আইনশৃঙ্খলা উন্নয়নে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে
২৫ জুন ২০২৬ ১০:৪৮
রাষ্ট্র সৃষ্টির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, মানুষ, জীবন ও সম্পদের নিরাপত্তার জন্য ঐক্যবদ্ধভাবে বসবাসের মাধ্যমেই এ প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয়েছে। কোনো মানুষই একা জীবনধারণ করতে পারে না। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমাদের এমন বৈশিষ্ট্য ও স্বভাব দিয়েই সৃষ্টি করেছেন। জীবন-সম্পদের নিরাপত্তার জন্য রাষ্ট্র, আইন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও বিচারালয়Ñ এসবই সংবিধান মেনে একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায় নির্বাচিত সরকার। সরকারকে স্বৈরাচারী হতে বাধা দিয়ে জনগণের পক্ষের শক্তি হিসেবে কাজ করে বিরোধীদল। তাই আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে বিরোধীদল কখনো সরকারের সাথে আপস করে না। এ আপসহীন ভূমিকা পালনে বিরোধীদলের বিরোধিতার মধ্যে কোনো রাজনৈতিক প্রতিহিংসা থাকে না, থাকে সরকারকে সঠিক পথে রাখার আন্তরিক প্রচেষ্টা এবং দেশ-জনগণের প্রতি দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে ভালোবাসা। তারপরও দেখা যায়, বিভিন্ন ষড়যন্ত্রমূলক মামলায় স্বৈরাচারী সরকারগুলো যুগে যুগে দলের নেতা-কর্মীদের ওপর দমনবিরোধী নীতি চালিয়েছে এবং এখনো চালাচ্ছে। কিন্তু এর মাধ্যমে মানবাধিকার লঙ্ঘন ছাড়া সরকার অন্য কিছু অর্জন করতে পারে না। সরকারের এমন উপলব্ধির বিকল্প নেই। কারণ এ উপলব্ধির কারণেই দেশে গণতান্ত্রিক সহিষ্ণুতার পরিবেশ স্থিতিশীল রয়েছে। দেশের উন্নয়নের চাকা গতি পায়। সরকারের জনপ্রিয়তা বাড়ে। সাধারণ মানুষের কথা হলো, ‘আমরা জানমালের নিরাপত্তা ও রুটি-রুজির নিরাপত্তা চাই। দুর্নীতি, ঘুষ, চাঁদাবজি, ছিনতাই, চুরি, ডাকাতিমুক্ত পরিবেশে বাঁচতে চাই। সকালে ঘর থেকে বের হয়ে আবার বাসায় ফিরতে পারব কি নাÑ এমন সংশয় থেকে মুক্তি চাই।’ আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার উন্নতি ছাড়া তা সম্ভব নয়। পুলিশের ওপর রাজনৈতিক চাপ ছাড়াও আছে পুরনো মানসিকতার চর্চা। তাই যতই দিন যাচ্ছে, যা আমাদের জন্য উদ্বগজনক। এদেশের মানুষ স্বৈরাচার ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করেছে। কারণ তিনি দল-মতের ঊর্ধে উঠে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে ব্যর্থ হয়েছেন। আগ্রাসী প্রতিবেশী দেশের অ্যাসাইনমেন্ট বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ন্যায়-অন্যায় ভুলে গিয়েছিলেন। শিষ্টের লালন ও দুষ্টের দমনে ব্যর্থ হয়ে গিয়ে দুষ্টদের দলে নিয়েছেন। নির্বাচন ব্যবস্থা নির্বাসনে পাঠিয়ে জনগণের জানমালকে ভেল্কিবাজি খেলায় পরিণত করেছিলেন। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দীর্ঘদিন দেশে পুলিশ নিষ্ক্রিয় ছিলো, তারপরও জনগণের প্রতিরোধের কারণে অপরাধীরা ভয়ে থাকতো। নির্বাচিত সরকার আসার পর অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন দলের কতিপয় নেতার মদদে কিশোর গ্যাংগুলো সক্রিয় হতে শুরু করেছে। ফ্যাসিস্টের দোসর সন্ত্রাসীরা আস্তে আস্তে মাথা তুলতে শুরু করেছে। পুরনো পরিচয় মুছে নতুন করে ক্ষমতাসীন দলের লেবেল লাগিয়ে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, খুন, ধর্ষণ, নারী নির্যাতন ও মাদক ব্যবসাসহ নানা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছে।
পুলিশ সদর দপ্তরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে চলতি বছরের মে পর্যন্ত ২১ মাসে ঢাকা মহানগরে খুনের মামলা হয়েছে ৫৯৭টি। এর মধ্যে ১১টি খুনের ঘটনা ঘটেছে অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’। রাজধানীতে ছিনতাই, ডাকাতি ও খুনের ঘটনা বাড়লেও অপরাধী চক্রগুলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে খুব একটা অচেনা নয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) করা সর্বশেষ তালিকা অনুযায়ী, রাজধানীতে ১১৭টি পেশাদার অপরাধী দল সক্রিয় রয়েছে। একই সময়ে ডাকাতি ও ছিনতাইয়ের মামলা হয়েছে ৭৭৩টি। যদিও ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা অনেক বেশি বলে পুলিশ কর্মকর্তারাই মনে করেন। কারণ অধিকাংশ ঘটনায়ই ভুক্তভোগীরা মামলা করেন না। কেউ কেউ সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে মামলা না নেওয়ার অভিযোগও আছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও কম নয়। গত ২১ মাসে কেবল ঢাকাতেই পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১৪২টি।
রাজধানী ঢাকার সাথে পাল্লা দিয়ে সারা দেশেই বাড়ছে অপরাধীদের দৌরাত্ম্য, যা সত্যি উদ্বেগজনক। কারণ এতে নাগরিকদের জানমালের নিরাপত্তাঝুঁকি বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলার অবনতির কারণ বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, ‘স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নিজ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনের চেয়ে অন্য কাজে বেশি ব্যস্ত থাকায় যথাযথভাবে দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় ঘটছে। তাই তার মন্ত্রণালয় ঠিকমতো কাজ করছে না। আমরা আশা করি, সরকার বিষয়টি বিশেষভাবে বিবেচনায় নিয়ে যত দ্রুত সম্ভব আইনশৃঙ্খলার উন্নতির জন্য কার্যকর উদ্যোগ নেবে। উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করবে।