শিক্ষার বৈষম্য আঘাত হানছে জাতীয় ঐক্যের ভিত্তিমূলে
৬ মে ২০২৬ ১৮:২৭
এত বছরেও বৈষম্য দূরীকরণে নেই পদক্ষেপ
মেধার চেয়ে বেশি মূল্যায়িত হচ্ছে অর্থ
॥ সাইদুর রহমান রুমী ॥
বাংলাদেশে ইংলিশ মিডিয়াম, বাংলা ও মাদরাসার ত্রিমাত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম বৈষম্য এবং বিভাজন তৈরি করছে। এটি কেবল পাঠ্যক্রমেই নয়, বরং সামাজিক মর্যাদা, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার ক্ষেত্রেও বিশাল পার্থক্য সৃষ্টি করছে। এত বছর পরও শিক্ষা ক্ষেত্রের বৈষম্য ক্রমেই বাড়ছে, যা আর্থসামাজিক বিভাজন এবং মৌলিক অধিকার খর্ব করছে। গোড়া থেকেই তৈরি করছে একটি বিভক্ত জাতি।
বেসরকারি স্কুল ও ইংরেজি মাধ্যমে প্রধানত দেখা যায় সামর্থ্যবান উচ্চবিত্ত, উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তানরা পড়াশোনা করে। যেখানে আধুনিক সুযোগ-সুবিধা ও ভালো শিক্ষক থাকে। আর ইংরেজি মাধ্যমে দেখা যায়, স্কুলে মুখস্থ বিদ্যার বদলে প্রায়োগিক ও মাল্টিমিডিয়াভিত্তিক শিক্ষার প্রচলন বেশি, যা বাংলা মাধ্যমে খুবই কম। একইভাবে ভাষাগত সক্ষমতায় ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা ইংরেজি দক্ষতায় এগিয়ে থাকছে। আর এক্ষেত্রে বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা ইংরেজি ভাষার দক্ষতার অভাবে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে। আর ইংরেজি, অংক এবং বিজ্ঞানের মতো বিষয়ে মাদরাসা শিক্ষার্থীরা ব্যাপক পিছিয়ে, যা আধুনিক যুগের কর্মসংস্থানমুখী ভূমিকায় তাদের পিছিয়ে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে সরকারি বনাম বেসরকারি, বাংলা বনাম ইংরেজি মাধ্যম এবং মাদরাসা
শিক্ষার এ ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে, যা একটি গভীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকটের ইঙ্গিত দেয়। এ ব্যবধান কেবল পাঠ্যবইয়ের নয়, বরং দৃষ্টিভঙ্গিরও।
মেধার চেয়ে অর্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল শিক্ষা
বিগত কয়েক দশকে শিক্ষা এখন মেধার চেয়ে অর্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। যেসব অভিভাবকদের প্রচুর অর্থ রয়েছে, তারা ইংরেজি মিডিয়াম, বেসরকারি উচ্চ বেতনের বিশ্ববিদ্যালয়ে সন্তানদের পড়াচ্ছেন। একইভাবে সাধারণ মধ্যবিত্ত শ্রেণি সন্তানদের সরকারি বাংলা মিডিয়াম কিংবা সাধারণ বাংলা মিডিয়ামে পড়াচ্ছেন। আর গ্রামের বা মফস্বলের সাধারণ মানুষ সন্তানদের বিভিন্ন আলিয়া বা কওমি মাদরাসায় পড়াচ্ছেন। সব মিলিয়ে দেশে একটি বৈষম্যমূলক এবং পুঁজিবাদী আর্থিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইংরেজি মিডিয়ামের শিক্ষা অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় এটি কেবল উচ্চবিত্তের নাগালে থাকছে, যা সমাজে ধনী-দরিদ্র বিভাজন তৈরি করছে। একইভাবে এ শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে ভালো ভালো চাকরিগুলো নিয়ন্ত্রণ করছে। ফলে দেশে অলিখিতভাবে একটি চরম বৈষম্যমূলক সমাজ ব্যবস্থা গড়ে উঠছে। অভিযোগ রয়েছে যে, ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীরা দেশীয় সংস্কৃতি ও ইতিহাস থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে যা মেধার চেয়ে টাকার ভিত্তিতে মূল্যায়িত হচ্ছে।
শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রাথমিক ও ইংলিশ মিডিয়াম বা কিন্ডারগার্টেনের মান বস্তুত এক না। একইভাবে ক্যাডেটের পড়াশোনার কোয়ালিটি আর মাধ্যমিক বা উচ্চমাধ্যমিকের কোয়ালিটিও সমান হচ্ছে না। তাদের মতে, ইংলিশ মিডিয়াম বা ক্যাডেট কলেজগুলো যেকোনো মূল্যে কোয়ালিটি নিশ্চিত করছে। কিন্তু তার বিপরীতে সরকারি বা বেসরকারি মাধ্যমিক বা সরকারি মাধ্যমিকে কিংবা মাদরাসায় ওই ধরনের শিক্ষক, ফান্ডিং, জবাবদিহি, রিসোর্স, ল্যাব ফ্যাসিলিটিজ নেই। একইভাবে, দেশ একটি হলেও শহর-গ্রাম বেসিসেও শিক্ষার মানে তারতম্য রয়েছে, যা প্রকারান্তরে ধনী গরিবের বৈষম্য ব্যাপকভাবে তৈরি করছে।
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মনিনুর রশীদ বলেন, শিক্ষার মান বৃদ্ধির বিষয়টি নির্ভর করে ভালো শিক্ষক, মানসম্মত কারিকুলাম, প্রয়োজনীয় বাজেট, ফ্যাসিলিটিজ এবং উপযুক্ত পরিবেশসহ অনেক কিছুর ওপর। এসব ইন্ডিকেটরের ভিত্তিতে শিক্ষার মান স্থানীয় কিংবা বৈশ্বিক দৃষ্টিকোণ থেকে বিবেচনা করা যেতে পারে।
তিনি বলেন, ক্যাডেট স্কুল বা কলেজের সুযোগ-সুবিধা, প্রশাসনিক মডেল, ফান্ডিং সবকিছুই ভালো। সেখানে মনিটরিং আছে, জবাবদিহি ও সবকিছুতে স্বচ্ছতা আছে।
এ শিক্ষাবিদের মতে, তারা যেকোনো মূল্যে কোয়ালিটি নিশ্চিত করছে। কিন্তু তার বিপরীতে সরকারি বা বেসরকারি মাধ্যমিক বা সরকারি মাধ্যমিকে কিংবা মাদরাসায় ওই ধরনের শিক্ষক, ফান্ডিং, জবাবদিহি, রিসোর্স, ল্যাব ফ্যাসিলিটিজ নেই। একইভাবে, দেশ একটি হলেও শহর-গ্রাম বেসিসেও শিক্ষার মানে তারতম্য রয়েছে। তিনি আরও বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে শিক্ষকদের বেতনকাঠামো কেমন, জবাবদিহি আছে কিনা, তারা ঠিকঠাক ক্লাসে যান কিনা, পড়ান কিনা, তাদের মনিটরিং আছে কিনা, শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুযোগ-সুবিধা কেমনÑ এসব শর্ত বিবেচনায় এলে শিক্ষার মান আমাদের দেশে ভালো হচ্ছে না। এ শিক্ষাবিদ মনে করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় জবাবদিহির পর্যাপ্ত অভাব রয়েছে। তিনি বলেন, যারা জবাবদিহিত নিশ্চিত করবে তাদের অনেকেই হয়তো জবাবদিহির বাইরে আছেন।
ঢাবির এ শিক্ষক বলেন, গ্লোবাল কন্টেক্সট অনুযায়ী বিবেচনা করলে দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষার মান আশপাশের দেশের তুলনায় কম। কারণ একটা সময় ছিল এ প্লাসের সংখ্যা বাড়ানোর প্রতিযোগিতা। কিন্তু এটা বিবেচ্য যে, আমি যাকে যে মার্ক দিচ্ছি, সেটার যোগ্য সে কিনা। আমরা আমাদের দেশের এসএসসি, এইচএসসি কিংবা এ এবং ও লেভেলের গ্রহণযোগ্যতা গ্লোবাল লেভেলে আছে কী? অনেক সময় এর জবাবে আসবে ‘নেই’। কারণ এগুলো গ্লোবাল স্ট্যান্ডার্ড মেইনটেইন করতে পারেনি। সুতরাং শিক্ষায় গ্লোবালি স্ট্যান্ডার্ডারাইজ করার বিষয়ে আমাদের ভাবতে হবে।
বৈষম্যের বীজ প্রাথমিকেই
বার্ষিক প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিসংখ্যান ২০২৪ অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান আছে অন্তত ১১ ধরনের। ধরনভেদে প্রতিষ্ঠানগুলোর কারিকুলাম বা শিক্ষাক্রমেও রয়েছে ভিন্নতা। সরকারিভাবে স্বীকৃত বা স্বীকৃতিহীন মিলিয়ে বাংলাদেশে প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় কারিকুলাম চালু আছে অন্তত পাঁচ রকমের। জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০-এ প্রাথমিক পর্যায়ে একই ধরনের কারিকুলামের আওতায় একমুখী শিক্ষা ব্যবস্থা প্রচলনের কথা বলা হলেও দেড় যুগেও তা বাস্তবায়ন করা যায়নি। দেশে বর্তমানে প্রাথমিক পর্যায়ে যেসব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্যগুলো হলোÑ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, উচ্চ বিদ্যালয়সংলগ্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়, এবতেদায়ি মাদরাসা, উচ্চ মাদরাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদরাসা, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, এনজিও পরিচালিত শিক্ষা কেন্দ্র, শিশু কল্যাণ ট্রাস্ট স্কুল, কওমি মাদরাসা ও ইংরেজি মাধ্যম বিদ্যালয়। এর মধ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের সঙ্গে সংযুক্ত প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোয় পুরোপুরি সরকারি কারিকুলামকেই অনুসরণ করা হয়। এ কারিকুলাম সাধারণ শিক্ষা কারিকুলাম নামেও পরিচিত। বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কিন্ডারগার্টেন, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়গুলোয় সাধারণ শিক্ষা কারিকুলামে নির্ধারিত পাঠ্যপুস্তকের পাশাপাশি বেশকিছু অতিরিক্ত বিষয়ও পড়ানো হয়। এবতেদায়ি মাদরাসা এবং উচ্চ মাদরাসাসংলগ্ন এবতেদায়ি মাদরাসায় অনুসরণ করা হয় সরকার নির্ধারিত পৃথক কারিকুলাম। এ কারিকুলাম সাধারণ মাদরাসা কারিকুলাম নামে পরিচিত, যেখানে ধর্মীয় শিক্ষায় বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়। আর কওমি মাদরাসা ও ইংরেজি মাধ্যমের বিদ্যালয়গুলোয় সম্পূর্ণ নিজস্ব কারিকুলাম অনুসরণ করা হয়। এ দুই ধরনের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মূল্যায়ন পদ্ধতিও পুরোপুরি আলাদা। কওমি মাদরাসায় কুরআন ও হাদিস শিক্ষায় জোর দেয়া হয় সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোয় অনুসরণ করা হয় বিদেশি কারিকুলাম। শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ পার্থক্যের কারণে শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক পর্যায় শেষে অর্জিত জ্ঞান ও দক্ষতার স্তরে পার্থক্য তৈরি হচ্ছে। এছাড়া সামাজিক বৈষম্যও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা (বাধ্যতামূলককরণ) আইন, ১৯৯০-এর মাধ্যমে পঞ্চম শ্রেণি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক ও অবৈতনিক করা হলেও প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পড়েন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে। প্রতিষ্ঠানভেদে এসব বিদ্যালয়ে সরকারি বিদ্যালয়ের তুলনায় ন্যূনতম দ্বিগুণ থেকে কয়েকগুণ বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। শিক্ষায় বিনিয়োগেও বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দেশের তালিকায় রয়েছে। ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী, শিক্ষা খাতে জিডিপির ৬ শতাংশ বরাদ্দের কথা থাকলেও ধারাবাহিকভাবে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশের আশপাশে বরাদ্দ দেয়া হচ্ছে। বিনিয়োগের এ ঘাটতির প্রভাব পড়ছে প্রাথমিকসহ শিক্ষার সর্বস্তরেই। দক্ষ প্রশিক্ষিত শিক্ষক ও সুযোগ-সুবিধার সংকটে মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এমনিক অনেক ক্ষেত্রে মানের অবনমন ঘটছে। জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী এখনো প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের বড় অংশই শ্রেণি অনুযায়ী কাক্সিক্ষত মানের দক্ষতা অর্জন করতে পারে না। আর প্রাথমিক স্তর থেকে যে ঘাটতি তৈরি হয়, তাদের এ ঘাটতি ওপরের শ্রেণিগুলোয় গিয়ে আরো বৃদ্ধি পায়। তবে প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য অর্জনও রয়েছে। বিগত কয়েক দশকে সাক্ষরতার হার, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এসব খাতে সরকারের পাশাপাশি অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বেসরকারি সংস্থাগুলো।
গতানুগতিক পড়াশোনায় শিক্ষার মান তলানিতে
দেশে শিক্ষার মান ক্রমে নিচের দিকে নামছে। শিক্ষার্থীদের পাঠ দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান ও বাস্তব প্রয়োগ ক্ষমতায় বড় ধরনের ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিভিন্ন অঙ্গনে বাংলাদেশের ডিগ্রির মান অবনমনেরও খবর আসছে।
বিশ্বব্যাংকের চলতি বছরের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের শিক্ষার মান নিয়ে বলা হয়, একটি শিশু ১৮ বছর বয়সে সাধারণত ১১ বছর মেয়াদি আনুষ্ঠানিক শিক্ষা সম্পন্ন করে (প্রথম শ্রেণি থেকে একাদশ শ্রেণি)। কিন্তু বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা শেখার মান বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ৬.৫ বছরের সমতুল্য। অর্থাৎ শিক্ষায় আন্তর্জাতিক মানে বাংলাদেশ অন্তত ৪.৫ বছর পিছিয়ে। সেক্ষেত্রে দেশের একাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে সপ্তম শ্রেণির সমান, যা শিক্ষার গুণগত দুর্বলতার বড় প্রমাণ।
সাম্প্রতিক বিভিন্ন সমীক্ষায় দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী পাঠ্যবই ঠিকভাবে পড়তে পারে না। মাধ্যমিক পাস করেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী আমাদের শিক্ষার্থীরা সাড়ে চার বছরের শিখন ঘাটতিতে রয়েছে। বিশ্ব র্যাংকিংয়ে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভালো জায়গা করে নিতে পারছে না। দেশে ১৭ বছর ধরে সৃজনশীল শিক্ষা পদ্ধতি চললেও সৃজনশীল ইনডেক্সে বাংলাদেশের অবস্থান একেবারে তলানিতে। এমনকি দেশে যত বেকার, এর ১৩ শতাংশই স্নাতক।
যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ২০২২ সালে একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে, শিক্ষার গুণগতমান কমে যাওয়া দেশের মধ্যে রয়েছে বাংলাদেশ, ভারত ও নাইজেরিয়া এবং বেড়েছে পেরু, ইন্দোনেশিয়া ও ভিয়েতনামের। এর মধ্যে ভিয়েতনামের অবস্থা সবচেয়ে ভালো। প্রাথমিক শিক্ষায় বাংলাদেশ ভিয়েতনামের চেয়ে অনেক পিছিয়ে।
শিক্ষাবিদদের মতে, শিক্ষক সংকট, প্রশিক্ষণের ঘাটতি, মানসম্মত পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন না করা, শিক্ষাঙ্গণে অস্থিরতা এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে শিক্ষার মান তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। বিশেষ করে প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা ও দক্ষতাভিত্তিক পাঠদান প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ পিছিয়ে থাকায় শিক্ষার্থীরা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। তারা সতর্ক করেছেন, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে দীর্ঘমেয়াদে দেশের মানবসম্পদ উন্নয়ন কঠিন হয়ে পড়বে।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এস এম এ ফায়েজ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘শিক্ষার মানের দিক দিয়ে আমরা খুব একটা এগোতে পারছি না। প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষকদের যে বেতন দেওয়া হয়, তা খুবই কম। ফলে মেধাবীরা শিক্ষকতায় আসছে না। তাই শিক্ষার মান বাড়াতে এ খাতের বাজেটও অনেক বাড়ানো উচিত।’ ইউজিসির তথ্যানুযায়ী, বর্তমানে দেশে সরকারি-বেসরকারি মোট বিশ্ববিদ্যালয় ১৭২টি। এর মধ্যে সরকারি ৫৬টি আর বেসরকারি ১১৬টি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা ও গবেষণা সংস্থা কোয়াককোয়ারেলি সায়মন্ডস (কিউএস) প্রকাশিত ২০২৫ সালের বিশ্ববিদ্যালয় র্যাংকিং অনুযায়ী, বিশ্বের সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠানই স্থান পায়নি। যুক্তরাজ্যভিত্তিক শিক্ষা সাময়িকী টাইমস হায়ার এডুকেশন ‘ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটি র্যাংকিং ২০২৫’-এ সেরা ৫০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেও বাংলাদেশের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় নেই।
২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফলেও শিক্ষার মানের একটা চিত্র বেরিয়ে আসে। ওই শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান ইউনিটে অংশ নেওয়া শিক্ষার্থীদের ৯৪ শতাংশ অকৃতকার্য। কলা, আইন ও সামাজিক বিজ্ঞান ইউনিটেও ৯০ শতাংশের বেশি ভর্তিচ্ছু ফেল করেছেন। এই দুই ইউনিটের পরীক্ষায় এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ-৫ পাওয়া এক লাখ ২১ হাজার শিক্ষার্থী পাস করতে পারেননি।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের ২০২২ সালের সর্বশেষ প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, ২০২২ সালে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৫১ শতাংশ বাংলায় ও ৩৯ শতাংশ গণিতে শ্রেণি বিবেচনায় প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জন করেছে। পঞ্চম শ্রেণির ক্ষেত্রে বাংলায় এ হার ৫০ ও গণিতে ৩০ শতাংশ। অর্থাৎ প্রাথমিক শিক্ষা শেষে মাতৃভাষা বাংলায়ই অর্ধেক শিক্ষার্থী দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের মনিটরিং অ্যান্ড ইভ্যালুয়েশন বিভাগের সর্বশেষ ২০২৩ সালের প্রতিবেদনেও মাধ্যমিক শিক্ষার্থীদের দুর্বলতার চিত্র উঠে আসে। প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, ষষ্ঠ শ্রেণিতে ৬১ শতাংশ শিক্ষার্থীর ইংরেজিতে অবস্থা খারাপ। একই শ্রেণিতে গণিতে ৪৩ শতাংশের অবস্থা খারাপ। অষ্টম শ্রেণিতে ইংরেজিতে ২৮ শতাংশ মোটামুটি ভালো, অন্যরা নানা স্তরে রয়েছে। ওই শ্রেণিতে গণিতে ৩৬ শতাংশ মোটামুটি ভালো অবস্থায় আছে। সার্বিক এ পরিস্থিতি উন্নতির আশু কোনো লক্ষণও দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।