পাথরঘাটায় রুহিতা সৈকতকে ঘিরে জেগে উঠছে পর্যটন সম্ভাবনা


৭ মে ২০২৬ ০৯:৩৯

কে এম বেলাল, পাথরঘাটা (বরগুনা) : বরগুনার দক্ষিণের শেষ প্রান্তে বঙ্গোপসাগরের ঢেউ-ছোঁয়া উপকূলে অবস্থিত পাথরঘাটা উপজেলা এক সমৃদ্ধ উপকূলীয় জনপদ। দেশের গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় উপজেলা হিসেবে পাথরঘাটা বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রও এখানে। পাশাপাশি রয়েছে মনোমুগ্ধকর বেশকিছু দর্শনীয় স্থান, যা পর্যটন শিল্পের বিপুল সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে।
হরিণঘাটা বনাঞ্চলের অপরূপ প্রাকৃতিক দৃশ্য, বন্যপ্রাণীর বিচরণভূমি ও নীরবতার সৌন্দর্য যেন পর্যটকদের টেনে নিয়ে যায়। এ হরিণঘাটা বনাঞ্চলের কাছেই বহুদিন ধরে আড়ালে ছিল রুহিতা। নির্জন, অচেনা অথচ অপার সৌন্দর্যে ভরা এক লুকানো সমুদ্রসৈকত রুহিতা। প্রকৃতির সৌন্দর্য এখন ধীরে ধীরে পরিচিত হয়ে উঠছে বরগুনার নতুন পর্যটন রত্ন হিসেবে।
পাথরঘাটা পৌরসভা থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দক্ষিণে অবস্থিত রুহিতা সৈকত একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন এলাকা, যার সৌন্দর্য এখনো পুরোপুরি পরিচিত হয়ে ওঠেনি। যাতায়াত ব্যবস্থা খুব একটা সুবিধাজনক না হলেও প্রতিদিনই এখানে ভিড় করছেন হাজারো পর্যটক। কারণ রুহিতা থেকে সরাসরি দেখা যায় বঙ্গোপসাগরের বুকে সূর্যাস্তের মনোমুগ্ধকর দৃশ্য। সমুদ্রের বাতাস এখানে সারাক্ষণই ঠান্ডা ও প্রশান্তিময়, যা ক্লান্ত শরীরকে মুহূর্তেই স্বস্তি দেয়।
সৈকতের ঠিক পাশেই বিস্তৃত জেলেপল্লি। ভোরের আলো ফুটতেই মাছ ধরার নৌকার সারি একে একে সাগরে পা বাড়ায়। দিনের পরিশ্রম আর সমুদ্রের গল্প বুকে নিয়ে তারা বিকেলে ফিরে আসে তীরে। জেলেদের এই কর্মচাঞ্চল্যে ফুটে ওঠে উপকূলীয় জীবনের স্বাভাবিক ছন্দ নির্ভেজাল, অনাড়ম্বর আর একেবারে বাস্তব। পর্যটকদের কাছে এটি শুধুমাত্র দৃশ্য নয়, বরং উপকূলের জীবনের স্পন্দন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো এক জীবন্ত অভিজ্ঞতা।
রুহিতা সৈকতের অপরূপ সৌন্দর্যকে প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়েছে। দক্ষিণ দিগন্তজোড়া তিন প্রধান নদী বিষখালী, বলেশ্বর ও পায়রা বহুদূরের পথ পেরিয়ে এখানে এসে মিশেছে বিশাল বঙ্গোপসাগরে। নদী আর সাগরের এই মিলনক্ষেত্রেই জন্ম নেয় রুহিতার পানির এক অপূর্ব রঙের উৎসব। কখনো নদীবাহিত কাদামাটির ঘন অচেনা আভা, কখনো আবার গভীর নীলের স্বচ্ছ বিস্তার।
জোয়ার-ভাটার প্রতিটি ওঠানামায় বদলে যায় এই উপকূলের চেহারা। কখনো তটরেখা সামনে এগিয়ে আসে, কখনো পিছিয়ে যায় দূরে। ফলে প্রতিদিনই রুহিতা সৈকত ধরা দেয় নতুন সাজে নতুন আলোয়, নতুন বিস্ময়ে। যেন প্রতিটি ভোর-সন্ধ্যায় প্রকৃতি এখানে নতুন গল্প লিখে যায় নীরবে।
রুহিতা বিচ থেকে সুন্দরবন খুব বেশি দূরে নয়, সমুদ্রপথে বলেশ্বর নদী পেরিয়ে অল্প দূরত্বেই এই বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভবন ও বলেশ্বর নদীর তীরঘেঁষে বিহঙ্গদ্বীপ। তাই চাইলে পর্যটকরা রুহিতা থেকে নৌপথে বিহঙ্গদ্বীপ ও সুন্দরবনের বিভিন্ন স্পটেও যেতে পারেন। ফলে রুহিতা সৈকত শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি নয়, বরং সুন্দরবন ভ্রমণেরও একটি সম্ভাব্য প্রবেশদ্বার হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
প্রবাস থেকে দেশে ফেরা মাসুদ রানা ঘুরতে আসেন রুহিতা বিচে। মাসুদ রানা বলেন, সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য তাকে বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে। রুহিতা বিচে এসে মনে হলো এক টুকরো শান্তি খুঁজে পেলাম। নদী আর সাগরের মিলনরেখার রঙের খেলা সত্যিই অসাধারণ। এখানে পর্যটনের সুযোগ আরও বাড়ানো গেলে রুহিতা দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় স্পট হয়ে উঠতে পারে।
রুহিতা বিচ নিয়ে শুরু থেকেই কাজ করে আসছেন স্থানীয় প্রাণিপ্রেমী জাকির হোসেন ওরফে টাইগার জাকির। বিচের সৌন্দর্য রক্ষা, পরিচ্ছন্নতা ও পর্যটন সম্ভাবনা নিয়ে তিনি নিয়মিত পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সৈকতের উন্নয়ন ও যাতায়াত সমস্যা নিয়ে নিজের সরল ভাষায় তিনি মতামত দেন।
জাকির হোসেন বলেন, রুহিতা বিচটা অনেক সুন্দর, কিন্তু যাতায়াত একটু ঝামেলার। রাস্তা-ঘাটটা ঠিকঠাক হলে আরও অনেক মানুষ এখানে আসবে। আমি প্রথম থেকেই রুহিতা বিচ নিয়ে কাজ করছি, চাই জায়গাটা আরও উন্নত হোক। প্রশাসন যদি একটু নজর দেয়, খুব কম সময়েই রুহিতা বড় একটা পর্যটন স্পট হয়ে উঠবে।
পাথরঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) তাপস পাল জানান, তিনি এলাকাটি পরিদর্শন করেছেন এবং পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে সরকারকে অবহিত করবেন। একই সঙ্গে সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নে তিনি উদ্যোগ নেবেন, যাতে পর্যটকদের যাতায়াত সহজ হয়।