টালমাটাল অর্থনীতি
১৮ জুন ২০২৬ ১০:৩৩
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
তৈরি পোশাকনির্ভর রফতানি বাজারে ক্রমাগত চ্যালেঞ্জের মুখে দেশ। বিনিয়োগখরায় মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি এবং কর্মসংস্থান নিম্নমুখী। অর্থনীতির সবগুলো সূচকের নিম্নমুখী টানে টালমাটাল দেশের অর্থনীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, শিল্প খাতে মন্থরতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কটে পুরো অর্থনীতি। সার্বিক বিষয়ে সময় থাকতেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও আস্থা তৈরিতে জোর দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জুলাই থেকে মে ১১ মাসে নেতিবাচক প্রবৃদ্ধির মুখে পড়েছে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাতের রফতানি আয়। রফতানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) প্রকাশিত সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, এ সময়ে খাত থেকে মোট রফতানি আয় ৩৫ দশমিক ৩১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের একই সময়ে অর্জিত ৩৬ দশমিক ৫৬ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ৩ দশমিক ৪১ শতাংশ কম।
পোশাক রফতানি ৯ মাসে কমেছে প্রায় সাড়ে ৮ শতাংশ : রফতানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্যানুযায়ী, বছরওয়ারি (ইয়ার-অন-ইয়ার) হিসাবে ২০২৬ সালের মে মাসে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি ৮ দশমিক ২৯ শতাংশ কমেছে। ২০২৫ সালের মে মাসে যেখানে পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ৩ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৬ সালের মে মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৫৯ বিলিয়ন ডলারে। খাতভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, নিটওয়্যার রফতানি মে মাসে ১ দশমিক ৯৭ বিলিয়ন ডলারে নেমে এসেছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৯১ শতাংশ কম। অন্যদিকে ওভেন পোশাক রফতানি কমে ১ দশমিক ৬২ বিলিয়ন ডলারে দাঁড়িয়েছে, যা বছরওয়ারি হিসাবে ৭ দশমিক ৫৩ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে।
এ বিষয়ে বিজিএমই-এর সাবেক পরিচালক মহিউদ্দিন রুবেল বলেন, বৈশ্বিক বাজারে চাহিদার ধীরগতি, ক্রয়াদেশে অনিশ্চয়তা এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য পরিস্থিতির প্রভাব বাংলাদেশের পোশাক রফতানিতে প্রতিফলিত হচ্ছে। শিল্পের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা ধরে রাখতে উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, পণ্যের বৈচিত্র্য এবং নতুন বাজার সম্প্রসারণ প্রয়োজন।
তিনি বলেন, সামনের মাসে আমাদের মিনিমাম চার বিলিয়ন ট্রাই করতে হবে, যদি গত বছরের এক্সপোর্ট ধরতে চাই। তার ওপরে গত বছর থেকে বাড়তি করতে গেলে চারের থেকে বেশি করতে হবে। যেটা বেসিক্যালি এখন কিছুটা ডিফিকাল্ট বলেই মনে হচ্ছেÑ বর্তমান প্রেক্ষাপটে এক মাসের মধ্যে চার বিলিয়ন এই গ্রোথটা।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘রফতানি উৎসাহিত করতে দেওয়া বিভিন্ন প্রণোদনা কমানো হয়েছে। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বের হয়ে গেলে প্রণোদনা দেওয়া সম্ভব না হলে বিকল্প কী উপায়ে রফতানিকারকদের সহায়তা দেওয়া যায়, তা নিয়েও কার্যকর কোনো উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে না।’
জ্বালানি সঙ্কট, ব্যাংকিং খাতের জটিলতা, কাস্টমসে বিলম্ব, বন্দরজট, পরিবহন সমস্যা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে বছরের পর বছর ধরে চলতে থাকা প্রতিবন্ধকতা হিসেবে উল্লেখ করেন হাতেম। তিনি আরও বলেন, ছোট রফতানিকারকদের জন্য কাঁচামালের আমদানি সহজ করতে দীর্ঘদিন ধরে সেন্ট্রাল বন্ডেড ওয়্যারহাউসের কথা বলা হলেও এক দশকেও তা বাস্তবায়ন হয়নি।
বিনিয়োগে চরম খরা
