৩ দিনে পৌনে ১৮ লাখ টাকা জমা শাহজালালের ডেগে
২৫ জুন ২০২৬ ১০:৫৩
আব্দুল বাছেত মিলন, সিলেট : সিলেটের আধ্যাত্মিক ঐতিহ্য ও শত বছরের সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির প্রতীক হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজারের নিরাপত্তা এবং অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা নিয়ে গত এক সপ্তাহে তৈরি হওয়া উত্তেজনাকর পরিস্থিতি শান্ত হয়েছে। স্থানীয় উলামা মাশায়েখ, মাজার কর্তৃপক্ষ এবং জেলা ও পুলিশ প্রশাসনের যৌথ উদ্যোগে একটি স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান করা হয়েছে। তবে এই পর্যায়ে আসতে সিলেটের আলোচিত জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সারওয়ার আলম আবারো এসেছেন আলোচনায়। মাজার নিয়ে পদক্ষেপের কারণে তাকে ইতোমধ্যে প্রত্যাহার করা হয়েছে। কিন্তু এরপরও দমে যাননি সারা দেশে আলোচিত এই ডিসি। মাজার ব্যবস্থাপনার একটি হাল করে ছেড়েছেন তিনি। অস্বচ্ছতার যে অভিযোগ, তা একটি ফ্রেমে বেঁধে শৃঙ্খলায় এনেছেন।
মাজারের বিষয়টি আলোচনায় আসে দানবাক্সে জমা হওয়া অর্থ, স্বর্ণালঙ্কার কিংবা অন্যান্য সামগ্রীর হিসাব সংরক্ষণ, ব্যবহার প্রক্রিয়া এবং মাজারের বিদ্যমান পরিবেশ তথা একটি অংশে মাদকের আখড়ায় পরিণত হওয়ার অভিযোগের প্রেক্ষিতে। এছাড়া মাজারের অভ্যন্তরে ওরশ বা সাধারণ সময়ে কিছু শরীয়তবিরোধী কর্মকাণ্ড, গান-বাজনা এবং মাদক সেবনের অভিযোগ এনে স্থানীয় আলেম সমাজের পক্ষ থেকে মাজারের মুতাওয়াল্লি বরাবর একটি আনুষ্ঠানিক স্মারকলিপি দেয়া হয়। তারা মাজারের পবিত্রতা রক্ষায় ৫ দফা দাবি এবং তা বাস্তবায়নে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেন।
পরে সংবেদনশীল বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কিছু বিভ্রান্তিকর তথ্যসহ উসকানিমূলক গুজব ছড়িয়ে পড়লে মাজার প্রাঙ্গণে তীব্র উত্তেজনা দেখা দেয়। বহিরাগত কিছু স্বার্থান্বেষী মহল মাজারে জড়ো হয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির চেষ্টা করলে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশ (এসএমপি) পুরো দরগাহ এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে সিলেটের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সারওয়ার আলম এবং পুলিশ কমিশনার মো. রেজাউল করিম মাজার কর্তৃপক্ষ ও আলেম সমাজের শীর্ষ প্রতিনিধিদের সাথে বৈঠক করার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
এর আগে গত ১২ জুন সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলম মাজার পরিদর্শনে গিয়ে আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিতের ঘোষণা দেন এবং এরই অংশ হিসেবে গত ১৮ জুন বৃহস্পতিবার বিকালে মাজারের ঐতিহাসিক ৩টি ডেগ সিলগালা করে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিজস্ব নতুন দানবাক্স স্থাপন করা হয়।
এ উদ্যোগের পর মাজার সংশ্লিষ্টদের মাঝে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিলে এবং প্রশাসনিক হস্তক্ষেপের সমালোচনার মুখে গত ২১ জুন রোববার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক আদেশে জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমকে হঠাৎ প্রত্যাহার করে মন্ত্রণালয়ের উপসচিব হিসেবে সংযুক্ত করা হয়।
তবে ডিসির পূর্ব ঘোষণা ছিল ১৫ দিন পর টাকা গণনা করা হবে। সেই আলোকে তাকে প্রত্যাহার আদেশের পর সিলেট ছাড়ার আগে গত ২২ জুন সোমবার তিনি নিজেই উপস্থিত থেকে এই প্রকাশ্যে গণনার কাজ শুরু করেন। মাজারের সিলগালাকৃত দানবাক্স থেকে তিন দিনে জমা হওয়া ১৭ লাখ ৬৫ হাজার ৫৬৯ টাকা, কিছু বিদেশি মুদ্রা ও স্বর্ণালঙ্কার পাওয়া যায়। অতীতে দানবাক্সের টাকার কোনো হিসাব প্রকাশ করা হতো না কিংবা খরচ কীভাবে হয়ে আসছে, তাও জানার সুযোগ ছিল না কারও।
সিলেট জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সারওয়ার আলম সংবাদমাধ্যমকে জানান, বাংলাদেশ ওয়াকফ আইনের ধারা এবং সরকারি আইনশৃঙ্খলার বিধিমালা অনুযায়ী মাজার প্রাঙ্গণে যেকোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা উসকানিমূলক কর্মকাণ্ড কঠোর হস্তে দমন করা হবে। কেউ আইন নিজের হাতে তুলে নিতে পারবে না।
একই সাথে এসএমপি কমিশনার মো. রেজাউল করিম নিশ্চিত করেন, মাজারের ভেতর ও বাইরে অতিরিক্ত পুলিশ ফোর্স মোতায়েন করা হয়েছে এবং ২৪ ঘণ্টা সিসিটিভি মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে।
মাজারের পুলিশ কন্ট্রোলরুমের উপপরিদর্শক আরাফাত বলেন, মাজারের নিরাপত্তা ব্যবস্থা অত্যন্ত জোরদার রয়েছে। দেশ-বিদেশের জিয়ারতকারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছে। যেকোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে আমরা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছি।