উজানের ঢল-অতিবর্ষণে প্লাবিত বিস্তীর্ণ এলাকা ফসলের ব্যাপক ক্ষতি


৬ মে ২০২৬ ১৮:২৫

স্টাফ রিপোর্টার : এপ্রিলের শেষ দিকে অতিবর্ষণ, উজানের ঢল, পাহাড়ি নদীগুলো উপচে পড়ায় প্লাবিত হয়েছে হাওরের বিস্তীর্ণ এলাকার ফসল। অনেক কৃষকই ধান কাটব কাটব করে সময় গুনছিলেন। এমন সময় এলো বিপর্যয়। এই বৃষ্টি শুধু হাওরের জেলাগুলোর ধানের ক্ষতি করেই ক্ষান্ত হয়নি। দেশের বিভিন্ন স্থানে তরমুজ, মুগডাল, বাদাম এবং সূর্যমুখীসহ নানা ফসলেরও ক্ষতি করেছে। ক্ষতির সীমা ছড়িয়েছে দক্ষিণ উপকূলীয় অঞ্চল, দক্ষিণ-পূর্ব; এমনকি উত্তরের কোনো কোনো জেলায়ও। কৃষিবিদ, আবহাওয়াবিদ, পানিবিশেষজ্ঞ এবং জলবায়ুবিশারদরা ফসলের এই ক্ষতির জন্য দুষছেন এপ্রিলের অকাল বৃষ্টিকে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, ২০১৭ সালের পর দেশে এপ্রিল মাসে এত বৃষ্টি আর হয়নি। দেশের সবচেয়ে উষ্ণ মাস এপ্রিল। এ মাসে গড় তাপমাত্রা থাকে ৩৩ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। তবে এবার এপ্রিল মাসে সর্বোচ্চ ও গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিক থেকে যথাক্রমে শূন্য দশমিক ৬ ডিগ্রি এবং শূন্য দশমিক ১ ডিগ্রি সেলসিয়াস কম থেকেছে। মাসের শুরুতে তাপপ্রবাহ শুরু হলেও দুই দিনের মধ্যেই তা কমে যায়। তারপর বৃষ্টি শুরু হয় প্রথম সপ্তাহেই। দ্বিতীয় সপ্তাহের পর আবার তাপপ্রবাহ শুরু হলে তা টেকে সাত দিনের মতো। তাও দেশের সর্বত্র তা থাকেনি। সর্বোচ্চ ২২টি জেলায় তাপপ্রবাহ ছিল। মাসের শেষ দিকে আবার বৃষ্টি শুরু হয়। এখন এই মে মাসেও সেই বৃষ্টির রেশ রয়ে গেছে।
গত কয়েকদিনের টানা বর্ষণে আবারও বিপর্যস্ত দেশের হাওরাঞ্চল। সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোণা, হবিগঞ্জ, সিলেট, মৌলভীবাজার ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিস্তীর্ণ হাওরাঞ্চলের পাকা ও আধাপাকা বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, হাওরাঞ্চলের সাত জেলায় এখনো প্রায় এক লাখ ৭২ হাজার ৯৫৮ হেক্টর জমির অধিকাংশ ধান পানির নিচে, যা মোট আবাদের অন্তত ৩৮ শতাংশ। ফলে যখন কৃষকের মুখে হাসি থাকার কথা তখন চেহারা মলিন থাকছে।
বেতাগীতে টানা বর্ষণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি
উপকূলীয় জনপদ বরগুনার বেতাগীতে টানা বৃষ্টিপাতের কারণে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। গত কয়েকদিন ধরে অবিরাম বর্ষণে মাঠের ফসল পানির নিচে তলিয়ে গেছে, ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে এই উপজেলায় সাত হাজার হেক্টর জমিতে বোরো ধান ও শাকসবজি চাষ করা হয়েছে। টানা বর্ষণে মাঠের ফসল পচতে শুরু করেছে। খবর নিয়ে জানা গেছে, অনেক মাঠে পানি জমে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং এসব ফসলের মাঠ থেকে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, গত সপ্তাহ ধরে শুরু হওয়া টানা বৃষ্টিতে আমন ধান, শাকসবজি, মুগডাল, বাদাম, মরিচসহ বিভিন্ন মৌসুমি ফসল সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। অনেক ক্ষেতেই জমিতে পানি জমে থাকায় গাছ পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কৃষকরা বলছেন, ‘গত কয়েকদিন বৃষ্টি অব্যাহত থাকার কারণে ক্ষতির পরিমাণ বেড়েছে। বিশেষ করে মুগডাল ও বাদাম পচে যাবে।’
নেত্রকোণায় বৃষ্টি-ঢলের পানিতে ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি
অতিবৃষ্টি আর পাহাড়ি ঢলে নেত্রকোণার হাওর অঞ্চলসহ ১০ উপজেলার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এর মধ্যে প্রাথমিক হিসেবে ২২ হাজার ৩৪৮ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। প্রাথমিক জরিপে অন্তত ৬৯ হাজার ৬৯৮ জন কৃষকের ৩১৩ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা প্রশাসন। স্থানীয় জেলা প্রশাসন ও কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, প্রাথমিক জরিপে জেলার কলমাকান্দায় ১৪ হাজার ৬৭৫টি পরিবারের সাত হাজার ২৫০ হেক্টর, খালিয়াজুরীতে ১৫ হাজার ১৩৩টি পরিবারের ছয় হাজার ২০০ হেক্টর, মদনে আট হাজার ৪৭০টি পরিবারের তিন হাজার ৮৫০ হেক্টর, সদরের তিন হাজার ৯৬৫টি পরিবারের ৪৯৫ হেক্টর, বারহাট্টায় তিন হাজার ৩৬৫টি পরিবারের ৫৮২ হেক্টর, কেন্দুয়ায় ৯ হাজার ৩৪০টি পরিবারের এক হাজার ৩১০ হেক্টর, আটপাড়ায় সাত হাজার ৫৫০টি পরিবারের এক হাজার ৬০০ হেক্টর, মোহনগঞ্জে তিন হাজার ৫০০টি পরিবারের ৪৩৪.৫ হেক্টর, পূর্বধলায় এক হাজার ২৫০টি পরিবারের ৩০০ হেক্টর ও দুর্গাপুরে দুই হাজার ৪৫০টি পরিবারের ৩২৭ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতি হয়েছে। যার বাজারমূল্য প্রায় ৩১৩ কোটি টাকা। তবে স্থানীয়রা জানিয়েছেন, ক্ষতির পরিমাণ এর কয়েকগুণ বেশি। প্রকৃত তথ্য কৃষি বিভাগের জরিপে উঠে আসেনি। পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) সূত্রে জানা গেছে, নেত্রকোণায় এবছর ৩১ কোটি টাকা ব্যয় ধরে ১৩৮ কিলোমিটার ফসলরক্ষা বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ বাঁধের ওপর কৃষকদের প্রায় ৪২ হাজার হেক্টর জমির বোরো ধান নির্ভর করে। সেখান থেকে ধান উৎপাদন হয় প্রায় তিন লাখ টন। এ ধানের ওপরই হাওরের কৃষকদের সন্তানদের লেখাপড়াসহ সারা বছরের সংসার খরচ নির্ভর করে। তাই ফসল হারানোর আশঙ্কা মানেই তাদের জীবনে নেমে আসে অনিশ্চয়তা। এবার অতিবৃষ্টি বা পাহাড়ি ঢলে জেলার ছোট-বড় সব নদনদীর পানি বাড়লেও কোনো বেড়িবাঁধ ভাঙার ঘটনা ঘটেনি। সব পানিই বৃষ্টির কারণে জমাটবদ্ধ।
চলনবিলে টানা বৃষ্টি ও ঢলের পানিতে ফসলের ক্ষতি
নাটোরের সিংড়া উপজেলার চলনবিল অঞ্চলে বোরো ধান কাটার ভরা মৌসুমে হানা দিয়েছে আগাম বন্যা ও প্রতিকূল আবহাওয়া। কয়েকদিনের টানা বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা ঢলে আত্রাই নদীর পানি দ্রুত বৃদ্ধি পাওয়ায় চলনবিলের সিংড়ার শতশত কৃষকের ‘সোনার ফসল’ এখন হুমকির সম্মুখীন। খবর নিয়ে জানা গেছে, মাঠের পর মাঠ ফসল বাঁচাতে নিরুপায় কৃষকরা এখন প্রকৃতির সঙ্গে এক অসম ও মরণপণ যুদ্ধে নেমেছেন। এ বছর সিংড়া উপজেলায় প্রায় ৩৬ হাজার ৬১০ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হলেও এখন পর্যন্ত মাত্র ১৫ শতাংশ ধান কাটা সম্ভব হয়েছে। সিংড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য দেখা গেছে। একদিকে নদীর পানি বিলে প্রবেশ করছে; অন্যদিকে সেই পানি ঠেকাতে স্থানীয় জনতা ও কৃষকরা একতাবদ্ধ হয়ে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করছেন। পুরুষদের পাশাপাশি ধান কাটতে কাজ করছে মহিলারাও। সরকারি সহায়তার অপেক্ষায় বসে না থেকে গ্রামবাসী ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের পকেটের টাকা দিয়ে বালুর বস্তা সংগ্রহ করে এক রকম ফসল বাঁচানোর যুদ্ধে নেমেছেন।
বাগেরহাটে অতিবৃষ্টিতে নষ্ট হচ্ছে ক্ষেতের ফসল
বাগেরহাটে বোরো মৌসুমের শেষ সময়ে টানা ভারী বৃষ্টি, বজ্রপাত ও রোদহীন আবহাওয়ায় চরম বিপাকে পড়েছেন হাজারো কৃষক। বৃষ্টির পূর্বাভাস পেয়ে আগাম ধান কাটা শুরু করলেও হঠাৎ টানা তিন দিনের অতিবৃষ্টিতে শেষ রক্ষা হয়নি। জেলার ৬৮ হাজার ১৭১ হেক্টর জমিতে আবাদ হওয়া বোরো ধানের বড় একটি অংশ এখনো মাঠে আছে। কোথাও কাটা ধান ভিজে নষ্ট হয়েছে, কোথাও জমিতে পানিতে তলিয়ে গেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার মাঠের খবর নিয়ে জানা গেছে, অনেক কৃষক বৃষ্টির আগে ধান কাটলেও রোদের অভাবে তা শুকাতে পারছেন না। আবার যারা ধান কাটতে পারেননি, তাদের ক্ষেতেই জমেছে বৃষ্টির পানি। এতে ধান ঝরে পড়া, পচন ধরা ও উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
ঝালকাঠিতে ঝড়-বৃষ্টিতে পাকা ধানের ক্ষতি
ঝালকাঠিতে কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে পাকা বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে, কোথাও হেলে পড়েছে পাকা ধান। এতে মৌসুমের শেষ সময়ে ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। ঝালকাঠিতে কালবৈশাখী ঝড় ও টানা বৃষ্টিতে পাকা বোরো ধানের ক্ষতি হয়েছে। অনেক এলাকায় ধানক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে, কোথাও হেলে পড়েছে পাকা ধান। এতে মৌসুমের শেষ সময়ে ক্ষতির শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকরা। চলতি মৌসুমে জেলায় ১৩ হাজার ৮২৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত মাত্র ৬৯২ হেক্টরের ধান কাটা সম্পন্ন হয়েছে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মো. রিয়াজ উল্লাহ বাহাদুর জানান, বর্তমানে জেলায় ৯টি কম্বাইন হারভেস্টার দিয়ে ধান কাটা চলছে এবং দ্রুত ফসল ঘরে তুলতে কৃষকদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
নান্দাইলে বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে গেছে কৃষকের ফসল
ময়মনসিংহের নান্দাইলে অতিবৃষ্টি এবং অপরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার কারণে কয়েকশ’ হেক্টর জমির পাকা বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। বিল ও হাওর অঞ্চলে কৃষকের হাড়ভাঙা খাটুনির সোনালি ফসল এখন পানির নিচে, যা দেখে দিশেহারা হয়ে পড়েছেন সাধারণ কৃষকরা। স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিতভাবে পুকুর খনন, খাল দখল এবং পানি প্রবাহের পথ বন্ধ করে বাড়িঘর নির্মাণই এই অকাল বন্যার প্রধান কারণ। উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, চলতি বছর নান্দাইলের ১৩টি ইউনিয়ন ও নান্দাইল পৌর এলাকার মোট ২২ হাজার ২৯৫ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ করা হয়েছে। তবে সাম্প্রতিক টানা বর্ষণে নিম্নাঞ্চলগুলোয় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে প্রায় ৯০০ হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ২৭০ হেক্টর জমির পাকা ও আধাপাকা ধান সম্পূর্ণ পানির নিচে তলিয়ে গেছে। প্রতিকূল আবহাওয়া এবং শ্রমিক সংকটের মাঝেও কৃষকরা মরিয়া হয়ে আধাপাকা ধান কেটে ঘরে তোলার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে।