ভোলায় জামায়াতের মহিলা কর্মীকে গ্রেফতারে দেশজুড়ে নিন্দার ঝড়

সাওদা সুমির সঙ্গে নিকৃষ্ট আচরণ নব্য ফ্যাসিবাদের বার্তা : ডা. শফিকুর রহমান


৯ এপ্রিল ২০২৬ ১১:৩৪

সোনার বাংলা ডেস্ক : সামাজিক-মাধ্যম ফেসবুকে সরকারের সমালোচনামূলক একটি পোস্ট শেয়ার করায় ভোলা পৌরসভা এলাকায় জামায়াতের মহিলা বিভাগের এক কর্মীকে গ্রেফতারের ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। ফ্যাসিস্ট আমলের করা কালো আইন সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে জামায়াতের মহিলা বিভাগের কর্মী বিবি সাওদাকে গত ৫ এপ্রিল রোববার রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে গ্রেফতার করে ভোলার ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারের ঘটনাটিকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
গ্রেফতারের এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতের মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মুয়াযযম হোসাইন হেলাল, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনির, ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম। পরে গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুরে ভোলা জেলা আদালত থেকে বিবি সাওদা সুমি জামিনে মুক্তিলাভ করেন।
বিবি সাওদা তার নিজের ফেসবুক আইডিতে একটি পোস্ট দিয়েছিলেন। তবে পোস্টটির শেষে ইংরেজিতে লেখা ছিল ‘জায়েফ নাদিম খান’। পোস্টটি ছিল নিম্নরূপ, “মনে হচ্ছে, সরকার কিছু একটা লুকাতে চেষ্টা করছে। আমরা হয়তো আসলেই সামনে একটা মহাবিপদে পড়তে যাচ্ছি। তেল নিয়ে সরকার কূটনৈতিক রাজনৈতিক সব দিক দিয়েই ঝামেলায় আছে।
এটা দ্রুত সুরাহা করার জন্য আন্তর্জাতিক পরিচিতি, কূটনৈতিক লবিং-এর বিভিন্ন চ্যানেল ম্যানেজ করার মতো ক্যাপাবল লোকবল বিএনপিতে নেই। কারণ এদের আসলেই কেউ চিনে না। ২০ বছর ক্ষমতায় না থাকায় এদের পরিচিতি হারিয়ে গেছে। কেউ কেউ চশমা তুলে খুব চেষ্টা করে এক দুইজনকে চিনতে পারে কি না’। গোটা বিএনপিতে এক নিমিষেই আন্তর্জাতিক, লবিং, চ্যানেল সব ম্যানেজ করে ফেলার মতো গ্রহণযোগ্য কেউ নেই। এমনকি জামায়াতেও নেই। এই সত্য বিবেচনায় রাখতেই হবে।
তেল সংকট যখন তীব্র হবে তখন মানুষের ঘরে বিদ্যুৎ থাকবে না, চুলা জ্বলবে না। জিনিসপত্রের দাম আকাশছুঁয়া হবে। খাওয়া জুটবে না। দুর্ভিক্ষও দেখা দিতে পারে। মানুষ সরকারকে টে*হি* ক্ষমতা থেকে নামাবে। ভয়াবহ এক অবস্থা হবে। এগুলো এক্সট্রিম পর্যায়ের পরিণতির কথা বললাম। আশা করি, এই পর্যায়ে দেশ যাবে না।
রাজনৈতিক দলগুলো ও তাদের কর্মী সমর্থক এবং সরকারের উচিত অযথা গালগল্প করা পেইড সাংবাদিক, কন্টেন্ট ক্রিয়েটরদের দিয়ে হাস্যকর যুক্তি আর মিথ্যা না ছড়িয়ে মানুষকে সত্য বলে প্রস্তুতি নেয়ার উপায় বলে দেয়া। এতে অন্তত মানুষ সচেতন হবার সুযোগ সময় পাবে।”
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের নিন্দা
বিবি সাওদা ইসলামকে অন্যায়ভাবে গ্রেফতারে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান। গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার সকালে নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে এক পোস্টে তিনি লেখেন, ‘জামায়াত কর্মী সাওদা সুমির সঙ্গে যে নিকৃষ্ট আচরণ করা হয়েছে, তা নব্য ফ্যাসিবাদের বার্তা দিচ্ছে। ফ্যাসিবাদীরা সকল যুগেই নিজেদের ব্যর্থতা আড়াল করার জন্য প্রতিবাদী জনগণের কণ্ঠ নির্লজ্জ ও নিষ্ঠুরভাবে স্তব্ধ করতে চায়। পরিণতিতে তাদের কণ্ঠই স্তব্ধ হয়ে যায়। জানি না, অন্তরে যারা ফ্যাসিবাদ লালন করে, তারা অতীত থেকে শিক্ষা নেবে কি না। লজ্জা, লজ্জা!’
