তীব্র জ্বালানি সংকটে দেশ


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৪:০০

রাজধানীসহ দেশের অধিকাংশ পাম্পে তেল নেই
রেকর্ড ভেঙে এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি
বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি করতে উচ্চপর্যায়ের কমিটি

স্টাফ রিপোর্টার : সরকার বলছে, জ্বালানি সংকট নেই। পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে। অথচ দেশের ১০ শতাংশ পাম্পে নেই অকটেন, পেট্রোল ও ডিজেল। গ্যাস সংকটও তীব্র। সংকটের মধ্যে এক লাফে ভোক্তাপর্যায়ে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাসের (এলপিজি) দাম ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম বাড়িয়ে দেওয়া হয় ৩৮৭ টাকা। দেশের ইতিহাসে এক লাফে এত টাকা বৃদ্ধির কোনো নজির নেই। ১২ কেজির সিলিন্ডারের নতুন দাম হয়েছে ১ হাজার ৭২৮ টাকা। গত মাসে দাম ছিল ১ হাজার ৩৪১ টাকা। অন্যদিকে বিদ্যুতের মূল্য বাড়াতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে ৬ সদস্যের একটি কমিটিও গঠিত হয়েছে। এমনিতেই জ্বালানি সংকট তীব্র, এলপিজির মূল্যবৃদ্ধি, এখন আবারও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির উদ্যোগে পুরো জাতি সরকারের ওপর ক্ষুব্ধ। এদিকে দেশের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি পিএলসি লিমিটেড (ইআরএল) ক্রুড অয়েলের তীব্র সংকটের কারণে সাময়িকভাবে বন্ধ ঘোষণা করেছে কর্তৃপক্ষ। গত ১৩ এপ্রিল সোমবার বিকেলে ইআরএলে সর্বশেষ পরিশোধন কার্যক্রম পরিচালিত হয় বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। তারা জানান, চলমান সংকট মোকাবিলায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত সব ধরনের বিকল্প উৎস ব্যবহার করা হয়েছে। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্রে জানা গেছে, দেশে বছরে মোট ৬৫ থেকে ৬৮ লাখ টন জ্বালানি তেল আমদানি করা হয়। এর মধ্যে প্রায় ১৫ লাখ টন অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে আনা হয়, যা ইআরএলে পরিশোধনের মাধ্যমে বাজারে সরবরাহ করা হয়। শেষ পর্যন্ত সেটিও বন্ধ হয়ে গেল।
টানা এক মাসেরও বেশি সময় ধরে দেশে জ্বালানি সংকট চলছে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বহু পাম্পে ‘পেট্রোল নেই, অকটেন নেই, জ্বালানি নেই’- এমন স্টিকার বা সাইনবোর্ড ঝুলছে। যেসব পাম্পে জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে দীর্ঘ লাইন দেখা যাচ্ছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে দুইশ’ থেকে সর্বোচ্চ পাঁচশ’ টাকার পেট্রোল বা অকটেন পাওয়া যায়। অনেক ক্ষেত্রে লাইনের একেবারে পেছনে দিকে থাকা চালকরা জ্বালানি পাচ্ছেন না। কারণ পাম্পে থাকা জ্বালানি শেষ হয়ে যাওয়া অথবা পাম্প মালিক ইচ্ছে করেই বিক্রি বন্ধ করে দিচ্ছেন। এদিকে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দায়িত্বশীল মন্ত্রীরা বলছেন, দেশে পর্যাপ্ত জ্বালানি মজুদ রয়েছে, কোনো সংকট নেই। সংকট হতে পারে সেই আশঙ্কায় অনেকে বেশি কিনে রাখছেন, তাই বিক্রির চাপ বেড়েছে। তাছাড়া অনেক অসাধু পাম্প মালিক অবৈধভাবে মজুদ করার কারণেও সংকট দৃশ্যমান হচ্ছে। কেউ কেউ বাড়তি দামে বিক্রির জন্য কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করছে। ফলে দেশে জ্বালানির প্রকৃত অবস্থার চাইতে সংকট বেশি দেখা যাচ্ছে।
