১ লাখ কোটি ডলারের অর্থনীতি
১১ জুন ২০২৬ ০৯:৫৫
॥ জামশেদ মেহদী ॥
তারেক রহমানের বিএনপি সরকার আগামী ৮ বছরের মধ্যে অর্থাৎ ২০৩৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার এক উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়েছে। উল্লেখ করা যেতে পারে যে, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতির আকার বা জিডিপি ৪৫৭ বিলিয়ন ডলার (মতান্তরে ৪৭০ বিলিয়ন ডলার)। আমাদের দেশে সাধারণত অর্থনীতি সম্পর্কে বিষয়াবলি মিলিয়ন, বিলিয়ন বা ট্রিলিয়নের হিসাবে করা হয় না। আমরা সেই ব্রিটিশ যুগ থেকে হাজার, অযুত, লাখ, নিযুত ও কোটির অংকে অর্থনীতির হিসাব করে থাকি। ট্রিলিয়ন ডলার অনেকের হিসাবের মধ্যেও আসে না। তবে সাধারণ মানুষের বোঝার জন্য বলছি যে, ১ ট্রিলিয়ন ডলার হলো ১ লাখ কোটি ডলার। এখানে লক্ষ্য করুন, ১ লাখ কোটি টাকা নয়, ১ লাখ কোটি ডলার। বাংলাদেশে টাকা ও ডলারের বিনিময় হার যদি হয় ১২২ টাকা তাহলে ১ লাখ কোটি ডলার হবে ১ লাখ কোটি X (গুনন) ১২২ টাকা। সমান ১২২ লাখ কোটি টাকা। এটি যে কত টাকা সেটি আমাদের কল্পনাতেও আসে না। সংখ্যাটি বোঝার জন্য আমাদের নিম্ন লিখিত পদ্ধতিতে যেতে হবে।
১ মিলিয়ন সমান ১০ লাখ। ১০ মিলিয়ন সমান ১ কোটি। ১০০ মিলিয়ন সমান ১০ কোটি। ১ হাজার মিলিয়ন সমান ১ বিলিয়ন অর্থাৎ ১০০ কোটি। ১ ট্রিলিয়ন সমান ১ হাজার বিলিয়ন সমান ১ লাখ কোটি। এই সংখ্যাটি বোঝার পর আমরা বর্তমান সরকারের ৮ বছর মেয়াদে জিডিপিকে ১ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১২২ লাখ কোটি টাকায় উন্নীত করার আলোচনায় যেতে পারবো।
পরিসংখ্যান থেকে দেখা যায় যে, ২০১৬ সালে বাংলাদেশে অর্থনীতির আকার বা জিডিপির সাইজ ছিলো ২৬৫.২ বিলিয়ন ডলার। ২০২৫ সালে সেটি উন্নীত হয় ৪৫৭ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ ৯ বছরে জিডিপির আয়তন বৃদ্ধি পায় ১৯২ বিলিয়ন ডলার। এই যদি হয় অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির হার, তাহলে আগামী ৮ বছরে জিডিপির সাইজ ১ ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে প্রবৃদ্ধি হতে হবে ৫৪৩ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ প্রতি বছর অর্থনীতির আকারকে বাড়তে হবে কম করে হলেও ১ বিলিয়ন ডলার। এটি কতদূর বাস্তব হবে, সেটি নিয়ে অর্থনীতিবিদদের রয়েছে অনেক সংশয়। তবে অর্থনীতিবিদরা বলেছেন যে, এখন থেকে অর্থাৎ আগামী ১ জুলাই থেকে যে অর্থবছর শুরু হবে, সেই অর্থবছর শেষে অর্থাৎ ২০২৭ সালের ৩০ জুন জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার হতে হবে ১০ শতাংশেরও ওপর। আর এই জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার আগামী ৮ বছর লাগাতার হতে হবে। সরকার এও বলেছে যে, আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে অর্থাৎ আগামী ৩ বছরের মধ্যে ১ কোটি লোকের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা হবে। সরকারের তরফ থেকে বলা হয়েছে যে, ১ ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমিতে উন্নীত হওয়ার জন্য ৫ বছর মেয়াদি একটি বিশেষ পরিকল্পনা প্রণয়ন করা হচ্ছে। এটি প্রণয়ন করছে জেনারেল ইকোনমিক ডিভিশন। এটি প্রণীত হলে সেটি অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার স্থলাভিষিক্ত হবে। সরকারের তরফ থেকে আরো বলা হয়েছে যে, ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি গড়ার লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে। বিএনপির নির্বাচনী মেনিফেস্টোর সাথে সংগতি রেখে। ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির এই মহাপরিকল্পনা গত ১৮ মে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) বৈঠকে অনুমোদিত হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এই বৈঠকের সভাপতিত্ব করেন।