নতুন বিনিয়োগে চরম খরায় উৎপাদন যেন এগোচ্ছেই না। ব্যাংকের টাকা বেসরকারি বিনিয়োগে না গিয়ে তা যাচ্ছে সরকারের কোষাগারে, ফলে থমকে যাচ্ছে কর্মসংস্থান। দেশীয় বিনিয়োগে চরম খরায় বিদেশি বিনিয়োগ যেন বর্তমানে সোনার হরিণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গত ৩৫ বছরের মধ্যে এবারই প্রথম দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ মারাত্মকভাবে কমেছে। বিনিয়োগের ক্ষেত্রে নেতিবাচক পরিস্থিতি এমন এক সময়ে দেখা দিয়েছে, যখন অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, শিল্প খাতে মন্থরতা এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কটে ভুগছে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বেসরকারি বিনিয়োগে এই দীর্ঘ খরার অন্যতম কারণ হচ্ছে ব্যাংকগুলোর ঋণ বিতরণের ধরনে বড় পরিবর্তন। উৎপাদন ও শিল্প খাতে ঋণ দেয়ার পরিবর্তে ব্যাংকগুলো ক্রমেই সরকারকে ঋণ দিতে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছে। এর ফলে নতুন উদ্যোক্তা সৃষ্টি, শিল্প সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি কমে গেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গত কয়েক বছরে সরকারের ব্যাংক ঋণ দ্রুত বেড়েছে। রাজস্ব ঘাটতি, বাজেট ঘাটতি এবং বৈদেশিক অর্থায়নের ধীরগতির কারণে সরকার অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেয়ার ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ব্যাংকগুলোর জন্য সরকারকে ঋণ দেয়া নিরাপদ ও লাভজনক। ট্রেজারি বিল ও বন্ডে বিনিয়োগ করলে নির্ধারিত হারে সুদ পাওয়া যায় এবং ঋণখেলাপি হওয়ার কোনো ঝুঁকি থাকে না। অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ দিলে ব্যবসায়িক ঝুঁকি, ঋণ পুনরুদ্ধারের অনিশ্চয়তা এবং খেলাপির আশঙ্কা থাকে। ফলে অনেক ব্যাংক এখন শিল্প ও ব্যবসা খাতের পরিবর্তে সরকারি সিকিউরিটিজে অর্থ বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, একসময় যেখানে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি ১৫ থেকে ১৮ শতাংশের মধ্যে ছিল, সেখানে বর্তমানে তা এক অঙ্কের ঘরে নেমে এসেছে। এটি শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়; এর অর্থ হচ্ছে নতুন কারখানা কম হচ্ছে, নতুন ব্যবসা কম শুরু হচ্ছে এবং বিদ্যমান শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলোও সম্প্রসারণে আগ্রহ হারাচ্ছে।
দেশের ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণের উচ্চ সুদহারও বিনিয়োগে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ব্যাংক ঋণের সুদহার বৃদ্ধি পাওয়ার ফলে নতুন প্রকল্প গ্রহণের খরচ বেড়েছে। একইসাথে মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় বাজারে চাহিদাও আগের মতো নেই। এমন পরিস্থিতিতে অনেক উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগ পরিকল্পনা স্থগিত রেখেছেন।
সাভারের একটি মাঝারি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক জানান, দুই বছর আগে উৎপাদন সম্প্রসারণের জন্য একটি নতুন ইউনিট স্থাপনের পরিকল্পনা করেছিলেন। কিন্তু ব্যাংক ঋণের ব্যয় বৃদ্ধি, বাজারের অনিশ্চয়তা এবং কাঁচামালের উচ্চমূল্যের কারণে তিনি এখন সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছেন না। তার মতে, বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন বিনিয়োগের ঝুঁকি নেয়া কঠিন।
অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেন সোনার বাংলাকে বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে দীর্ঘদিন ধরে বেসরকারি বিনিয়োগ কাক্সিক্ষত মাত্রায় বাড়ছিল না। এখন সেটি সরাসরি নিম্নমুখী হওয়া আরো উদ্বেগজনক। তিনি বলেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য বেসরকারি বিনিয়োগের বিকল্প নেই। সরকার যত বেশি ব্যাংক থেকে ঋণ নেবে, তত বেশি বেসরকারি খাত অর্থসঙ্কটে পড়বে।
এদিকে বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বাস্তবতা আরো উদ্বেগের। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর বিভিন্ন জরিপ অনুযায়ী, প্রতি বছর প্রায় ২০ থেকে ২২ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে হলে নিয়মিত নতুন শিল্পপ্রতিষ্ঠান, কারখানা এবং সেবা খাতের উদ্যোগ প্রয়োজন। কিন্তু বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফলে কর্মসংস্থান সৃষ্টির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে মন্থর হয়ে পড়েছে।
