নীল পাহাড়ের রহস্য
১ জুলাই ২০২৬ ১৯:৪৩
॥ মাহমুদা তাবাসসুম ॥
একটি পুরোনো ডায়েরি ও আল্লাহর ওপর ভরসা
অয়ন এবার ওর বাবা-মায়ের সাথে বান্দরবানের এক পাহাড়ি গ্রামে বেড়াতে এসেছে। সবুজ পাহাড় আর মেঘের আনাগোনা অয়নের খুব ভালো লাগলেও, গ্রামের মানুষগুলোর একটা ফিসফিসানি ওর নজরে এলো। গ্রামের ঠিক পাশেই একটা মেঘে ঢাকা পাহাড় আছে, যেটাকে সবাই ‘নীল পাহাড়’ বলে। গ্রামপ্রধান জং বাহাদুর প্রথম দিনই বলেছিলেন-
‘ওদিকে যেও না দাদু। ওই পাহাড়ে প্রাচীন কোনো অশুভ শক্তির বাস আছে। যারা গেছে, কেউ ভালো ফেরেনি।’
অয়ন মনে মনে হাসল। ও জানে, ভালো-মন্দ সবকিছুর মালিক একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। অশুভ শক্তি বা কুসংস্কারে একজন মুসলিম কখনো বিশ্বাস করতে পারে না।
সেদিন বিকেলে ওদের কাঠের বাংলোর পুরোনো লাইব্রেরি ঘরটায় বই খুঁজছিল অয়ন। হঠাৎ একটা কাঠের সিন্দুকের আড়ালে চামড়ায় বাঁধানো একটা ডায়েরি পেয়ে গেল সে। ধুলো ঝেড়ে পাতা উল্টাতেই অয়নের চোখ আটকে গেল। ডায়েরির প্রথম পাতায় চমৎকার আরবি ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ‘বিসমিল্লাহির রহমানির রাহিম’। নিচে বাংলায় লেখা, ‘আজ থেকে প্রায় চারশ বছর আগে, আরবের এক সুফি সাধক ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে এই বাংলায় এসেছিলেন। তিনি তাঁর সাথে এনেছিলেন পবিত্র কুরআনের একটি অত্যন্ত প্রাচীন ও মূল্যবান হাতে লেখা কপি এবং কিছু ঐতিহাসিক দলিল। তাতার জলদস্যুদের হাত থেকে বাঁচাতে তিনি সেগুলো নীল পাহাড়ের একটি গোপন গুহায় সংরক্ষণ করেন। যারা আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে খাঁটি নিয়তে এটি উদ্ধার করতে চাও, তারা নিচের সংকেতটি অনুসরণ করো…।’
অয়নের বুকটা দুরুদুরু করে কাঁপতে লাগল। কোনো ধন-সম্পদ নয়, ইসলামের এক মহান ইতিহাস লুকিয়ে আছে ওই পাহাড়ে! ও মনে মনে আল্লাহর কাছে সাহায্য চাইল এবং ডায়েরিটা লুকিয়ে রাখল।
মংয়ের সাথে পরিকল্পনা
পরদিন সকালে বাংলোর পাশে ঝর্ণার ধারে বসে অয়ন ডায়েরির সংকেতটা বোঝার চেষ্টা করছিল। সেখানে একটা চমৎকার ধাঁধা লেখা ছিল:
ফজরের প্রথম আলো যেখানে এসে পড়ে, তিনটি পাথরের ছায়া যেখানে সেজদা করে, সেখান থেকে যাও দশ কদম বাঁয়ে, ইসলামের আলো পাবে নীল পাহাড়ের গায়ে।
‘কী পড়ছ একা একা?’ পেছন থেকে বলে উঠল মং। মং এই গ্রামেরই একটা ছেলে, যার সাথে গত দুদিনে অয়নের বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে।
অয়ন একটু চিন্তা করে মং-কে ডায়েরির ব্যাপারটা খুলে বলল। মং বলল, ‘আমিও দাদুর কাছে শুনেছি, বহু বছর আগে এক দাড়িওয়ালা বুড়ো সাধু ওই পাহাড়ে থাকতেন। তিনি খুব ভালো মানুষ ছিলেন। কিন্তু গ্রামের মানুষ ভয়ে ওদিকে যায় না। তুমি যদি যেতে চাও, আমি পথ চিনি, তোমাকে নিয়ে যাব।’
অয়ন বলল, ‘তাহলে চলো, আগামীকাল ফজরের সালাত পড়েই আমরা রওনা দেব। আল্লাহর ওপর ভরসা রাখলে কোনো ভয় নেই।’
কুয়াশা ঘেরা পথ
পরদিন ভোর চারটে। অয়ন বাংলোর বারান্দায় দাঁড়িয়ে ফিসফিসিয়ে ফজরের আযান দিল এবং নামাজ আদায় করে নিল। তারপর পিঠে ব্যাগ ঝুলিয়ে মংয়ের সাথে বেরিয়ে পড়ল। ব্যাগে আছে টর্চলাইট, পানি, কিছু শুকনো খাবার আর সেই ডায়েরিটা। যাওয়ার সময় অয়ন বারবার ‘আয়াতুল কুরসি’ পড়ে ফুঁ দিচ্ছিল, এতে ওর মনের সব ভয় কেটে গেল।