সাওদা সুমিকে গ্রেফতার সম্পূর্ণ অন্যায় ও মানবাধিকারের পরিপন্থি : মিয়া গোলাম পরওয়ার
ভোলা পৌরসভা মহিলা জামায়াতে ইসলামীর কর্মী সাওদা সুমিকে গত ৫ এপ্রিল রাত ১১টার দিকে নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গত ৭ এপ্রিল এক বিবৃতি দিয়েছেন।
বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভোলায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের কর্মী সাওদা সুমি সরকারের সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একটি স্ট্যাটাস প্রদান করায় তাঁকে পুলিশ কর্তৃক গ্রেফতার করা হয়েছে; যা সম্পূর্ণ অন্যায়, অমানবিক, নিন্দনীয় এবং মৌলিক মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন। আমি এই গ্রেফতারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছি এবং এর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি।
তিনি আরও বলেন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা সংবিধান স্বীকৃত নাগরিক অধিকার। সরকারবিরোধী মতপ্রকাশ করলেই কাউকে গ্রেফতার করা স্বাধীন রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক চেতনার পরিপন্থি এবং আইনের শাসনের ওপর সরাসরি আঘাত।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকার ক্রমাগতভাবে বিরোধী মত ও রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কণ্ঠরোধ করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে ব্যবহার করছে। জামায়াতের নারী কর্মী সাওদা সুমির গ্রেফতার সরকারের দমনমূলক ও ফ্যাসিবাদী মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ।
মিয়া গোলাম পরওয়ার আরও বলেন, একটি স্বাধীন দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতপ্রকাশ করাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ধরনের গ্রেফতার দেশের রাজনৈতিক পরিবেশকে আরও অস্থির করে তুলবে এবং জনগণের মধ্যে ভয় ও আতঙ্ক সৃষ্টি করবে।
এছাড়া তিনি দেশের সচেতন নাগরিক সমাজ, মানবাধিকার সংগঠন, আইনজীবী সমাজ, সাংবাদিক সমাজ এবং আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাসমূহের প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, বাংলাদেশে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা হরণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে, প্রতিবাদ জানাতে হবে এবং আন্তর্জাতিক মহলকে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, নারী অধিকার নিয়ে যে সব তথাকথিত প্রগতিবাদী নারী সংগঠন অহর্নিশ মুখে ফেনা তোলেন তারা এখন নিরব কেন?
তিনি বলেন, দেশের নাগরিকদের ওপর জুলুম-নির্যাতন ও দমন-পীড়ন চালিয়ে কোনো সরকার ক্ষমতায় টিকে থাকতে পারে না। জনগণের অধিকার হরণ করে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস চালানোর দায় সরকারকেই নিতে হবে।
আমি অবিলম্বে সাওদা সুমির নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি এবং এ ঘটনার সাথে জড়িতদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানাচ্ছি। একই সঙ্গে জুলুম-নির্যাতন বন্ধ করে জনগণের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার জন্য সরকারের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।
ভোলা জেলা জামায়াতের সংবাদ সম্মেলন
বিবি সাওদাকে গ্রেফতারের ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে তার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভোলা জেলা শাখা। গত ৬ এপ্রিল সোমবার ভোলায় এক সংবাদ সম্মেলনে জেলা জামায়াতের নেতারা এই প্রতিবাদ জানান। ভোলা জেলা আমীর মুহাম্মদ জাকির হোসাইন বলেন, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম রাজনীতি, সমাজনীতি ও মুক্তচিন্তার একটি উন্মক্ত ফ্লাটফর্ম। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের নাগরিকরা পরমতসহিষ্ণুতা ও বাক স্বাধীনতার কারণে এ বিষয়টি অত্যন্ত উদারচিত্তে উপভোগ করে থাকে। বিগত ফ্যাসিস্ট সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনগণের বাকস্বাধীনতাকে এই আইনটির অপব্যবহার করে ব্যাপকভাবে রুদ্ধ করেছিল। যে কারণে বহু রক্তের বিনিময়ে জুলাই বিপ্লব ঘটেছিল।
