আশুরা : ইতিহাস, ফজিলত ও বর্জনীয় কুসংস্কার
১৮ জুন ২০২৬ ১০:৪১
॥ অধ্যাপক আতাউর রাহমান নাদভী ॥
আশুরার ঐতিহাসিক পটভূমি
হিজরি সনের প্রথম মাস হলো মহররম। এই মাসের দশম তারিখকে ‘ইয়াওমে আশুরা’ বলা হয়। ইসলামের ইতিহাসে আশুরা অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও মহিমান্বিত একটি দিন। সৃষ্টির শুরু থেকে আজ পর্যন্ত এই দিনে অসংখ্য অলৌকিক ও ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। মানব ইতিহাসের বহু মহান ঘটনার সাথে এই দিনটির গভীর সংযোগ রয়েছে। ধর্মীয় বর্ণনা অনুযায়ী, এই বরকতময় দিনেই বনি ইসরাইল ও মূসা (আ.)-কে ফেরাউনের চরম জুলুম-নির্যাতন থেকে অলৌকিকভাবে লোহিত সাগর পার করে মুক্তি দেওয়া হয়েছিলো। এছাড়া ১০ মহররমেই এক ভয়াবহ প্লাবন থেকে রক্ষা পেয়ে নূহ্ (আ.)-এর কিসতি ‘জুদি’ পাহাড়ে এসে ভিড়েছিলো। যুগে যুগে অন্যান্য আম্বিয়ায়ে কেরামের বহু দোয়া ও সংকট থেকে মুক্তির মাধ্যমও ছিলো এই পবিত্র দিনটি।
জাহেলি যুগেও মক্কার কুরাইশদের কাছে এ দিনটি অত্যন্ত সম্মানিত ছিলো। তারা এই দিনে কাবা শারীফে নতুন গিলাফ চড়াত এবং রোজা রাখত। ধারণা করা হয়, ইবরাহিম (আ.)-এর আমল থেকেই তারা এই ঐতিহ্য পেয়েছিলো। মহানবী (সা.) মাক্কায় থাকাকালীন কুরাইশদের সাথে এই আশুরার রোজা রাখতেন বলে সীরাতের গ্রন্থসমূহের মধ্যে আমরা দেখতে পাই।
পরবর্তীতে হিজরতের পর মদীনায় গিয়ে তিনি দেখলেন, ইহুদিরাও এই দিনে রোজা রাখছে। কারণ হিসেবে তারা জানালো, এই দিনে আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবী মূসা (আ.) ও তাঁর কওমকে ফেরআউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন এবং ফেরাউনকে সৈন্যসহ লোহিত সাগরে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মানব ইতিহাসের বাঁক পরিবর্তনের বহু অবিস্মরণীয় ঘটনার সাক্ষী পবিত্র আশুরা। এই দিনটি একদিকে যেমন অলৌকিক ও ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মারক, অন্যদিকে মুসলিম উম্মাহর জন্য এক চরম ত্যাগ ও শোকের দিন।
মহররম ও আশুরার ফজিলত
কুরআনের সূরা তাওবার মধ্যে যে চারটি মাসকে ‘আশহুরুল হুরুম’ বা সম্মানিত মাস ঘোষণা করা হয়েছে, মহররম মাস সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। হাদীসের মধ্যে এই মাসকে ‘শাহরুল্লাহ’ বা আল্লাহর মাস হিসেবে অভিহিত করা হয়েছে। আশুরার দিনের ঐতিহাসিক ফজিলত হলো, যখন আল্লাহ তায়ালা আপন অনুগ্রহে তাঁর নবী মূসা (আ.)-কে লোহিত সাগর পার করালেন এবং ফেরাউনকে ডুবিয়ে মারলেন, তখন মূসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ আশুরার দিনে রোজা রেখেছিলেন। এ কারণে ইহুদিরাও আশুরার রোজা রাখত। আল্লাহর রাসূল যখন হিজরত করে মাদীনায় পৌঁছলেন, তখন কোনো এক উপলক্ষে তিনি ইহুদিদের আশুরার রোজা রাখতে দেখলেন। অতঃপর তাদের কাছে জানতে চাইলেন, ‘তোমরা এই রোজা কেন রাখো?’ তারা জানালো, যখন আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) এবং তার জাতি বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন, তখন মূসা (আ.) শুকরিয়াস্বরূপ আজকের দিনে রোজা রেখেছিলেন। তাই আমরাও এই দিনে রোজা রাখি। আল্লাহর রাসূল (সা.) বললেন, ‘মূসার ঐতিহ্যের ওপর আমল করার ক্ষেত্রে আমরা তোমাদের চেয়ে বেশি হকদার।’ তাই তিনি সাহাবায়ে কেরামকে এই রোজার প্রতি গুরুত্ব দেওয়ার তাগিদ দিলেন।
