আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ
৯ এপ্রিল ২০২৬ ০৯:৫৬
স্টাফ রিপোর্টার : আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রেখেই সংসদে পাস হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের (সংশোধিত) অধ্যাদেশ। এর আগে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই অধ্যাদেশ জারি করেছিল। গত ৮ এপ্রিল বুধবার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে এই অধ্যাদেশটি পাস হয়। এর আগে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশকে’ আইনে রূপান্তর করার সিদ্ধান্ত নেয় বিএনপি সরকার। অধ্যাদেশটি সংশোধন করে শাস্তির বিধান যুক্ত করার প্রস্তাব করা হয়। সেই সংশোধনীসহ অধ্যাদেশটি পাস হলো। অন্তর্বর্তী সরকারের জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশ ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম দিনে, গত ১৩ মার্চ উত্থাপন করা হয়। সেদিন গঠিত ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাই করে। সংবিধানের ৯৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, অধ্যাদেশ সংসদে পাস না হলে ৩০ দিন তথা ১২ এপ্রিলের পর তা কার্যকারিতা হারাবে।
সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত ব্যক্তি বা সত্তা এবং তাদের কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ করার বিধান যুক্ত করে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ অনুমোদন করেছে জাতীয় সংসদ। গত বুধবার দুপুরে জাতীয় সংসদে এ সংক্রান্ত ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) বিল’ পাস হয়। পাস হওয়া বিলে অধ্যাদেশের বিষয়বস্তুতে কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি।
অধ্যাদেশের মাধ্যমে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে সংশোধনী এনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও তার নেতাদের বিচার কার্যসম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল অন্তর্বর্তী সরকার। এর আগে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে কোনো সত্তার কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান ছিল না। তখন বলা ছিল, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে ওই ব্যক্তিকে তফসিলে তালিকাভুক্ত করতে পারে বা সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে। তবে অধ্যাদেশের মাধ্যমে সংশোধনী এনে সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধের বিধান যুক্ত করা হয়। এটিকে আইনে রূপ দিতে জাতীয় সংসদে বিল পাস হলো।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে পাসের জন্য উত্থাপন করেন। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান এ সময় আপত্তি জানিয়ে বলেন, এ সংক্রান্ত একটি তুলনামূলক শিট তারা ৩-৪ মিনিট আগে হাতে পেয়েছেন। এটা পুরো পড়তে পারেননি। এটি অবশ্যই একটি স্পর্শকাতর আইন। আইনটি পাসের জন্য তাদের আরেকটু সময় দেওয়া হোক।
জবাবে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, আপত্তি জানানোর জন্য একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। সেই সময় আপত্তি হলে গ্রাহ্য করতে পারতেন। বিলের এই পর্যায়ে এসে আর আপত্তির সুযোগ নেই।
জবাবে বিরোধীদলের নেতা বলেন, দুঃখজনকভাবে শিটটা তো পেয়েছি এই মাত্র।
তখন স্পিকার বলেন, এ বিষয়টি হয়তো পরে দেখবেন, বিলের এই পর্যায়ে আপত্তির কোনো সুযোগ নেই।
পরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি সংসদে পাস করার প্রস্তাব করেন। এ সময় তিনি বলেন, বিলটি একটি গণহত্যাকারী সন্ত্রাসী সংগঠনের নিষিদ্ধকরণ সংক্রান্ত সংশোধনী। আগের যে সন্ত্রাসীবিরোধী আইন ছিল, তা সংশোধনের জন্য। বিরোধীদলীয় নেতার নিশ্চয় স্মরণ থাকার কথা, তারা এবং এনসিপির বন্ধুরা সবাই মিলে একটি আন্দোলন করেছিলেন। সেই আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে মোটামুটি বাংলাদেশে একটা জনমত সৃষ্টি হয়েছিল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করা হয়েছে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে। সে অনুযায়ী নির্বাচন কমিশনে তাদের নিবন্ধনটাও স্থগিত হয়ে আছে। এই আইনের অনুবলে পরবর্তীতে ৪৭ অনুচ্ছেদ অনুসারে আইসিটি অ্যাক্টেও পরিবর্তন এনে সংগঠনের বিচারে বিধান যুক্ত করে সেই আইনটাও সংশোধন করা হয়েছে। পরে বিলটি কণ্ঠভোটে পাস হয়।
বিলে যা আছে
বিলে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে সরকার প্রজ্ঞাপন দিয়ে সত্তাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা ও তফসিলে তালিকাভুক্ত করিতে পারবে বা সত্তার যাবতীয় কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণা করতে পারবে।
বিলে বলা হয়েছে, উক্ত সত্তা কর্তৃক বা উহার পক্ষে বা সমর্থনে যেকোনো প্রেস বিবৃতির প্রকাশনা বা মুদ্রণ কিংবা গণমাধ্যম, অনলাইন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অন্য যেকোনো মাধ্যমে যেকোনো ধরনের প্রচারণা, অথবা মিছিল, সভা-সমাবেশ বা সংবাদ সম্মেলন আয়োজন বা জনসম্মুখে বক্তৃতা প্রদান নিষিদ্ধ করিবে।
বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি হুবহু এবং ১৫টি সংশোধিত আকারে সংসদে অনুমোদের সুপারিশ করেছিল জাতীয় সংসদের বিশেষ কমিটি। বাকি ২০টির মধ্যে ৪টি রহিত করা এবং ১৬টি পরবর্তীতে আরও শক্তিশালী করে নতুন বিল আনার সুপারিশ করা হয়।
যে ১৫টি বিল সংশোধিত আকারে অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছিল, তার একটি সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যদেশ। তবে এ-সংক্রান্ত যে বিল পাস হয়েছে, সেখানে কোনো সংশোধনী আনা হয়নি।
ফিরে দেখা
২০২৪ সালে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থান ঠেকাতে গণহত্যা চালিয়েছিলো আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা। তাদের এ অপকর্মের কারণে তারা জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। ছাত্র-জনতার পক্ষে অবস্থান নিয়ে পক্ষে অবস্থান নিয়ে আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে আন্দোলন করে জামায়াত, এনসিপি, গণঅধিকার পরিষদ ইসলামী আন্দোলনসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দল।
এই দাবিতে সেই সময় প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বাসভবন যমুনা ঘেরাও করে কর্মসূচি পালন করেন এনসিপি। আন্দোলন চলাকালেই গত বছরের ১১ মে রাতে যমুনায় উপদেষ্টা পরিষদের জরুরি বৈঠক করে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের দুটি ধারা সংশোধন করে অন্তর্বর্তী সরকার। এতে বলা হয়, কোনো ব্যক্তি বা সত্তা সন্ত্রাসী কাজের সঙ্গে জড়িত থাকলে নির্বাহী আদেশে সরকার তাদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করতে পারবে। একই দিনে সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে। এরপর থেকে দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধ রয়েছে। আওয়ামী লীগের নিষিদ্ধে অধ্যাদেশসহ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ১৩৩টি অধ্যাদেশ জারি করে গেছে। এর মধ্যে ৯৮টি অধ্যাদেশ সরাসরি পাস এবং ১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধন করে আইনে পরিণত করার সুপারিশ করে সংসদীয় বিশেষ কমিটি। এই ১৬টির মধ্যে রয়েছে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের অধ্যাদেশটি। অধ্যাদেশগুলো যাচাই-বাছাইয়ে গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশের আলোকে সংসদে ধারাবাহিকভাবে বিলগুলো উঠছে এবং পাসও হচ্ছে।
ড. ইউনূস সরকারের সময় রাজনৈতিক দলগুলো আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দাবি তুললেও আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করেনি অন্তর্বর্তী সরকার, কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। দল নিষিদ্ধ না হলেও কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকায় অধ্যাদেশের ২০ ধারা অনুযায়ী আওয়ামী লীগ মিছিল-সভা-সমাবেশ করতে পারছে না। এই ধারা অনুযায়ী দলটির ব্যাংক হিসাব জব্দ হবে, পোস্টার-ব্যানার প্রচার করতে পারবে না, সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিতে পারবে না, গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমে তা প্রকাশ করা যাবে না এবং সংবাদ সম্মেলন করতে পারবে না দলটি। ওই নিষেধাজ্ঞার পর প্রকাশ্যে আর দলীয় কার্যক্রম চালাতে পারছে না আওয়ামী লীগ। এ প্রেক্ষাপটে ঝটিকা মিছিল, অনলাইনে বক্তব্য বিবৃতি দেয়া ছাড়া তেমন কোনো কার্যক্রম নেই দলটির। ঝটিকা মিছিল করতে গিয়ে বিভিন্ন স্থানে গ্রেপ্তার হয়েছেন অনেকে। বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে যে অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছিল সেটি সংশোধিত আকারে সংসদে পাসের জন্য সুপারিশ করেছে বর্তমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের গঠিত বিশেষ কমিটি।
বিশ্লেষকদের মতে, কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী অধ্যাদেশটি সংসদে আইন আকারে পাস হলে এরপর আওয়ামী লীগের যেকোনো কার্যক্রম শুধু নিষিদ্ধই নয়, বরং দলটির নেতাকর্মীদেরও বিচারের আওতায় আনা যাবে। বিশ্লেষকরা বলছেন, আইন করে একটি দলকে নিষিদ্ধ করার পরিবর্তে অপরাধ থাকলে আদালতে বিচার কিংবা জনগণকে ভোটের মাধ্যমে দলটিকে প্রত্যাখ্যান করার সুযোগ দিলে ভালো হতো, দল নিষিদ্ধের সিদ্ধান্ত গ্রহণযোগ্যতা পাবার ইতিহাস রাজনৈতিক অঙ্গনে নেই।
আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পাতায় দলটির মুখপাত্র মোহাম্মদ আলী আরাফাত এক বিবৃতিতে বলেন, ‘বিএনপিকে দেশের অন্যতম প্রাচীন ও বৃহত্তম রাজনৈতিক দলকে নিষিদ্ধ করার পূর্ণ দায় নিতে হবে এবং ভবিষ্যতে এর ফলে যে পরিণতি হবে, তা বিএনপিকেই ভোগ করতে হবে।’ আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধের দায় বিএনপির ওপর বর্তাবে কি-না এমন এক প্রশ্নের জবাবে বিএনপি ও সরকারের একটি সূত্র অবশ্য বলছে, ‘আইনটি পরে সংশোধনের সুযোগ থাকবে’।
বাস্তবতা হচ্ছে, সাড়ে ১৫ বছরের ক্ষমতার আমলে আওয়ামী লীগ দেশটাকে নরকে পরিণত করেছিল। মানুষের কথা বলার অধিকার ছিল না, বিরোধী দল দমনে হেন কোনো কাজ নেই, যা আওয়ামী লীগ করেনি। বিচারের নামে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ-নেতাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হয়েছে। আয়নাঘর বানিয়ে বছরের পর বছর নিরপরাধ মানুষকে সেখানে বন্দী করে রেখেছে। কোটা আন্দোলন থেকে সরকার পতন আন্দোলন ঠেকাতে গণহত্যা চালিয়েছে আওয়ামী লীগ। ফলে সাধারণ মানুষও চায় দল হিসেবে আওয়ামী লীগ ও দলটির যারা এসব অপরাধে জড়িত তাদের বিচার হোক। দীর্ঘ সাড়ে ১৫ বছরের অপরাধের জন্য সাধারণ মানুষ এই দলটির কার্যক্রম নিষিদ্ধও চায়।