ইসলামী প্রজাতন্ত্র পূর্ব তুর্কিস্তান আজকের জিনজিয়াং

ঘৃণিত মেকিং ফ্যামিলি ও নৃশংস গণহত্যার শিকার উইঘুর মুসলিমরা


১৪ মে ২০২৬ ১০:২৯

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
উইঘুর জাতির ইতিহাস প্রায় চার হাজার বছর আগের। ‘উইঘুর’ শব্দটি এসেছে ‘উয়্যুঘুর’ শব্দ থেকে। এর অর্থ সংঘবদ্ধ। মূলত এরা স্বাধীন ইসলামিক রিপাবলিক অব ইস্ট তুর্কিস্তানের অধিবাসী, যা বর্তমান চীনের সর্ববৃহৎ প্রদেশ জিনজিয়াং। এটি প্রাচীন সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত মধ্য এশিয়ার একটি অঞ্চল। এর চতুর্পাশে চীন, ভারত, পাকিস্তান, কাজাখস্তান, মঙ্গোলিয়া ও রাশিয়ার অবস্থান। এটির আয়তন ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার। চীনের উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত অঞ্চলটি আয়তনে সে দেশের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ এবং জার্মানির প্রায় পাঁচগুণ। ২০০৯ সালের এক হিসাব অনুযায়ী, জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের মধ্যে মুসলমান প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ বা ৫৮ শতাংশ। উল্লেখ্য, চীনের মোট জনসংখ্যার ৫ শতাংশ মুসলিম। এছাড়া কাজাখস্তানে ২ লাখ ২৩ হাজার, উজবেকিস্তানে ৫৫ হাজার, কিরগিজস্তানে ৪৯ হাজার, তুরস্কে ১৯ হাজার, রাশিয়ায় ৪ হাজার, ইউক্রেনে ১ হাজারের মতো উইঘুর লোকে বসবাস। সাংস্কৃতিক দিক থেকে উইঘুর তুর্কি ও আরবি প্রভাবিত। উইঘুরদের বর্ণমালা আরবি।
সাম্প্রতিক ইতিহাস : ১৯১১ সালে মাঙ্কু সাম্রাজ্য উৎখাতের মাধ্যমে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইস্ট তুর্কিস্তানে চীনা শাসন চালু হয়। তবে স্বাধীনচেতা উইঘুর জাতি এ বৈদেশিক শাসনের সামনে মাথা নত করেনি যারা ১৯২১ সালে উজবেকিস্তানে এক সম্মেলনে তাদের পুরোনো পরিচয় ফিরে পেয়ে ১৯৩৩ সালে পুনরায় ইসলামিক রিপাবলিক অব ইস্ট তুর্কিস্তান অর্থাৎ ইসলামী প্রজাতন্ত্র পূর্ব তুর্কিস্তান রাষ্ট্র গঠন করে। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই চাইনিস ফোর্স জেনারেল শেং শির নেতৃত্বে এটি দখল করে। এ সময় আব্দুল আজিজ মাখদুম ও আব্দুল হাকিম মাখদুম উইঘুরদের সংগঠিত করে সংগ্রাম চালাতে থাকে এবং ১৯৪০ সালে প্রতিষ্ঠা করে তুর্কিস্তান ইসলামী পার্টি। ১৯৪৪ সালে আবারো প্রতিষ্ঠা করে ইসলামিক রিপাবলিক অব ইস্ট তুর্কিস্তান। পরে ১৯৪৯ সালে ফের তারা চীনা কমিউনিস্টদের হাতে পরাজিত হয়। তখন সাইফুদ্দিন আজিজি সেখানে গভর্নর ছিলেন।
উইঘুর মুসলিম নির্যাতন : ১৯৪৯ সালে পূর্ব তুর্কিস্তানে উইঘুর মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৯৫ শতাংশ, ১৯৮০ সালের মধ্যেই তা ৫৫ শতাংশে নেমে আসে। বর্তমানে নিজেদের ভূখণ্ডে উইঘুরদের হার নেমে এসেছে প্রায় ৪৬ শতাংশে। চীনের দখলে যাওয়ার পর থেকেই জিনজিয়াংয়ে মুসলিমদের নিধন করতে ব্যাপক কার্যক্রম গ্রহণ করে চীনা সরকার।
এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯০ সালে সেখানে এক ভয়াবহ দাঙ্গা উসকে দিয়ে দাঙ্গার অভিযোগে গ্রেপ্তার ও হত্যা করা হয় কয়েক হাজার উইঘুর যুবককে। এরপর গত শতাব্দীর শেষে উইঘুর মুসলমানরা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। উইঘুর অধিকাংশ পুরুষকেই রাখা হয় কনসেনট্রেশন বা ডিটেনশন ক্যাম্পে। নারীদের আটকে রেখে চালানো হয় নানা ধরনের যৌন নির্যাতন। যদিও বিবিসির অ্যান্ড্রু মার শো-তে উপস্থিত হয়ে যুক্তরাজ্যে চীনের রাষ্ট্রদূত লিউ জিয়াওমিং জোর দিয়ে বলেছিলেন যে ‘জিনজিয়াং এরকম কোনো ক্যাম্প নেই’। তবে যুক্তরাষ্ট্র ইতোমধ্যে উইঘুরদের প্রতি চীনের নীতিকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছে।
মেকিং ফ্যামিলি : উইঘুরদের মধ্যে চীনা জাতীয়তাবাদ প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে ২০১৬ সালে মেকিং ফ্যামিলি নামে একটি ঘৃণ্য ও অভিনব পদ্ধতি চালু করে চীন। এর আওতায় উইঘুর পরিবারগুলোতে প্রতি মাসে কয়েকদিন অতিথি হয়ে থাকেন হান পুরুষরা। এসব চীনা পুরুষদের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কে বাধ্য করা হয় পরিবারের নারীদের।
মুসলিম ঐতিহ্য নিরসন : বিবিসি জানায় চীন সরকারের তথ্য বিশ্লেষণ করে হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ) প্রতিবেদন তৈরি করেছে বিভিন্ন জায়গার ‘সুলতান’ বা মুসলিম নাম বাদ দেওয়া হয়েছে জিনজিয়াংয়ে মুসলিম ঐতিহ্য মুছতে। উইঘুর মুসলিমদের অধিকার নিয়ে সক্রিয় নরওয়ের একটি সংস্থার সঙ্গে মিলে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে এইচআরডব্লিউ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচের বিশ্লেষকরা চীনের ন্যাশনাল ব্যুরো অব স্ট্যাটিসটিকসের ওয়েবসাইটে গত ১৪ বছরে জিনজিয়াং অঞ্চলের গ্রামগুলোর নাম পরিবর্তনের বিষয়টি লক্ষ করেছেন। তারা দেখেছেন, ওই অঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার গ্রামের মধ্যে ৩ হাজার ৬০০টি গ্রামের নাম বদলে ফেলা হয়েছে। অন্যদিকে মুসলিমদের অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ ত্রয়োদশ শতাব্দীর স্থাপনা নাগুর নাজিয়াইং মসজিদটি ২০২০ সালে দেশটির একটি আদালত ভেঙে ফেলার নির্দেশ দেয়। তবে সেখানকার মুসলিমরা সরকারের এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছেন। ইউনানের টংহাই কাউন্টির পুলিশ এক বিবৃতিতে বিক্ষোভকারীদের আত্মসমর্পণের আহ্বান জানিয়েছে, যা অতি গর্হিত কাজ। বিক্ষোভের ভিডিওগুলোর সত্যতা যাচাই করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি।
মুসলিম জনসংখ্যা হ্রাসকরণ কৌশল : জার্মানির একজন গবেষক অ্যাডরিন জেনজ সম্প্রতি এক বিশ্লেষণের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণের জন্য চীন সরকার যে আঞ্চলিক নীতি গ্রহণ করেছে তাতে দেশটির দক্ষিণাঞ্চলের জিনজিয়াংয়ে বসবাসরত সংখ্যালঘুদের জনসংখ্যা আগামী ২০ বছরে ২৬ লাখ থেকে ৪৫ লাখ পর্যন্ত কমে যেতে পারে।
চীনে সরকারের নতুন নীতির আগে দেশটির গবেষকরা ধারণা করেছিলেন, ২০৪০ সালের মধ্যে জিনজিয়াং প্রদেশে এক কোটি ত্রিশ লাখ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
জার্মান গবেষক মি. জেনজ বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে বলেছেন, ২০১৯ সালের মধ্যে জিনজিয়াং কর্তৃপক্ষ সেখানকার চারটি সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর ওপর জবরদস্তিমূলক জন্মনিয়ন্ত্রণের পরিকল্পনা করে। এজন্য সন্তান জন্মদানে সক্ষম ৮০ শতাংশ নারীকে জন্মনিয়ন্ত্রণের জন্য নানা ধরনের সার্জারি এবং বন্ধ্যত্বকরণ করা হয়।