মহররম ও আশুরার গুরুত্ব
রমাদানের পর মহররমের রোজাকে সর্বাধিক ফজিলতপূর্ণ বলা হয়েছে। আল্লাহর রাসূলের স্থায়ী তরিকা বা সুন্নত হওয়াই মুসলমানদের জন্য এর গুরুত্ব দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট। এটাই এর সবচেয়ে বড় ফজিলত। তা সত্ত্বেও হাদীসসমূহে এই দিনের রোজা এবং এর ফজিলত বর্ণিত হয়েছে। মহররম ও আশুরার গুরুত্ব অনুধাবনের জন্য আমরা যে কয়েকটি বিষয় দেখতে পাই, তা হলো-
এক. রাসূল (সা.) এই মাসকে আল্লাহর মাস বা ‘শাহরুল্লাহিল মহররম’ বলেছেন। অতএব হাদীসের মধ্যে আল্লাহর দিকে এ মাসের সংযুক্তি ইসলাম ও মুসলমানদের কাছে এ মাসের ফজিলত ও গুরুত্ব প্রমাণ করে।
দুই. রাসূল (সা.) স্বয়ং রমাদানের সিয়ামের পর সব চয়ে গুরুত্ব দিয়ে মহররমের সিয়াম আদায় করতেন।
তিন. রমাদানের সিয়াম ফরজ হওয়ার পূর্বে উম্মতে মুহাম্মদীর ওপর আশুরার সিয়াম ফরজ ছিলো। দ্বিতীয় হিজরীতে যখন রামাদান মাসের সিয়াম ফরজ করা হলো তখন আশুরার সিয়াম সুন্নত হিসেবে পালনের বিধান রাখা হলো।
চার. সওয়াবের দিক দিয়ে আশুরা এমন এক দিন যেদিনের একটিমাত্র সিয়াম বিগত এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হয়ে যায়। রাসূল (সা.) বলেছেন, ‘আমি আশাবাদী যে, আশুরার সিয়ামের কারণে আল্লাহ অতীতের এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দিবেন।’ (মুসলিম-১১৬২)।
কারবালার হৃদয়বিদারক ঘটনা
আশুরার ইতিহাসের সবচেয়ে বড়, বেদনাদায়ক এবং যুগান্তকারী ঘটনাটি ঘটেছিল ৬১ হিজরির ১০ মহররম। ইরাকের কারবালা প্রান্তরে মহানবী (সা.)-এর প্রাণপ্রিয় দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.), তাঁর পরিবার ও বিশ্বস্ত সঙ্গীরা সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে নিজেদের জীবনের সর্বোচ্চ কুরবানি পেশ করেছিলেন। ইয়াজিদী শাসনের অন্যায় ও স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে ইমাম হুসাইন (রা.)-এর এই আপসহীন সংগ্রাম মানবজাতিকে শিখিয়েছে, পরিস্থিতি যত কঠিনই হোক না কেন, জুলুম, অত্যাচার ও অসত্যের সামনে কখনো মাথা নত করা যাবে না। কারবালার এই ত্যাগ আমাদের ধৈর্য, অবিচলতা এবং ন্যায়ের পথে অবিরাম লড়ে যাওয়ার চিরন্তন শিক্ষা দেয়।
আমাদের জানা থাকা দরকার
* আশুরার সিয়ামের গুরুত্ব বা ফজিলতের সাথে হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের বিশেষ কোনো সম্পর্ক নেই।
* হুসাইন (রা.)-এর শাহাদতের ঘটনা হিজরতের ৬১ বছর পর ঘটেছিলো।
* রাসূল (সা.)-এর নবুয়্যাতপ্রাপ্তির আগে অর্থাৎ জাহেলি যুগ থেকেই আশুরার সিয়ামের প্রচলন ছিলো।
* আশুরার সিয়াম মূসা (আ.)-এর নাজাতের কারণে আল্লাহর শুকর আদায়ের জন্যও রাখা হতো।
রাসূলুল্লাহ (সা.) মক্কায়ও আশুরার রোজা রাখতেন।
সাধারণত ওয়ায়েজীন (বক্তাগণ) ও অন্যরা এটিকে এমনভাবে বয়ান করেনÑ যেন রাসূলুল্লাহ (সা.) মদীনায় আসার পর আশুরার রোজা রাখা শুরু করেছিলেন; অর্থাৎ মূসা (আ.)-এর অনুসরণে ইহুদিদের কাজকর্ম দেখে শুরু করেছিলেন। কিন্তু এমন বক্তব্য সঠিক নয়। রাসূলুল্লাহ এবং সাহাবায়ে কেরাম মক্কায়ও আশুরার রোজা রাখতেন। বরং কুরাইশ অর্থাৎ মক্কার মুশরিকরাও আশুরার রোজা রাখত। রাসূল (সা.) যখন হিজরত করে মদীনায় আসলেন, তখন তিনি আশুরার রোজার আনুষ্ঠানিক নির্দেশ দিলেন এবং মদীনায় ও আশপাশের সমস্ত মুসলমান এই রোজার গুরুত্ব দিতেন। আয়েশা (রা.) বলেন, রমাদান মাসের রোজা ফরজ হয়ে গেল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজাকে ঐচ্ছিক করে দিলেন; যার ইচ্ছা সে রাখুক, আর যার ইচ্ছা না রাখুক। (বুখারী, ২০০১)। তবে রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে গুরুত্বের সাথে এটি রাখতেন এবং এই দিনের রোজার বিশেষ যত্ন নিতেন।
একটি রোজায় এক বছরের গুনাহ মাপ
আবু কাতাদাহ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা.) এরশাদ করেছেন, ‘আমি আশা করি, আশুরার রোজার বিনিময়ে আল্লাহ তায়ালা বিগত এক বছরের গুনাহ ক্ষমা করে দেবেন।’ (সহীহ মুসলিম)। একটি মাত্র সিয়াম বিগত এক বছরের গুনাহ মাফের কারণ হবে। ‘রাসূল (সা.) যখন আশুরার দিনে সিয়াম আদায় করেন এবং অন্যদেরও সিয়াম আদায়ের নির্দেশ দেন, তখন সাহাবীরা অবাক হয়ে বলেন, ইয়া রাসূলুল্লাহ! ইহুদি-নাসারারা তো এই দিনটিকে বড়দিন মনে করে। (আমরা যদি এই দিনে সিয়াম আদায় করি, তাহলে তো তাদের সঙ্গে সামঞ্জস্য হয়ে যাবে। তাদের প্রশ্নের উত্তরে রাসূল (সা.) বললেন, ‘তারা যেহেতু এদিন একটি রোজা পালন করে আগামী বছর ইনশাআল্লাহ আমরা এই ১০ তারিখের সঙ্গে ৯ তারিখ মিলিয়ে দুই দিন সিয়াম পালন করবো।’
এই হাদিস আমাদের কী শিক্ষা দেয়
* ইসলামী শরীয়াতের মূলমন্ত্র হচ্ছে মুসলমানদের কথা, কাজ, অবস্থা কাফেরদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ না হওয়া।
* রাসূল (সা.) আশুরার সিয়ামের ক্ষেত্রে ইহুদিদের বিরোধিতা করছেন, আমাদেরও তাই করতে হবে।
* মুসলমানদের কথা, কাজ, গুণাগুণ, কালচার, ইবাদত ও উৎসব সব কিছুতে নিজস্ব বৈশিষ্ট থাকবে।
* রাসূল (সা.) আরো বলেছেন, তোমরা আশুরার দিন সাওম পালন কর এবং ইহুদিদের বিরুদ্ধাচরণ করো।’
* রাসূল (স.) বলছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে ব্যক্তি ঐ জাতির অন্তর্ভুক্ত হবে।’ (আবু দাউদ-৪০৩১)।
আশুরার আমল : সুন্নত বনাম প্রথা
আশুরার প্রধান আমল হলো রোজা রাখা। তবে বিশ্বনবী (সা.) ইহুদিদের সাথে সাদৃশ্য বর্জন করার জন্য ১০ মহররমের সাথে আগে বা পরে একদিন মিলিয়ে (৯ ও ১০ অথবা ১০ ও ১১ তারিখ) মোট দুটি রোজা রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। তাই রাসূল (সা.)-এর বাতলানো মতে আমল করতে হবে। কারণ আল্লাহ কুরআনের মধ্যে বলেছেন, ‘নিশ্চয় তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে।’ (সূরা আহযাব : ২১)।
আশুরার দিনটি হলো রোজা রাখার দিন। রমাদানুল মোবারকের রোজা ফরজ হওয়ার আগে আশুরার রোজাই রাখা হতো এবং আল্লাহর রাসূল (সা.) হিজাতের আগেও এবং হিজরতের পরেও সর্বদা আশুরার রোজা রেখেছেন। দ্বিতীয় হিজরিতে রমাদানের রোজা ফরজ হওয়ার পর আশুরার রোজার ফারযিয়াত (বাধ্যবাধকতা) তো শেষ হয়ে যায়, কিন্তু রাসূলুল্লাহ (সা.) নিয়মিতভাবে আশুরার রোজা রাখতেন। এভাবে আশুরা আল্লাহর রাসূলের একটি স্থায়ী সুন্নত। রাসূলুল্লাহ (সা.) আশুরার রোজার গুরুত্ব ঠিক সেভাবেই দিতেন, যেভাবে রমাদানের রোজার গুরুত্ব দিতেন। ইবনে আব্বাসের একটি রেওয়ায়েত ইমাম বুখারী নকল করেছেন। তিনি বলতেন, ‘আমি রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে দিনগুলোর মধ্যে আশুরার দিন এবং মাসগুলোর মধ্যে রমাদানের মাসের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে অন্য কোনো রোজার সন্ধান করতে দেখিনি।’ (বুখারী, হাদীস : ১৮৬৭)।
ইবাদতের ক্ষেত্রে যতটুকু ইবাদত শরীয়াতসম্মত, অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ (সা.) থেকে প্রমাণিত, ততটুকু করাই হলো রাসূলের প্রকৃত অনুসরণ। এতে কম বা বেশি করার অর্থ হলো নিজের নফসের (প্রবৃত্তির) অনুসরণ। তাই আশুরায়ে মহররমের দাবি হলো, যেভাবে রাসূলুল্লাহ এই দিনে রোজা রেখেছেন, আমরাও যেন রোজা রাখি এবং আশা রাখি যে, এর মাধ্যমে আমাদের গুনাহ মাফ হবে। আর এভাবে আমরা সেই ঐতিহাসিক ঐতিহ্যের সাথেও যুক্ত হয়ে যাব, যা মূসা (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত চলে আসছে। অর্থাৎ এই দিনেই বনি ইসরাইল ফেরাউনের জুলুম থেকে মুক্তি পেয়েছিলো। তাই এই দিনটি হলো মজলুমের সহায়তার এক প্রতীক।
মহররমের ১০ তারিখের গুরুত্ব আগেও ছিল
আশুরার গুরুত্ব কেবল কারবালার ঘটনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারবালার হৃদয়বিদারক শাহাদাতের ঘটনা অনেক পরে সংঘটিত হয়েছে। নিঃসন্দেহে হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাত মুসলিম উম্মাহর জন্য চরম শোকের, তবে ইসলামের দৃষ্টিতে শোক পালনের নামে মাতম করা, শরীর রক্তাক্ত করা বা তাজিয়া মিছিল বের করার কোনো ভিত্তি নেই। মুহররমুল হারামের দশ তারিখ অর্থাৎ আশুরার দিন ইসলামী ইতিহাসের সেই বেদনাদায়ক দুর্ঘটনাটি ঘটেছিলো, যাতে রাসূলের দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা.) শাহাদাতবরণ করেন। যেহেতু এই ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ছিলো, তাই সমগ্র মুসলিম বিশ্ব এর নিন্দা জানিয়েছিলো এবং পরবর্তীতে এই ট্র্যাজেডি একটি রূপক বা প্রতীকে পরিণত হয়।