এদিকে বিশ্বব্যাংক সতর্ক করে বলছে, বেসরকারি বিনিয়োগের এই পতন দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। কারণ অর্থনীতির টেকসই সম্প্রসারণ, রফতানি বৃদ্ধি এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টির মূল চালিকাশক্তি হলো বেসরকারি খাত। বিনিয়োগ কমতে থাকলে শিল্পায়নের গতি শ্লথ হবে এবং মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত অর্থনীতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ গত এক দশকে প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখিয়েছে। কিন্তু প্রবৃদ্ধির সেই ধারাকে ধরে রাখতে হলে নতুন বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বিকল্প নেই। ব্যাংকের অর্থ যদি উৎপাদন, শিল্প ও উদ্যোক্তা তৈরির পরিবর্তে ক্রমাগত সরকারি ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত হতে থাকে, তাহলে প্রবৃদ্ধির চাকা ধীর হয়ে যাবে এবং কর্মসংস্থানের সঙ্কট আরো গভীর হবে। ফলে অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
ব্যবসায়ী ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রেখে ব্যবসায় গতি ফেরানো, বিনিয়োগ চাঙা করা এবং কর্মসংস্থান বাড়ানোই এখন সরকারের জন্য চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, সেদিকে নজর থাকবে সবার।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসিআই) সভাপতি তাসকীন আহমেদ বলেন, বর্তমান সঙ্কটের পেছনে শুধু সরকারি ঋণগ্রহণ নয়, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতাও বড় কারণ। দীর্ঘদিন ধরে খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং সুশাসনের অভাব ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের বড় অংশ তৈরি হয় বেসরকারি খাতে। সরকারি চাকরির সুযোগ সীমিত। ফলে নতুন বিনিয়োগ না হলে নতুন চাকরিও তৈরি হবে না। এর প্রভাব ইতোমধ্যে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে দৃশ্যমান হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যাংক খাতের শাসনব্যবস্থা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। আর্থিক খাতের সংস্কার ছাড়া বেসরকারি বিনিয়োগ পুনরুদ্ধার সম্ভব নয়। ব্যাংকগুলোকে রাজনৈতিক ও গোষ্ঠীগত প্রভাবমুক্ত রেখে পেশাদার ব্যবস্থাপনার আওতায় আনতে হবে। অন্যথায় ঋণ প্রবাহ উৎপাদনশীল খাতে ফিরিয়ে আনা কঠিন হবে।
তিনি বলেন, পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের জন্য সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণগ্রহণ কমাতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়িয়ে বাজেট ঘাটতি মোকাবিলার উদ্যোগ নিতে হবে। একইসাথে দীর্ঘমেয়াদি শিল্প ঋণ, বণ্ড মার্কেটের উন্নয়ন এবং পুঁজিবাজারকে কার্যকর অর্থায়নের উৎস হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। ব্যাংক খাতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, খেলাপি ঋণ আদায় এবং বিনিয়োগবান্ধব নীতি নিশ্চিত করা না গেলে বেসরকারি বিনিয়োগে গতি ফিরবে না বলে তিনি মনে করেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ৯ (জুলাই-মার্চ) মাসে ১০০ কোটি ৬০ লাখ ডলারের নিট বিদেশি বিনিয়োগ এসেছে। গত অর্থবছরের একই সময়ে এসেছিল ১৩১ কোটি ৬০ লাখ ডলারের বিদেশি বিনিয়োগ। তার মানে চলতি অর্থবছরের ৯ মাসে নিট বিদেশি বিনিয়োগ কমেছে সাড়ে ২৩ শতাংশ।
সার্বিক বিষয়ে কয়েকজন উদ্যোক্তা জানান, দেশের ব্যবসায়ীরা গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কট, ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদহারসহ বিভিন্ন সমস্যায় জর্জরিত। দেশি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা যদি মসৃণ হয়, তাহলে বিদেশি উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে উৎসাহী হন। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এ বিষয়ে বলেন, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ বাড়াতে সরকার ১৮০ দিনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে, যার মধ্যে ২৫টি অগ্রাধিকারমূলক উদ্যোগ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে বিনিয়োগ সেবা আরও সহজ করতে বিডা, বেজা, বেপজা, পিপিপিএ এবং হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষের মতো বিনিয়োগ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে একীভূত করা; চীনে সম্ভাব্য বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ ও বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়াতে সেখানে বিডার অফিস চালু ইত্যাদি। আশিক চৌধুরীর মতে, সামগ্রিকভাবে এই পরিকল্পনা বিনিয়োগের একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করতে সহায়ক হবে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, যেকোনো উপায়ে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কমাতে হবে। কারণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি চাহিদা কমিয়ে রাখে। তাছাড়া মূল্যস্ফীতি বাড়তে থাকলে টাকার অবমূল্যায়নে চাপ বাড়বে। সেটি হলে আমদানি ব্যয় বাড়বে। তাতে ব্যবসার খরচ বাড়বে। তার মতে, জ্বালানিসংকট মোকাবিলায় মধ্য মেয়াদে সক্ষমতা বাড়াতে হবে। সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়াতে হবে। নতুন কূপ খনন করার মাধ্যমে জ্বালানি নিয়ে উদ্যোক্তাদের মধ্যে আস্থা ফেরাতে হবে।
কমছে ঋণপ্রবাহ ও যন্ত্রপাতি আমদানি
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলা গত অর্থবছরের একই সময়ে তুলনায় প্রায় ৩ শতাংশ কমে গেছে এবং তা ক্রমাগত কমছে। একইভাবে মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে প্রায় ১০ শতাংশ। ঋণপত্র খোলা ও নিষ্পত্তি কম হওয়ার অর্থ হচ্ছে, নতুন বিনিয়োগ বা সম্প্রসারণ কমেছে।
উচ্চ সুদের হার ও বৈশ্বিক অস্থিরতার বেসরকারি খাতে ঋণ নেওয়া রেকর্ড পরিমাণ কমেছে। গত এপ্রিলে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ। এই হার সাধারণত ১০ শতাংশের ওপরে থাকে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন, ঋণে চড়া সুদের হারে নতুন বিনিয়োগ কমেছে। দেশের অভ্যন্তরে তীব্র লোডশেডিং, গ্যাস সংকট এবং বিদ্যুৎ সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় উৎপাদন কমেছে; যা নতুন করে কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি ও ব্যাক টু ব্যাক এলসি কমায় প্রভাব ফেলেছে। অপরদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতার কারণে ইউরোপের অনেক ক্রেতা নতুন অধ্যাদেশ কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে দেশের পোশাক কারখানাগুলোয় অর্ডার প্রবাহ আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। অনেক কারখানাই আগের তুলনায় সীমিত সক্ষমতায় পরিচালিত হচ্ছে।
ঢাকা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (ডিসিসি আই) সদস্য ব্যবসায়ীরা বলছেন, ‘উচ্চ সুদহারে ব্যাংকঋণ নিয়ে কোনো শিল্প প্রকল্প লাভজনক করা কঠিন। এতে উদ্যোক্তারা নতুন বিনিয়োগে যাচ্ছেন না, বরং বিদ্যমান ব্যবসা টিকিয়ে রাখতেই হিমশিম খাচ্ছেন। আবার ব্যাংকিং খাতে আস্থার সংকট ঋণপ্রবাহ কমিয়ে দিয়েছে। খেলাপি ঋণের হার প্রায় ৩৫ শতাংশের বেশি হওয়ায় ব্যাংকগুলো নতুন ঋণ দিতে অনাগ্রহী হয়ে পড়েছে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তারা অর্থায়ন পাচ্ছেন না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও ঋণ পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ ঝুঁকি নিতে চাইছে না ব্যাংকগুলো।’
তিনি বলেন, ‘ডলার সংকট ঋণ সংকোচনের অন্যতম বড় কারণ। ডলারের দাম ১২২ টাকার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক উদ্যোক্তা বিনিয়োগ স্থগিত রেখেছেন।’
অন্যদিকে বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী, গ্যাস সঙ্কটের কারণে উৎপাদনশীলতা ২০ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমেছে। ডলার সঙ্কটও ঋণচাহিদা কমিয়ে দিয়েছে। ডলারের বিনিময় হার বেশি হওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির ব্যয় বেড়েছে। এতে নতুন শিল্প স্থাপন বা উৎপাদন সম্প্রসারণের উদ্যোগ কমে গেছে। এ সব কিছু মিলিয়ে পরিস্থিতি বিপর্যয়কর অবস্থায় পৌঁছেছে। এর জন্য অনতিবিলম্বে দীর্ঘমেয়াদি পলিসি নির্ধারণ করা না হলে পরিস্থিতি আরো জটিলতর হবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা করছেন।