আবদুল আলী এবং তার স্বপ্ন


২০ জুন ২০২৬ ১১:১০

॥ রফিক মুহাম্মদ ॥
নয়নের মা ও নয়নের মা, কই তুমি, কই গেলা গা, স্ত্রীকে ডাকতে ডাকতে আবদুল আলী রিকশাটা নিয়ে বাড়ির আঙিনায় ঢুকে। বাড়ির সামনে আম গাছের নিচে রিকশা রেখে মাথায় বাঁধা গামছাটা খুলে শরীরের ঘাম মুছতে শুরু করে। অবশ্য এখন আর শরীরে ঘাম তেমন নেই। গায়ের গেঞ্জিটা ভিজে একাকার। ঘড়ের পাশে এবং হাতের বাহুতে ঘাম শুকিয়ে সাদা লবণ জমে আছে। গামছা দিয়ে আবদুল আলী সেগুলো মুছতে মুছতে আবার ডাকে, নয়নের মা ও নয়নের মা…। ডাক শুনে বাড়ির ভেতর থেকে সুফিয়া জবাব দেয়, আইতাছি…।
– জগডা ভইরা পানি লইয়া আও। গলা টলা একবারে হুহাইয়া গেছেগা। কথাগুলো বলে আবদুল আলী আম গাছের ছায়ায় বাঁশ ফালি করে বেঞ্চের মতো বানানো মাচায় বসে পড়ে।
জ্যৈষ্ঠের প্রখর রোদে খাঁখাঁ করছে চারদিক। প্রচণ্ড গরমে হাসপাশ করছে মানুষ, জীব-জন্তু, পশুপাখি সব। আবদুল আলী দেখে আম গাছের ডালে দুটো কাক তাদের ডানা দুটো কিছুটা ফাঁক করে বসে হাঁপাচ্ছে। একটা কুকুর জিভ বের করে হাঁপাতে হাঁপাতে রাস্তার পাশের ডোবায় পানি খেতে নামছে। আবদুল আলী তা দেখে একা একাই বলে, ‘বাপরে বাপ কি যে একটা গরম পড়ছে, ঠাডা পড়া রইদের বিজ্বালা গরমে কুত্তাও পানিত পড়তাছে।’ গত আট দশদিন যাবত বৃষ্টি নেই। জ্যৈষ্ঠের দাবদাহে পুড়ছে প্রকৃতি। এই গরমের দিনে ফজরের নামজের পর পরই আবদুল আলী রিকশা নিয়ে বেরিয়েছিল। এখন ভরদুপুর। এ সময়ের এই কড়া রোদে আবদুল আলী আর রিকশা চালাতে পারছে না। সকাল থেকে তিন-চারটা খ্যাপ মেরে গরমে একেবারে কাহিল হয়ে পড়েছে।
সুফিয়া জগ ভরে পানি নিয়ে এসে আবদুল আলীর পাশে দাঁড়ায়। মগে পানি ঢেলে আবদুল আলীর দিকে বাড়িয়ে দেয়, ‘এই নেওহাইন পানি। এই গরমের মইধ্যে পশু-পক্কিও ঝিম পারতাছে। আপনেরে কইছি আইজ রিকশা লইয়া বাইর অইন না যে। আমার কথাতো কানেই যায় না।’ বলতে বলতে সুফিয়া নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে আবদুল আলীর শরীরের ঘাম শুকিয়ে জমে থাকা লবণ মুছতে থাকে। ‘ইসরে ঘাম হুহাইয়া শইল্ল লবণ জইম্ম্যা গেছেগা। আপনেরে কত কইতাছি এই পাওয়ে চালানি রিকশাডা বেইচ্চ্যা একটা অটো কিনহুয়াইন। আগে তো মাডির রাস্তা আছিলো হের লাইগ্গ্যা কইছেন মাডির রাস্তায় অটো চালাইতে পারবেন না। অহন তো এই রাস্তা পিচ অইছে। নয়নও কইতাছে অটো কিনলে মাঝে মাঝে হেও চাইলাইবো। আপনে তো হেইডা হুনতেই আছেন না।’
