চৌগাছায় ড্রাগন চাষে সফলতার স্বপ্ন দেখছেন স্কুলশিক্ষক মালেক
১ জুলাই ২০২৬ ২০:১২
জাহাঙ্গীর আলম, চৌগাছা (যশোর) : শিক্ষকতা তার পেশা, কৃষি তার নেশা। শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষায় আলোকিত করার পাশাপাশি কৃষিক্ষেত্রেও সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত উন্মোচনের চেষ্টা করছেন এক নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক। যশোরের চৌগাছা উপজেলার পুড়াপাড়া বাজার সংলগ্ন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে ড্রাগন ফলের বাগান গড়ে তুলে এলাকায় আলোচনায় এসেছেন মহেশপুর উপজেলার শ্যামনগর গ্রামের বাসিন্দা ও শার্শা উপজেলার নিজামপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ধর্মীয় শিক্ষক আব্দুল মালেক (৫০)।
কৃষির প্রতি গভীর আগ্রহ থেকেই ২০২৩ সালের শেষের দিকে তিনি চৌগাছা উপজেলার ৩৩ শতক জমিতে ড্রাগন চাষ শুরু করেন। বাগান স্থাপন, খুঁটি নির্মাণ, উন্নতমানের চারা সংগ্রহ, সেচ ও পরিচর্যাসহ বিভিন্ন খাতে প্রায় ৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা বিনিয়োগ করেন। বর্তমানে তার বাগানে রয়েছে প্রায় ২ হাজার ৭০০টি ড্রাগন গাছ। শুরুতেই ফলন পেয়ে আশাবাদী হয়ে ওঠেন মালেক। তবে বর্তমানে ভাইরাস রোগের কারণে উৎপাদনে কিছুটা চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে। তবুও তিনি দমে যাননি। বরং ড্রাগনের পাশাপাশি ভবিষ্যতে বাণিজ্যিকভাবে মালটা চাষের পরিকল্পনা করছেন।
সরেজমিন দেখা যায়, সারিবদ্ধভাবে সাজানো ড্রাগন গাছগুলো পরিচর্যার স্পষ্ট সাক্ষ্য বহন করছে। প্রতিটি গাছের গোড়া পরিচ্ছন্ন, রয়েছে সেচের ব্যবস্থা এবং রোগবালাই দমনে নিয়মিত পরিচর্যা। স্থানীয় কৃষক, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন এলাকার দর্শনার্থী প্রায়ই বাগানটি দেখতে আসেন এবং ড্রাগন চাষের বিভিন্ন বিষয়ে তার কাছ থেকে পরামর্শ গ্রহণ করেন।
আব্দুল মালেক বলেন, ‘শিক্ষকতার পাশাপাশি কৃষিতে কিছু করার স্বপ্ন থেকেই ড্রাগন চাষ শুরু করি। প্রথম বছরেই ফলন পেয়ে উৎসাহিত হয়েছিলাম। বর্তমানে ভাইরাসের আক্রমণ বড় চ্যালেঞ্জ হলেও আমি হতাশ নই। কৃষিতে সফল হতে হলে ধৈর্য, পরিশ্রম ও নতুন পরিকল্পনা থাকতে হয়। তাই ভবিষ্যতে মালটা চাষেও বিনিয়োগ করার ইচ্ছা রয়েছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘যারা ড্রাগন চাষে আগ্রহী, তারা আমার বাগানে এসে বাস্তব অভিজ্ঞতা নিতে পারবেন। উন্নতমানের চারা ও প্রয়োজনীয় পরামর্শও দেওয়া হবে।’
চৌগাছা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মুশাব্বির হোসাইন বলেন, ‘চৌগাছার মাটি ও জলবায়ু ড্রাগন চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ৫২০ হেক্টর জমিতে ড্রাগনের আবাদ হয়েছে এবং দিন দিন এর পরিধি বাড়ছে। তবে ফলের আকার বড় করার জন্য অনেক কৃষক বিভিন্ন ধরনের উদ্ভিদ হরমোন ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে অবশ্যই কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুযায়ী অনুমোদিত মাত্রায় হরমোন ব্যবহার করতে হবে। অতিরিক্ত ব্যবহার ফলের গুণগত মান, মানুষের স্বাস্থ্য ও পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।’
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ড্রাগন একটি উচ্চমূল্যের অর্থকরী ফল। যশোর অঞ্চলের মাটি ও আবহাওয়া এ ফল চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় প্রতি বছর নতুন নতুন কৃষক এ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। তবে ভাইরাস ও অন্যান্য রোগবালাই দমনে নিয়মিত পরিচর্যা, মানসম্মত চারা ব্যবহার এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শ অনুসরণ করা জরুরি।
পুষ্টিবিদদের মতে, ড্রাগন শুধু লাভজনক ফলই নয়, এটি অত্যন্ত পুষ্টিকরও। প্রতি ১০০ গ্রাম ভক্ষণযোগ্য ড্রাগন ফলে প্রায় ৩৫-৫০ কিলোক্যালরি খাদ্যশক্তি, ৯-১৪ গ্রাম শর্করা, ০.১৫-০.৫ গ্রাম প্রোটিন, ০.৩০-০.৯০ গ্রাম খাদ্য-আঁশ, ৬-১০ মিলিগ্রাম ক্যালসিয়াম, ১৬-৩৫ মিলিগ্রাম ফসফরাস, ০.৩–০.৯ মিলিগ্রাম আয়রন এবং ৪-২৫ মিলিগ্রাম ভিটামিন-সি রয়েছে। এছাড়া এতে ভিটামিন বি১, বি২, বি৩ ও বিটা-ক্যারোটিনসহ বিভিন্ন প্রয়োজনীয় ভিটামিন ও খনিজ উপাদান বিদ্যমান। অ্যান্টি-অক্সিডেন্ট ও খাদ্য-আঁশে সমৃদ্ধ এই ফল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি, হজমশক্তি উন্নত করা, কোলেস্টরেল নিয়ন্ত্রণ, হৃদস্বাস্থ্য ভালো রাখা এবং শরীরের স্বাভাবিক রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
এদিকে চৌগাছা উপজেলায় সাঞ্চাডাঙ্গা মাটপাড়া গ্রামে সহকারী অধ্যাপক (বাংলা) মো. শওকত আলী, মাশিলা গ্রামের মাওলানা ফিরোজ রশিদও ড্রাগন চাষের মাধ্যমে সফলতার আশা করেন।
স্থানীয়দের মতে, একজন শিক্ষক হিসেবে আব্দুল মালেক দীর্ঘদিন ধরে সম্মানিত ব্যক্তি। কৃষিতে তার এই ব্যতিক্রমী উদ্যোগ এলাকার তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে। চাকরির পাশাপাশি আধুনিক ফল চাষ করেও যে স্বাবলম্বী হওয়া সম্ভব, তার বাস্তব উদাহরণ হয়ে উঠেছেন তিনি।
নানা প্রতিকূলতার মাঝেও আব্দুল মালেক বিশ্বাস করেন, কৃষিই হতে পারে আত্মনির্ভরতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি। সেই বিশ্বাস নিয়েই চৌগাছায় তিনি লালন করছেন সফলতার সবুজ স্বপ্ন, যে স্বপ্ন একদিন তাকে শুধু সফল কৃষকই নয়, একজন অনুকরণীয় কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত করবে।