বিশ্বে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ২১টি দেশের রয়েছে ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি। এর মধ্যে প্রথম ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমি হয় আমেরিকা ১৯৬৯ সালে। তার ১০ বছর পর হয় জাপান ১৯৭৯ সালে। অতঃপর ক্রমানুসারে জার্মানি, ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, ইতালি, চীন, স্পেন, কানাডা, ব্রাজিল, দক্ষিণ কোরিয়া, রাশিয়া, মেক্সিকো, ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইন্দোনেশিয়া, নেদারল্যান্ডস, সৌদি আরব, তুরস্ক, পোল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ড। এর মধ্যে পোল্যান্ড এবং সুইজারল্যান্ড ২০২৫ সালে ট্রিলিয়ন ডলার ক্লাবের সদস্য হয়।
এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করতে হবে। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে ২ ভাগে ব্যাখ্যা করা হয়। একটি হলো নমিনাল গ্রোথ বা মার্কেট প্রাইস হিসাবে প্রবৃদ্ধির হার। আরেকটি হলো, পার্চেজিং পাওয়ার প্যারিটি থিওরি। অর্থাৎ জনগণের ক্রয়ক্ষমতার ভিত্তি। তবে আইএমএফ এবং বিশ্বব্যাংকসহ দাতা দেশ এবং দাতা সংস্থাসমূহ প্রবৃদ্ধির ক্ষেত্রে ক্রয়ক্ষমতার তত্ত্ব নাকচ করে দিয়েছেন। সুতরাং বাংলাদেশ যখন ট্রিলিয়ন ডলারের ইকোনমি হবে, তখন তাকে হতে হবে নমিনাল গ্রোথ থিওরি মোতাবেক।
অর্থমন্ত্রী বলেছেন যে, একটি নির্বাচিত সরকার হিসাবে আমরা এসমস্ত প্রতিশ্রুতি এই পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করেছি। আমাদের এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য হবে অর্থনীতির পুনরুদ্ধার, পুনর্গঠন এবং রূপান্তর ঘটানো। ট্রিলিয়ন ডলারের এই মহাপরিকল্পনার ভিত্তি হিসাবে ধরা হয়েছে ৭টি স্তম্ভকে। এগুলো হলো- (১) অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ, (২) ব্যবসার পরিবেশ উন্নত করে ডিরেগুলেশন বা নিয়ন্ত্রণ শিথিল করা, (৩) বিনিয়োগ নির্ভর প্রবৃদ্ধি, (৪) সুসম আঞ্চলিক উন্নয়ন, (৫) সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, (৬) কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দক্ষতার উন্নয়ন এবং (৭) সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।
এই মহাপরিকল্পনার প্রথম বছরটিতে দৃষ্টি নিবদ্ধ থাকবে ভঙ্গুর অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করা। আর সেটি করতে হলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সুচিন্তিত মুদ্রা বিনিময় হার নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য কঠোর মনিটারি পলিসি।
রাষ্ট্র সংস্কারের মধ্যে রয়েছে গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সুশাসন। আর্থসামাজিক সুষম উন্নয়নের জন্য দারিদ্র্যবিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা এবং জাতীয় ভিত্তিক কর্মসংস্থান। ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠনের জন্য লক্ষ্য নির্ধারিত হয়েছে প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ, সৃজনশীল অর্থনীতি এবং নীল অর্থনীতি (Blue Economy) সুষম অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য চট্টগ্রামকে বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে গড়ে তোলা, উত্তরবঙ্গ এবং হাওর অঞ্চলের উন্নয়ন এবং নিরাপদ ও টেকসই ঢাকা।
প্রথম বছরে অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় দারুণভাবে হ্রাস করা এবং প্রান্তিক মানুষকে মূল্যস্ফীতির কষাঘাত থেকে সেফটিনেট দেওয়া প্রভৃতি।
রাশেদ মাহমুদ তিতুমীর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন নামকরা অর্থনীতিবিদ। তিনি বিএনপি সরকারের অর্থনৈতিক উপদেষ্টা হিসেবে জয়েন করেছেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন অর্থনৈতিক জার্নালে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ওপর গবেষণামূলক মূল্যবান নিবন্ধ লিখেছেন। ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি সম্পর্কে এই অধ্যাপক বলেন, শুধুমাত্র অর্থনীতির আকার বাড়লেই হবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির এই সুফল যেন ১৮ কোটি মানুষ ভোগ করতে পারেন সেটি সরকারকে সুনিশ্চিত করতে হবে। যেহেতু তিনি বিএনপি করেন না, বরং একজন বিশেষজ্ঞ হিসেবে তাকে সরকারে নেওয়া হয়েছে, তাই তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সম্পর্কে গণমুখী বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। তিনিই সর্বপ্রথম বলেছেন যে, অর্থনীতির এই অবিশ্বাস্য সম্প্রসারণ করতে গেলে, তার ভাষায়, সমগ্র অর্থনীতির বিকেন্দ্রীকরণ করতে হবে (Decentralization of the whole economy)এটি করতে গেলে, তার মতে, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা দূর করতে হবে। দেশের মানুষের জন্য ব্যবহার যোগ্য পণ্য এবং রপ্তানিযোগ্য পণ্য- উভয় ক্ষেত্রে লেভেলপ্লেয়িং ফিল্ড থাকতে হবে। এর আগে সরকার ঘোষণা করেছিলেন যে, বন্ধ কলকারখানাসমূহ পুনরায় খোলার জন্য ৬০ হাজার কোটি টাকার একটি প্যাকেজ প্রণয়ন করা হচ্ছে। এই প্যাকেজ যেনো নিরপেক্ষভাবে বণ্টন করা হয়।
এই উচ্চাভিলাষী মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের চিন্তাধারাকে সাধুবাদ জানিয়েও বলতে হয় যে, এর জন্য প্রাথমিকভাবে যেসব কাজ করতে হবে সেগুলো হলো, কৃষি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার, পানি ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বর্ধিত বাজেট বরাদ্দ এবং সরকারি সেবাকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া।
শেখ হাসিনার সরকার বিগত ১৫ বছরে উন্নয়নের নামে, মেগা প্রজেক্টের নামে দেশে কায়েম করেছিলেন ক্লিপটোক্র্যাসি বা চোরতন্ত্র। ড. ইউনূস সরকার অর্থনৈতিক অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির ওপর ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে যে টাস্কফোর্স গঠন করেছিলেন, সেই টাস্কফোর্স এই মর্মে রিপোর্ট দিয়েছেন যে, ২৩৪ বিলিয়ন ডলার শেখ হাসিনার সময় দেশ থেকে পাচার হয়েছে এবং লুটপাট হয়েছে। এ কারণেই বর্তমান সরকার বার বার বলছে যে, আমাদের অর্থনীতির অবস্থা ফ্র্যাজাইল বা ভঙ্গুর।
অর্থনীতিবিদরা বলেন যে, এই মহাপরিকল্পনা সামনে রেখে এগোনোর সময় সরকারকে সতর্কভাবে পা ফেলতে হবে। বিশ্বব্যাংক বা আইএমএফের পেসক্রিপশনের ওপর সব সময় নির্ভর করলে চলবে না। এ কথা ঠিক যে, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি হাসিলের জন্য বিপুল পরিমাণ বিদেশি ঋণের প্রয়োজন হবে। এই ঋণ গ্রহণ করার সময় এই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে যে, ঋণ গ্রহণের নামে যেন আমরা দাতা গোষ্ঠী বা বৃহৎ দাতাদের ঋণের ফাঁদে না পড়ি। শ্রীলঙ্কা ঋণের ফাঁদে পড়েছিল। সেখান থেকে তাদের জেন-জি বিপ্লব শুরু হয় এবং শেষ পর্যন্ত রাজা পাকশের সরকার উৎখাত হয়।
এই লক্ষ্য হাসিলের জন্য সরকারের পক্ষে রাজস্ব আয় বিপুলভাবে বৃদ্ধি করা ছাড়া উপায় নেই। ট্যাক্স জিডিপি রেশিও বিপুলভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। ট্যাক্স ফাঁকি দেওয়া রোধ করতে হবে। ট্যাক্সনেট বৃদ্ধি করতে হবে। তবে দেখতে হবে যে, এই ট্যাক্সনেট বৃদ্ধি করতে গিয়ে প্রান্তিক জনগোষ্ঠী যেন ফতুর না হন। অতীতে বহুবার বলা হয়েছে যে, পরোক্ষ কর বিপুলভাবে বৃদ্ধি করতে হবে। কিন্তু সেটি করা হয়নি। বরং দেশে Oligopoly কায়েম করা হয়েছিলো। যার ফলে গত কয়েক বছরে আমরা শুনেছি যে হাতেগোনা কয়েকজন অলিগার্ক দেশের অর্থনীতিকে গ্রাস করেছে। এস আলম, বেক্সিমকো, নাসা গ্রুপ- এদেরকে মানুষ এত সহজেই ভুলে যায়নি।
বলাই বাহুল্য ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির স্টার্টআপ হবে প্রযুক্তিনির্ভর। এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাংলাদেশেও দ্রুত বিকশিত হচ্ছে। এই দ্রুত বিকাশের সাথে সাথে ম্যানুয়াল লেবারদের চাকরি যেন হ্রাস না পায় বা ছাঁটাইয়ের খড়গ যেন নেমে না আসে। তবে বাংলাদেশের অনেক এআই এক্সপার্ট উন্নত দেশসমূহে উচ্চপদে চাকরি করছেন। আমাদের দেশে ট্রিলিয়ন ডলার ইকোনমির জন্য বিদেশি বিশেষজ্ঞ না এনে আমাদের বিদেশি বাংলাদেশি এক্সপার্টদের যত বেশি সম্ভব দেশে ফেরত এনে কাজে লাগাতে হবে।
E-mail: jamshemehdi15@gmail.com