আবদুল আলী একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে, ‘তোমরা তো মুখ দিয়া খালি কইলেই অইলো। হুন নয়নের মা একটা অটো কিনতে লাখ দেড় লাখ টেহা লাগে। অত টেহা আমি কই পাই কও। এই রিকশাডা তো কিস্তিতে নিছি। এইডা বেচলে কিস্তির টেহা শোধ কইরা হয়তো হাজার দশেক টেহা পাইয়াম, বাকি টেহা কেলা দিব কও।’
আবদুল আলীর কথা শুনে সুফিয়া এবার চুপ হয়ে যায়। সত্যি তো এত টাকার হিসাব তো তার মাথায় আসেনি। সে তো এতদিন ভেবেছিল এই রিকশাটা বেচে আর সামন্য কিছু টাকা ধার কর্য করে একটা অটো কিনা যাবে। ছেলে নয়ন ইশকুলে পড়ে। এবার নাইনে উঠেছে। সে তার বাবা-মাকে হিসাব কষে বুঝিয়েছে অটো রিকশা কিনলে এখন যে টাকা আয় হয় তার চেয়ে চারগুণ আয় হবে। নয়ন বলে, ‘অহন বাবা হারাদিন রিকশা চালাইয়া পাঁচশ’ টেহার বেশি কামাইতে পারে না। অটো অইলে বাবা হারাদিনে দেড় দুই আজার টেহা কামাইতে পারবো। এছাড়া পায়ে প্যাডেল মারতে অইবো না, ব্যাটারিতে চলবো। তাই হারাদিন চালাইলেও কোন কষ্ট অইবো না। ইশকুল থাইক্ক্যা আইস্যা বিহালে আমি নিজেও দুই তিন ঘণ্টা অটো চালাইতে পারবাম।’
ছেলের কথা শুনে মায়ের চোখ মুখ আনন্দে ভরে যায়। মনের কোনে অনেক স্বপ্ন এসে ভিড় করে। সুফিয়া মনে মনে ভাবে, ‘পত্তিদিন যদি দেড় দুই আজার টেহা কামাই অয় তাইলে তো বছর গেলেই টিনের ঘর করতে পারবো। এরপর কিছু জমিন রেন-বন্ধক রাইখ্যা আস্তে ধীরে গিরস্তি কাম শুরু করবো। নিজের ক্ষেতে ধান অইবো। হারা বছর ঘরের ভাত খাইবো। গিরস্ত ঘরের বউ অউনের এতদিনের আশা তার পূরণ অইবো।’
স্বপ্নতো আবদুল আলীও দেখে। এতদিন তারও স্বপ্ন ছিল বাড়ির সামনের সড়কটা পাকা হবে। এরপর সে একটা অটো কিনবে। প্যাডেল দিয়ে রিকশা চালানোর যে কষ্ট সেটা এখন আর তার সহ্য অয় না। বয়স তো কম হয়নি ষাট বছরের কাছাকাছি। এই বয়সে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বের হলে যাত্রীও এখন আর উঠতে চায় না। সবাই অটো দিয়া তাড়াতাড়ি যাইতে চায়। যাত্রী নিয়ে সে যখন শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে প্যাডেল মারতে মারতে রাস্তা দিয়ে যায়, তখন কত অটো তাকে পাশ কাটিয়ে পিছন ফেলে চলে যায়। তখন আবদুল আলীর নিজেকে বড় অসহায় মনে হয়। অল্প বয়সের অনেক ছোট ছোট পোলাপান রাস্তায় কেমন তিড়িং বিড়িং করে অটো চালায়। এই রাস্তায় কত অটো চলে, দেখলে মনে হয় এই বুঝি এক্সিডেন্ট করে বসবে। কিন্তু