তিনি বলেন, বিপ্লব উত্তর একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জনগণ তাদের স্বাভাবিক জীবন ও সামাজিক যোগাযোগ প্ল্যাটফর্মে যৌক্তিক স্বাধীনতা উপভোগ করবে এটাই প্রত্যাশা ছিল। হঠাৎ করে ভোলার শান্ত শহরে পৈশাচিক ফ্যাসিস্টের কালোথাবায় আমাদের নিরীহ রাজনৈতিক মহিলা কর্মী বিবি সাওদাকে কোনো ধরনের অপরাধের দালিলিক প্রমাণপত্র ছাড়াই হঠাৎ পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের আদর্শ একাডেমি সড়কের যমযম টাওয়ারের নিজ বাসা থেকে গত ৫ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী গ্রেফতার করে।
তিনি আরও বলেন, সাওদার তিন বছরের বাকপ্রতিবন্ধী একটি সন্তান রয়েছে। যে শিশুটিকে মা ছাড়া অন্য কেউ লালন-পালন করতে পারে না। পরিবারের পক্ষ থেকে শিশু সন্তানটির প্রতিপালনের স্বার্থে যে কোনো শর্তে তাকে গ্রেফতার না করার অনুরোধ জানানো হলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ওপরের নির্দেশ রয়েছে মর্মে তাকে গ্রেফতার করে।
জেলা আমীর বলেন, ওপরের এ নির্দেশদাতা কে বা কারা, জনগণ তাদের পরিচয় জানতে চায়। গ্রেফতারের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে অবিলম্বে তার মুক্তির দাবি জানান তিনি। অন্যথায় এ সরকারকে ফ্যাসিস্ট সরকারের ভাগ্য বরণ করতে হবে বলেও হুঁশিয়ারি দেন জামায়াতের এই নেতা।
এদিকে বিবি সাওদাকে গ্রেফতারের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন মহিলা বিভাগের সেক্রেটারি নুরুন্নিসা সিদ্দিকা। গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার দেয়া বিবৃতিতে তিনি বলেন, ভোলার বিবি সাওদা (৩৭) নামে জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগের কর্মী, যিনি ফেসবুকে দেশের জ্বালানি পরিস্থিতি ও রাষ্ট্রীয় বিষয়ে মতামত প্রকাশ করেছিলেন। যাকে জেলা গোয়েন্দা শাখার সাইবার ক্রাইম ইনভেস্টিগেশন সেল তাকে নিজ বাড়ি থেকে গ্রেফতার করে। তার ‘অপরাধ’ সরকারের নীতির সমালোচনা করা। একজন নারীকে রাতে বাড়ি থেকে আটক করা এটি কোনো আইনি প্রক্রিয়া নয়। সাইবার ক্রাইম সেলকে ব্যবহার করে ফেসবুক পোস্টের জন্য নাগরিকদের গ্রেফতার করা গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য অশনিসংকেত।
তিনি আরও বলেন, রাতের গভীরে গৃহ থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া কোনো সাধারণ ঘটনা হতে পারে না। চরমভাবে নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ, নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হয় অথচ নারীর গণতান্ত্রিক অধিকার ক্ষুণ্ন করা হয়েছে। এটা ভয়ের এক শাসনব্যবস্থার ইঙ্গিত। বিপ্লোপত্তর দেশে নারী গ্রেফতার করার মতো ঘটনা আমরা মেনে নেব না।
নুরুন্নিসা সিদ্দিকা বলেন, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী মহিলা বিভাগের পক্ষ থেকে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। এ ঘটনা সরকারের অগণতান্ত্রিক আচরণের বহিঃপ্রকাশ। আমরা অবিলম্বে বিবি সাওদার নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করছি। একই সাথে দেশের সকল নারীর মতপ্রকাশের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের বিশেষ দৃষ্টি দেয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
এছাড়া বিবি সাওদাকে গ্রেফতারের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে এবং তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছেন জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এডভোকেট মোয়াযযম হোসাইন হেলাল।