সাধারণ মানুষের কাছে ১০ মহররম বলতে মূলত হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতের ঘটনাই বোঝায় এবং এই দিনের প্রাচীন ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় মর্যাদার কথা খুব কমই স্মরণ করা হয়। তাই আমাদের মূল ইতিহাস জানতে হবে। আমাদের অনেকেই মনে করে হুসাইনের শাহাদাতের কারণে মহররমের মাস ও মহররমের ১০ তারিখ মুসলমানদের কাছে অনেক গুরুত্বপূর্ণ একটি মাস ও একটি দিন। অথচ বিষয়টি এমন নয়। কারণ ইসলামের আগমনের পূর্বেও মহররমের ১০ তারিখের গুরুত্ব ও শ্রেষ্ঠত্ব ছিলো। হুসাইন (রা.)-এর শাহাদাতও নিঃসন্দেহে একটি অনেক বড় ঘটনা ছিলো। মুসলিম উম্মাহ আজও এর ক্ষত ভুলে যায়নি। কিন্তু ‘আশুরায়ে মুহররম’ অর্থাৎ মুহররমের দশ তারিখের ধর্মীয় ও ইসলামী ফজিলত এই ঘটনার আগে থেকেই ছিলো।
বর্জনীয় কুসংস্কার ও বিদ’আত
বর্তমানে আমাদের দেশ বাংলাদেশেও আশুরা আসলে মুসলমানের সন্তানরা শিয়া হয়ে ওঠে। তারা জানতেই চায় না যে, কোন কাজ তারা করতে পারবে আর কোন কাজ করতে পারবে না। তাই আশুরাকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে নানা বিদ’আত ও কুসংস্কার ছড়িয়ে পড়েছে, যা থেকে বেঁচে থাকা ঈমানের দাবি :
১. তাজিয়া ও মাতম : বুক চাপড়ানো বা মাতম করা ইসলামে নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি গালে চপেটাঘাত করে এবং জামার কলার ছিঁড়ে ফেলে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।’ একজন উর্দু কবি বড় চমৎকার করে বলেছেন, ‘না ইশকে হুসাইন, না যাওকে শাহাদাত, গাফেল সামঝ বৈঠা হায় মাতম কো ইবাদত।’ অর্থাৎ হুসাইনের প্রতি ভালোবাসা কিংবা শাহাদাতের আস্বাদ, কোনোটিই নয়, উদাসীন ব্যক্তি শোককে ইবাদাত মনে করেছে।
২. বিশেষ রান্না (খিচুড়ি প্রথা) : নির্দিষ্টভাবে আশুরার দিনে খিচুড়ি বা বিশেষ কোনো খাবার রান্না করাকে সওয়াবের কাজ মনে করা শরীয়াতসম্মত নয়। এই সম্পর্কে উপরে আমি বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
৩. বিয়ের ক্ষেত্রে অশুভ ধারণা : মহররম মাসকে শোকের মাস মনে করে এ মাসে বিয়ে-শাদী বা আনন্দ অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকা একটি ভুল ধারণা। ইসলামে কোনো মাস বা দিন অশুভ নয়।
৪. আলোকসজ্জা : ধর্মীয় আবহে মসজিদগুলোয় সওয়াবের কাজ মনে করে আলোকসজ্জা করা এবং রাতে আতশবাজি ফুটিয়ে উৎসবে মেতে ওঠা এসবই বিজাতীয় সংস্কৃতির অংশ। এসবের সাথে মহররম এবং আশুরার কোনো সম্পর্ক নেই। করলে সাওয়াবের পরিবর্তে গোনা হবে।
উপসংহার : পুরো বিষয়টির সারমর্ম হলো ‘ইয়াওমে আশুরা’ মুসলিম উম্মাহকে তাওহীদ, হক ও আত্মত্যাগের মহান চেতনা স্মরণ করিয়ে দেয়। সকল প্রকার অন্যায় ও অপসংস্কৃতি পরিহার করে ইবাদতের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করাই হোক এই দিনের মূল লক্ষ্য। আশুরা আমাদের ত্যাগের শিক্ষা দেয় এবং অসত্যের বিরুদ্ধে সত্যের জয়ের বার্তা দেয়। এই দিনের প্রকৃত শিক্ষা হলো, সুন্নত অনুযায়ী রোজা পালন করা, ইবাদতে মশগুল থাকা এবং সকল প্রকার শিরক ও বিদ’আতমুক্ত জীবন গড়া। আল্লাহ আমাদের সঠিকভাবে আশুরার ইতিহাস জেনে এবং কুসংস্কার ও অপসংস্কৃতি হতে দূরে থেকে আশুরার মর্যাদা রক্ষা করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
লেখক : আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক।