বগুড়ায় গণসমাবেশে মিয়া গোলাম পরওয়ার

জাতীয় ঐক্য সৃষ্টি করে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করুন


৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৬

বগুড়া সংবাদদাতা : বিএনপি সরকার গঠন করেই দেশে রাজনৈতিক সংকট সৃষ্টি করেছে উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, জুলাই শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে বর্তমান সংসদ গঠিত হয়েছে। আপনারা সরকার গঠন করেছেন, এবার জুলাই সনদের ভিত্তিতে দেশ পরিচালনায় জাতীয় ঐক্য গড়ে তুলুন। দিল্লির কথায় দেশের ভেতরে বিভেদ সৃষ্টি করবেন না।
গত ৬ এপ্রিল সোমবার বিকেলে বগুড়া সদরের বাঘোপাড়া শহীদ দানেশ উদ্দিন স্কুল অ্যান্ড কলেজ মাঠে উপনির্বাচন উপলক্ষে পৃথক দুটি গণসমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
বগুড়া-৬ আসনের উপনির্বাচনে জামায়াতসহ ১১ দল মনোনীত প্রার্থী ও বগুড়া শহর জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলের সভাপতিত্বে গণসমাবেশে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিন, কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও বগুড়া অঞ্চলের সহকারী পরিচালক অধ্যাপক নজরুল ইসলাম, বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী, এনসিপির মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম, জাতীয় নারী শক্তির সদস্য সচিব ও এনসিপির যুগ্ম মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) ডা. মাহমুদা আলম মিতু ও বগুড়া জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যক্ষ আব্দুল হক সরকার।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, জুলাই আন্দোলনে যারা জীবন দিয়েছেন এবং যারা আহত হয়ে হাসপাতালে শুয়ে আছেন এই মানুষগুলো একটি বৈষম্যহীন, মানবিক বাংলাদেশ চেয়েছিলেন। শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী কাঠামো ভেঙে নতুন একটি গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ চেয়েছিলেন তারা। প্রধানমন্ত্রী নিজে গণভোটে হ্যাঁ’তে ভোট দিতে বলেছিলেন। জনগণ ভোট দিয়ে হ্যাঁ বিজয়ী করার পর এখন তিনি তা অস্বীকার করছেন। অন্তর্বর্তী সরকারের গণভোট আদেশ বাতিল করে প্রধানমন্ত্রী জনগণের সাথে প্রতারণা করছেন। যেই ৫ কোটি ভোটার হ্যাঁ ভোট দিয়েছেন তাদের সাথে প্রতারণা জাতি ভুলবে না, সতর্ক করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, ফ্যামিলি কার্ড ইমাম মুয়াজ্জিনদের টাকা দিয়ে মুখরোচক জনপ্রিয়তা অর্জন করতে গিয়ে ভাগাভাগি ভাগ-বাঁটোয়ারা দলীয়করণ নিয়ে তাদের মাঝে কোন্দল শুরু হয়েছে। এখানে যিনি এমপি প্রার্থী তার বিরুদ্ধেও অভিযোগ রয়েছে, সারা দেশে এমনটাই চলছে। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পাচ্ছে। পেট্রোল পাম্পে দীর্ঘ লাইন, তার পরও সরকার বলছে সংকট নেই। মারামারি খুনোখুনি বৃদ্ধি পেয়েছে। বাঁশবাগানের মাঝে রিলিফের চাল, মাটির নিচে পেট্রোল পাওয়া যাচ্ছে। অসৎ লোকের হাতে ক্ষমতা গেলে দেশের উন্নয়ন হয় না।
সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, দেশের মানুষের সাথে প্রতারণা করে অতীতে কেউ সুবিধা করতে পারেনি। শেখ হাসিনা যেমন মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে জোর করে ক্ষমতায় টিকে থাকতে চেয়েছিলেন, সেভাবে বিএনপিও সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে নিজেদের খবরদারি প্রতিষ্ঠার জন্য গণভোট, গুম কমিশন সংস্কারসহ জুলাই সনদের গুরুত্বপূর্ণ আদেশগুলো বাতিলের উদ্যোগ নিয়েছে। জামায়াতে ইসলামী বিরোধীদল হিসেবে জাতীয় সংসদে সরকারের এসকল গণবিরোধী উদ্যোগের প্রতিবাদ করছে, একই সাথে রাজপথে তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা করছে।
তিনি বলেন, দেশের ৫ কোটি মানুষ গণভোটের মাধ্যমে রাষ্ট্র সংস্কারের যেই ম্যান্ডেট দিয়েছে কোনো অপশক্তি যেন সেই ম্যান্ডেট নস্যাৎ করতে না পারে, সেজন্য জামায়াতের নেতৃত্বে বিরোধী জোট সবসময় সজাগ রয়েছে। সংসদের আলোচনায় কাজ না হলে রাজপথের আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে বাধ্য করা হবে বলেও তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন। তিনি আসন্ন উপনির্বাচনে বগুড়া-৬ আসনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী অধ্যক্ষ আবিদুর রহমান সোহেলকে বিজয়ী করতে ভোটারদের আহ্বান জানান।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে সারজিস আলম বলেন, বিএনপি গণভোটের রায় অস্বীকার করে শুধু ভোটারদের অসম্মান করছেন- তা নয়, তারা নিজেদের ৩১ দফার সাথেও প্রতারণা করছে। ৩১ দফার প্রথম দফায় সংবিধান সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এসে এখন তারা নিজেদের প্রতিশ্রুতিও মানতে চান না। তারা মুখে এক কথা আর কাজে আরেকটা করে নিজেদের কী প্রমাণ করছেন, সেটা জাতি ভালো করেই বুঝে গেছে।
তিনি আরও বলেন, সরকার সব বিশ্ববিদ্যালয়ে দলীয় চাটুকারদের ভিসি নিয়োগ করে শিক্ষা ব্যবস্থাকে দলীয়করণ করছে। ঋণখেলাপিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর করে দেশের অর্থনীতি ধ্বংস করছে। তিনি প্রশ্ন রাখেন- একজন ঋণ খেলাপি কিভাবে দেশের অর্থনীতি ঠিক করবে? তিনি আসন্ন উপনির্বাচনে প্রশাসনকে নিরপেক্ষ থাকার আহ্বান জানিয়ে ভোটারদের দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান। পরে শহরের শহীদ খোকন পার্কে আরেকটি নির্বাচনী গণসমাবেশে বক্তব্য দেন নেতারা।
অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দি বলেন, আমরা বেগম জিয়ার প্রতি সম্মান জানিয়ে অতীতে বগুড়ায় বিএনপিকে ছাড় দিয়েছি। আর কোনো ছাড় নয়, উপনির্বাচনে দাঁড়িপাল্লাকে বিজয়ী করতে হবে। বগুড়া সদরের ভোটাররা ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ভালোবেসে তারেক রহমানকে ভোট দিয়েছিলেন, কিন্তু তিনি আপনাদের ভালোবাসার প্রতিদান দিতে পারেননি। বগুড়ার আসন ছেড়ে দিয়েছেন বলেই আঙুলের কালির দাগ মুছে যাওয়ার আগেই আবারও ভোট দিতে হচ্ছে। জামায়াতে ইসলামী বিজয়ী হলে জনগণের অধিকার শতভাগ নিশ্চিত করা হবে। বিগত নির্বাচনে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের মাধ্যমে হারিয়ে দেয়া হয়েছে। তিনি দলমত ভুলে সবাইকে ৯ এপ্রিল কেন্দ্রে গিয়ে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দেওয়ার আহ্বান জানান।
গোলাম রব্বানী বলেন, বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর গণভোটের রায়কে অস্বীকারের মাধ্যমে জাতির সাথে বেঈমানি করেছে। আমরা এই বিএনপির প্রতি আর আস্থা রাখতে পারি না। জনগণ আর কোনো ভুল করবে না।
পরে প্রধান অতিথিসহ অন্যান্য অতিথিরা শহরের শহীদ খোকন পার্কে আরেকটি গণসমাবেশে বক্তব্য দেন। গণসমাবেশে বক্তব্য দেন শিক্ষাবিদ ড. সৈয়দ আব্দুল আজিজ, শহর জামায়াতের সেক্রেটারি অধ্যাপক আ.স.ম আব্দুল মালেক, জেলা জামায়াতের নায়েবে আমীর আব্দুল হাকিম সরকার, এনসিপির জেলা সভাপতি এস এ মাহমুদ, জামায়াত নেতা রফিকুল আলম, আল-আমিন, আব্দুস ছালাম তুহিন, আব্দুল হামিদ বেগ, ইকবাল হোসেন, হেদাইতুল ইসলাম প্রমুখ।
সমাবেশগুলোয় হাজার হাজার নারী ও পুরুষ অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া সন্ধ্যায় শহরের সাতমাথা, জলেশ্বরীতলাসহ গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় এনসিপি নেতা সার্জিস আলম ও ডা. মাহমুদা আলম মিতুর নেতৃত্বে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে গণসংযোগ করেন নেতাকর্মীরা।