বাজেটের অঙ্ক বাড়ে সুফল পায় না মানুষ


২৫ জুন ২০২৬ ১০:২৭

উন্নয়নের চেয়ে পরিচালন ব্যয়ে বেশি গুরুত্ব

॥ কাওসার রহমান ॥
প্রতি বছর জাতীয় বাজেট ঘোষণার সময় সরকার উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও জনকল্যাণের নানা প্রতিশ্রুতি দেয়। বাজেটের আকারও বছর বছর বাড়ে। স্বাধীনতার পর প্রথম বাজেট ছিল মাত্র ৭১৯ কোটি টাকার, আর ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রস্তাবিত বাজেটের আকার দাঁড়িয়েছে প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। সংখ্যার হিসাবে এটি নিঃসন্দেহে বড় অর্জন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল অর্থ ব্যয়ের সুফল কি সাধারণ মানুষ পাচ্ছে? কেন প্রতি বছর বাজেট বড় হচ্ছে অথচ জনগণের জীবনমান সেই অনুপাতে উন্নত হচ্ছে না?
অর্থনীতিবিদদের মতে, বাংলাদেশের বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা বাজেট প্রণয়নে নয়, বরং বাস্তবায়নে। বরাদ্দ দেওয়া হচ্ছে, কিন্তু সেই বরাদ্দের কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। ফলে কাগজে-কলমে উন্নয়নের গল্প যত বড়ই হোক, বাস্তবে মানুষ তার প্রতিফলন খুব কমই দেখতে পায়।
বাজেট বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবায়ন একই জায়গায়
বাজেটের আকার ধারাবাহিকভাবে বাড়লেও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কাক্সিক্ষত অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। বাজেটে বরাদ্দের পরিমাণ বাড়লেও বাস্তবায়নের গুণগতমানে তেমন পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে ধীরগতি ও প্রশাসনিক জটিলতার কারণে প্রতি বছরই সংশোধিত বাজেট প্রণয়ন করতে হয়। তারপরও শতভাগ উন্নয়ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। আবার যতটুকু বাস্তবায়ন হয়, সেটার গুণগতমান নিয়েও প্রশ্ন দেখ দেয়। আর প্রশ্নবিদ্ধ উন্নয়নের সুফল কখনোই সাধারণ মানুষ পায় না।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, ঋণের সুদ পরিশোধ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি এবং বিভিন্ন ভর্তুকি খাতে ব্যয় বৃদ্ধির কারণে জাতীয় বাজেটের আকার বড় হচ্ছে। কিন্তু একই হারে বাড়ছে না উন্নয়ন খাতের বরাদ্দ। স্বাধীনতার পর ঘোষিত প্রথম বাজেটে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশ ছিল মোট বরাদ্দের অর্ধেকেরও বেশি। অথচ ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে উন্নয়ন বরাদ্দ মোট বাজেটের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।
নতুন বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে উন্নয়ন কর্মসূচির জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। অর্থনীতিবিদদের মতে, বাজেটের আকার বৃদ্ধি পেলেও উন্নয়ন ব্যয়ের অনুপাত কমে যাওয়ায় দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
গত এক দশকের বাজেট পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মূল বাজেটের গড়ে ৮০ থেকে ৮৫ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। ফলে বাজেটের পরিমাণ যতই বাড়ুক না কেন, বাস্তবায়ন হার একটি নির্দিষ্ট বৃত্তের মধ্যেই ঘোরাফেরা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরিকল্পনা প্রণয়ন ও বরাদ্দ বণ্টনের ক্ষেত্রে বাস্তব চাহিদাভিত্তিক মূল্যায়নের অভাব রয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক জনসংখ্যা, অবকাঠামোগত প্রয়োজন এবং সামাজিক চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্প নির্বাচন না করায় বাস্তবায়ন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বরাদ্দ থাকলেও সময়মতো প্রকল্পের কাজ শুরু বা শেষ করা যায় না।
ফলে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসময় লেগে যায়। আর এই দীর্ঘসময়ের বেড়াজালে ব্যয় বাড়ে, দুর্নীতি ডালপালা মেলে। আবার অর্থবছরের শেষ দিকে তড়িঘড়ি করে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ তৈরি হয়। এতে কাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, বাড়ে অপচয় ও দুর্নীতির ঝুঁকি।
কেন বাস্তবায়ন হয় না?
