট শত্রু তৈরি করা। সমাজে ঘৃণা ছড়ানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট পক্ষ বা সম্প্রদায়কে শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা। আমেরিকা গোয়েবলসীয় নীতি অনুসরণ করেই ইসলাম ও মুসলমানদের হেয় করার ক্রমাগত অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
কাজে আসেনি ইসলামোফোবিয়া : ‘ফোবিয়া’ বলতে বোঝায় ভয়, ঘৃণা, আতঙ্ক। আর এটা যদি ইসলামের সাথে যুক্ত হয়, তখন অর্থ হয় ইসলাম মানেই ভয় বা ত্রাস। অর্থাৎ ইসলাম শান্তির বার্তা দেয় না, বরং ইসলাম মানুষকে ত্রাসের শিক্ষা দেয়। সমাজে ত্রাস সৃষ্টি করতে চায়। ‘ইসলামোফোবিয়া’ শব্দের অর্থ দাঁড়ায়- ইসলামে প্রতি ভীতি, ইসলাম নামের আদর্শকে ভয় পাওয়া, ইসলাম ধর্ম পালনকারীদের কাছ থেকে ক্ষতির আশঙ্কা করা। নাইন-ইলেভেনের পর গোটা আমেরিকায় মুসলিমদের বিরুদ্ধে অবিশ্বাস, ভীতি ও বিদ্বেষ বেড়ে যায়। যারা মুসলিমের মতো দেখতে, তাদের প্রতিও বিদ্বেষজনিত অপরাধ নাটকীয়ভাবে বেড়ে যায়। যারা হিজাব পরেন এবং যাদের দাড়ি আছে, তাদের সঙ্গে লোকজন গায়ে পড়ে ঝগড়া লাগাতে শুরু করে। কোথাও কোথাও প্রতিশোধমূলক হামলা হয়ে ওঠে স্বাভাবিক ঘটনা। জঙ্গিবাদ দমনের নামে আফগানিস্তানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বেশকিছু দেশে সামরিক আগ্রাসন চালায় যুক্তরাষ্ট্র। এতে প্রাণ হারান বহু নিরপরাধ মানুষ। পরবর্তীতে ২০১১ সালে পাকিস্তানে এক অভিযান চালিয়ে ওসামা বিন লাদেনকে হত্যা করে মার্কিন বাহিনী। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টার ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর তা আমেরিকার অর্থনীতি এবং বিশ্ববাজারে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
শেষ কথা : শতাব্দীর সবচেয়ে আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা নাইন-ইলেভেনের ২৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও আজও নিজেদের দাবির পক্ষে সঠিক তথ্য-প্রমাণ বিশ্বদরবারে উপস্থিত করতে পারেনি মার্কিন প্রশাসন। নাইন-ইলেভেনের প্রসঙ্গ এলে প্রধানত যে দুটি প্রশ্ন সামনে আসে তার একটি হলো কারা ঘটিয়েছিল এ ঘটনা? এবং নাইন-ইলেভেনের পর বিশ্বে যে ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ শুরু করা হয়, আজ ২৫ বছর পর সেই যুদ্ধের ফল কী? এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজতে গিয়ে বলতে হয়, যুক্তরাষ্ট্র নাইন-ইলেভেনের পরিকল্পনাকারী হিসেবে আল-কায়দা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করলেও মার্কিন প্রশাসন এ ব্যাপারে গোয়েবলসীয় স্টাইলে কিছু অনুমাননির্ভর মিথ্যাচার ছাড়া সুনির্দিষ্ট কোনো প্রমাণ দেখাতে পারেনি। নিজের গোলায় আগুন লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে ফাঁসানোর কৌশলে মার্কিন প্রশাসন পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলেই আজ বিশ্বদরবারে একথা প্রমাণিত সত্য।
লেখক : দি ইউনিভার্সিটি অব কুমিল্লার প্রফেসর ও ডিন।