রাজধানীর যেকোনো পেট্রোলপাম্পে চোখ রাখলে দেখা যাবে দুই ধরনের দৃশ্য। একটি হচ্ছে, জ্বালানি নেওয়ার দীর্ঘ লাইন, অন্যটি জ্বালানি নেই স্টিকার বা সাইনবোর্ড। এর বাইরে অন্য কোনো দৃশ্য দেখা যাবে না। অর্থাৎ যেই স্টেশনে জ্বালানি রয়েছে সেখানে দীর্ঘ লাইনও রয়েছে। রাজধানীর রমনা পেট্রোলপাম্পে পেট্রোল বিক্রির সময় প্রতিদিনই দীর্ঘ লাইন তৈরি হচ্ছে। সরবরাহ চলমান থাকা সাপেক্ষে পাম্প কর্তৃপক্ষ সব ধরনের জ্বালানি বিক্রি করেন। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র মৎস্য ভবন মোড়ে রমনা ফিলিং স্টেশন। জনশ্রুতি রয়েছে এই স্টেশনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কেউ অবৈধ মজুদ করেন না। জ্বালানি থাকা পর্যন্ত তারা বিক্রি কার্যক্রম অব্যাহত রাখেন। সরকার নির্ধারিত মূল্যের চাইতে বেশি মূল্য নেওয়ার অভিযোগও নেই এই স্টেশন কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এই ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা যায়, তাদের কাছে কোনো ধরনের জ্বালানি নেই। কিন্তু ব্যক্তিগত গাড়ির রয়েছে দীর্ঘ লাইন। মৎস্য ভবন সংলগ্ন সেই ফিলিং স্টেশন থেকে জ্বালানি নিতে প্রাইভেট কারের লাইন শিল্পকলা একাডেমি সড়ক অতিক্রম করে সেগুনবাগিচা হয়ে বারডেম-২ পার হয়ে জাতীয় প্রেস ক্লাবের বিপরীতে প্রধান সড়ক পর্যন্ত ঠেকেছে। পরবর্তীতে এই লাইন আরও কত লম্বা হয়েছে, তা জানা যায়নি। লাইনে থাকা সবাই জ্বালানি পাবেন কিনা, তার কোনো নিশ্চিয়তা ছাড়াই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করছিলেন গাড়ি চালকরা। একই সময় স্টেশন কর্তৃপক্ষের একজন স্টাফকে মাইকিং করতে দেখা গেছে। তিনি বলছিলেন, পাম্পে এখন কোনো ধরনের জ্বালানি নেই, তবে জ্বালানি এলে বিক্রি শুরু করা হবে।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মাতুয়াইলে ‘আসমা আলী সিএনজি রি-ফুয়েলিং অ্যান্ড ওয়ার্কশপ লিমিটেড, রাজধানী ফিলিং স্টেশন ও ‘মুক্তি ফিলিং স্টেশন’-এ জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে না। এখানেও মোটরসাইকেল, বাস-ট্রাক, পিকআপ, প্রাইভেট কারসহ বিভিন্ন যানবাহন অপেক্ষমাণ থাকলেও জ্বালানি পাচ্ছে না। এ প্রতিবেদক ঢাকার একাধিক ফিলিং স্টেশনে ঘুরেও জ্বালানি তেল পাননি। চার ঘণ্টা অপেক্ষা করে জ্বালানি না পেয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জসিম উদ্দিন। তিনি বলেন, প্রতিদিন প্রায় দুই লিটার তেল দরকার হয় তার, কিন্তু তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে থেকেও জ্বালানি পাচ্ছেন না।
সরকারের পক্ষ থেকে সবসময়ই বলা হচ্ছে জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই। পর্যাপ্ত জ্বালানি রয়েছে, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হচ্ছে। কিন্তু সরকারের বক্তব্য ও ফিলিং স্টেশনগুলোর বাস্তব চিত্র ভিন্ন। দেশের অধিকাংশ স্টেশনেই জ্বালানি নেই সাইনবোর্ড ঝোলানো রয়েছে। তাছাড়া অবৈধ মজুদ ও কৃত্রিম সংকটের কিছুটা বাস্তবতাও দেখা যাচ্ছে, বিপুল পরিমাণে অবৈধ মজুদকৃত জ্বালানি উদ্ধারের ঘটনায়। বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের জ্বালানি বিভাগের যুগ্ম সচিব (অপারেশন অনুবিভাগ) মনির হোসেন চৌধুরী গত বৃহস্পতিবার (৯ এপ্রিল) সচিবালয়ে জ্বালানি বিভাগের সম্মেলনকক্ষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে জানান, সারা দেশে জ্বালানি ও খনিজসম্পদ বিভাগের অভিযানে অবৈধভাবে মজুদকৃত ৪ লাখ ৬৯ হাজার ৪২ লিটার জ্বালানি তেল উদ্ধার করা হয়েছে। তার ভাষ্যানুযায়ী, জ্বালানি তেলের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে গত ৩ মার্চ থেকে ৭ এপ্রিল পর্যন্ত পরিচালিত ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রমে এসব জ্বালানি উদ্ধার করা হয়। কিন্তু গত কয়েকদিন অবৈধ মজুদ থেকে উদ্ধারের কোনো খবর পাওয়া যাচ্ছে না। এর মানে অবৈধ মজুদ নেই অথবা এখন আর অভিযান হচ্ছে না।
সরকারি তথ্যানুযায়ী, গত ৮ এপ্রিল পর্যন্ত দেশে ডিজেল মজুদ ছিল এক লাখ ৫৪ হাজার মেট্রিক টন, নিশ্চিতভাবে আরও এক লাখ ৭৫ হাজার মেট্রিক টন ডিজেল আসছে। ইতোমধ্যে দুটি জাহাজ এসেও পড়েছে। এসব তথ্য জানান, যুগ্ম সচিব মনির হোসেন চৌধুরী। তিনি জানান, দেশে মাসে অকটেন প্রয়োজন হয় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন, ৮ এপ্রিল পর্যন্ত মজুদ রয়েছে ১০ হাজার মেট্রিক টন, ২৫ হাজার মেট্রিক টন যেকোনো সময় পৌঁছাবে, আরও আসছে ২৫ হাজার মেট্রিক টন। অন্যদিকে পেট্রোল আমদানি করতে হচ্ছে না, দেশেই উৎপাদন হয়, তিনি জানান পেট্রোল মজুদ রয়েছে ১৬ হাজার মেট্রিক টন। পেট্রোল উৎপাদনের জন্য যেসব কাঁচামাল প্রয়োজন তাও পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। ফলে পেট্রোলের কোনো সংকট নেই, সংকট সৃষ্টির আশঙ্কাও নেই।
তাহলে সংকট কেন? এমন প্রশ্নে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, সংকটের মূল কারণ দুটি। একটি হচ্ছে অতিরিক্ত দামে বিক্রির জন্য অবৈধ মুজদ; অন্যটি হচ্ছে ‘প্যানিক বায়িং’ বা আতঙ্কিত হয়ে কেনার হিড়িক। এই দুই কারণেই কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বাস্তব সংকট সরকার উপলব্ধি করলেও স্বীকার করতে চাচ্ছে বলে মনে করছেন ভুক্তভোগী পরিবহন মালিকরা।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র মিলে ইরানে হামলা শুরুর পর বিশ্বের জ্বালানি বাজার অস্থির হয়ে ওঠে। তাতে শঙ্কিত হয়ে কেনা বেড়ে গেলে সরকার মার্চের শুরুতে ফিলিং স্টেশনে রেশনিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয়। ঈদের আগে রেশনিং বন্ধ করে দেওয়া হলেও ফিলিং স্টেশনের লাইন আর শেষ হচ্ছে না।