শাপলা গণহত্যার ১৩ বছর পূর্তি

নিহত ৫৮ জনের পরিচয় শনাক্ত, হত্যায় হাসিনাসহ ৩০ জন জড়িত


৭ মে ২০২৬ ০৯:১৯

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের ডাকা সমাবেশে রাষ্ট্রীয় বাহিনী কর্তৃক গণহত্যা চালানোর ১৩ বছর পূর্ণ হয়েছে গত ৫ মে মঙ্গলবার। ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা তৎকালীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের ওপর গণহত্যা চালায়। সেই থেকে এই দিনটি শাপলা চত্বর হত্যাকাণ্ড দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। সেদিন মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ও পবিত্র কুরআনের অবমাননার প্রতিবাদসহ ১৩ দফা দাবিতে আলেম-ওলামা ও কওমি মাদরাসার শিক্ষার্থীরা শাপলা চত্বরে সমবেত হন। দিনভর উত্তেজনা ও সংঘর্ষের পর মধ্যরাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যৌথ অভিযানে গণহত্যা চালায়। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার সমাবেশকে সরকারবিরোধী আন্দোলন হিসেবে উল্লেখ করে তা উচ্ছেদের সিদ্ধান্ত নেয়। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অভিযানের নাম ছিল অপারেশন সিকিউরড শাপলা, আর বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একে অপারেশন ক্যাপচার শাপলা বলা হয়। এই অভিযানে হতাহতের সুনির্দিষ্ট সংখ্যা নিয়ে ভিন্নমত রয়েছে। মানবাধিকার সংগঠন অধিকার সে সময় ৬১ জন নিহত হওয়ার তথ্য প্রকাশ করে। যদিও সরকারি হিসাবে এ সংখ্যা ভিন্ন ছিল। ঘটনার পরদিন ভোরে দিগন্ত টিভি ও ইসলামিক টিভির সম্প্রচার বন্ধ করে দেওয়া নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়।
ঘটনার পর থেকেই বিচার দাবিতে সরব ছিলেন ভুক্তভোগী ও বিভিন্ন সংগঠন। তবে দীর্ঘদিন এ বিষয়ে কার্যকর অগ্রগতি না হওয়ায় ক্ষোভ ছিল সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিষয়টি আবারও আলোচনায় আসে এবং বিচার প্রক্রিয়া নতুন করে গতি পায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে এ ঘটনায় আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করা হয়। হেফাজতে ইসলামের পক্ষ থেকে দায়ের করা অভিযোগে সাবেক ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ২১ জনকে অভিযুক্ত করা হয়েছে। এ মামলায় ইতোমধ্যে ছয়জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
এদিকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা জানিয়েছে, মামলার প্রায় ৯০ শতাংশ তদন্ত শেষ হয়েছে। চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, আগামী ৭ জুনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হতে পারে। প্রাথমিকভাবে ঢাকায় ৩২ জন নিহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে বলেও জানান তিনি। চিফ প্রসিকিউটর জানান, ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশ ঘিরে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে ৫৮ জন নিহতের তথ্য পাওয়া গেছে। গত ৫ মে মঙ্গলবার তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর বলেন, এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। মো. আমিনুল ইসলাম বলেন, ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতের সমাবেশকে কেন্দ্র করে দেশের তিনটি স্থানে হত্যাকাণ্ডের তথ্য পাওয়া গেছে। ঢাকায় দিনের বেলা ও রাতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। পরদিন নারায়ণগঞ্জ ও চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়।
কয়েকজন ব্লগারের বিরুদ্ধে ইসলাম ধর্ম নিয়ে কটূক্তি করার অভিযোগ ও নারীনীতির বিরোধিতা করাসহ ১৩ দফা দাবিতে ২০১৩ সালের ৫ মে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে অবস্থান নেন হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা। সেদিন সারা দেশ থেকে ঢাকয় এসেছিলেন কওমি মাদরাসাভিত্তিক সংগঠনটির নেতাকর্মীরা। ওই কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে দিনভর উত্তেজনা ও সহিংসতা ছড়িয়েছিল। পরে রাতে পুলিশ, র‌্যাব ও বিজিবির যৌথ অভিযানে খালি করা হয় শাপলা চত্বর।
২০১৩ সালের ৫ মে এই দিনে রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরের ঘটনাকে ‘ভয়াল ও বেদনাবিধুর’ হিসেবে উল্লেখ করে বিচার না হওয়া পর্যন্ত ন্যায়বিচারের সংগ্রাম অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে এই ঘোষণা দেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হক। তিনি বলেন, ২০১৩ সালের এই দিনে একটি শান্তিপূর্ণ গণআন্দোলন নির্মম দমন-পীড়নের শিকার হয় এবং অসংখ্য নিরীহ মানুষের রক্তে রঞ্জিত হয় শাপলা চত্বর। তিনি লেখেন, ‘সে রাতের স্মৃতি এখনো জাতির হৃদয়ে দগদগে ক্ষত হয়ে আছে এবং এই অধ্যায় ভুলে যাওয়ার নয়। বরং এটি জাতিকে দায়বদ্ধতার কথা মনে করিয়ে দেয়।’
২০১৩ সালের ৫ মে রাজধানীর শাপলা চত্বরে সংঘটিত নারকীয় হত্যাকাণ্ডের ঘটনার একটি স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য তদন্ত কমিশন গঠন করে প্রকৃত ঘটনা জাতির সামনে উন্মোচন এবং হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা এবং জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গত ৫ মে মঙ্গলবার গণমাধ্যমে পাঠানো বিবৃতিতে তিনি এই দাবি জানিয়ে বলেন, দেশের ইতিহাসে এটি একটি বেদনাবিধুর ও কলঙ্কজনক অধ্যায়। সেদিন ধর্মপ্রাণ তাওহিদী জনতার ওপর যে নির্মম অভিযান পরিচালিত হয়েছিল, তা জাতির বিবেককে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছিল। এই নারকীয় হত্যাকাণ্ড মানবতা, ন্যায়বিচার ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের সম্পূর্ণ পরিপন্থি একটি জঘন্যতম ঘটনা।
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, দীর্ঘসময় পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও গ্রহণযোগ্য বিচার না হওয়া অত্যন্ত দুঃখজনক। এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার এখনো সম্পন্ন না হওয়ায় ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং দেশের জনগণের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভের সৃষ্টি হচ্ছে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি কোনো সভ্য রাষ্ট্রে কাম্য হতে পারে না। তিনি বলেন, আমরা মনে করি, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণের শান্তিপূর্ণ সমাবেশ ও মতপ্রকাশের অধিকার সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। সেই অধিকার দমন করতে শক্তি প্রয়োগ এবং প্রাণহানির ঘটনা কখনোই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে সত্য উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের আইনের আওতায় আনা অত্যন্ত জরুরি। দেশবাসীর প্রতি শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানান তিনি।