জুলাই সনদ থেকে সরে যাওয়া বিএনপির অন্তহীন প্রতারণা
৯ এপ্রিল ২০২৬ ১০:০৮
॥ জামশেদ মেহদী ॥
গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার গঠনের পর ২ মাসও অতিক্রান্ত হয়নি। অথচ এই ২ মাসের মধ্যেই জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে দেশ সুস্পষ্টভাবে দুই ভাগে ভাগ হয়েছে। এক ভাগে রয়েছে বিএনপি- যারা মনে করে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ-২০২৫ অবৈধ। প্রেসিডেন্টের এ ধরনের আদেশ জারি করার কোনো ক্ষমতা নেই। তাদের মতে, এ আদেশ নাকি অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তহীন প্রতারণার দলিল। এ কথাটি জাতীয় সংসদে অত্যন্ত দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ। সালাহউদ্দিন আহমেদ এ কথা বলার সময় আরো পরিষ্কারভাবে বলেছেন যে, এ কথা তিনি বলছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের পক্ষে। তিনি যখন এ কথা বলেন, তখন তারেক রহমান সংসদে উপস্থিত ছিলেন এবং সালাহউদ্দিন আহমেদের কথার পর তিনি টেবিল চাপড়াতে থাকেন। বিএনপির সাথে আরো রয়েছে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ- যারা কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় প্রকাশ্যে স্বনামে রাজনীতি করতে পারছে না। কিন্তু তারা বিভিন্ন নামে, বিভিন্ন বুদ্ধিজীবীর নামে, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মাধ্যমে বিএনপির ঐ বক্তব্যকেই সমর্থন করে যাচ্ছে। এখানে আরো উল্লেখ করা যেতে পারে যে, জুলাই বিপ্লবের পর তো সকল আওয়ামী লীগার ভারতে পালিয়ে যায়নি। নেতা গোছের কিছু ব্যক্তি এবং তৃণমূলেও জনতার ওপর জুলুম করা কয়েক হাজার ব্যক্তি ভারতে পালিয়েছে। কিন্তু তাদের অসংখ্য সমর্থক দেশে রয়ে গেছে। বিগত নির্বাচনে এরা বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। সেই সাথে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সিংহভাগ বিএনপিকে ভোট দিয়েছে। এরা সকলে মিলে জুলাই বিপ্লবকেই ভুলিয়ে দিতে চায়।
জুলাই বিপ্লবের বিরুদ্ধে সরাসরি কথা বলার সাহস না থাকায় এরা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের বিরোধিতায় বিএনপি যে অবস্থান নিয়েছে, সেই অবস্থানকে সমর্থন করে বিএনপির হাত শক্তিশালী করছে।
পক্ষান্তরে জামায়াতের নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট বিনা শর্তে জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ হুবহু বাস্তবায়ন করার জন্য অবস্থান নিয়েছে। তাদের সাথে রয়েছেন সমাজের অধিকাংশ শিক্ষিত সচেতন মানুষ। এদের মধ্যে এমন লোকও রয়েছেন যারা একসময় বিএনপির পক্ষে মুখর ছিলেন। এদের মধ্যে দুয়েকজনের নাম করা যায়। একজন হলেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের সাবেক প্রধান ড. দিলারা চৌধুরী। আরো আছেন ড. ইউনূসের শাসনামলে নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার।
এরা মনে করেন যে, ড. ইউনূস সরকার জুলাই সনদ আদেশের মাধ্যমে অন্তহীন প্রতারণা করেননি। বরং আজ যারা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ নিয়ে টালবাহানা করছেন, সময়ক্ষেপণ করছেন এবং এ প্রক্রিয়ায় একসময় জুলাই সনদকে তামাদি করার ফন্দি এঁটেছেন, বিএনপিসহ ঐসব শক্তিই জনগণের সাথে প্রতারণা করছেন। অন্তহীন প্রতারণা যদি কেউ করে থাকেন, তাহলে জুলাই সনদকে পেছনের সিটে ঠেলে দেওয়ার চক্রিরাই করছেন।
জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট তথা জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশের পক্ষের জোট আইনগতভাবে এবং নৈতিকভাবে একশত ভাগ সত্যের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে যদি প্রতারণা করা হয়ে থাকে, তাহলে বিএনপি এবং তার সমর্থকরা ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন এবং গণভোটে অংশ নিলেন কেন? ডেইলি স্টার, প্রথম আলো, সমকালসহ দেশের প্রধান প্রিন্ট মাধ্যমে একাধিক নিবন্ধ এবং কলাম লিখে তারা সরকারের কাছে একটি জ¦লন্ত প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। তারা বলছেন যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ প্রেসিডেন্ট জারি করেছেন গত বছরের অর্থাৎ ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর। আর নির্বাচন হয়েছে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। মাঝখানে সময় ছিলো ২ মাস ২৯ দিন, অর্থাৎ ৩ মাস।
প্রেসিডেন্টের ঐ আদেশ যদি অবৈধ হয়ে থাকে, তাহলে তারা ৩ মাসের মধ্যে ঐ বিষয়টি ইউনূস সরকারকে জানালেন না কেন? তখনো ঐকমত্য কমিশন সক্রিয় ছিল। সেখানে ৩০-৩২টি দল মিলে ব্যাপক আলোচনা করে হয়তো সকলের নিকট গ্রহণযোগ্য একটা সমাধান বের করা যেত।
দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্টের যদি এ ধরনের আদেশ জারি করার ক্ষমতা নাই থাকে, তাহলে তারা নির্বাচন এবং গণভোটে অংশ নিলেন কেন? নির্বাচন এবং গণভোট তো হয়েছে প্রেসিডেন্টের ঐ আদেশের অধীনে। আলোচ্য বাস্তবায়ন আদেশে পরিষ্কার বলা আছে যে, ভোটারদের দেওয়া হবে ২টি ব্যালট। একটি সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য। আরেকটি গণভোটে হ্যাঁ বা না ভোট দেওয়ার জন্য। ঐ আদেশে এ কথা আরো স্পষ্ট বলা হয়েছে যে, নির্বাচিত সদস্যরা ২টি শপথ নেবেন। একটি জাতীয় সংসদ সদস্য হিসেবে। আরেকটি সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে। আসলে সংবিধান সংস্কার পরিষদ বলতে গণপরিষদই বোঝানো হয়েছে। হয়তো কৌশলগত কারণে গণপরিষদ কথাটি ব্যবহৃত হয়নি। সংসদ সদস্য হিসেবে শপথনামা এবং সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে দুটি শপথনামা তৈরি করা হয়েছিলো এবং নির্বাচিত সদস্যদের দেওয়া হয়েছিলো।
স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী পদত্যাগ করে পলাতক থাকায় এবং ডেপুটি স্পিকার বিভিন্ন অভিযোগে কারাগারে থাকায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার প্রথমে সংসদ সদস্যদের শপথবাক্য পাঠ করান। এই শপথবাক্য পাঠ করেন নবনির্বাচিত ২৯৮ জন সদস্যই (দুটি আসনে নির্বাচন স্থগিত করা হয়েছে)। কিন্তু সংস্কার পরিষদে শপথের বেলায় বিএনপি শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানায় এবং শুধুমাত্র জামায়াত নেতৃত্বাধীন বিরোধীদলের ৭৭ জন সদস্য সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন।
কেন বিএনপি সংস্কার আদেশের ব্যাপার প্রকাশ্যে বিরোধিতা করলো- এ ব্যাপারে বিএনপির সিনিয়র নেতৃবৃন্দকে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করেন। তারা এও বলেন যে, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী এবং তখনকার বিএনপি প্রধান তারেক রহমান তার নির্বাচনী একাধিক জনসভায় গণভোটে হ্যাঁ ভোটের স্বপক্ষে ভোট দেওয়ার জন্য জনগণের প্রতি আহ্বান জানান। আজ তারা কেন গণভোটে ৭০ শতাংশ ভোটে হ্যাঁ বিজয়ের পর এখন গণভোট বাস্তবায়ন করছেন না? উত্তরে বিএনপির দুই নেতা স্পষ্ট ভাষায় বলেন যে, সেটি ছিলো বিএনপির একটি কৌশল। তখন যদি বিএনপি বলতো যে, তারা সংস্কার আদেশে গণভোটের বিরোধী, তাহলে হয়তো সংসদ নির্বাচন হতো না। অথবা হলেও অনেক পিছিয়ে যেত। তাই যাতে সময়মতো নির্বাচন হয়, সেজন্য বিএনপি ঐ কৌশল অবলম্বন করেছিল। এ কথাটি বলেছেন বিএনপির অন্তত সিনিয়র দুই নেতা। এদের একজন হলেন বর্তমান স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমেদ এবং অপরজন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ।
