নিষিদ্ধ আ’লীগের হুমকি, রুখবে ঐক্যবদ্ধ জনতা
২৫ জুন ২০২৬ ১০:২৫
॥ সৈয়দ খালিদ হোসেন ॥
জনতার টানা আন্দোলনের মুখে গুম-খুন ও সন্ত্রাস এককথায় গণহত্যার দায়ে বিচারের মুখোমুখি কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সকল সংগঠন। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নানা অপকর্ম ও সন্ত্রাসী কার্যক্রমে রাজনৈতিক দলের নিষিদ্ধের বিধানসংবলিত একটি অধ্যাদেশও জারি করে। বিএনপি ক্ষমতায় এসে সেই অধ্যাদেশ সংসদে পাস করে। ফলে নিষিদ্ধই থাকে আওয়ামী লীগ। কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকলেও দলটির বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। হঠাৎ ঝটিকা মিছিল বের করছে, মিছিল থেকে প্রকাশ্যে পুলিশকে হত্যার হুমকি দিচ্ছে। ফ্যাসিস্ট সরকারের উচ্ছিষ্টভোগীরা আদালতের প্রাঙ্গণে দাঁড়িয়ে নানা হুমকি দিচ্ছে। জ্বালাও-পোড়াওসহ নানা অপতৎপরতা চালাচ্ছে। সরকারি দল ও বিরোধীদল মনে করে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টই জনগণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে তাদের প্রত্যাখ্যান করেছেন। ফলে আওয়ামী লীগের কেউ নতুন করে অপতৎপরতা চালালে জনগণই তাদের প্রতিহত করবে।
নিষেধাজ্ঞার প্রেক্ষাপট
২০২৫ সালের মে মাসে সন্ত্রাসবিরোধী আইন সংশোধনের পর সরকার প্রজ্ঞাপন জারি করে আওয়ামী লীগ এবং এর সহযোগী, অঙ্গ ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর সব ধরনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে সংশ্লিষ্ট বিচার কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির সভা, সমাবেশ, মিছিল, সম্মেলন, প্রচার-প্রচারণা, গণমাধ্যমে প্রকাশনা এবং অনলাইন কার্যক্রমও নিষিদ্ধ থাকবে। পরবর্তীতে জাতীয় সংসদে আইন পাসের মাধ্যমে এই নিষেধাজ্ঞার আইনি ভিত্তি আরও সুসংহত করা হয়। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো সংগঠনের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার অর্থ হলোÑ সেই সংগঠনের নামে বা পক্ষে প্রকাশ্য সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা আইনসম্মত নয়। এ ধরনের কার্যক্রমের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে উত্তাপ ছড়ানোর অপচেষ্টা, প্রশাসনের সতর্কতা
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ২৩ জুনকে কেন্দ্র করে দলটির সমর্থকদের সম্ভাব্য কর্মসূচি নিয়ে কয়েকদিন ধরেই আলোচনা চলছিল। তারা চেয়েছে দেশজুড়ে শক্তির জানান দিতে, বিভিন্ন এলাকায় উত্তাপ ছড়াতেও চেয়েছিল। কিন্তু বিএনপি, জামায়াত, এনসিপিসহ রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলার জন্য প্রস্তুত ছিল। প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সম্ভাব্য পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। রাজধানী ঢাকা ছাড়াও গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর ও চট্টগ্রামসহ কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে ৬ জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে সেনাবাহিনী এবং পাঁচ জেলায় মোতায়েন করা হয়েছে বিজিবি।
মিছিল থেকে প্রকাশ্যে হুমকি
গত ২১ জুন রোববার ভোরে গাজীপুরে যুবলীগের বিক্ষোভ মিছিল ও পুলিশকে হুমকি দেওয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভিডিওতে পুলিশের উদ্দেশে বলতে শোনা যায়, ‘ওই, একটাও সামনে আসবি না। একটাও সামনে আসবি না। মাইরা ফালামু, মাইরা ফালামু।’ জানা গেছে, নিষিদ্ধঘোষিত আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গাজীপুরে যুবলীগের ব্যানারে আয়োজিত ওই মিছিল থেকে পুলিশকে প্রকাশ্যে হুমকি দেওয়া হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, মহানগরীর ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কলম্বিয়া এলাকায় শাকিল এন্টারপ্রাইজ নামের একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সামনে থেকে ৩০-৪০ জন যুবক একটি ব্যানার নিয়ে মিছিল শুরু করে। ব্যানারে লেখা ছিল, ২৩ জুন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সফল হোক, সার্থক হোক। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করতে হবে। ব্যানারের নিচে ‘গাজীপুর মহানগর যুবলীগ’ লেখা ছিল। এছাড়া ব্যানারের এক পাশে শেখ হাসিনা ও অন্য পাশে গাজীপুর মহানগর যুবলীগের আহ্বায়ক কামরুল আহসান সরকারের ছবি দেখা যায়। মিছিলকারীরা ‘শেখ হাসিনা বীরের বেশে, আসবে ফিরে বাংলাদেশে’, ‘জয় বাংলা জয় বঙ্গবন্ধু’, ‘রাজপথ ছাড়ি নাই, শেখ হাসিনার ভয় নাই’ এবং ‘যুবলীগের অ্যাকশন, ডাইরেক্ট অ্যাকশন’ স্লোগান দিতে দিতে গাছা এলাকার দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় মহাসড়কের বিপরীত পাশ থেকে কয়েকজন পুলিশ সদস্য মিছিলের দিকে এগিয়ে এলে মিছিলকারীদের কয়েকজন তাদের লক্ষ করে বিভিন্ন ধরনের হুমকিমূলক বক্তব্য দিতে থাকে। এমন ঔদ্ধত্যপূর্ণ ঘটনা পুলিশের সামনে ঘটলেও পুলিশ তাৎক্ষণিক কোনো অ্যাকশনে যায়নি। পরে অবশ্য এ ঘটনায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। বিশ্লেষকরা মনে করেন, নিষিদ্ধ একটি সংগঠনের নেতারা যদি প্রকাশ্যে পুলিশকে হুমকি দেওয়ার পর পুলিশ কোনো অ্যাকশন না নেয়, তাহলে পলাতাক এই ফ্যাসিস্টদের শক্তি ও সাহস আরও বাড়বে। সাধারণ মানুষের জীবন ও সম্পদ হুমকির মথ্যে পড়তে পারে।
ইনুর আস্ফালন
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ফ্যাসিস্ট হাসিনার পতনের মাত্র কয়েকদিন আগে ১৪ দলীয় জোটের সঙ্গে গণভবনে বৈঠক করেন শেখ হাসিনা। ওই বৈঠকে হাসানুল হক ইনু ও রাশেদ খান মেননরা আন্দোলন থামাতে ছাত্র-জনতার ওপর গুলি চালানোর পরামর্শ দেন বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়েছে। বৈঠকে জামায়াতে ইসলামী ও ছাত্রশিবির নিষিদ্ধের পরামর্শও দেন তারা। ফ্যাসিস্টের এই দোসর (আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী ও জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দলের সভাপতি হাসানুল হক ইনু) গত ২২ জুন সোমবার আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে বিচারক ও আইনজীবীকে হুমকি দেন। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গেও বাগবিতণ্ডায় জড়িয়ে হুমকি দেন বলে জানা গেছে। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে তিনি বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে জেলে আছি। কোন আদালতের কোন বিচারক, কোন আইন কর্মকর্তা কী করতেছে, তা কারাগারের একটা লাল খাতা ও একটা সবুজ খাতায় সংরক্ষণ করে রাখছি।’ ইনু আরও বলেন, ‘বর্তমানে বিচার ব্যবস্থা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটা শাখা হিসেবে কাজ করছে।’ এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী হারুন অর রশিদ আসামি ইনুকে থামতে বলেন। কিন্তু ইনু না থেমে রাষ্ট্রপক্ষের ওই আইনজীবীকে বলেন, ‘আপনি চুপ করেন।’ এরপর ইনু ও আইনজীবীর বাগবিতণ্ডা হয়। এ সময় রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আসামির আদালত অবমাননার অভিযোগ তুলে হাসানুল হক ইনুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বলেন। সে বিষয়ে পরবর্তীতে সিদ্ধান্ত নেবেন বলে জানান আদালত। এরপর মামলাটিতে ইনু ও মেননকে গ্রেপ্তার দেখানোর আবেদন মঞ্জুর করেন।
যা বলছেন রাজনীতিকরা
নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অপতৎপরতার সম্পর্কে মন্তব্য জানতে বিএনপির স্থানীয় কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন এমপির সঙ্গে এ প্রতিবেদকের কথা হয়। তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। মন্তব্য না করার জন্য তিনি দুঃখ প্রকাশও করেন। তবে এ বিষয়ে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা অ্যাডভোকেট রুহুল কবির রিজভী আহমেদ বলেছেন, ফ্যাসিবাদের উত্থানের চেষ্টা আর সম্ভব নয়। জনগণ ও গণতান্ত্রিক শক্তি ঐক্যবদ্ধ রয়েছে। তাই ফ্যাসিবাদের কোনো ধরনের ইঙ্গিত বা অশুভ কর্মকাণ্ড প্রতিহত করতে হবে। রিজভী বলেন, বিএনপি ও এর বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠন গত ২৩ জুন মঙ্গলবার যৌথভাবে প্রতিবাদ মিছিল করেছে। মিছিলের উদ্দেশ্য হলো ফ্যাসিবাদের উঁকি দেওয়ার চেষ্টা প্রতিহত করা। তিনি বলেন, যারা জনগণের জীবন থেকে সুন্দর ভোর, সূর্যের আলো, স্বাভাবিক ও সুস্থ জীবনযাপন এবং মানুষের বাঁচার অধিকার কেড়ে নিয়েছিল, তারা এখন নানা কায়দায় তাদের চুরি ও পাচার করা অর্থ ব্যবহার করে দেশে অস্থিতিশীলতা ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এবং কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, আওয়ামী লীগ হচ্ছে গণহত্যাকারী দল। এই দল দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতি ধ্বংস করেছে। ব্যাংক লুট করে সব অর্থ বিদেশে পাচার করেছে। জুলাই আন্দোলনে ১৪শ’ সাধারণ মানুষকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, ২০ হাজার লোককে আহত করে পঙ্গু করে দিয়েছে। তাদের দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে তারা বহু গুম-খুন করেছে। এই নিষিদ্ধ দলটির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়েছে। বেশকিছু মামলায় রায়ও হয়েছে। এরা দেশে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে ভারতে পালিয়ে গিয়ে দেশের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। জাতীয় সংসদ তাদের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ফলে দেশের জনগণ তাদের আর মেনে নেবে না। গত ২৩ জুন মঙ্গলবার এ প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে এডভোকেট জুবায়ের বলেন, আওয়ামী লীগের স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিবাদী চরিত্র এখনো পালটায়নি, তারা এত বড় বড় অপরাধ করার পরও কোনো অনুশোচনা নেই। তারা এখন ঝটিকা মিছিল করছে, ককটেল নিক্ষেপ করছে। এসব তাদের ফ্যাসিবাদী চরিত্রেরই বহিঃপ্রকাশ। আমরা জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় জোট জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এদের প্রতিহত করবো, ইনশাআল্লাহ।
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিমসহ একাধিক আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করেন এই প্রতিবেদক। কিন্তু তাদের অনেকেরই ফোন বন্ধ থাকায় মন্তব্য জানা সম্ভব হয়নি। দলটির কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক এডভোকেট আফজাল হোসেনের সঙ্গে কথা বলেন এ প্রতিবেদক। তবে তিনি ফোন রিসিভ করলেও দল ও দলের কার্যক্রম সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করতে চাননি। তিনি বলেন, এ অবস্থায় কী আর বলবো। আমি আসলে এখন গণমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে চাই না।
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কার্যক্রম আইনগতভাবে নিষিদ্ধ থাকার পরও দলটির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন স্থানে তাদের ঝটিকা উপস্থিতি রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। গত এক সপ্তাহে দেশের বিভিন্ন এলাকায় আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনের ব্যানারে মিছিল, শোডাউন ও কর্মসূচির খবর সামনে এসেছে। বিশেষ করে গাজীপুরে যুবলীগের ব্যানারে অনুষ্ঠিত একটি মিছিলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও এবং সেখানে পুলিশকে লক্ষ করে হুমকিসূচক বক্তব্যের অভিযোগ জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। নিষিদ্ধঘোষিত কোনো সংগঠনের প্রকাশ্য সাংগঠনিক কার্যক্রম আইনের পরিপন্থী। ফলে এমন কর্মসূচি আয়োজন কিংবা তাতে অংশগ্রহণের বিষয়টি আইনগত অপরাধ।