উইঘুর নারীদের জোরপূর্বক বিবাহ : তদন্তে দেখা গেছে, চীনের সরকার প্রত্যক্ষভাবে উইঘুর নারীদের হান চাইনিজ পুরুষদের সঙ্গে জোরপূর্বক বিয়ে দিয়ে তাদের সঙ্গে আত্তীকরণে বাধ্য করছে। ইউএইচআরপির প্রধান নির্বাহী ওমর কানাত বলেছেন, এই সহিংসতার বিরুদ্ধে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ও জাতিসংঘের অঙ্গ প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ওয়াশিংটনভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থাটি আরও জানিয়েছে, উইঘুর নারীদের সঙ্গে যা করা হচ্ছে তা স্পষ্ট মানবাধিকার লঙ্ঘন।
‘জিনজিয়াং পুলিশ ফাইল’ : দেশটির সংখ্যালঘু উইঘুরদের ইসলামী বিশ্বাসের কোনোরকম চিহ্ন দেখা গেলে তাদের দীর্ঘ কারাদণ্ড দেওয়া হচ্ছে। ওই এলাকার পুলিশের কম্পিউটার সার্ভার হ্যাক করা তথ্যভাণ্ডারে রয়েছে গোপন হাজার হাজার ছবি এবং আটক কেন্দ্র থেকে পালানোর চেষ্টা করলেই গুলি চালিয়ে হত্যার নীতি বিষয়ক নানা সাক্ষ্য-প্রমাণ। ফাঁস হওয়া কিছু ছবিতে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যদের দেখা যাচ্ছে বন্দিদের মাথায় কালো হুড এবং শরীরে শেকল বেঁধে নতি স্বীকারে বাধ্য করার কৌশল প্রয়োগ করতে। ‘জিনজিয়াং পুলিশ ফাইল’ নামে পরিচিত এসব নথি বিবিসি পায়। ২০২০ সালে উইঘুরদের চোখ বেঁধে টেনে নিয়ে যাওয়ার এমন একটি ভিডিও প্রকাশিত হওয়ার পর যুক্তরাজ্যের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডমিনিক রাব চীনকে তার মুসলিম জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ‘গুরুতর এবং জঘন্য’ মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য অভিযুক্ত করেছিলেন।
উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবী নিধন : প্রতিবেশী ও দুই সন্তানকে কুরআন শেখানোয় চীনে ৪৯ বছর বয়সী সেইলিহান রোজি নামে এক উইঘুর নারীকে ১৭ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে দেশটির সরকার। দেশটির কর্মকর্তারা রেডিও ফ্রি এশিয়াকে এই তথ্য জানিয়েছেন। হিন্দুস্তান টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রোজি ছাড়াও তার দুই সন্তান ও এক প্রতিবেশীর কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে চীনা কর্তৃপক্ষের নির্যাতনে আহত তরুণ উইঘুর মুসলিম নারী আইনজীবী গুলনার আবদুুল্লাহ মে মাসে মারা যান। ওয়ার্ল্ড উইঘুর কংগ্রেসের প্রেসিডেন্ট রাবেয়া কাদির গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অভিযোগ করেন ২০১৪ সালের ১৫ জানুয়ারি চীনের পুলিশ খ্যাতনামা উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবী, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোহতি ও তার মাকে গ্রেফতার করে। ইলহাম তোহতি বেইজিং ইউনিভার্সিটির ইকোনমিকসের একজন খ্যাতনামা অধ্যাপক। এছাড়া গ্রেফতার করেছে ইসলামী শিক্ষাবিদ মোহাম্মদ সালিহ হাজিম, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাউদ, পপশিল্পী আবদুর রহিম হায়াত, ফুটবল খেলোয়াড় এরফান