বাজেট বাস্তবায়নের পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা হলো প্রশাসনিক অদক্ষতা ও জবাবদিহির অভাব। প্রকল্প হাতে নেওয়ার আগে যথাযথ সমীক্ষা করা হয় না। অনেক প্রকল্প রাজনৈতিক বিবেচনায় অনুমোদন পায়, কিন্তু বাস্তব প্রস্তুতি থাকে না। জমি অধিগ্রহণ, দরপত্র প্রক্রিয়া, নকশা পরিবর্তন এবং আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় বছরের পর বছর আটকে থাকে উন্নয়ন প্রকল্প।
আরও বড় সমস্যা হলো দক্ষ জনবলের অভাব। অনেক ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ প্রকল্প পরিচালকের পরিবর্তে অনভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে সময়মতো কাজ শেষ হয় না কিন্তু ব্যয় বাড়ে, আবার প্রকল্পের লক্ষ্যও অর্জিত হয় না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে বারবার অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয় উঠে এলেও সেসব সুপারিশ খুব কম ক্ষেত্রেই কার্যকর করা হয়। ফলে একই ধরনের ভুল বছরের পর বছর পুনরাবৃত্তি হচ্ছে। এতে বাজেট বাস্তবায়ন অদক্ষতা, মানহীনতার প্রশ্ন, অপচয় ও দুর্নীতির বেড়াজালে ঘুরপাক খাচ্ছে। এর থেকে উত্তরণের কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা বা উদ্যোগ পরিলক্ষিত হচ্ছে না। বাজেটে এ বিষয়ে স্বল্পমেয়াদি অর্থনৈতিক কৌশলপত্র থাকলে নীতি স্পষ্ট হতো, কিন্তু এমন উদ্যোগ এবারের বৃহত্তম বাজেটে নেই।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক রুমানা হক বলেন, দীর্ঘ ও জটিল ক্রয়প্রক্রিয়া বাজেট বাস্তবায়নে প্রধান বাধাগুলোর একটি। তার ভাষ্য, যে ক্রয় প্রক্রিয়া শেষ হতে ১২ মাস লাগার কথা, অনেক সময় তা ১৮ মাস পর্যন্ত গড়ায়। এতে ব্যয় প্রক্রিয়া মারাত্মকভাবে পিছিয়ে যায়। দেশে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট ব্যবস্থা চালু হলেও অনেক কর্মকর্তার এখনো এটি কার্যকরভাবে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় দক্ষতা নেই।
তিনি বলেন, অর্থছাড় ও অনুমোদনের জটিল প্রক্রিয়াও বড় সমস্যা। প্রথম দুই প্রান্তিকের অর্থ একসঙ্গে ছাড় করা হলেও পরবর্তী দুই প্রান্তিকের অর্থ পেতে ব্যয়ের হিসাব জমা দিয়ে নতুন করে অনুমোদন নিতে হয়, যা ব্যয়ের গতি কমিয়ে দেয়।
উন্নয়নের চেয়ে পরিচালন ব্যয়ে বেশি গুরুত্ব
বাজেট বিশ্লেষণে দেখা যায়, সরকারের মোট ব্যয়ের বড় অংশ চলে যাচ্ছে পরিচালন খাতে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা, পেনশন, ভর্তুকি এবং ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় হচ্ছে বিপুল অর্থ। উন্নয়ন ব্যয়ের চেয়ে সরকারের পরিচালন এমন উচ্চাতায় পৌঁছে যাচ্ছে যে, পরিচালন ব্যয় এখন দ্বিগুণেরও বেশি হয়ে গেছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে সরকারের মোট ব্যয়ের প্রায় ৮৪ শতাংশই হয়েছে পরিচালন খাতে। উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় এখন প্রায় দ্বিগুণ। অর্থাৎ নতুন হাসপাতাল, স্কুল, গবেষণা, প্রযুক্তি উন্নয়ন বা কর্মসংস্থানমুখী বিনিয়োগের তুলনায় রাষ্ট্রের দৈনন্দিন খরচই বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য এটি উদ্বেগজনক। কারণ দীর্ঘমেয়াদে উন্নয়ন ব্যয়ই অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়, নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে এবং জনগণের জীবনমান উন্নত করে। কিন্তু পরিচালন ব্যয়ের ধারাবাহিক উল্লম্ফনের কারণে উন্নয়ন ব্যয়ের কার্যকারিতা কমে যাচ্ছে। বিশেষ করে অবকাঠামো নির্মাণ, সরকারি বিনিয়োগ এবং উৎপাদনশীল খাতে ব্যয় সংকুচিত হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
তাদের ভাষ্য, একটি উন্নয়নশীল দেশের জন্য পরিচালন ও উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। কারণ পরিচালন ব্যয় মূলত রাষ্ট্রযন্ত্র চালানোর জন্য প্রয়োজন হয়। ফলে উন্নয়ন ব্যয়ের তুলনায় পরিচালন ব্যয় বেশি হলে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতির গতিশীলতা কমে যেতে পারে।
তারা মনে করছেন, সরকারি ব্যয়ে কৃচ্ছ সাধন নীতি কার্যকর না হলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে। তাই অপ্রয়োজনীয় বিদেশ সফর, বিলাসবহুল গাড়ি কেনা এবং অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি রাজস্ব আদায় বাড়ানো, ভর্তুকি ব্যবস্থার সংস্কার এবং এডিপি বাস্তবায়নে দক্ষতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য খাতে হাজার কোটি টাকা, কিন্তু চিকিৎসা কোথায়?
স্বাস্থ্য খাত বাংলাদেশের বাজেট বাস্তবায়ন সংকটের অন্যতম বড় উদাহরণ। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে স্বাস্থ্য খাতে প্রায় ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। সরকার পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ, এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শয্যা বৃদ্ধি এবং ই-হেলথ কার্ড চালুর মতো পরিকল্পনার কথা বলছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অধিকাংশ সরকারি হাসপাতালে এখনো চিকিৎসক সংকট রয়েছে। আবার যাও চিকিৎসক রয়েছে তাদের বেশিরভাগকেই দেখা যায়, অফিস সময়ে সেমিনার-সিম্পোজিয়ামে ব্যস্ত থাকতে কিংবা সরকারদলীয় কোনো ঊর্ধ্বতন চিকিৎসক নেতার কক্ষে বসে আড্ডা দিতে। ফলে রোগীদের দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়।
আবার হাসপাতালগুলোয় প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষার ব্যবস্থা নেই। ওষুধের সংকট নিয়মিত ঘটনা। অনেক হাসপাতালে পর্যাপ্ত শয্যাও নেই। ফলে মানুষ বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালে যায় এবং নিজের পকেট থেকে বিপুল অর্থ ব্যয় করে। বাংলাদেশে চিকিৎসা ব্যয়ের ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ মানুষকে নিজের পকেট থেকেই দিতে হয়।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অতীতের বাজেটগুলোয় স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ দেওয়া অর্থের একটি বড় অংশই ব্যয় করা যায়নি। এমন অভিযোগও রয়েছে যে, কিছু সময় স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দের অর্ধেকেরও কম খরচ হয়েছে। অর্থাৎ সমস্যা বরাদ্দে নয়, বরং বাস্তবায়নে।
এ কারণেই প্রতি বছর হাজার হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসার জন্য ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিদেশে যান। এতে একদিকে জনগণের আর্থিক কষ্ট বাড়ছে; অন্যদিকে বৈদেশিক মুদ্রাও দেশ থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্য খাতে বাজেট পুরোপুরি খরচ না হওয়ার মূল কারণ হলো আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, অপরিকল্পিত প্রকল্প গ্রহণ এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় ধীরগতি। অর্থনীতিবিদ ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অনুমোদন না হওয়া এবং দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে প্রতি বছর বড় অঙ্কের বাজেট অব্যবহৃত থেকে যায়।
আর্ক ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক হিসেবে স্বাস্থ্য খাত নিয়ে কাজ করা রুমানা হক বলেন, সরবরাহ শৃঙ্খলের সমস্যা এবং পরিকল্পনাকারী ও বাজেট কর্মকর্তাদের মধ্যে দুর্বল সমন্বয়ও বাস্তবায়নে বাধা সৃষ্টি করে। তিনি বলেন, নতুন অবকাঠামো নির্মাণের চেয়ে মানুষের চিকিৎসা ব্যয় কমানোর দিকে সরকারকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তার মতে, রোগীদের ব্যক্তিগত ব্যয়ের চাপ কমাতে ওষুধ, টিকা ও অন্যান্য জরুরি সেবায় সরকারি ব্যয় বাড়ানো প্রয়োজন। পাশাপাশি প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবাকেও অগ্রাধিকার দিতে হবে।
ইউনিভার্সেল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চেয়ারম্যান প্রীতি চক্রবর্তী বলেন, ‘আমাদের দেশে স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ করা অর্থ ফেরত যাওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এ দেশে একজন মানুষ নিজের চিকিৎসার মোট খরচের ৬০-৭০ শতাংশ নিজের পকেট থেকে ব্যয় করেন। এ দেশে সরকারি অর্থ চিকিৎসা খাতে খরচ হবে না, এটি ঠিক নয়। নির্বাচিত সরকারের কাছে আবেদন জানাব, স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়িয়েই দায়িত্ব শেষ করবেন না, কোথায় কীভাবে কারা কতটা খরচ করছে, তাও খতিয়ে দেখবেন। এ দেশের মানুষের জন্য বিনামূল্যে সরকারি চিকিৎসা নিশ্চিত করতে হবে।’
শিক্ষা খাতে লাখ কোটি টাকা, তবু কোচিং নির্ভরতা
শিক্ষা খাতেও একই চিত্র। ২০২৬-২৭ অর্থবছরে শিক্ষা খাতে এক লাখ ২২ হাজার কোটি টাকারও বেশি বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ শিক্ষা বাজেট। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিপুল ব্যয়ের সুফল কি শিক্ষার্থী ও অভিভাবক পাচ্ছেন?
বাস্তবতা বলছে, না। প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে প্রায় প্রতিটি শিক্ষার্থীকেই অতিরিক্ত কোচিং, প্রাইভেট টিউশন বা গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। একজন মধ্যবিত্ত অভিভাবককে সন্তানের শিক্ষার পেছনে প্রতি মাসে কয়েক হাজার টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে।
কেন? কারণ শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত এখনো অনেক ক্ষেত্রে অস্বাভাবিক। মুখস্থনির্ভর শিক্ষা ব্যবস্থা এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতা শিক্ষার্থীদের কোচিংমুখী করে তুলেছে।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষকের বেতন রাষ্ট্র দিচ্ছে, বিদ্যালয়ের অবকাঠামো রাষ্ট্র নির্মাণ করছে, বই রাষ্ট্র সরবরাহ করছে; তারপরও শিক্ষার্থীর শেখার জন্য অভিভাবককে আবার আলাদা খরচ করতে হচ্ছে। অর্থাৎ জনগণ কর দিচ্ছে, বাজেট হচ্ছে, কিন্তু সেই সেবার জন্য আবার ব্যক্তিগত ব্যয়ও করতে হচ্ছে। এটি মূলত রাষ্ট্রীয় সেবার গুণগত দুর্বলতার প্রতিফলন।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিক্ষা শেষে বিপুলসংখ্যক তরুণ চাকরি পাচ্ছেন না। অর্থাৎ শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি বড় ধরনের অসামঞ্জস্য তৈরি হয়েছে। দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষার সমন্বয় এখনো দুর্বল।
শিক্ষা বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়িত না হওয়ার মূল কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাবকে চিহ্নিত করেছেন। তাঁদের মতে, শিক্ষা খাতের বাজেটের সিংহভাগই ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণে, যা গুণগত শিক্ষা অর্জনে কোনো ভূমিকা রাখে না।
শিক্ষা গবেষক অধ্যাপক ড. মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘শিক্ষার বাজেট নিয়ে একটি রোডম্যাপ তৈরি করতে হবে। তিন বছর, দুই বছর বা চার বছরে তারা জিডিপির ৫ শতাংশে পৌঁছাবেন। সেইসঙ্গে ব্যবহার করতে হবে বরাদ্দ, যেটি দেয়া হবে তা যেন সুন্দর ও সুষম হয়। শিক্ষকের মান উন্নয়ন, শিক্ষার্থীদের রিডিং ম্যাটেরিয়েলের উন্নয়ন, শিক্ষার গুণগতমান উন্নয়ন করতে হবে, আবার একই সঙ্গে বিল্ডিংও বানাতে হবে।’
জবাবদিহির অভাবই সবচেয়ে বড় সমস্যা
বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থার অন্যতম দুর্বলতা হলো স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব। কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হলো, কাজের মান কেমন হলো, সময়মতো প্রকল্প শেষ হলো কি না, ব্যর্থতার জন্য কে দায়ী, এসব প্রশ্নের স্পষ্ট উত্তর অনেক সময় পাওয়া যায় না।
বিশ্বব্যাংকের মূল্যায়নে বলা হয়েছে, বাজেট বাস্তবায়ন, নিরীক্ষা এবং তথ্য প্রকাশের ক্ষেত্রে বড় ঘাটতি রয়েছে। অনেক তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা হয় না। সংসদীয় কমিটির প্রতিবেদনও অনেক সময় প্রকাশ করা হয় না। ফলে জনগণ জানতে পারে না কোন প্রকল্পে কত টাকা ব্যয় হলো, কাজের মান কেমন হলো এবং দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হলো।
জবাবদিহি না থাকলে দক্ষতা বাড়ে না, বরং অপচয় ও দুর্নীতি বাড়ে। কিন্তু সরকার প্রতি বছর বড় আকারের বাজেট দিচ্ছে, সেই দিকটায় নজর দিচ্ছে না। ফলে জনগণের করের টাকার যথাযথ ব্যবহার হচ্ছে কি না, তা জানার সুযোগ সীমিত।
মানুষ কেন বাজেটের সুফল পায় না?
মূলত তিনটি কারণে সাধারণ মানুষ বাজেটের প্রত্যাশিত সুফল পায় না। প্রথমত, বরাদ্দের বড় অংশ পরিচালন ব্যয়ে চলে যায়, যা সরাসরি উৎপাদনশীলতা বা সেবার মান বাড়ায় না। দ্বিতীয়ত, উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নে বিলম্ব, অপচয় ও দুর্নীতির কারণে বরাদ্দের কার্যকারিতা কমে যায়। তৃতীয়ত, সরকার ব্যয়ের পরিমাণকে সাফল্য হিসেবে তুলে ধরে, কিন্তু ফলাফলকে নয়। কত টাকা খরচ হলো, সেটি হিসাব করা হয়; কিন্তু সেই টাকায় জনগণের জীবন কতটা বদলালো, তার মূল্যায়ন খুব কমই করা হয়।
অর্থাৎ বাজেটের সুফল মানুষ না পাওয়ার মূল কারণ হলো বরাদ্দের তুলনায় ফলাফল মূল্যায়নের অভাব। আমরা প্রায়ই শুনি, স্বাস্থ্য খাতে রেকর্ড বরাদ্দ, শিক্ষা খাতে রেকর্ড বরাদ্দ, কৃষিতে রেকর্ড বরাদ্দ। কিন্তু কতজন রোগী উন্নত চিকিৎসা পেল, কতজন শিক্ষার্থী মানসম্মত শিক্ষা পেল, কতজন যুবক চাকরি পেল- এসব প্রশ্নের উত্তর খুব কম পাওয়া যায়। অর্থাৎ ব্যয়কে সাফল্য হিসেবে দেখানো হয়, ফলাফলকে নয়।
ফলে হাসপাতাল আছে, কিন্তু চিকিৎসক নেই; বিদ্যালয় আছে, কিন্তু মানসম্মত শিক্ষা নেই; প্রকল্প আছে, কিন্তু কাক্সিক্ষত সেবা নেই; রাস্তা আছে, কিন্তু রক্ষণাবেক্ষণ নেইÑ এমন এক বাস্তবতা তৈরি হয়েছে। ফলে বাজেটের অঙ্ক বড় হলেও জনগণের কল্যাণ নিশ্চিত হয় না।
করণীয় কী?
বাংলাদেশের বাজেট ব্যবস্থাকে কার্যকর করতে হলে, সত্যিকার অর্থে জনগণের বাজেট করতে হলে কয়েকটি বিষয়ে গুরুত্ব দিতে হবে। প্রথমত প্রকল্প গ্রহণের আগে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যোগ্য ও দক্ষ কর্মকর্তাদের প্রকল্প পরিচালনার দায়িত্ব দিতে হবে। তৃতীয়ত, আইএমইডি ও নিরীক্ষা প্রতিবেদনের সুপারিশ বাধ্যতামূলকভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
একইসঙ্গে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ বাজেটের খাতগুলোয় শুধু অবকাঠামো নয়, সেবার মানোন্নয়নে গুরুত্ব দিতে হবে। হাসপাতাল নির্মাণের পাশাপাশি চিকিৎসক নিশ্চিত করতে হবে; বিদ্যালয় নির্মাণের পাশাপাশি শ্রেণিকক্ষে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, বাজেট ব্যয়ের প্রতিটি টাকার জন্য জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা করতে হবে।
পাশাপাশি সরকারের আকার ছোট করে পরিচালন ব্যয় কমাতে হবে। সরকার হবে আকারে ছোট, দক্ষ এবং প্রযুক্তিনির্ভর। মুক্তবাজার অর্থনীতিতে সরকার পরিচালিত হবে জনবলের মাধ্যমে নয়, প্রযুক্তির মাধ্যমে। সরকারের কাজ হবে একটি গতিশীল, কর্মমুখী এবং শিল্প সমৃদ্ধ বেসরকারি খাত গড়ে তোলা। দেশের অর্থনীতির চালিকাশক্তি হবে রপ্তানিমুখী বেসরকারি খাত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে সরকার নয়, বেসরকারি খাত। এই শিল্পমুখী বেসরাকরি খাত গড়ে তোলায় সহযোগিতা করাই হবে সরকারের প্রধান কাজ।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আব্দুল হামিদ বলেন, অনেক প্রকল্প পরিচালক ও কর্মকর্তার সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ নেই, যা প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
তিনি বলেন, স্বাস্থ্য বাজেটের পূর্ণাঙ্গ ও কার্যকর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হলে স্বাস্থ্য সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, প্রকল্প পরিচালকদের প্রশিক্ষণ দিতে হবে, অর্থছাড়ের প্রক্রিয়া সহজ করতে হবে এবং যোগ্য ঠিকাদার নির্বাচন নিশ্চিত করতে হবে।
তিনি আরও বলেন, ক্রয় প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে একটি বিশেষ সেল গঠন এবং স্বাস্থ্য প্রশাসকদের সহায়তার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে একটি সার্বক্ষণিক হেল্পডেস্ক চালু করা যেতে পারে।
বড় বাজেট নয়, জনগণ বাজেটের সুফল পেতে চায়
বাংলাদেশের জাতীয় বাজেটের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ অর্থের অভাব নয়, বরং অর্থের সঠিক ব্যবহার। বাজেটের আকার বাড়ছে, কিন্তু বাস্তবায়ন সক্ষমতা সেই গতিতে বাড়ছে না। ফলে জনগণের করের টাকায় তৈরি হওয়া বিশাল বাজেটের পূর্ণ সুফল জনগণের কাছে পৌঁছাচ্ছে না।
স্বাস্থ্য খাতে হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিয়েও যদি মানুষ চিকিৎসার জন্য বিদেশে যায়, শিক্ষা খাতে লাখ কোটি টাকা ব্যয় করেও যদি অভিভাবককে কোচিংয়ের পেছনে হাজার হাজার টাকা খরচ করতে হয়, তাহলে বোঝা যায় সমস্যাটি বরাদ্দে নয়, বরং সমস্যাটি বাস্তবায়নে।
সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুনের মতে, বাজেটের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এর বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া। বাজেট বাস্তবায়নের জন্য যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা প্রয়োজন, তা দেশে এখনো তৈরি হয়নি। বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো এবং সক্ষমতা নিয়ে এই বিশাল বাজেট পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে। তাই শুধু বাজেট ঘোষণা করলেই হবে না, এগুলো কতখানি এবং কীভাবে বাস্তবায়িত হচ্ছেÑ সেটাই এখন মূল বিষয়।
তার মতে, ‘সরকারের উচিত হবে বাজেট বাস্তবায়নের পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কাজ একসাথেই চালিয়ে যাওয়া। প্রকৃতপক্ষে ‘ইনস্টিটিউশনাল রিফর্ম’ বা প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের গতি আরও বাড়াতে হবে, তবেই বাজেট সফলভাবে বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে। কারণ বাজেট সফল করার ক্ষেত্রে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জই হলো এর বাস্তবায়ন।’
অতএব জাতীয় বাজেটের সাফল্য তার আকারে নয়, বরং জনগণের জীবনে তার প্রভাবের মাধ্যমে পরিমাপ করা উচিত। বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ বাজেটের আকার বাড়ানো নয়, বরং বাজেট বাস্তবায়নের গুণগতমান বাড়ানো। কারণ জনগণ বড় বাজেট দেখতে চায় না, তারা চায় উন্নত চিকিৎসা, মানসম্মত শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং উন্নত জীবন। সেই লক্ষ্য অর্জিত হলেই কেবল বাজেট সত্যিকার অর্থে জনগণের কল্যাণের হাতিয়ার হয়ে উঠবে। রাষ্ট্র যখন ব্যয়ের চেয়ে ফলাফলকে গুরুত্ব দিতে শিখবে, তখনই বাজেট সত্যিকার অর্থে জনগণের বাজেট হয়ে উঠবে।