সুনামগঞ্জের হাওরে ডুবেছে কোটি কোটি টাকার ধান, দিশেহারা কৃষক
৭ মে ২০২৬ ০৯:৪০
দোয়ারাবাজার (সুনামগঞ্জ) সংবাদদাতা : টানা বৃষ্টি আর উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে সুনামগঞ্জের হাওরাঞ্চলে নেমে এসেছে কৃষকের কান্না। বছরের একমাত্র অবলম্বন বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় হাজারো কৃষক এখন হতাশা আর অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। কেউ বুকসমান পানিতে নেমে, কেউ আবার নৌকা ভাসিয়ে শেষ চেষ্টা হিসেবে ধান কাটছেন। কিন্তু প্রকৃতির নির্মমতার কাছে অনেকের সেই চেষ্টাও ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।
গত ২৬ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া টানা বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে জেলার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চল প্লাবিত হয়। শুরুতে পানি তুলনামূলক কম থাকলেও শ্রমিক সংকটের কারণে কৃষকরা দ্রুত ধান ঘরে তুলতে পারেননি। এরই মধ্যে বজ্রপাতের ঘটনায় পাঁচ দিনে আট কৃষকের মৃত্যুর খবর হাওরাঞ্চলে আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়। ফলে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অনেক কৃষক মাঠে নামতেও সাহস পাননি।
টানা কয়েকদিনের বৃষ্টিতে উপজেলার অধিকাংশ হাওরের পাকা ধান পানির নিচে তলিয়ে যায়। কোথাও ধান কেটে ঘরে তোলার আগেই ঢলের পানিতে ভেসে গেছে কৃষকের স্বপ্ন, শ্রম আর বছরের সম্বল।
গত ২ মে শনিবার সকালে দোয়ারাবাজার উপজেলার বিস্তীর্ণ দেখার হাওরের পশ্চিমপারের রামপুর, বাহাদুরপুর, করিমপুর, পলিরচর, শ্রীপুর, জলসী, কৃষ্ণনগর, রাধানগর ও নলুয়া এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, পুরো হাওরজুড়ে থৈথৈ করছে পানি। ডুবে যাওয়া পাকা ধানের আর কোনো চিহ্ন নেই, শুধু দেখা যাচ্ছে পানির ঢেউ। এমনকি হাওরের তীরবর্তী এলাকার পাকা ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। কোথাও সড়কের ওপর কাটা ধান শুকানোর চেষ্টা করছেন কৃষকরা, কোথাও আবার স্তূপ করে রাখা হয়েছে খড়। কিন্তু রোদের অভাবে কাটা ধানেও অঙ্কুর গজাতে শুরু করেছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রায় অর্ধেক ধানই নষ্ট হয়ে গেছে বলে জানান কৃষকরা।
পান্ডারগাঁও ইউনিয়নের পলিরচর এলাকায় গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। চারদিকে শুধু পানিতে নুয়ে পড়া পাকা ধান। কৃষকদের চোখেমুখে হতাশা, কণ্ঠে দীর্ঘশ্বাস। বছরের একমাত্র ফসল বাঁচাতে প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়েও যেন প্রকৃতির কাছে হার মানতে হচ্ছে তাদের।
কৃষক জায়েদ হোসেন জানান, তিনি ৪০ বিঘা জমিতে বোরো আবাদ করেছিলেন। এখনো তার বাড়ির আঙিনা খালি পড়ে আছে। অর্ধেক ধান কাটতে পারলেও টানা মেঘলা আকাশ ও রোদের অভাবে তা শুকাতে পারছেন না। তিনি বলেন, ‘ধান কেটে আনছি, কিন্তু শুকাতে না পারলে সব নষ্ট হয়ে যাবে। বাড়াল এখনো শূন্য পড়ে আছে।’
অন্যদিকে পানি বৃদ্ধি ও শ্রমিক সংকটের কারণে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষক আব্দুল হেকিম। প্রায় ১০০ বিঘা জমিতে ধান আবাদ করলেও এরই মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, ‘শ্রমিক পাচ্ছি না, পানিও বাড়তেছে। চোখের সামনে ধান ডুবতেছে, কিন্তু কিছুই করতে পারতেছি না।’
এদিকে আফছর নগর গ্রামের ফরিদ আহমদ, সামছুজ্জান ও আব্দুল হাই বশিরসহ একাধিক কৃষক তাদের দুর্বিষহ অবস্থার কথা জানান। তাদের ভাষায়, হাওরের এই ধানই ছিল সারা বছরের স্বপ্ন, বেঁচে থাকার ভরসা এবং পরিবারের একমাত্র অবলম্বন। কিন্তু অকাল বন্যা ও টানা বৃষ্টিতে সেই স্বপ্ন এখন পানির নিচে তলিয়ে যাচ্ছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দেখার হাওরে প্রায় ১৩ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হয়েছে। এসব জমি থেকে প্রায় প্রায় সাড়ে ৬ হাজার টন (চাল) খাদ্য উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল। টাকার অংকে প্রায় ৩৫ কোটি।
তবে এবারের বানে কী পরিমাণ জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে কৃষি বিভাগ এখনো চূড়ান্ত হিসাব নিরূপণ করতে পারেনি। প্রাথমিকভাবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ ধান ইতোমধ্যে কৃষকের আওতায় এলেও অবশিষ্ট ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ জমির ধান পানিতে নষ্ট হয়েছে।