বিএনপির এ কৌশলের সোজা বাংলা মানে কী? সোজা বাংলা মানে হলো, তারা ইলেকশনের আগে মিথ্যা বলেছিল। মিথ্যা শব্দটি অনেক কঠিন। কিন্তু বিএনপি নির্বাচনের আগে এবং পরে তথাকথিত কৌশলের কথা বলে যা বোঝালো, সেটি চরম মিথ্যাচার। সেটি জনগণের সাথে সবচেয়ে বড় প্রতারণা।
অধ্যাপিকা দিলারা চৌধুরী একাধিক টকশোতে অব্যাহতভাবে বলে যাচ্ছেন যে, জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে বিএনপি যে খেলা শুরু করেছে, তার জন্য জাতিকে অনেক বড় মূল্য দিতে হবে। তাদের এই খেলার ফলে জাতি এক ভয়াবহ সাংবিধানিক জটিলতায় নিক্ষিপ্ত হবে, যেখান থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন হবে। বদিউল আলম মজুমদার বলেছেন যে, বিএনপির এ অবস্থান পরিবর্তনের ফলে জনগণের মধ্যে আস্থার সঙ্কট সৃষ্টি হবে।
বাংলাদেশের শিক্ষিত মহলের মধ্যে যে অংশটিকে সেক্যুলার বলা হয়, তাদেরও বিপুল মেজরিটি টকশোতে কথা বলে এবং সংবাদপত্রে লেখালেখি করে বলছেন যে, এভাবে গণরায়কে অসম্মান করলে এই সরকার দ্রুত জনসমর্থন হারাবে, যার পরিণতিতে দেশ আবার একটি টালমাটাল পরিস্থিতিতে নিক্ষিপ্ত হবে। যেসব পত্রপত্রিকাকে মেইনস্ট্রিম পত্রপত্রিকা বলে মনে করা হয়, তারা বলছেন যে, এই বিরোধটি সংসদেই মিটিয়ে ফেলা উচিত ছিল। যদি সেই বিরোধ সংসদের বাইরে চলে আসে, তাহলে সেই বিরোধের অনেক ডালপালা গজাবে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে বিরোধটি ইতোমধ্যেই সংসদের বাইরে চলে এসেছে।
সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং বিষয় হলো, গত ৬ এপ্রিল ডেইলি স্টারের শেষ পৃষ্ঠার একটি রিপোর্ট। ঐ রিপোর্টের শিরোনাম, “Ordinance repeal could have been handled better/BNP leaders at standing Committee metting.” বাংলা অনুবাদ : “অধ্যাদেশ বাতিলকে আরো ভালোভাবে হ্যান্ডেল করা যেত/স্থায়ী কমিটির সভায় বিএনপি নেতৃবৃন্দ”।
খবরে বলা হয়, Some senior BNP leaders have expressed disappointment with the way the repeal of several key ordinances, issued during the interim government, was handled.
They said the issue was poorly managed despite there being valid grounds for the move. As a result, the opposition is now using it to mobilise protests and question the ruling party’s stance on the July charter, which could have been avoided with clearer and more timely public communication.
বাংলা অনুবাদ : ‘অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারিকৃত কতিপয় ইস্যুকে যেভাবে বাতিল করা হয়েছে, সেটা দেখে কতিপয় সিনিয়র বিএনপি নেতা হতাশা প্রকাশ করেছেন। বাতিলের পেছনে বৈধ যুক্তি থাকা সত্ত্বেও বিষয়টিকে অত্যন্ত আনাড়িভাবে ম্যানেজ করা হয়েছে। ফলে প্রতিবাদ করার জন্য বিরোধী দল একটি ইস্যু পেয়ে গেছে। তারা জুলাই সনদে বিএনপির অবস্থানকেই প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। আরো স্পষ্ট এবং সময়োপযোগী জনসংযোগের মাধ্যমে বিরোধীদলের হাতে ইস্যু তুলে দেওয়াকে এড়ানো যেত।’ গত ৫ এপ্রিল রোববার বিএনপির স্ট্যান্ডিং কমিটির সভায় নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন সদস্য আলোচ্য ইংরেজি দৈনিকটিকে এসব কথা বলেন।
ওপরের আলোচনা থেকে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, জনগণের সাথে ড. ইউনূস সরকার সনদ বাস্তবায়ন আদেশ জারি করে প্রতারণা করেননি। বরং বিএনপিই নির্বাচনের আগে এক কথা বলে এবং পরে সেই কথাটি কৌশল বলে জুলাই সনদ বাস্তবায়নে অনীহা দেখিয়ে তারাই জনগণের সাথে অন্তহীন প্রতারণা করেছেন।
Email : jamshedmehdi15@gmail.com