হিজিম প্রমুখ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন ডুই হুয়া ফাউন্ডেশনের নির্বাহী পরিচালক জন কাম বলেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পাওয়া রাহাইল দাউদের ব্যাপারটি একটি নিষ্ঠুর ঘটনা। রাহাইলের মেয়ে আকিদা পুলাতি বলেন, তিনি তাঁর মাকে নিয়ে সারাক্ষণই দুশ্চিন্তা করছেন। অবশ্য বার্তা সংস্থা এপির তথ্যমতে, চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, রাহাইলের মামলার বিষয়ে তাঁর কাছে কোনো তথ্য নেই। রাহাইল উইঘুর লোককাহিনি ও ঐতিহ্যের একজন বিশেষজ্ঞ। গ্রেপ্তারের আগে তিনি জিনজিয়াং ইউনিভার্সিটি কলেজ অব হিউম্যানিটিজে অধ্যাপনা করছিলেন। ২০০৭ সালে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে জাতিগত সংখ্যালঘুবিষয়ক গবেষণা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন রাহাইল। তিনি হার্ভার্ড, কেমব্রিজসহ যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় বক্তব্যও দিয়েছিলেন। অন্যদিকে তাইওয়ান নিউজের এক অনুসন্ধানে গত কয়েক বছরে চীনের কর্মকর্তারা উইঘুরদের মালিকানাধীন প্রচুর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছে বলে দাবি করা হয়েছে। এসব সম্পত্তি প্রায় ৮৪ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে বিক্রি করা হয়। সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের একজন ভুক্তভোগী হলেন আবদু জেলিল হেলিল। উইঘুর এই ধনকুবের রপ্তানিকারককে ২০১৭ সালে আটক করে চীনা পুলিশ। পরে তাকে প্রায় ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলার মূল্যের সম্পত্তি চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে সমর্পণ করতে বাধ্য করা হয়।
বিলিয়ন ডলারে উইঘুরদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি : অস্ট্রেলিয়ান স্ট্র্যাটেজিক পলিসি ইনস্টিটিউট (এএসপিআই) বলছে, ২০১৭ থেকে ২০১৯ সাল পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার উইঘুরকে জিনজিয়াং থেকে চীনের বিভিন্ন অঞ্চলের কারখানায় পাচার করা হয়েছে। এই উইঘুরদের জোরপূর্বক শ্রমে নিযুক্ত এবং তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করে কোটি কোটি ডলার অর্থ সংগ্রহ করছে চীন। দেশটির কালো বাজারে বছরে কমপক্ষে ১ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেনাবেচা হয় বলে ধারণা করা হচ্ছে। ২০১৯ সালে চীনের একটি আদালতে দেশটিতে প্রায় ৬০ হাজার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন হয়েছে বলে জানানো হয়। তবে এই সংখ্যা দাতাদের তুলনায় অনেক বেশি। চীনের যেসব হাসপাতালে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ প্রতিস্থাপন করা হয়, সেসবের বেশিরভাগেরই অবস্থান উইঘুর বন্দিশিবিরের আশপাশের এলাকায়। এএসপিআই বলছে, কালোবাজারে একেকটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যাপক চড়াদামে বিক্রি হয়। দেশটিতে একটি ভালো লিভার প্রায় এক লাখ ৬০ হাজার ডলারে বিক্রি হয়। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিক্রি করার মতো জঘন্য কাজ করেও পার পাচ্ছে চীন শুধু বিশ্ব বিবেকের নিরবতায়।
উইঘুর মুসলিম-পাকিস্তান নীরব : পাকিস্তান সরকার মুসলিম উম্মাহর রক্ষাকারী হিসেবে ভাবমূর্তি উপস্থাপন করে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে কাশ্মীরে গণহত্যার জন্য দায়ী করে অ্যাডলফ হিটলারের সঙ্গে তুলনা করেছে। পাকিস্তান সরকার জানায়, ‘কাশ্মীরের জনসাধারণের ওপর ভারতের নিষ্ঠুর আচরণ মানা হবে না।’ যদিও পাকিস্তানের ডন পত্রিকায় কলামিস্ট হুমা ইউসুফ বলেছেন, উইঘুর সম্প্রদায় নিয়ে পাকিস্তানের নীরবতার কারণে কাশ্মীর ইস্যুতে পাকিস্তানের প্রতিবাদের যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক উইলসন সেন্টারের এশিয়া প্রোগ্রামের উপপরিচালক মিখাইল কুগেলম্যান বলেন, এ ধরনের সমালোচনা যৌক্তিক। কুগেলম্যান বলেন, পাকিস্তান কাশ্মীরি মুসলিম সম্প্রদায় ও ভারতের মুসলিমদের অধিকার নিয়ে সোচ্চার। কিন্তু উইঘুরদের নিয়ে তারা নীরব। এ ব্যাপারে পাকিস্তানের নীতিমালা থাকা উচিত।
জানা যায়, চায়না-পাকিস্তান ইকোনমিক করিডোরের অংশ হিসেবে চীন পাকিস্তানে পাঁচ কোটি ডলারেরও বেশি বিনিয়োগ করেছে। ভারতের সঙ্গে অস্থিতিশীলতার সময়ে চীন পাকিস্তানকে কূটনৈতিক সহায়তার প্রস্তাবও দিয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে পাকিস্তানের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও হাডসন ইনস্টিটিউটের জ্যেষ্ঠ ফেলো হুসেন হাক্কানি এএফপিকে বলেন, পাকিস্তান ভারতের বিরুদ্ধে চীনকে তাদের প্রধান সমর্থক মনে করে। ব্রুকিংস ইনস্টিটিউটের ফেলো মাদিহা আফজাল বলেন, পাকিস্তানের জনসাধারণ উইঘুরদের নিয়ে খুব বেশি জানে না। অন্যদিকে পাকিস্তান সরকার জানায়, দুটি আলাদা ইস্যু।
উইঘুর নির্যাতনে মুসলিম উম্মাহ নিশ্চুপ : উইঘুর আমেরিকান উদ্যোক্তা ও মানবাধিকারকর্মী কুযযাত আলতেয় বলেন, চীন মুসলিম দেশগুলোয় প্রভাব বিস্তার করতে কোটি কোটি ডলার ব্যয় করে উইঘুর প্রশ্নে এসব দেশের সরকারকে চাপে রাখে এবং মিডিয়াকে উইঘুর সম্পর্কে কথা বলতে বিরত রাখে।
উইঘুর এ মানবাধিকার কর্মী আরো বলেন, সব তথ্যের নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে থাকায় মুসলিম দেশগুলো চীনের উত্তর তুর্কিস্তান দখল ও সেখানে গণহত্যার প্রস্তুতি সম্পর্কে অবগত নয়। যদি এসব দেশের মানুষ সঠিক সংবাদ সম্পর্কে অবগত হয়, তাহলে তারা আওয়াজ উঠাবে। রুকিয়ে তুরদুশ উইঘুর কানাডা সোসাইটির সাবেক সভাপতি। তিনি নিয়মিত তুরস্ক ও চীনে যাতায়াত করেন। ২০১৭ সালের মাঝামাঝি সময়ে তাঁর পরিবারের সদস্যরা কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই গ্রেপ্তার হন। চীনে তাঁর ব্যাংক হিসাব জব্দ করা হয়। তুরদুশের হারানোর কিছুই নেই। কারণ, তাঁর স্ত্রীকে কোনো অভিযোগ ছাড়াই গ্রেপ্তার করেছে চীনের সশস্ত্র নিরাপত্তা বাহিনী। তুরদুশ জানেনও না তাঁর দুই সন্তান কোথায়? রুকিয়ে তুরদুশও মানবাধিকারকর্মী কুযযাত আলতেয়র সাথে সহমত পোষণ করেন।
জাতিসংঘের ভূমিকা : জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার মিশেল ব্যাশেলেট বহুদিন ধরেই একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে চীনের মুসলিমদের দেখতে যেতে চাইছেন, কিন্তু চীন তাতে সম্মতি দেয়নি। আবার জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান জোসেপ বরেল বলেছেন, চীনের উচিত জাতিসংঘকে স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে দেয়া। সম্প্রতি উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে একটি পিটিশনও জমা পড়েছিল কিন্তু বিচারপতিরা সেই আবেদন গ্রহণ করেননি। তাঁরা জানিয়েছিলেন, চীন যেহেতু আদালতে আসবে না, ফলে বিষয়টির বিচার করা সম্ভব নয়।
অন্যদিকে মিশেল ব্যাশেলেট জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার হিসেবে তার চার বছর দায়িত্ব পালনের শেষ কর্মদিবসে মানবাধিকার প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। প্রতিবেদনটি প্রকাশ না করার আহ্বান জানিয়েছিল চীন। চীনে হিউম্যান রাইটস ওয়াচের পরিচালক সোফি রিচার্ডসন বলেছেন, প্রতিবেদনে যা উঠে এসেছে তাতে পরিষ্কার যে ‘চীনা সরকার কেন প্রতিবেদনের প্রকাশ ঠেকাতে লড়াই করেছে’। চীনের সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম জনগোষ্ঠীকে নিয়ে জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনার মিশেল ব্যাশেলেটের বহুপ্রতীক্ষিত প্রতিবেদনকে স্বাগত জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। আর ইউনিভার্সাল পিরিওডিক রিভিউর জুলাই সংস্করণে লার্সেন বলেন, ‘জাতিসংঘের প্রতিষ্ঠিত উদ্বেগগুলোর অর্থবহ সমাধান করার অনেক সুযোগ ছিল চীনের।’ চীনের মুসলিমদের ওপর গণহত্যা বন্ধ করতে জাতিসংঘকে আরো কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।
অ্যামনেস্টির সুপারিশ : চীনের উইঘুর মুসলিমদের নিয়ে ১৬০ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে মানবাধিকারবিষয়ক আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। ‘আমরা যেন যুদ্ধে শত্রুপক্ষ’ শিরোনামে রিপোর্টটি প্রকাশ করা হয়। জার্মান সংবাদমাধ্যম ডয়চে ভেলে জানিয়েছে, ২০১৯ সালের অক্টোবর থেকে ২০২১ সালের মে মাস পর্যন্ত গবেষণা করেছে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। এ সময়ের মধ্যে তারা ১২৮ জন উইঘুর মুসলিমদের সাক্ষাৎকার নিয়েছে।
অ্যামনেস্টির সেক্রেটারি জেনারেল অ্যাগনেস ক্যালামার্ড বলেছেন, ‘চীন মানবতার বিরুদ্ধে যে অপরাধ করেছে, তা তথ্যসহ এই রিপোর্টে তুলে ধরা হয়েছে। অন্য দেশগুলোকে সাহসী ভূমিকা নিতে হবে এবং চীনকে এই কাজ বন্ধ করতে বাধ্য করা জরুরি।’ অ্যাগনেস আরও বলেছেন, ‘আমাদের দেওয়া তথ্য-প্রমাণগুলো জানার পরও দেশগুলোর পক্ষে চুপ করে বসে থাকা মুশকিল।’
উইঘুরদের মামলা-ট্রাইব্যুনালের রায় : আল-জাজিরা বলছে, ইস্তাম্বুলের প্রধান প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে চীনের ১১২ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করেন ১৯ উইঘুর সদস্য। ইস্তাম্বুলের প্রধান আদালতের বাইরে আইনজীবী গুলদেন সনমেজ জানান, ‘এই মামলার বিচারকাজ আরও আগেই শুরু করা উচিত ছিল আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের। কিন্তু চীন জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য হওয়ায় বিচার সম্ভব হবে বলে মনে হয় না।’ এ সময় ইস্তাম্বুলের ওই আদালতের সামনে আইনজীবীকে ঘিরে পতাকা ও প্লাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন অর্ধশতাধিক নারী ও পুরুষ। তারা সবাই তাদের পরিবারের নিখোঁজ সদস্যদের ছবি হাতে সেখানে উপস্থিত ছিলেন। আর তাদের হাতে থাকা প্লেকার্ডে অভিযুক্ত চীনা কর্মকর্তাদের বিচারের দাবি জানানো হয়। মামলায় অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে গণহত্যা, নির্যাতন, ধর্ষণ এবং মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে। তুরস্কে প্রায় ৫০ হাজার উইঘুর বসবাস করে। মধ্য এশিয়ার বাইরে এককভাবে কেবল তুর্কি ভূখণ্ডেই এতসংখ্যক উইঘুর মুসলিমের বাস রয়েছে। তুরস্কের আইনজীবী গুলদেন সনমেজ বলেন, দীর্ঘদিন ধরে গুরুতর এই অভিযোগ সামনে আসার পরও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় চীনা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। আর এ কারণেই অভিযুক্ত চীনা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি অভিযোগ দায়ের করার প্রয়োজন ছিল।
এর আগে সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালানোর দায়ে চীনকে অভিযুক্ত করে যুক্তরাজ্যভিত্তিক একটি স্বাধীন ট্রাইব্যুনাল। ঐ উইঘুর ট্রাইব্যুনালের প্রধান এবং মানবাধিকারবিষয়ক প্রখ্যাত আইনজীবী স্যার জিওফ্রে নাইস বলেছেন, ট্রাইব্যুনালের সবাই প্রশ্নাতীত ভাবেই এ বিষয়ে একমত হয়েছে যে, নানা অমানবিক পদক্ষেপের মাধ্যমে চীনা সরকার উইঘুর মুসলিমদের ওপর গণহত্যা চালিয়েছে। আইনি স্বীকৃতি না থাকলেও এই ট্রাইব্যুনালের রায়ের আন্তর্জাতিক গুরুত্ব রয়েছে। কারণ উইঘুর ট্রাইব্যুনালের প্রধান স্যার জিওফ্রে নাইস ইতোপূর্বে গণহত্যা ও যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে সাবেক সার্বিয়ান প্রেসিডেন্ট স্লোবোদান মিলোসেভিকের বিচারকার্যেও নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
এছাড়া মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক মানবাধিকার পরিস্থিতি প্রতিবেদনে জিনজিয়াংয়ে চীনা নিপীড়নের ব্যাপারে বলা হয়, ২০২০ সালে উইঘুর ও অন্যান্য ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে গণহত্যা ও অন্যান্য মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটিত করেছে চীনের ক্ষমতাসীন সরকার, যা এখনই বন্ধ করতে হবে।
জিনজিয়াং নিয়ে প্রতিবেদন করতে চীনে অনেক বছর কাটিয়েছেন বিবিসির জন সুডওয়ার্থ। ফলাফল হিসেবে চীন ছাড়তে কার্যত বাধ্য হন তিনি। চীন এক উদীয়মান পরাশক্তি। হাঁটছে ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক, সামরিক সমৃদ্ধির পথে। বৈশ্বিক অর্থনীতি ও সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যবস্থায়ও নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে দেশটি ফলে দেশের অভ্যন্তরে সংখ্যালঘু উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের খবর খুব কমই প্রকাশ পায়। সুতরাং মুসলিম উম্মাহসহ বিশ্ব সম্প্রদায়কে চীনের উইঘুর মুসলিমদের নিরাপত্তার জন্য এগিয়ে আসতে হবে।
সূত্র : উইঘুর নিউজ ডটকম, আল্-জাজিরা, বিবিসি, এপি, এএফপি, সিএনএন, ডয়েচে ভেলে, হিন্দুস্তান টাইমস, ইউএন ইউনিভার্সাল পিরিওডিক্যাল রিপোর্ট (UPR), হিউম্যান রাইটস ওয়াচ।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।