না কি সুন্দর পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। আবদুল আলীরও তো মন চায় রাস্তায় এভাবে অটো চালিয়ে দ্রুত যাত্রীদের গন্তব্যে পৌঁছে দিতে। গত বছর রাস্তার কাজ যখন শুরু হয়েছিল তখনই আবদুল আলী মনে মনে ভেবেছিল এবার একটা অটো কিনবে। অটো কিনার জন্য সে টাকাও জমিয়েছিল। কিন্তু হঠাৎ করে তার মেয়ে জমিলার বিয়ে ঠিক হয়ে গেল। ভালো পাত্র। পাশের দুই গ্রাম পরেই ছেলের বাড়ি। ছেলের বাপের সাথে আবদুল আলীর আগে থেকেই পরিচয় আছে। ছেলের বাপে ভ্যান গাড়ি দিয়া তরিতরকারির ব্যবসা করে। ছেলে টঙ্গিতে একটা ফ্যাক্টরিতে চাকরি করে। এমন একটা ভালো সম্বন্ধকে আবদুল আলী হাত ছাড়া করেনি। হাতে জমানো যা টাকা ছিল, তা দিয়ে এবং মেয়ের মামা-খালাদের কাছ থেকেও কিছু সহযোগিতা নিয়ে মেয়ে বিয়েটা সম্পন্ন করেছে। আর তাতে আবদুল আলী বড় নিশ্চিন্ত হয়েছে। এখন সে তার বউ আর ছেলেকে নিয়ে ভালোই আছে। তবে পায়ে চালানো এই রিকশার আয়ে চলতে বড় কষ্ট হচ্ছে। টানা দুই দিন চালানোর পর আর পারে না। এভাবে দেখা যায় যে মাসের দশ দিনই তাকে ঘরে বসে বিশ্রাম নিতে হয়। বাকি দিনগুলোর আয় দিয়ে কোনো রকমে টেনেটুনে চলে যায়। অটো কেনার জন্য যে কিছু টাকা জমাবে সেটা কিছুতেই পারছে না।
রাতে শুয়েও আবদুল আলীর চোখে ঘুম আসছে না। একে তো ভীষণ গরম তার ওপর অটো কিনার চিন্তা। কীভাবে অটো কেনার টাকা জোগাড় করা যায় বিছানায় শুয়ে তাই ভাবছে আবদুল আলী। ভেবে কোন কুলকিনারা পাচ্ছে না। জমি-জিরাত বলতে তো বাড়ির ভিটে টুকু ছাড়া আর কিছু নেই। এই বাপের ভিটে তো কোনো মতে মাথা গুঁজে আছে। এটা না থাকলে যাবে কোথায়? তাই এ ভিটে টুকু বিক্রি করার কথা সে ভাবতেও পারে না। রিকশাটা হয়তো বিশ হাজার টাকা বেচতে পারবে। কিস্তির টাকাটা না হয় অটো কিনার পর মাসে মাসে শোধ করবে। তারপরও তো আরও লাখ টাকার দরকার। কীভাবে এত টাকা জোগাড় করবে। ‘আইচ্ছা কালুরে বেইচ্চ্যা দিলে অয় না।’ অন্ধকারেই আবদুল আলীর চোখে মুখে আনন্দ ঝিলিক মারে। পাশে শুয়ে থাকা স্ত্রী সুফিয়াকে এবার হাত দিয়ে ধাক্কা দেয়, ‘এই নয়নের মা হুনছ, ঘুমাইয়া গেছগা নাহি…।’ আবদুল আলীর ধাক্কায় আড়মোড়া ভেঙে সুফিয়া বলে কি অইছে , অত রাইতে..।
-আরে না ওইসব কিছু না, হুন অটো কিননের একটা উপায় পাইছি।
– অটো কিনার কথা শুনে সুফিয়া এবার পাশ ফিরে আবদুল আলীর দিকে মুখ করে বলে, কি উপায়. কেমনে অটো কিনবাইন?
