ভারতে সিজেপির ব্যানারে ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে জেন-জিরা বিজেপিতে টেনশন


১৮ জুন ২০২৬ ১০:২৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতে জেন-জিদের উত্থান দেখছে ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। দেশটির প্রধান বিচারপতির এক মন্তব্যকে ঘিরে তরুণরা ক্ষুব্ধ হন। একপর্যায়ে শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ দাবিতে রাজপথে সোচ্চারও হন। তরুণদের ক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় ককরোচ জনতা পার্টি বা তেলাপোকা জনতা পার্টি। পার্টির গঠনের ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই হাজার হাজার তরুণ-তরুণী এতে যোগ দেন। এরা দিল্লিতে বিশাল সমাবেশ করে নিজেদের অবস্থান জানানও দিয়েছেন ইতোপূর্বে। ফলে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার বেশ টেনশনে পড়েছে। নিজেদের ক্ষমতার জন্য অনেকটা থ্রেটও মনে করছেন তেলাপোকা দলকে। যার প্রমাণ মেলে জেন-জিদের নতুন এই দলের প্রধানের ওপর যখন ক্ষমতাসীনরা হামলা চালান। গত ১৫ জুন সোমবার ভারতের রাজস্থানের জয়পুরে একটি বিক্ষোভ সমাবেশকে কেন্দ্র করে ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকের ওপর হামলা করে বিজেপির নেতাকর্মীরা। শহীদ স্মারকে আয়োজিত কর্মসূচিতে বক্তব্য দেওয়ার ঠিক আগে এ হাসলা চালানো হয়।
জানা গেছে, অনেকটা ব্যঙ্গাত্মকভাবে শুরু হওয়া রাজনৈতিক আন্দোলন ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি)’ বয়স মাত্র এক মাস। দলটি মাত্র তিন সপ্তাহে দিল্লিতে অবস্থান জানান দিয়েছে, সঙ্গে কাঁপনও ধরিয়ে দিতে সক্ষম হয়েছে মোদির মসনদে। ককরোচ জনতা পার্টি ‘আপাতত’ ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের একজন মন্ত্রীকে সরে যেতে বা সরিয়ে দিতে আন্দোলনে রয়েছে। কিন্তু তারা দলটির প্রতিষ্ঠার মাত্র তিন সপ্তাহের মধ্যেই জানান দিয়েছে যে, তারা দুয়েকটি ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে রয়েছে তেমনটি নয়, বরং দলটি দীর্ঘমেয়াদি আন্দোলনে থাকছে, রাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মের বিরুদ্ধে তারা সোচ্চার থাকছে। তেলাপোকা পার্টির হঠাৎ প্রতিষ্ঠা লাভ ও বিপুল জনসমর্থন দেশটির ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষমহলকে চিন্তায় ফেলেছে। কারণ পার্টি ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে জোয়ারের মতো বাড়ে সমর্থন। দলটির আনুষ্ঠানিক ওয়েবসাইট চালুর মাত্র ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে ৪০,০০০ জনেরও বেশি মানুষ এতে নিবন্ধিত হন এবং পরবর্তীতে এই সংখ্যা সাড়ে তিন লাখ ছাড়িয়ে যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দলটির ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়। গত ১৬ মে পার্টি ঘোষণার পর গত ১৬ জুন মঙ্গলবার এ রিপোর্ট লেখার দিনে অর্থাৎ মাত্র এক মাসেই তেলাপোকা পার্টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোর ফলোয়ার ক্ষমতাসীন দল বিজেপি ও প্রধান বিরোধীদল কংগ্রেসকেও ছড়িয়ে গেছে। ফলে মোদি সরকারের শীর্ষকর্তাদের ঘুম অনেকটা হারাম হয়ে গেছে।
২০১৪ সালের পর থেকেই একচেটিয়া ক্ষমতা ভোগ করছে নরেন্দ্র মোদির নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার। চরম হিন্দুত্ববাদ ও উন্নয়নের রাজনীতির প্রচারণা চালিয়ে রাজনৈতিক সুবিধা নিচ্ছে দলটি। কিন্তু শেষ লোকসভার নির্বাচন পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তরুণদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ বিজেপি থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। অর্থাৎ তরুণরা ধর্মভিত্তিক রাজনীতির টোপ থেকে নিজেদের দূরে রাখতে শুরু করেছে। তারা মনে করছে, নাগরিকদের অধিকার কোনো ধর্মের ভিত্তিতে হওয়ার কথা নয়, দেশের সব নাগরিকের অধিকার হবে সমান। ফলে সরকারের কর্তাব্যক্তিরা ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি যে বীজ বপন করেছিলেন, এবারের নির্বাচনে সেই বীজ ভালো ফলন দেয়নি। উল্টো দেশের তরুণরা সরকারের বিরুদ্ধে রাজপথে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেছেন। তরুণদের এত বিশাল সমাবেশ ও বিক্ষোভ মোদি সরকারের কল্পনায়ও ছিল না। সিজেপির এই গণজোয়ারে বিজেপির উদ্বেগের মূল কারণ হচ্ছে ভারতের প্রতিবেশী তিনটি দেশে খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে সরকার পতন হয়েছে তরুণদের আন্দোলনের ফলে। এই দিনটি দেশ হলোÑ শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল। ক্ষমতাসীন সরকারের চরম অনিয়ম, দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে তরুণ ও যুবারা এই তিনদের সরকার পতন ঘটিয়েছেন। প্রতিবেশী এ দেশগুলোর তরুণরা শুরুতে সরকার পতনে আন্দোলন শুরু না করলেও শেষ পর্যন্ত আন্দোলন সরকার পতনে গড়ায়। ফলে নরেন্দ্র মোদি সরকারের নীতিনির্ধারকরাও উদ্বিগ্ন যে ওই তিন দেশের আদলে এখানেও যদি তরুণরা আরও বেশি সংগঠিত হয়ে যায়, তাহলে নাটকীয় অনেক কিছুই ঘটে যেতে পারে। কারণ অস্ত্র চালিয়ে কোনো দেশেই তরুণদের থামিয়ে দিতে পারেনি।
শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালে আন্দোলন এবং সরকার পতনে বড় ভূমিকার রাখা তরুণরা, পরিচিতি পেয়েছেন ‘জেন-জি’ নামে। বেকারত্বের হতাশা ও সরকারের দুর্নীতি থেকেই এসব আন্দোলনের সূত্রপাত। প্রথমে ছোট ছোট মিছিল, বিক্ষোভ তারপর বড় সমাবেশ। একসময় তা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে। আর এই দাবানলেই দক্ষিণ এশিয়ার তিনটি দেশে সরকার পতন হয়। ভারতের ক্ষমতাসীন দলের উদ্বেগের মূল কারণ হচ্ছে, শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপালের পর ভারতীয় তরুণরা কি সেই একই পথে হাঁটছে?
২০২৬ সালের ১৫ মে’র ঘটনা। ভারতের সুপ্রিম কোর্টে একটি মামলার শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত একটি মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘দেশে কিছু এমন তরুণ রয়েছে, যারা ককরোচের (আরশোলা) মতো; তারা না কোনো কর্মসংস্থান পায়; না নিজেদের কোনো পেশাগত অবস্থান তৈরি করতে পারে। তাদের কেউ কেউ মিডিয়া বা সোশ্যাল মিডিয়া কর্মী হয়ে ওঠে; কেউ তো হয় আরটিআই (জঞও) অ্যাক্টিভিস্ট এবং এরপর তারা সবাইকেই আক্রমণ করা শুরু করে দেয়।’ তার এ মন্তব্যের পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়। এর পরদিন ১৬ মে অভিজিৎ দিপকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘এক্সে’ (সাবেক টুইটার) দেশের সকল ‘আরশোলাদের’ জন্য একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম গঠনের ঘোষণা দেন। তিনি কৌতুকপূর্ণভাবে দলটিতে যোগ দেওয়ার যোগ্যতা হিসেবে বেকার, অলস, দীর্ঘসময় অনলাইনে কাটানো এবং পেশাগতভাবে ক্ষোভ প্রকাশের ক্ষমতা থাকার শর্ত দেন। এসব শর্ত মাথায় রেখেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ইনস্টাগ্রামে দলটির ফলোয়ার সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে কয়েক মিলিয়নে পৌঁছায়। দলে নাম নিবন্ধন করতে থাকেন হাজার হাজার সমর্থক, যা এখন দেশটির ক্ষমতাসীনদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শুধু প্রধান বিচারপতির মন্তব্যের জেরেই নয়, ভারতের তরুণদের মধ্যে ক্ষোভ জমে উঠছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। দেশটির ১৪০ কোটি জনসংখ্যার প্রায় অর্ধেকের বয়স ২৫ বছরের নিচে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এবং দেশের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরীক্ষায় নানা অসংগতি এই ক্ষোভকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। ফলে সামনে আসে কেন্দ্রীয় সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ। এখন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে টেনশন ধরেছে- এরা আসলে কী করতে চায়, টার্গেট কী ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে থাকা তেলাপোকারা।