রূপপুরের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বল

পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশ


৩০ এপ্রিল ২০২৬ ১৩:৫৯

স্টাফ রিপোর্টার : রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম অ্যাসেম্বল করার মধ্য দিয়ে পারমাণবিক জ্বালানি ব্যবহারকারী দেশ হিসেবে বিশ্বের তালিকায় নাম লেখাল বাংলাদেশ। এ যাত্রা সহজ নয়, অনেক প্রক্রিয়ায় বেশকিছু ধাপ পার করতে হবে পারমাণবিক এ কেন্দ্র থেকে বিদ্যুৎ পেতে। আগামী আগস্ট পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতে পারে বাংলাদেশকে।
কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে গত ২৮ এপ্রিল মঙ্গলবার পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুল্লিতে ইউরেনিয়াম বা পারমাণবিক জ্বালানি লোড (চুল্লিপাত্রে প্রবেশ করানো) শুরু হয়েছে। চুল্লিতে জ্বালানি অ্যাসেম্বল করার মধ্য দিয়ে ‘রূপপুর থেকে রূপান্তর’ এই স্লোগানে বাংলাদেশের পারমাণবিক জ্বালানি শক্তি ব্যবহারের যাত্রা শুরু হলো। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চুল্লিপাত্রে জ্বালানি প্রবেশ করানো শেষে বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রক্রিয়া শেষ করতে সাড়ে তিন মাস সময় লাগতে পারে। এর মধ্য দিয়ে শুরু হবে পরীক্ষামূলক বিদ্যুৎ উৎপাদন। এতে করে আগামী আগস্টের শেষ দিকে জাতীয় গ্রিডে আসতে পারে ৩০০ মেগাওয়াট পারমাণবিক বিদ্যুৎ। তবে সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বাণিজ্যিকভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হতে পারে ২০২৭ সালের মার্চ বা এপ্রিলে।
দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় একক প্রকল্প রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র। এ বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন পরমাণু শক্তি কমিশন। এ প্রকল্পের আওতায় ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াটের দুটি ইউনিট নির্মাণ করছে রাশিয়ার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অ্যাটমস্ট্রয় এক্সপোর্ট। প্রকল্পে প্রায় ৫ হাজার বিদেশিসহ ৩০ হাজার কর্মী দিন-রাত কাজ করছেন।
জ্বালানি প্রবেশ কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিমন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম। এছাড়া প্রকল্পটির সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানী, প্রকৌশলী, কলাকুশলীসহ চার শতাধিক অতিথি উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে প্রযুক্তিমন্ত্রী, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টাসহ অতিথিরা বোতাম চেপে ফুয়েল লোডিং শুরু করেন।
অনলাইন অনুষ্ঠানে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রসি যুক্ত হয়ে বাংলাদেশকে অভিনন্দন জানান। তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা শুরু থেকেই বাংলাদেশের পারমাণবিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত রয়েছে এবং নিরাপদ ও সুরক্ষিত প্রকল্প বাস্তবায়নে সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে।
কেন্দ্রটি চালু হলে এর স্বাভাবিক আয়ুষ্কাল হবে ৬০ বছর। এই সময়জুড়ে পাওয়া যাবে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ। তবে প্রয়োজনীয় মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ সাপেক্ষে আরও ৩০ বছর পর্যন্ত কেন্দ্রটির আয়ু বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সব মিলিয়ে ৯০ বছর পর্যন্ত সেবা দিতে পারে এই কেন্দ্র।
প্রথম ইউনিটের পারমাণবিক চুল্লিতে বিক্রিয়ার জন্য প্রয়োজন ১৬৩টি ইউরেনিয়াম বান্ডেল। প্রতিটি বান্ডেলে রয়েছে ১৫টি করে ইউরেনিয়াম প্লেটসমৃদ্ধ রড। দুই বছর আগেই বাংলাদেশ ১৬৮টি বান্ডেল সংগ্রহ করেছে। ১৬৩টি চুল্লিতে ব্যবহার হবে। আর বাকি ৫টি থাকবে সংরক্ষণে।
প্রকল্প সূত্রে জানা যায়, সব বান্ডেল চুল্লিতে স্থাপন করতে সময় লাগবে ৪০ থেকে ৪৫ দিন। এরপর নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় উৎপন্ন তাপে পানি বাষ্পে পরিণত হবে, সেই বাষ্প টারবাইন ঘুরিয়ে তৈরি করবে বিদ্যুৎ।
একবার জ্বালানি লোড করলে তা দিয়ে চলবে টানা দেড় বছর। ফলে তেল, গ্যাস বা কয়লার মতো নিয়মিত জ্বালানি কেনার ঝামেলা থাকবে না। দেড় বছর পর পুরো জ্বালানি একসঙ্গে পরিবর্তন না করে এক-তৃতীয়াংশ করে বদলালেই চলবে।
জ্বালানি লোডিংয়ের পরেও শতাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা সম্পন্ন করতে হবে। সব ধাপ সফলভাবে পার হলে কয়েক মাস পর ধাপে ধাপে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ যুক্ত হবে। রূপপুরের দুটি ইউনিটের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট।
উল্লেখ্য, ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত ছিল রূপপুর প্রকল্পের মেয়াদ। মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৮ সালের জুন পর্যন্ত নির্ধারণ করেছে সরকার। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুসারে মেয়াদ বাড়লেও প্রকল্পের খরচ বাড়ানোর সুযোগ নেই। কিন্তু ডলারের দাম বাড়ায় ২৬ হাজার কোটি টাকা খরচ বেড়েছে প্রকল্পের। সে হিসাবে ১ লাখ ৩৮ হাজার ৬৮৬ কোটি টাকা খরচ হবে রূপপুর বিদ্যুৎকেন্দ্রে।