– হুন নয়নের মা তোমার কালুরে যদি বেইচ্চ্যা দেই তাইলে প্রায় লাখ টেহা পাওন যাইবো। বাকি টেহা রিকশা বেইচ্চ্যা, কিছু ধার কর্য কইরা একটা অটো কিইন্ন্যালানি যাইবো।
– কালুরে বেইচ্চ্যা দিবাইন মানে…। এইডা আপনে কি কইতাছুইন। নিজের পেডের সন্তানের মতন কইরা কালুরে লালন পালন করতাছি। ওরে বেইচ্চ্যা দিবাইন। কালু হলো কালো রঙের একটা ষাড় গুরু। প্রায় দুই বছর আগে মদনপুরের বাজার থেকে ছোট্ট একটা বাছুর কিনে এনেছিল আবদুল আলী। সেই বাছুরটাকে নিজের সন্তানের মত আদর যত্ন করে লালন-পালন করছে সুফিয়া। গায়ের রংটা কি সুন্দর মিজমিজে কালো। আর এজন্যই সুফিয়া ওকে আদর করে কালু বলে ডাকে। এই মাঝ রাতে স্বামী-স্ত্রী যখন তাদের স্বপ্ন পূরণের উপায় নিয়ে শলাপরপমর্শ করছে, তখন ঘরের একপাশে থাকা কালু হাম্বা স্বরে ডেকে ওঠে। আর কালুর ডাকে সুফিয়ার ভেতরটা নড়ে ওঠে। সুফিয়া আবদুল আলীরে বলে, ‘আর একটু ভাইব্ব্যা দেহেন। কালুরে না বেইচ্চ্যা…
– এছাড়া তো অটো কিননের আর কোনু উপায় দেখতাছি না। হুন নয়নের মা অটো অইলে তো আল্লার রহমতে কামাই রুজি ভালাই অইবো। আল্লায় চাইলে অটোর কামাই দিয়া দুই তিন মাস পরেই এমন কালু তোমারে দুইডা কিইন্ন্যা দিয়াম।
সুফিয়া আর কোনো কথা বলে না। বুকের দীর্ঘশ্বাস চেপে রেখে চুপচাপ শুয়ে থকে। আবদুল আলী বলে, কাইল অইল বুধবার, আমতলার আড। কালুরে লইয়া ওই আডেই যাইয়াম। ফজরের আজানডা পরলেই তুমি উইট্ট্যা কালুরে ভালা কইরা ঘাস-পানি খাওয়াইয়া দিবা। এরপর নয়ন আর আমি দুই বাপ-বেডা কালুরে লইয়া আমতলার আডে যাইয়ামগা।
আস সালাতু খাইরুম মিনান নাউম… আজান শুনেই শরীরের আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসে সুফিয়া। আবদুল আলীকে আস্তে আস্তে হাত দিয়ে ধাক্কা দেয় আর ডাকে ও নয়নের বাপ হুনছুইন আজান পড়ছে তো। উইট্টা নমাজডা পড়হাইন। সুফিয়া আস্তে আস্তে বিছানা থেকে নেমে অজু করে নামাজডা পড়ে নেয়। তারপর কালুর জন্য ঘাস নিয়ে যায়। দরজা খুলেই সুফিয়া দেখে ঘরে কালু নাই। সে চিৎকার দিয়ে উঠে, ও নয়নের বাপ আইলাইন্ন্যা, সব্বনাশ অইয়া গেছেগা। আমরারর কালুরে চোরে নিয়া গেছেগা। ও আল্লারে অহন কী অইবো গো… আমার কি ডাহাতি অইছে গো…। সুফিয়ার আর্তচিৎকারের ভোরের বাতাস ভারী হয়ে ওঠে। আবদুল আলী ধড়ফড় করে ঘুম থেকে উঠে ছুটে আসে। সে হতবাক কোন দিকে যাবে, কী করবে কিছুই বুঝতে পারছে না।