সেই ছেলেটি
৭ জুন ২০২৬ ১০:৩০
॥ তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী ॥
কফিরঙা দরজাটা ঠেলে বাসায় ঢুকতে না ঢুকতেই আম্মার মুখ থেকে তিরস্কারসমৃদ্ধ তীক্ষè বাণীর মৌমাছিরা আমার দিকে ছুটে এসে পড়লো। যতক্ষণ না কার্যসিদ্ধি হবে, ততক্ষণ এই মৌমাছিগুলো কানের কাছে অবিরাম ঘ্যান ঘ্যান করতেই থাকবে। অগত্যা ফের রাস্তায় নেমে পড়তেই হলো।
আসলে ব্যাপারটা হলো- সালাতে যাওয়ার সময় পাঁচ লিটারের বোতলটা সঙ্গে নিয়ে মসজিদের নলকূপটা থেকে পানি ভর্তি করে নিয়ে আসার জন্য আম্মার অর্ডার ছিল। বোতলটা বের হওয়ার পথে টেবিলের ওপরেই ছিল। কিন্তু ভুলো মন যে আমার! বোতলটা দেখেও অন্ধের মতো খালি হাতে চলে গেলাম মসজিদে।
এক হাত লম্বা সিমেন্টের দেয়ালের চৌহদ্দিতে ঘেরা নলকূপটার সামনে গিয়ে দেখি মহাবিপদ- লাইন। এক ভদ্রলোকের পরেই ছিল রোদে পোড়া একহাড়া একটা ছেলে। তারপর আমি। কিন্তু ভদ্রলোকের কার্যসিদ্ধি হলেই পাশের এক মুদি দোকানদার বালতি নিয়ে এসে ঐ ছেলেটাকে সরিয়ে নিজেই আগে পানি সংগ্রহ শুরু করে দিয়েছে। ছেলেটির ভ্রুকুটি মিশ্রিত মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে, সে এতে মহাবিরক্ত। কিন্তু তার ও আমার উভয়েরই অবস্থা হলো- বুক ফাটে তো মুখ ফোটে না। চোখ দুটি তার কোটরাগত- চামড়াবৃত কোয়েল পাখির ডিমের মতো। গায়ে কমলা রঙের হাতাকাটা গেঞ্জি, পরনে মিলিটারি স্টাইলের একটা প্যান্ট আর পায়ে বর্তমানের আধুনিক নৌকামার্কা জুতা। বয়স আন্দাজ ছয় থেকে আট।
সে এনেছে দুটি বোতল- দুই লিটার করে চার। দোকানদারটা চলে গেলে ছেলেটা একটা বোতলের ছিপি খুলে তাতে পানি ভরতে যাবে, তখন আমি এগিয়ে আসি নলকূপের হাতল চেপে তাকে সাহায্য করতে। তবে সে সরে গেল। ভেবেছে হয়তো আমি নিজের বোতলই ভরতে চাচ্ছি। দয়াপরবশ হয়ে তার দিকে তাকিয়ে বোতল হাতে বসতে বললাম, যাতে হাতল চেপে তাকে সাহায্য করতে পারি, অথচ সে নারাজ। কয়েকবার বলার পরও যখন মাথা নাড়িয়ে আমার দয়াকে উপেক্ষা করে নিজের আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে চাইলো, আমি হাতল থেকে হাত গুটিয়ে নিই।
সে যদি এ ‘পরের ওপর ভরসা ছেড়ে নিজের পায়ে দাঁড়া’ আদর্শে অটল থাকতে পারে, তবে নিশ্চিত সে জীবনে অনেক উন্নতি করতে পারবে। কারণ পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ্ কোনো সম্প্রদায়ের অবস্থা পরিবর্তন করেন না, যতক্ষণ না তারা নিজেদের অবস্থা নিজেরা পরিবর্তন করে।’ (সূরা রাদ : ১১)।
তারপর দেখি সে উবু হয়ে বসে প্রথমে সরু হাতটা উঁচু করে হাতল চেপে নলকূপের মুখ থেকে পানি উগড়ে বের করে বোতলটাতে ঢুকিয়ে নেড়ে পরিষ্কার করে ফেলে দিচ্ছে। এরপর বোতলে পানি ভরতে শুরু করেছে- খুবই আস্তে আস্তে। আমার চঞ্চল মনের আর তর সইছে না। বাসা থেকে যেন বইগুলো নীরব পাখির মতো ডেকেই চলছে। তার প্রথম বোতলটা পূর্ণ হলে আমি নিজের বোতলটা নিয়ে ধপাধপ নলকূপের হাতল চেপে গোঙানির শব্দ বের করে অল্পক্ষণের মধ্যেই পানিপূর্ণ করে ফেলি।
সে পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলো। আমার কাজ সম্পন্ন হলেই সে হয়তো তার অপর বোতলটা পূর্ণ করেছে। আমি তো ততক্ষণে বোতল হাতে বাসায় এসে হাজির।